সম্পাদকীয় খ্যাতি ও যশকে সবাই ধরে রাখতে পারে না। -মেকলে

ভেজাল খাদ্যে আয়ু কমছে

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৬-২০১৮ ইং ০০:১৩:০৫ | সংবাদটি ৬১ বার পঠিত

চলছে মধু মাস জ্যৈষ্ঠ। মওসুমী ফলের মনমাতানো গন্ধে বিমোহিত চারদিক। চলছে সিয়াম সাধনার মাস মাহে রমজান। ঈদের আগমনী বার্তাও বেজে ওঠেছে প্রকৃতিতে। সব মিলিয়ে বাঙালিদের জীবন প্রবাহে নতুন ব্যস্ততা। কিন্তু এতোকিছুর মধ্যেও আছে শঙ্কা, ভয়। সেটা হলো, খাদ্যপণ্য ও ফলমূলে বিষাক্ত ক্যামিকেল মিশ্রণ। আর সবচেয়ে ভয়ংকর খবর হলো, খাদ্যে ভেজাল ও ক্যামিকেল মেশানোর ফলে প্রকৃতপক্ষে মানুষের আয়ু কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অতিমাত্রায় কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহারও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, খাবার প্লেটে পৌঁছানো পর্যন্ত অনেকগুলো হাত পেরিয়ে আসায় নিরাপদ খাদ্যনীতি ‘বহুখাত’ ভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন। কেবল পরামর্শ অনুযায়ী সার ও ওষুধ ব্যবহারে কৃষকদের অভ্যস্ত করে দূষণ ঠেকানোর পাশাপাশি খাবারের গুণাগুণ ও নিরাপত্তা বাড়াতে কাজ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির কারণে দেশে শিশু মৃত্যুর হার কমেছে। তাই আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, দেশের মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাস্তবে নিরাপদ খাদ্যের অভাবে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের প্রকৃত আয়ু কমছে। শুধু মানুষের আয়ুই কমছে না, বরং ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। যার জন্য একদিকে বিশাল সংখ্যক মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে, অপরদিকে চিকিৎসাখাতে বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হচ্ছে। অথচ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলো আমাদের বোকা বানিয়ে খাদ্যপণ্য রাসায়নিক সার ও কীটনাশক নির্ভর করে তুলছে। ফসলে কীটনাশক বা পেস্টিসাইড ব্যবহার করলে প্রাথমিকভাবে ক্ষতিকর পোকা কমে যায় ঠিকই, তবে সবচেয়ে বেশি কমে উপকারী পোকা। তাছাড়া, ক্ষতিকর পোকার প্রজনন ক্ষমতা, জীবনচক্র এবং কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। তাই এসব পোকা কীটনাশকের বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে দিন দিন।
আসল কথা হলো, কীটনাশক ব্যবহারে জ্ঞানের অভাবে পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে। অর্থাৎ কীটনাশক ব্যবহারের যথাযথ নিয়ম মানা হয় না, ফলে হিতে বিপরীত হচ্ছে। দেখা গেছে, জাপানের কৃষকরা আমাদের চেয়ে সাত গুণ বেশি কীটনাশক ব্যবহার করে। তারপরেও জাপানীরা নিরাপদ খাবার খাচ্ছে। নিয়ম হলো, কীটনাশক ব্যবহার থেকে শস্য আহরণের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট সময় দিতে হয়। এই সময়সীমা কীটনাশকের গ্রুপ ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়। ফসলের খামারের বাইরেও বিভিন্ন ধাপে বিষাক্ত ক্যামিকেল মেশানো হয় খাদ্যপণ্যে। বিশেষ করে মওসুমী ফল ও শাকসবজিতে বিভিন্ন ধাপে মেশানো হয় বিষাক্ত ক্যামিকেল। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে একটি দেশের অবশ্যই আইন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রমাণ পেতে ল্যাবরেটরি থাকা জরুরি।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার পাস করেছে নিরাপদ খাদ্য আইন। প্রণীত হয়েছে জাতীয় নিরাপদ খাদ্যনীতি। এসব নীতি বা আইন কার্যকর হলে ভোক্তার নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে বলে আমরা আশা করছি। তবে এই আইন কার্যকর করতে সরকার কতোটুকু তৎপর, সেটাই প্রশ্ন। খাদ্যে রাসায়নিক দ্রব্য ও ভেজাল মিশ্রণের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালিত হয়। কিন্তু বিশুদ্ধ খাদ্য নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারে না। ভেজাল বিরোধী অভিযান কার্যকর করতে হলে দেশের সর্বত্র সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। দরকার সার্বক্ষণিক মনিটরিং। ফরমালিন বা অন্য যেসব বিষাক্ত ক্যামিকেল মেশানো হচ্ছে খাদ্যে, এইসব ক্যামিকেলের আমদানী ও বিপণনে কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে। আসল কথা হলো, খাদ্যপণ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণন ও ভোক্তা পর্যন্ত খাদ্যের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে সর্বমহলে সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT