স্বাস্থ্য কুশল

রোগ প্রতিরোধে তেঁতুল

মো. জহিরুল আলম শাহীন প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৬-২০১৮ ইং ০০:২৩:০৫ | সংবাদটি ৩৫ বার পঠিত

তেঁতুল আমাদের দেশের সকল মানুষের নিকট অতি পরিচিত একটি ফল। বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে প্রচুর তেঁতুল সব জায়গায় পাওয়া যায়। এ সময় তেঁতুল পেকে যায়। তেঁতুলের নাম শুনলে জিভে পানি আসে না এমন মানুষ খোঁজে পাওয়া বড় কঠিন। আমাদের মাঝে একটি ভুল ধারণা আছে তেঁতুল খেলে শরীরের রক্ত পানি হয়ে যায়। এটি একটি কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা। তেঁতুলে এমন কোনো উপাদান নেই যা রক্তকে পানিতে পরিণত করতে পারে। বরং তেঁতুলে দেহ গঠনের গুরুত্ব খাদ্য উপাদান রয়েছে যা ছোট বড় সকলের জন অতি প্রয়োজন। তেঁতুল গাছের পাতা, ফুল, ফল, বীজ, খোসা সবই মানুষের জন্য উপকারী। তেঁতুলের বৈজ্ঞানিক নাম ঞধসধৎরহফঁং রহফরপধ. খবমঁসরহড়ংধব পরিবারের একটি বৃহৎ আকৃতির বৃক্ষ। তেঁতুল গাছ সারা বাংলার গ্রাম গঞ্জের প্রতি বাড়িতে পাওয়া যায়। বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে তেঁতুল পাকে এবং এ সময় হাট বাজারে প্রচুর পাওয়া যায়। এ সময় ফলটি বীজ ছড়িয়ে রোদে শুকিয়ে সারা বছরের জন্য সংগ্রহণ করা যায় এবং খাওয়া যায়।
রাসায়নিক উপাদান : ফলের শাঁসে থাকে প্রচুর পরিমাণ টারটায়িক এসিড, সাইট্রিক এসিড, ম্যালিফ ও অ্যাসিটিক এসিড, পটাসিয়াম, টারটারেট, পেকটিন। বীজে থাকে অ্যালুুবুমিনয়েডস, ফ্যাট, কর্বোহাইড্রেট। পাতায় থাকে গ্লাইকোসাইডস। খোসায় থাকে ট্যানিন ও রজন।
উপকারিতা : তেঁতুল অতি সহজলভ্য ফল। ফলটি মানব শরীরের জন্য বেশ উপকারি। রক্তে শর্করার পরিমাণকে সঠিক রাখতে যথেষ্ট পরিমাণে কাজ করে থাকে।
এই মূল্যবান ফলটিতে অবস্থিত বেশ কিছু এনজাইম, কার্বোহাইড্রেটের শোষণ মাত্রা কমিয়ে দেয়। ফলে দেহে ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। গবেষকদের মতে শরীরে কার্বোহাইড্রেটের মাত্রা বাড়তে থাকলে নানা কারণে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর একারণেই অতি মাত্রায় কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার খেতে ডাক্তারগণ নিষেধ করেন। সুতরাং তেঁতুল ফলটি নিয়মিত পরিমাণ মতো খেলে শরীরের খুবই উপকার হয়। তেঁতুলে থাকে টারটারিক এসিড যা অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। ফলে আমাদের শরীর নানা রোগের হাত থেকে বেঁচে থাকে। তেঁতুল শরীর থেকে বিষাক্ত টক্সিন বের করে দেয়। ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমায় তেঁতুল। তেঁতুল উচ্চ রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণ করে। পাকা তেঁতুল হৃদরোগের জন্য খুবই উপকারি। গর্ভবতী মায়েদের যাদের বমি বমি ভাব দেখা দেয় তারা তেঁতুলের শরবত খান উপকার পাবেন। তেঁতুলের শাঁসে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন আমিষ, শর্করা, আঁশ ও টারটারিক এসিড আছে।
