উপ সম্পাদকীয়

একটি তাৎক্ষণিক মিথস্ক্রিয়া

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৬-২০১৮ ইং ০২:২৩:৩৯ | সংবাদটি ২২ বার পঠিত

ইয়ামানা মাহমুদ। সাড়ে তিন বছর বয়সী। আমার নাতনী। অতি চটপটে কিন্তু একটি বিদেশী টি.ভি চ্যানেলের অতীব অনুরক্ত। আকন্ঠ পিয়াসী আর মনোযোগী দর্শক। সে এই চ্যানেলটির জন্যই পাগলপারা এবং এটিই তার একমাত্র বায়না। এটির অনুষ্ঠানমালার মাঝে মাঝে একটি খন্ডচিত্র দেখানো হয় যাতে কথোপকতন বা বাক্যালাপটি থাকে মা ও মেয়ের মধ্যকার। মেয়ের কালো রূপ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত মা-টি যখন মেয়েটির কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তখন আত্মবিশ্বাসী মেয়েটি দৃপ্তকন্ঠে মা-কে জানিয়ে দেয় যে কালো রংটি তার জন্য বরাদ্দ দিয়েছে, সেই জানে পরবর্তীতে তার (মেয়েটির) জন্য কি রয়েছে। কি বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর আর কি তার আবেদনময়ী ভাষা। ইয়ামানা মাহমুদ এর সাথী হিসাবে এখন আমিও একজন নিত্য দর্শক হয়ে উঠেছি প্রায়। শুধুমাত্র এই বাক্যাংশটি শোনার জন্য। ধর্ম বা বিশ্বাস কার কি সেটা বিবেচনায় না এনে বলতে চাইছি বিশ্বাসের শক্তিমত্তার কথা। পবিত্র ইসলাম ধর্মে একমাত্র আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপনের কথাটিই বলা হয়েছে। যতো অপকর্ম করবো সবকিছুই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দৃষ্টির বাইরে নয়। এমনতরো ভাবনা থেকেই তো আমরা রমজান মাসের সিয়াম বা সংযম ব্রতটি পালন করি। এখানে মহান আল্লাহর দৃষ্টিকে সবসময় গ্রাহ্যের মধ্যে বা অনুভূতির মধ্যে রেখে আমরা পবিত্র রমজান মাসের সকল কর্তব্য পালনের চেষ্টা সর্বতোভাবে করে থাকি। অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকে কোন একটি অপরাধ এমনকি রোজাটি পর্যন্ত ভঙ্গ করলে কে ই-বা দেখবে এই ধারণা বা প্রবৃত্তিটুকু আমরা বিসর্জন দিতে পারি যখন সৃষ্টিকর্তার প্রতি অটুট বিশ্বাস আর তিনিই সব ভালো-মন্দের মালিক সে প্রত্যয়টি আমরা ধরে রাখি।
আমার নাতনী তার বাবাকে বেশ কয়েকদিন বিরতির পরে দেখা পেলেই এই আকর্ষণীয় আবার মনভুলানো বাক্যটি বলবেই। আমার নাতনী তার বাবা রাহবার মাহমুদকে বুঝিয়ে বলতে গিয়ে বলে যে রং তুমি ধরাবে সেটি হতে হবে তোমার মনমতো তাহলেই হবে তোমার আত্মতুষ্টি বা তৃপ্তি। এই বাক্যটিও আমাকে আলোড়িত করেছে বিপুলভাবে। ভাবিত করেছে কিভাবে আমরা নিজেদের স্বকীয়তাকে হারিয়ে আপন বিশ্বকে তুলে দিচ্ছি কূপমন্ডুকতা আর বিভীষিকার রাজ্যে।
ইয়ামানা মাহমুদকে রঙ্গে রঙ্গে সাজিয়ে তুলতে চান তার মা-বাবা। অন্যদিকে আমাদের দেশটিকে সাজিয়ে তুলতে কারা অগ্রগামী সেটি নির্ধারণ করতে করতেই দিন গড়িয়ে যায়। রজনীও গড়ায় সন্ধান পাওয়া মুশকিল হয়ে উঠে।
আজ সারা দেশে রাজনীতির ময়দানে রং বদলের জোর হাওয়া লেগেছে। আগে ছিলো রাজনীতির আবহের হাওয়া বদলানো বর্তমানে হয়েছে রাজনীতির ময়দানের খেলোয়াড়দের রং বদলানো পর্ব। সবাই ব্যস্ত কোন দিকে হাওয়া বইছে আর কোনদিকে পালটি টাঙ্গানো সেটি ঠিক করতে। যদি হাওয়া অনুযায়ী পালটি ঘেটে যায় অবশ্যই তরী আর ঘাটে ভেড়াতে হবে না শূন্যে ভাসিয়ে নিলে হবে।
উদাহরণ, প্রমাণ বিশ্লেষণ কোন কিছুই আজ আর ধোপে টিকছে না। যে কোনদিন একশত টাকা এক জায়গায় দেখে নাই সেই ধরনের মানুষও আজ শত কোটি টাকার মালিক। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ফলভোগ করার কথা ছিলো বাংলার প্রতিটি মানুষের। কেউ আর ভুখা-নাঙ্গা থাকবে না, কর্মহীন থাকবে না আর ভূমিহীনতো নয়ই। যেগুলি থাকার কথা ছিলো না সবগুলিই বহাল রয়েছে আর যেগুলি ইস্পিত ছিলো সেগুলি নির্দিষ্ট সংখ্যক লোকের জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে। অসংখ্য লোক আজ হিল্লি দিল্লী ঘুরে বেড়াচ্ছেন সাধারণ চর্মরোগের চিকিৎসা সারাতে। অনেকেই আবার সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছেন অহরহ নিজ চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে। কি বিস্ময়কর ব্যাপার। এ সকল বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণেচ্ছুকদের অনেককেই পুরো নির্ভর করতে হতো ঝাড়, ফুক আর পানি পড়ার উপর এবং সেটি বেশি দিন আগের ব্যাপারও নয়। প্রশ্ন জাগতে পারে কিভাবে এটি হতে পারে? রং বদলের রাজনীতি আর হাওয়া বদলের কূটনীতি মিলেমিশে যখন একাকার হয় তখন নিজেকেও মানিয়ে নিতে হয় সব পরিস্থিতির সাথে। নীতি আদর্শ তোরগে তুলে রাখতে হবে প্রথমেই আর নিজেকে লীন করে দিতে হবে সর্বাগ্রে গমনরত ব্যক্তিত্বটির তুষ্টি লাভের বেদীতে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি অতি দ্রুত উন্নয়নের পথে ধাবিত হচ্ছে। কোন কোন অর্থনীতিবিদ বলেন রাস্তায় গাড়ী ঘোড়ার (ব্যক্তিগত) জটলা দেখলেই অর্থনীতির হালচাল অনুধাবন করা যায়। যদিও দুই গাড়ীর মাঝখানে চাপা পড়ে প্রথমে অঙ্গ তারপরে প্রিয় প্রাণটিও হারাতে হচ্ছে অনেককে। সেটি আবার কেউ বিবেচনায় নিতে নারাজ। বিস্ময় জেগেছে যখন পর্যায়ক্রমে একাধিক যাত্রী প্রত্যঙ্গ হারালেন, প্রাণও হারালেন দুটো গাড়ীর মাঝখানে পড়ে। দায়িত্বশীলদের ভাষ্যও বদলালো সাথে সাথে। বলা হলো নিজেদেরও হুশ জ্ঞান ঠিক রেখে চলতে হবে। মনে হচ্ছে যেন শখ করেই যাত্রী সাধারণ হাত, মাথা বাইরে রাখছেন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ীতে চড়ে অবশ্য বুঝার উপায় থাকে না বাসে বাদুড় ঝোলা যাত্রীদের অবর্ণনীয় কষ্টভোগ। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা কিন্তু আশা জাগানিয়া বাণী শুনিয়েছিলো অর্থাৎ সব প্রাণের সুরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি একই সুরে উঠবে রনী। হয়নি। নেতৃত্বের, নীতির নাকি ওয়াদা বিস্মৃতির কিসের দোষে যে এমন হতভাগাদের উদয় হলো বুঝা মুশকিল।
নির্বাচন আসলেই আজকের হতভাগাদের কদর বাড়ে হাজার গুণ। ঘরে তিষ্ঠানো মুশকিল হয় ভোট প্রার্থীদের জ্বালায়। যখন বৈতরনী পাড়ি সমাপ্ত হয় তখন কিন্তু সুর বদলায়, দৃষ্টি বদলায় আর বদলায় বিজয়ী স্বত্বাটির ঠাটবাট। অন্যদিকে সেই মাত্রায় কমে আসে ভোট দাতা সাধারণ মানুষের ওজন এবং পরিমাপ। তাইতো বলা হয় গাড়ীতে চড়তে হুশ বুদ্ধি কাজে লাগাতে। নাহলে বিপদ। সমস্যা আরেকটি হয় প্রশ্নবিদ্ধ গাড়ীটির মালিক যেমন থাকেন নেতাটি, তেমনি পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাটিও থাকেন একই ব্যক্তি। তাই শাখের করাত আসতে যেমন কাটে যাইতেও তেমনি কাটে।
শোনা যায় নির্বাচন আসন্ন। ন্যাক্কারজনকভাবে দিক আর দর্শন বদলের পালা শুরু হয়েছে। সবাই বিজয়টি করায়ত্ত্ব করতে চান কিন্তু সেটি যদি হয় নিজ ক্ষমতায় তাহলে শতভাগ প্রশংসার দাবীদার হতে পারতেন তিনি বা তারা। দুঃখজনকভাবে সত্যি আমাদের রাজনীতির অঙ্গনটি এতো বেশি দেউলিয়াত্বে ভরপুর যে কোন রাজনীতিকই যেন ভরসা পাচ্ছেন না আপন প্রতিভা, কর্ম আর আন্তরিকতার উপর। তাই তারা অন্যের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে চান। চিহ্নিত মার্কা পেতে তারা মরিয়া। তারা জানেন ভোটদাতাদের পকেট থেকে ভোটগুলি খসাতে মহামূল্য মার্কাটি দরকার। প্রার্থীর কোন গুরুত্ব এখানে নেই এমনকি প্রয়োজনীয়তা টাও অনুভূত হয় না। কি বিচিত্র পরিবেশ আর কি অদ্ভুত আচরণ। আমার নাতনীর প্রিয় টি.ভি সংলাপটি দেখা যায় এখানে মুখ্য। যে রংটি দিয়েছে সেই জানে সব। আপন কর্ম এখানে তুচ্ছ। ইয়ামানা মাহমুদ যেমন আমরাও কি তেমন।
লেখক : অধ্যক্ষ, কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বাচ্চাটা একটা খেলনা ফোন চেয়েছিল
  • স্থানীয় সরকার প্রসঙ্গে কিছু প্রস্তাবনা
  • চাই দূষণমুক্ত পরিবেশ
  • সিরিয়ার আকাশে শকুনের ভীড়-সামাল দিবে কে!
  • টের পাওয়া যাচ্ছে বিশ্বকাপ প্রলয়
  • মাছের পোনা দেশের সোনা
  • শিক্ষা ব্যবস্থার হালচাল
  • যৌতুক, ইফতারি, আমকাঁঠলি বনাম নারী নির্যাতন প্রসঙ্গ
  • ঈদযাত্রায় ভোগান্তি রোধে ব্যবস্থা জরুরি
  • বজ্রপাত শনাক্তকরণ সেন্সর এবং কৃষকের সেন্স
  • মাদক সমস্যার প্রতিকার
  • শিক্ষা খাত ও জাতীয় বাজেট
  • ফুটবল বিশ্বকাপ ছড়িয়ে দিক সম্প্রীতির বার্তা
  • আসুন, আমরা মাদককে না বলি
  • মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন
  • ইতিকাফ
  • ট্রাম্পইজম, কর্তৃত্ববাদ : আমেরিকান উদারনৈতিক গণতন্ত্রের বিপদ
  • রমজানের তাৎপর্য ও রোজার উপকারিতা
  • একটি তাৎক্ষণিক মিথস্ক্রিয়া
  • অর্থ বছরে দুটি প্রত্যাশা
  • Developed by: Sparkle IT