ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিভীষিকাময় একাত্তর

পাক মিলিটারির ৭ ঘণ্টা ইন্টারগেশন

তাজুল মোহাম্মদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৬-২০১৮ ইং ০২:৩১:৩১ | সংবাদটি ৮৬ বার পঠিত

১৯৭১ সালের এপ্রিল। ঢাকার হৃদপিন্ড বলে পরিচিত মতিঝিলে নিজ অফিসে কর্মব্যস্ত সময় অতিক্রম করছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক চৌধুরী সাজু। কে. এম. দাস লেনের চৌধুরী বাড়ির বড় ছেলে আব্দুল মালেক চৌধুরী সাজু নটরডেম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা সমাপ্ত করে চলে যান বাইরে। বিলেতের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রিন্টিং এন্ড পাবলিকেশন্স বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে ফেরেন দেশে তারপর শুরু করেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ব্যবসা। একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে সুনামও ছিল তাঁর সে সময়েই। কিন্তু রাজনীতি করেননি তিনি কখনো। না ছাত্র জীবনে না কর্ম জীবনে। তবে রাজনীতি সচেতন ছিলেন পুরোপুরি। ভাবতেন দেশ নিয়ে, জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে। স্বাধীকার, সায়ত্বশাসন, স্বাধীনতা এ সব দাবিকে ইতিবাচক দৃষ্টি নিয়েই দেখেছেন। বাঙালি জাতির স্বার্থের পক্ষে অবস্থান সব সময়ই। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্বাধীনতার পক্ষেই ছিলেন। কাজও করেছেন যথাসাধ্য গোপনে গোপনে।
মালেক চৌধুরী অফিসে বসে আছেন। স্বাভাবিকভাবে কাজ কর্ম করে যাচ্ছেন। সেদিন গ্রাফিক্স লিমিটেডের অফিসে আবির্ভূত হয় পাকিস্তানি মিলিটারি। মিলিটারি দেখে আসছেন অনেক দিন থেকেই। আর নিজের ছোট ভাই আব্দুস সালেক চৌধুরী ফারুক আর্মি অফিসার। তাই কারণে-অকারণে নিজের বাড়িতে গিয়েছে কতো আর্মি অফিসার। প্রায়ই আসত ওরা তাঁর এই অফিসেও। সম্মানের সঙ্গে কথা বলতো তখন। কিন্তু সে দিন তাদের ভিন্ন রূপ। চোখে মুখে হিং¯্রতা। পশুত্ব ঠিকরে বেরুচ্ছে দু’চোখ দিয়ে। অবশ্য এ চেহারাও দেখেছেন আরো। গত এক সপ্তাহ থেকে প্রত্যক্ষ করছেন ওদের দানবীয় সব কর্মকান্ড। গিয়েছে তাঁদের কে. এম. দাস লেনের বাড়িতে। দুই ভাই আব্দুল মতিন চৌধুরী ফেরদৌস এবং আব্দুল খালেক চৌধুরী সাদেককে আটক করেছিল বাড়ি থেকে। তারপর জিজ্ঞাসাবাদ এবং মানসিক নির্যাতন। জিজ্ঞাসাবাদ থেকে বাদ যাননি তিনিও। তারপরও আসে অফিসে। তুলে নিল তাঁকে সেখান থেকে। অফিস ভবন থেকে নিচে নামিয়ে নিজের গাড়িতে করেই তাদেরকে অনুস্মরণ করার নির্দেশ প্রদান করে। তাই করছিলেন তিনি নির্বিবাদে। কিছু দূর যাবার পরই আবার থামার সংকেত পেলেন। থামলেন তিনি। আসলো মিলিটারিরা। গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে চাবির গোছা নিয়ে গেলো তাদের কাছে। মালেক চৌধুরীকে নিয়ে উঠায় একটি মিলিটারি ভ্যানে। আর ভ্যানে উঠার আগেই শক্ত করে বেঁধে নেয় চোখ।
মিলিটারি ভ্যান চলছে রাজধানীর পথে পথে। আব্দুল মালেক চৌধুরী চোখ বাঁধা অবস্থায় মিলিটারি পরিবেষ্টিত হয়ে আছেন ভ্যনে। তিনি জানেন না কোন পথ দিয়ে কোন দিকে ছুটছে গাড়্ অিনুমান করারও কোনো উপায় ছিলো না। তাঁর কাছে সবই অন্ধকার। বুঝতে পারছেন না আলোর মুখ আর কখনো দেখবেন কি না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে ভয়াবহ অবস্থা ছিলো সে বাস্তবতায় এ রকম অবস্থা থেকে ফিরে আসাটাই ছিল অস্বাভাবিক। প্রতিদিন শত শত লোককে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। খুন করে ফেলে দিচ্ছে যেখানে ইচ্ছে সেখানে। শহরে গ্রামে হাজার হাজার বধ্যভূমি সৃষ্টি করে চলেছে। সে সব স্থানে জমা হচ্ছে লাখ লাখ মানুষের কঙ্কাল।
দীর্ঘ সময় ধরে চললো গাড়ি। কোথা দিয়ে কোথায় যাচ্ছে তিনি বলতে পারেন না। এক সময় থামলো গাড়ির ঘর্ঘর শব্দ। ইঞ্জিনের হৃদ কম্পনও থামলো। কিন্তু কোথায়? জানেন না মালেক চৌধুরী। চোখ বাঁধা অবস্থায়ই নামিয়ে নিলো তাঁকে। বুঝতে পারছেন একটি ঘরের ভেতর নিয়ে গেছে। চোখ খুললো সেখানে। কিন্তু চার দেয়াল ব্যতিত কিছুই পড়ছে না চোখে। সবই অজানা অচেনা। ফলে, অজানা বা অজ্ঞাত স্থান হিসেবে রয়ে গেলো তাঁর কাছে।
সামনে দু’জন পাকিস্তানি সেনা অফিসার। মুখোমুখি বসে আছেন তিনি। তাৎক্ষণিক শুরু করে জিজ্ঞাসাবাদ প্রশ্ন করলো ক্যাপ্টেন আব্দুস সালেক চৌধুরীকে পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি করা হয়েছিল। তিনি সেখানে যাননি কেন? এ প্রশ্নের কি উত্তর দেবেন তিনি। তাঁরা জানতেন সালেক চৌধুরী পশ্চিম পাকিস্তানে যাবার জন্যেই বিমানবন্দর রওয়ানা হয়েছেন। এর পরের কোনো সংবাদইতো জানেন না তিনি। জানেন না পরিবারের কোনো সদস্যই। তা হলে উত্তর দেবেন কি? সালেক চৌধুরী কোথায় আছেন। কেমন আছেন কিছুই জানা নেই কারো। এ সব প্রশ্নতো এর আগে বাড়িতে গিয়েও আর্মি অফিসাররা করেছে বার বার। করেছে অন্য ভাইদেরকেও আটক। জানালেন এ ব্যাপারে তাঁদের কোনো ধারণা নেই। সালেক চৌধুরী কতবার বাড়ি গিয়েছেন, সঙ্গে কে কে যেতেন কতক্ষণ অবস্থান করতেন কোথায় বসতেন কি আলাপ করতেন কি বারে যেতেন, সাধারণতঃ কয়টার দিকে বাড়ি প্রবেশ করতেন এসব ছিলো তাদের জিজ্ঞাস্য বিষয়। এ রকম ইন্টারগেশন চলেছে একটানা ৭ ঘণ্টা ধরে।
আব্দুল মালেক চৌধুরীর চোখ বাঁধে আবার। প্রবেশ করলেন অন্ধকারে। যেন আলোকময় জগৎ থেকে ছিটকে পড়েছেন আবার। উঠে দাঁড়াবার নির্দেশ। তা হলে কি নিয়ে যাচ্ছে কোনো বধ্যভূমিতে। টেনে নিয়ে গেল বাইরে। আবার উঠায় মিলিটারি ভ্যানে। সচল হলো যন্ত্রদানব। নানা রকম শব্দ সৃষ্টি করে করে চলছে রাজপথে। কোন সে পথ? কেমন করে বঝুবেন? হঠাৎ খেয়াল হলো তাঁকে নিয়ে আসার সময় যতোটুকু সময় ব্যয় হয়েছিল তার চেয়ে ঢের বেশি সময় লাগছে ফিরে আসতে। মনে হলো প্রচুর রাস্তা-ঘাট ঘুরে ঘুরে এক সময় থামলো যান খানা। তার চোখের বাঁধন খোলা হলো। দেখলেন যেখান থেকে চোখ বেঁধে মিলিটারি ভ্যানে তুলেছিল ঠিক সে স্থানেই ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। তাঁর নিজের গাড়ি খানাও রয়েছে পার্ক করা অবস্থায়।
মিলিটারি কর্তাটির তখন কড়া নির্দেশ। ক্যাপ্টেন আব্দুস সালেক চৌধুরীর সন্ধান পাওয়া মাত্রই জানাতে হবে। অন্যথায় কি ভয়ানক অবস্থায় পড়তে হতে পারে সে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেয়া হলো। তারপর চাবির গোছা হাতে দিয়ে বিদেয় দেয় তাঁকে।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • ইতিহাস-ঐতিহ্যের লীলাভূমি সোনারগাঁও
  • হারিয়ে যাওয়া বর্ণমালা
  • স্বামী হত্যার বিচার পাননি সাহার বানু
  • বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম মিয়ারচর
  • বিভীষিকাময় একাত্তর শ্বাসরুদ্ধকর পাঁচঘণ্টা
  • সিলেটের প্রথম সংবাদপত্র এবং কবি প্যারীচরণ
  • সিলেটের প্রথম সাংবাদিক, প্রথম সংবাদপত্র
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মুক্তিযোদ্ধা নজরুল এবং অন্যান্য
  • বানিয়াচং সাগরদিঘী
  • খুন ও ধর্ষণ করেছে চরমপন্থিরাও
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • Developed by: Sparkle IT