পুষ্টিবিদদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম খাবার উপযোগী তেঁতুলের খাদ্য উপাদান হলো : আমিষ ৩.১০ গ্রাম, শর্করা ৬২.৫ গ্রাম, আঁশ ৫.১ গ্রাম, চর্বি ০.৬ গ্রাম, ভিটামিন ‘এ’ ৬০ মাইক্রোগ্রাম, ২৮৩ কিলোক্যাররি খাদ্য শক্তি, ভিটামিন সি ৩ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি ০.৩৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন ই ০.১ মিলিগ্রাম, লৌহ ১০.৯ মিলিগ্রাম, ক্যালাসিয়াম ১৭০ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৬২৮ মিলিগ্রাম, সেলেনিয়াম ১.৩ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ২৮ মিলিগ্রাম, দস্তা ০.১২ মিলিগ্রাম, ম্যাগনোসিয়াম ৯২ মিলিগ্রাম, তামা ০.৮৬ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ১১৩ মিলিগ্রাম। পাকা তেঁতুলে খনিজ পদার্থ লৌহ অন্য যে কোনো ফলের চেয়ে অনেক বেশি। তেঁতুল রক্তের কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমিয়ে হৃদরোগ থেকে বাঁচিয়ে রাখে। তেঁতুল পেটের গ্যাস কমায়, খিদে বাড়ায়, হজম শক্তি বৃদ্ধি করে। হাত পা জ্বালা যন্ত্রনায় বেশি উপকারি। মূখের ঘা, ত্বকের দেহের বাত এবং হাড়ের জোড়ায় জোড়ায় ব্যথা কমায়। পুরনো তেঁতুল কাশি কমাতে সাহায্য করে। তেঁতুল নিয়মিত খেলে শরীরের চর্বি কমিয়ে বের করে দেয় এবং প্রজননতন্ত্রের কাজ শক্তিশালী করে।
ঔষধি গুণাগুণ : যাদের শরীর মোটা বা মেদ জমা হচ্ছে তা পরিমাণ মতো প্রতি দিন তেঁতুল খান, মেদ কমে আসবে। যাদের বাতের ব্যথা হয় তাদের জন্য তেঁতুল পাতা খুবই উপকারী বিশেষ করে পূর্ণিমা বা অমাবস্যায় যাদের পায়ের হাঁটু কিংবা হাড়ের জোড়া ফুলে ওঠে তাদের বেলায় সিদ্ধ তেঁতুল বেটে অল্প গরম করে ফোলা বা ব্যথাযুক্ত জায়গায় প্রলেপ দিন ব্যথা কমে আসবে। শরীরের কোনো স্থানে ঘা বা ক্ষত হলে বা মুখের ভিতর ঘা হলে তেঁতুল পাতা সিদ্ধ করে সেই পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে দিলে বা মুখে ঘা হলে পাঁচ মিনিট মুখে পানি রেখে ফেলেদিন উপকার পাবেন। তিন দিন করতে হবে। পিত্ত বিকারের কারণে অনেকেই প্র¯্রাবের জ্বালাপোড়ায় ভোগেন তারা ১ চামচ পরিমাণ তেঁতুল পাতার রসের শরবত খেলে সমস্যা কমে আসবে। অশ্ব রোগে আক্রান্ত হয়ে যাদের শরীর থেকে রক্ত বের হয় তারা পুরাতন তেঁতুল সিদ্ধ পানি খেলে উপকার পাবেন। সর্দি হয়ে বুকে বসে গেলে শ্বাস নিতে সমস্যা হয়। এক্ষেত্রে পুরাতন তেঁতুল ভিজানো পানি খেলে উপকার পাবেন। সর্দি বেরিয়ে আসবে। যাদের ঘন ঘন পেটের অসুখ হয় তারা ১০/১২ কচি তেঁতুল পাতা সিদ্ধ করে প্রতিদিন খেলে উপকার পাবেন। অতিরিক্ত গরম লাগলে অশান্তির সৃষ্টি হয় এসময় সামান্য তেঁতুল পানিতে গুলে চিনি মিশিয়ে খেলে বেশ আরাম পাবেন। যাদের পায়খানা কম হয় বা হয় না তারা প্রতিদিন সকালে ৪/৫টি তেঁতুলের শাঁস ১ কাপ পানিতে গুলে সামান্য লবণ মিশিয়ে খান অন্য কোনো সমস্যা না থাকলে পায়খানা হবে। কোষ্ঠকাঠিন্য জ্বর, শরীর জ্বালা, চর্মরোগ, অধিক পিপাসায় তেঁতুলের শরবত খান খুবই উপকার পাবেন। যে সব মেয়েদের মাসিকে সমস্যা হয় তারা ঘরে রাখা পুরাতন তেঁতুল নিয়মিত খেলে উপকার পাবেন। অনেকের ধাতু বা শুক্রানু বা ডিম্বানু শরীরে কম তৈরি হয় এ সমস্যা যাদের আছে তারা তেঁতুল বীজ পানিতে ভিজিয়ে ছাল তুলে বেটে নিয়ে ভেজে দুধে সিদ্ধ করে ছোট এলাচ, দারুচিনি, তেজপাতার গুড়ো দিয়ে হালুয়া তৈরি করে, বোয়ামে ভরে রাখুন প্রতিদিন সকালে খান। শরীরের শক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং শুক্র তৈরি হবে। যাদের অশ্বরোগ বা পায়খানা রাস্তার আশপাশ গুটা হয়। গুটা হতে রক্ত পড়ে। তারা তেঁতুলের বীজের খোসা ফেলে ভিতরের আঁশের সাথে গুড় মিশিয়ে ছোট ছোট বড়ি বানান। ২টি বড়ি করে প্রতিদিন খান রক্ত পড়া কমে আসবে। তেঁতুলের বীজের চূর্ণ ও হলুদের গুঁড়ো ঠান্ডা পানিতে মিশিয়ে খেলে বসন্ত রোগ হয় না। উপকারী এ গাছটি বাড়ির আশেপাশে লাগান যতœ নিন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT