ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য তথ্য কোষ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৬-২০১৮ ইং ০২:৩৩:১৫ | সংবাদটি ৬৪ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
(তাং-বৃহস্পতিবার ১৮ কার্তিক ১৪০৭ বাংলা ২ নভেম্বর ২০০০ খ্রিস্টাব্দ/ দৈনিক গিরিদর্পণ, রাঙামাটি)।
রেগুলেশন নং ১/১৯০০ এর অধীন রচিত পার্বত অঞ্চল শাসন আইনের ধারা নং ৭ বলে গোটা পর্বতাঞ্চলের ফৌজদারী, দেওয়ানী রাজস্ব ও সাধারণ প্রশাসনিক বিষয়াদির দায়িত্ব, জেলা প্রশাসক বা প্রশাসকদের উপর ন্যাস্ত, এবং তিনি/তারা জেলা হাকিম ও বটে। ধারা ৫/৬ অনুযায়ী তিনি/তারা জেলা প্রশাসক নিযুক্ত হোন। ধারা ১৮ এর অধীন রচিত উপধারা সমূহ তার বা তাদের ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট করেছে। এই সাথে ধারা ১৮ (২) ঘ এর অধীন রচিত পার্বত্য শাসন বিধি নং ৩৪ এবং তার উপধারা সমূহ, পর্বতাঞ্চলের সমুদয় বন্দোবস্তি, হস্তান্তর, নাম জারি ও তত্ত্বাবধানের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা জেলা প্রশাসকদের দান করেছে। তিনি বা তারা এই ক্ষমতা প্রয়োগের সহায়ক রূপে ধারা ৪৮ বলে মৌজা প্রধান হেডম্যান নিযুক্ত করে থাকেন। ধারা ৪৭ বলে, তিন সার্কেল প্রধান বা চীফ, নিজেদের আবাস ক্ষেত্রাধীন সদর মৌজার হেডম্যান নিযুক্ত হোন। হেডম্যানদের নিযুক্তি ও বরখাস্তের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা জেলা প্রশাসকদের হাতে ন্যস্ত। তারা প্রশাসনের ব্যাপারে চীফদের ইচ্ছা অনিচ্ছার কাছে বাধ্য নন। ধারা ৩৮ বলে চীফ ও হেডম্যানদের দায়িত্ব হলো : জেলা প্রশাসকদের পক্ষে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলের তথ্য দান, শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা, জেলা প্রশাসকদের আদেশ নিষেধ জনসাধারণের মাঝে ত্বরিত গতিতে কার্যকর করা, রাজস্ব আদায়, শিক্ষা বিস্তার জনসাধারণের স্বাস্থ্য ও বৈষয়িক উন্নয়নে প্রভাব খাটান এবং জেলা প্রশাসকদের আদেশ পালন করা। গ্রামাঞ্চল ও জনসাধারণের মাঝে কোন রূপ পরিবর্তন বা চাষাবাদ সংক্রান্ত বিরূপতা দেখা দিলে তা জেলা প্রশাসকদের অবহিতকরণ। তারা নিজ নিজ এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষায়ও নিয়োজিত হন এবং উপজাতীয়দের সামাজিক বিচার সম্পাদন করাও তাদের দায়িত্ব (যথা : ধারা নং ৪০) তবে এই সামাজিক বিচারেও পুনর্বিচারের ক্ষমতা জেলা প্রশাসকদের হাতে ন্যস্ত। এই আইনগত প্রাধান্যের কারণে জেলা প্রশাসকেরাই তিন পার্বত্য জেলার প্রধান কর্তৃপক্ষ। প্রশাসকরূপী আমলা হওয়ার পাশাপাশি তারা জেলা দেওয়ানী আদালতের বিচারক ও সরকার নিযুক্ত প্রতিনিধিও বটে। তাদের দেওয়ানী ক্ষমতা, তিন পার্বত্য জেলার সমুদয় জায়গা জমি সম্পদ সম্পত্তি ও রাজস্ব বিষয়াদির উপর ন্যস্ত। তারা এতদাঞ্চলীয় সমুদয় বৈষয়িক বিরোধ বিসম্বাদ নিজেদের বিচারাধীন করে নিতে পারেন। তখন ভূমি কমিশনের কিছুই করণীয় থাকবে না। এটি তাদের সুয়োমটো বা স্বপ্রণোদিত ক্ষমতা।
জেলা পরিষদ আইনের ধারা নং ৬৪ স্বঘোষিত প্রধান আইন। তাতে বলা হয়েছে : ‘অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন-’ এই বক্তব্য হাস্যকর। ভূমি কমিশন সংক্রান্ত চুক্তির বক্তব্যেও বলা হয়েছে : ‘এই কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে কোন আপিল করা যাইবে না এবং এই কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া বিবেচিত হইবে।’ এতে বলা যায়, বাংলাদেশ সংবিধানের বিপরীতে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিপরীতে পার্বত্য ভূমি কমিশনের প্রাধান্য থাকা, পাগলামী ছাড়া কিছু নয়।
বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৭ (২) এর বক্তব্য হলো :
জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি রূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতোখানি অসমাঞ্জস্যপূর্ণ, ততোখানি বাতিল হইবে।
অনুরূপভাবে সুপ্রীম কোর্টের সুপ্রিমেসি নিয়ে ও সংবিধানিক বক্তব্য হলো :
অনুচ্ছেদ নং ৯৪ (১) বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট নামে বাংলাদেশের একটি সর্বোচ্চ আদালত থাকিবে এবং আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ লইয়া তাহা গঠিত হইবে।
অনুচ্ছেদ নং ১০২। (১) কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে এই সংবিধানের তৃতীয় ভাগের (মৌলিক অধিকার) দ্বারা অর্পিত অধিকার সমূহের যে কোন একটি বলবৎ করিবার জন্য প্রজাতন্ত্রের বিষয়াবলীর সহিত সম্পর্কিত কোন দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিসহ যে কোন ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে হাইকোর্ট বিভাগ উপযুক্ত নির্দেশাবলী বা আদেশাবলী দান করিতে পারিবেন।
সুতরাং পার্বত্য পরিষদ আইনকে সর্বোচ্চ আইনের মর্যাদা প্রদান এবং ভূমি কমিশনকে সর্বোচ্চ স্বাধীন আদালতের ক্ষমতা দান, হাস্যস্পদ ব্যাপার। বাস্তবে এসব হলো ঠুনকো নি¤œস্তরের আইন এবং ভূমি কমিশনটিও স্বাধীন সর্বোচ্চ স্থায়ী আদালত নয়। সুপ্রীম কোর্টে ভূমি কমিশনের রোয়েদাদ অবশ্যই আপিল যোগ্য। এর গঠন ভিত্তি, পার্বত্য চুক্তি, আর পরিষদীয় আইনগুলোর দোষ ত্রুটিও চ্যালেঞ্জযোগ্য। উপজাতিদের পক্ষে প্রবোদমূলক পক্ষপাতিত্ব ও বক্তব্য, বর্ণিত চুক্তি ও আইন সমূহে ঠাসা, যা সাধারণ অউপজাতীয় লোকদের পক্ষে ক্ষোভ ও উদ্বেগের কারণ, এবং এটি অবশ্যই হাইকোর্টে রীট আবেদনের উদ্ভব ঘটাবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি বসতি স্থাপন সরকারেরই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল। খাস জমিতেই সরকারিভাবে ভূমি দানের ঘটনা ঘটেছে। এখন তাতে উপজাতীয় অধিকারের উদ্ভব ঘটা রহস্যজনক। যদি কোন উপজাতীয় লোকের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে সরকারিভাবে ভুলক্রমে বাঙালি আবাসন ঘটে থাকে, তা হবে বিচ্ছিন্ন সরকারি ভুল ও অপরাধ। তজ্জন্য আবাসিত বাঙালি পক্ষকে দায়ী করা ভুল।
গোটা পার্বত্য অঞ্চলকে পরিষদভুক্ত করে চুক্তি ও আইন রচিত হয় নি। জনসংহতি সমিতির পাঁচ দফা দাবী নামায় গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম অন্তর্ভুক্ত নয়। জেলা পরিষদ আইনের ৬৪ ধারাতে গোাটা পার্বত্য অঞ্চলকে তিন জেলা পরিষদের এখতিয়ারভুক্ত করা হয় নি। আবাসিত বাঙালিদের বৃহদাংশ পরিষদের আওতা মুক্ত, জাতীয় এলাকার বাসিন্দা। জনসংহতি সমিতি নিজেও দাবী করেছে : সরকারি বা জাতীয় এলাকা এবং পরিষদভুক্ত এলাকার ভাগ বাটোয়ারা সম্পন্ন করা হোক যথা দাবী নং ২(৫)খ। তাতে এই বিভ্রান্তি মিটে যাবে যে, উল্লেখযোগ্য এলাকা ও বাঙালি বাসিন্দারা বাস্তবে পরিষদ থেকে মুক্ত এবং জেলা পরিষদের ভূমি সংক্রান্ত পুর্বানুমোদন এবং উপজাতীয় অগ্রাধিকার সর্বত্র প্রযোজ্য নয়।
চুক্তি হয়েছে। এখন এখতিয়ারভুক্ত এলাকার নির্দিষ্ট করণ সহ তার বাস্তবায়ন হওয়া উচিত। এখন আর লাভ ক্ষতির কথা চিন্তা করে পিছু হটা বা বিলম্ব করা যুক্তিযুক্ত নয়। চুক্তি বাস্তবায়ন পর্যায়ে ক্ষোভ অসন্তোষ প্রদর্শনের সুযোগ নেই। এখতিয়ারের সীমা সরহদ আর পাওয়ার ক্ষেত্র সুখকর কি না তা নিয়েই ভাবা অথবা ভাবতে দেয়া উচিত। প্রকৃত হিসাবে সরকারের পক্ষেই পাল্লা ভারি। এখানে একথা ভাবার সুযোগ নেই যে, প্রশাসনিক এলাকার খন্ডিতাংশ নিয়ে জেলা পরিষদ স্থাপিত হলে, সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৫৯ লঙ্ঘিত হয়। তা হলে পরিষদীয় বিধানটাই অসাংবিধানিক হয়ে যায়।
পরিষদের ভূমি এলাকা বাস্তবে গোটা পর্বত্যাঞ্চলের এক দশমাংশের বেশি নয়। চুক্তিতে বলা হয়েছে :
‘তবে শর্ত থাকে যে, রক্ষিত বনাঞ্চল, কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূউপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প কারখানা ও সরকারের নামে রেকর্ডকৃত জমির ক্ষেত্রে এই (পূর্বানুমোদন) বিধান প্রযোজ্য হইবে না। (সূত্র : জেলা পরিষদ আইন ধারা নং-৬৪)
এখানে উল্লেখিত বাক্যাংশঃ সরকারের নামে রেকর্ডকৃত জমির অর্থ ব্যাপক। এর ভিতর কর্ণফুলী হ্রদ এলাকা, প্রশাসনিক দপ্তর এলাকা রিজার্ভ ফরেস্ট ও আন ক্লাসড স্টেট ফরেস্ট এলাকাও পড়ে। সুতরাং ৯০% পার্বত্যাঞ্চল সরকারি বা জেলা প্রশাসকদের এখতিয়ারে নিশ্চিত ভাবেই থাকে। পরিষদ অঞ্চল ১০% এর বেশি হয় না।
[চলবে]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • ইতিহাস-ঐতিহ্যের লীলাভূমি সোনারগাঁও
  • হারিয়ে যাওয়া বর্ণমালা
  • স্বামী হত্যার বিচার পাননি সাহার বানু
  • বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম মিয়ারচর
  • বিভীষিকাময় একাত্তর শ্বাসরুদ্ধকর পাঁচঘণ্টা
  • সিলেটের প্রথম সংবাদপত্র এবং কবি প্যারীচরণ
  • সিলেটের প্রথম সাংবাদিক, প্রথম সংবাদপত্র
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মুক্তিযোদ্ধা নজরুল এবং অন্যান্য
  • বানিয়াচং সাগরদিঘী
  • খুন ও ধর্ষণ করেছে চরমপন্থিরাও
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • Developed by: Sparkle IT