মহিলা সমাজ

চিরকালের শেকড়ের সন্ধানী

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৬-২০১৮ ইং ০২:৪৪:৫৮ | সংবাদটি ৭৪ বার পঠিত

বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির জগতে ‘আজাদ রহমান’ এক কিংবদন্তি নাম। তাঁর সৃজনশীল মেধা ও কর্মের ব্যাপকতা খুবই ঈর্ষনীয়। সংগীত ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং উন্নয়নে নিবেদিত প্রাণ এই বহুমাত্রিক প্রতিভাবান শিল্পী বাংলা লোকসংগীত থেকে শুরু করে ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা, ঠুমরি, গজল, কাওয়ালি এবং আধুনিক গানে সমান পারদর্শী। নিজস্ব ধারায় সৃষ্টিশীল সংগীত রচনা অর্কেষ্ট্রা কম্পোজিশন সব ক্ষেত্রে তিনি সাবলীল আর প্রাণবন্ত। আজাদ রহমানের কণ্ঠের গান বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় গহীনে এক মজবুদ স্থান দখল করে আছে। পশ্চিমা বিশ্বে আজাদ রহমানের ‘রাগা অন পিয়ানো’ ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। উপমহাদেশের ঐতিহ্যময় রাগ সংগীত রসিকদের কাছে সুন্দর-সাবলীলভাবে তুলে ধরে আজাদ রহমান দেশ-বিদেশে দেশের সুনাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।
বাংলা গানের প্রতিভাধর শিল্পী আজাদ রহমান ১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম খলিলুর রহমান এবং মায়ের নাম আশরাফা খাতুন। বাবা খলিলুর রহমান ছিলেন একজন উচ্চ মানের সংগীত শিল্পী। তাই আজাদ রহমানের সংগীতে হাতেখড়ি তাঁর বাবার কাছেই। বড় হয়ে বর্ধমান জেলার ‘গোপেশ্বর সংগীত সংসদ’ এ আজাদ দীর্ঘ দিন শিক্ষা গ্রহণ করেন বা তালিম নেন। সংগীত জীবনের প্রথমে আজাদ যাত্রা, লেটো পালায় গান করতেন। পরে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণের পর জীবনযুদ্ধে লেগে যান। ১৯৬৪ সালে পূর্ব বাংলায় চলে আসার পর গুণী এই শিল্পী অত্যন্ত আন্তরিকভাবে সংগীত সৃষ্টিতে লেগে আছেন।
একজন সংগীত বিশারদ আজাদ রহমান গান শিখেছেন তারাপদ চক্রবর্তী (খেয়াল), তানসেন পান্ডে (ধ্রুপদ-ধামার), রমেশ চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় (ধ্রুপদ-ধামার, টপ্পা, ভজন, রবীন্দ্র সংগীত), অমিয় রঞ্জন বন্দোপাধ্যায় (খেয়াল), মায়া সেন (রবীন্দ্র সংগীত), চিত্ত রায় (নজরুল সংগীত, প্রাচীন বাংলা গান, লোক সংগীত), পঞ্চান ভট্টাচার্য (কীর্তন), পরেশ মজুমদার (কীর্তন ও ছন্দ জ্ঞান), সুবোধ নন্দী (তাল ও ছন্দজ্ঞান), বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী (ভিন্ন ভিন্ন সংগীত যন্ত্রের বাদন পদ্ধতি), সাত্তার আলী খান (তবলা, পাখোযাজ), নেপাল আঢ্য (খেয়াল, ঠুমরি, রাগপ্রধান), শিব প্রসাদ ভট্টাচার্য (যন্ত্রসংগীত ও তবলা), বিন্দু বাবু (নৃত্য), গুয়ে মুচি (বাংলা ঢোল), ষ্টানলি গোমেজ (পিয়ানো), শেখ খলিলুর রহমান (হারমোনিয়াম, প্রাচীন বাংলা গান, লেটো গান, মারফতি মুর্শিদি হামদ-নাত ও লোক সংগীত) প্রমুখ গুণীজনের কাছে।
অসাধারণ সংগীত ব্যক্তিত্ব আজাদ রহমান মেধা ও কর্মের গুণে প্রশংসা এবং কৃতিত্বের সর্বোচ্চ শিখরে দীপ্তমান। দীর্ঘ দিন নানা সংগীতানুরাগীদের সান্নিধ্যে থেকে আজাদ শুধু যে একজন খ্যাতিমান গায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তা নয় বরং সংগীত রচনা, সুর সংযোজন এবং সংগীত পরিচালনায় তাঁর দক্ষ হাতের ছোঁয়া দেখিয়েছেন। পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণ, শিক্ষকতা সবক্ষেত্রে তাঁর পরিশীলিত পরিমিত গতিময়তার দুর্লভ উদাহরণ স্থাপন করেছেন। পাহাড় প্রমাণ সংস্কার প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে বাস্তবায়িত করেছেন ‘বাংলা খেয়াল’। বাঙালির জাতীয় সংস্কৃতির এক নবতর অধ্যায় এই ‘বাংলা খেয়াল’ বলে সংগীতবিদরা মনে করেন। এছাড়া উচ্চাঙ্গ সংগীতের বন্দিশ রচনা ও প্রচার-প্রসারে আজাদ রহমানের অবদান সর্বজন স্বীকৃত।
সংগীত জীবনে ষাটের দশক থেকে আজাদ রহমান তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের শিল্পী হিসেবে সব ধরণের গান পরিবেশন করতে থাকেন। উচ্চাঙ্গ সংগীত শিল্পী হিসেবে বেতার এবং টেলিভিশনে তিনি নিয়মিত সংগীত পরিবেশন করতেন। তারপর ১৯৬৭ সালে সংগীত শিক্ষক, সংগীত পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে আজাদ রহমান বেতার এর চাকুরিতে যোগদান করেন। এসব ছাড়াও জাতীয় পারফর্মিং আর্টস একাডেমির এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং সরকারি সংগীত মহাবিদ্যালয়ের পদ অলংকৃত করেন আমাদের সংস্কৃতি জগতের সকলের প্রিয় ব্যক্তিত্ব আজাদ রহমান।
এরপর দ্বিতীয়বার তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ২০০০ সালে চাকুরি জীবন থেকে স্বাভাবিক অবসরে গিয়েছেন। এখন রেডিও, টিভি, মঞ্চে গান, পিয়ানো বাদন ইত্যাদি পরিবেশনা নিয়ে সদা ব্যস্ত থাকেন। সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে এবং একক শিল্পী হিসেবে আজাদ রহমান যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কুয়েত, পাকিস্তান, ভারত, সিঙ্গাপুর, হংকং, রাশিয়া, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ইটালি, বাহরাইন, মায়ানমারসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন।
চিরকালের শেকড়ের সন্ধানী আজাদ রহমান বারবার ছুটে গেছেন শাস্ত্রীয় সংগীত আর লোকসংগীতের দরজায়-জানালায়। উচ্চ মার্গের গান পরিবেশন করতে আজাদ রহমান স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। স্বাধীনতার পর থেকে আজাদ রহমান বিভিন্ন জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যমে অনুষ্ঠান করে উচ্চাঙ্গ সংগীতকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। মোদ্দাকথা বাংলা উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রচারে এবং প্রসারে আজাদ রহমানের অবদান একেবারে কম গুরুত্বের নয় বরং একটু বেশিই বলা যায়। আন্তর্জাতিক সংগীত উৎসব ২০০৫, জাতীয় সংগীত উৎসব ২০০৬, আন্তর্জাতিক সংগীত উৎসব ২০০৮ এ উচ্চাঙ্গ সংগীত শিল্পীবৃন্দ আজাদ রহমানের লেখা ও সুরে বাংলা ভাষায় উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিবেশন করেন। বিদেশের মাটিতেও আজাদ রহমান বাংলা উচ্চাঙ্গ সংগীতের সৌরভ ছড়িয়ে দিয়েছেন।
সংগীত সাধনার স্বীকৃতি স্বরূপ আজাদ রহমান শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী, শ্রেষ্ঠ সুরকার, শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক হিসেবে তিনটি ক্ষেত্রে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকেও তিনি সৃজনশীল কর্মক্ষেত্রে পুরস্কৃত হয়েছেন। যেমনÑজাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার, পূর্বাণী চলচ্চিত্র পুরস্কার, চিত্রালী চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার, দেশ চলচ্চিত্র পুরস্কার, জাতীয় অর্কেষ্ট্রা পুরস্কার, রেডিও স্টাফ আর্টিষ্ট পুরস্কার, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতি পুরস্কার, নবাব সলিমু স্মারক সম্মাননা এবং তাঁর রচিত ‘মাছের গল্প’ নাটকের জন্য শ্রেষ্ঠ নাট্যকার অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার ইত্যাদি।
সংগীতজ্ঞ, উচ্চাঙ্গ সংগীত গুরু প্রথিতযশা এই সংগীত সাধক বিগত পঞ্চান্ন বছর ধরে যে সাধনা এবং গবেষণা করে যাচ্ছেন তাতে বাংলা উচ্চাঙ্গসংগীতের এক বড় ভান্ডার তৈরি হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, ইতিহাস নীরবে কথা কয়Ñসে-ই ইতিহাসের পাতায় নিশ্চয়ই আজকের বাংলা উচ্চাঙ্গ সংগীতের কিংবদন্তী আজাদ রহমান এর নাম সোনার হরফে লেখা থাকবে। ভবিষ্যতের উচ্চাঙ্গ সংগীত শিল্পীরা আজাদ রহমানকে ‘আইডল’ মনে করবে। একজন আজাদ রহমান বেঁচে থাকুন আপনি নিরোগ দেহে, সুস্থ-সুন্দর মনে দীর্ঘকাল সমকালের বৈরি পরিবেশে। সুরের ভুবনের পথচারীরা খুঁজবে আপনাকে বাংলা গানের তাল, লয়, শিখতে। শিখতে সা-রে-গা-মা-পা। পামাগারেসা! পন্ডিত আজাদ রহমান এর সংগীত জীবন আরও বিস্তৃত হোক, সফল হোক তাঁর সকল সাধনা। এই আমাদের কামনা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT