ইতিহাস ও ঐতিহ্য ড. শ্যামল কান্তি দত্ত

সিলেটের প্রাচীন ইতিহাস

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৬-২০১৮ ইং ০২:৩৪:১৮ | সংবাদটি ২৮০ বার পঠিত

বর্তমান ভাষা-মানচিত্রে সিলেট বিভাগকে দেখলে মনে হয় যেন বাংলাভাষার ঘোমটাপরা লাজুক বধূ উঁকিদিয়ে অন্যান্য ভাষা-কক্ষের জানালা দিয়ে তার মুখখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। এ অঞ্চলটির পশ্চিমে বাংলা ভাষাভাষী নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলা। দক্ষিণে ককবরক ভাষাভাষী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পূর্বে অসমিয়া (কামরূপী উপভাষা) ভাষাভাষী আসাম (কাছাড় ও করিমগঞ্জ জেলা ) ও উত্তরে খাসি বা ‘মন-খেমে’ ভাষাভাষী মেঘালয় (খাসিয়া ও জৈন্তীয়া পাহাড়) রাজ্য । অবশ্য ভারতের এ রাজ্যগুলোর দ্বিতীয় ভাষা বাংলা । বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্গত সিলেট বিভাগের আয়তন প্রায় তের হাজার বর্গ কিলোমিটার (১২,৭১৯ ব.কি.মি.)
সিলেটের ইতিহাস বাংলা আসাম ও ত্রিপুরার ইতিহাসের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক যুক্ত। আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে (খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহ¯্রাব্দের মধ্যভাগে) প্রাচীন ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আর্য প্রভাব অনুভূত হয়। উপমহাদেশের পূর্ব প্রান্তে পৌঁছতে আর্যদের আরও সময় লাগে । তাই বাংলার অধিবাসীগণ আর্যায়নের ¯্রােতধারা বেশ দেরিতেই উপলব্ধি করে। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী থেকে পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে বাংলায় আর্যদের অনুপ্রবেশ ঘটে এবং সমগ্র বাংলাকে আর্যায়িত করতে তাদের প্রায় এক হাজার বছর লেগে যায়। উত্তর ভারতে এ দীর্ঘ যাত্রাকালে আর্যপ্রভাব স্বাভাবিক ভাবেই অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়েছিল। ততদিনে বাংলার অধিবাসীদের সংস্কৃতিতে অনার্য উপাদান দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবার সুযোগ পায়। ফলে বাংলায় আর্যায়ন বা আর্য প্রভাব সত্ত্বেও আর্য-পূর্ব জীবন বৈশিষ্ট্যের অনেক উপাদানই বজায় থাকে। এই অনার্য সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল সমÍবত দশ হাজার বছর (বা তারও) আগে। কিরাত নিষাদ বা অস্ট্রিক কিংবা অস্ট্রো-এশীয় গোষ্ঠীর অনার্য লোকেরাই এতদ অঞ্চলের আদি বাসিন্দা। আজকের কোল, ভিল, সাওতাল, শবর, পুলিন্দ প্রভৃতি আদিম অধিবাসীরা তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে। পরবর্তী কালে দ্রবিড় ও তিব্বতি-বর্মি ভাষাভাষী আরও দুটি জাতি বাংলায় বসতি স্থাপন করে। ক্রমান্বয়ে আর্যায়ন প্রক্রিয়া এতদঞ্চলের পরবর্তী ইতিহাসের মূল প্রতিপাদ্য। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দী থেকে বাংলার ইতিহাস আমাদের নিকট মোটামুটি স্পষ্ট ভাবেই প্রতিভাত হয়। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এ ইতিহাস আর্য প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ।
প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী মনিরুজ্জামান মনে করেন, ‘বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় এ অঞ্চলের ইতিহাস শুরু সপ্তম শতকের কাল থেকে । এই সময় এ অঞ্চল কামরূপের অধীন ছিল। ১০ম শতকে এখানে এক কৃষক বংশ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিন ভায়ের মধ্যে এই রাজ্য বিভক্ত হলে দুই ভাগ বর্তমান সিলেট (প্রাচীন গৌড় ও লাউড় ) ও আর একটি ভাগ জৈন্তিয়া (আসামের অংশ সহ) নিয়ে গঠিত হয়। চতুর্দশ শতকে এখানে ইসলাম ধর্মান্তর ঘটে। তখন স্থানীয় রাজাদের দ্বারা এতদ অঞ্চল শাসিত হতো। সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজশাহের সময় সিলেটের শেষ হিন্দু রাজার নাম গৌড় গোবিন্দ। মোগল আমলে এখানে একসময় ফৌজদারের শাসনও কায়েম হয়েছিল।’
বিভিন্ন সূত্রে অধিকাংশ গবেষকের ধারণায় সপ্তম শতক থেকে সিলেটের ইতিহাস প্রমাণিত হলেও, তার পূর্বেও সিলেট এবং তার পার্শ্ববতী রাজ্য সমূহের ইতিহাসের নিদর্শন আমাদের দৃষ্টি গোচর হয়। সিলেটের ইতিহাস কামরূপের ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত। কামরূপের পূর্ব নাম ছিল প্রাগজ্যোতিষ; বর্তমানে এর বৃহৎ অংশ আসাম। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম মতে ‘এ (আসাম) ভূখ-কে মহাকাব্যে প্রাগ-জ্যোতিষ এবং পুরাণে কামরূপ বলা হয়েছে। মুসলিম ঐতিহাসিকরাও একে কামরূপ বলেছেন। অহমীরা এই ভূখ-ের কর্তৃত্ব গ্রহণ করার কিছুকাল পর এটি আসাম নামে পরিচিতি লাভ করে। সবদিক দিয়েই আসামে প্রবেশ করা সহজ এ কারণে এই ভূখন্ডটি সকল যুগের পার্শ্ববর্তী এলাকার ক্ষুধিত মানুষ ও দুঃসাহসী অভিযাত্রীদের জন্য ছিল একটি আকর্ষণীয় এলাকা । ফলে এখানে অস্ট্রিক মঙ্গোলীয় দ্রাবিড় বংশোদ্ভূত ও আর্যদের বেশ কয়েক ধরনের উপজাতি সৃষ্টি হয়েছে । আসামের আধুনিক জনগণ ভারতের অন্যান্য অংশের মতোই সংমিশ্রিত এবং কথা বলে নানা ধরনের ভাষা ও উপভাষায়। এদের মধ্যে কেবল অহমীয় ও বাঙালিদেরই রয়েছে তাদের নিজস্ব লিখন পদ্ধতি ও সাহিত্য।’
কথিত আছে লাউড়ের পাহাড়ে কামরূপের রাজা ভগদত্তের একটি উপরাজধানী ছিল। বিষ্ণুপুরাণে ভারতের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত কিরাত রাজ্যের সীমানা ছিল উত্তরে জৈন্তার হরিপুর এবং দক্ষিণে মৌলভী বাজারের মনুনদী বাহিত অঞ্চল। গরুড়পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ীÑ ‘কিরাত দেশের মনু নদী তীরে, / মনু বহু জপ-তপ কৈল / তদবধি মনুনদী পুন্যতোয়া হৈল।’ সংস্কৃত ভাষার প্রখ্যাত প-িত পাণিনি তাঁর অষ্টাধ্যায়ী-তে প্রাচ্য জনপদের মধ্যে মগধ, কোশল, অবন্তীর সঙ্গে ‘সুরমস’ নামক একটি জনপদের উল্লেখ করেছেন। ডি.এস.আগরওয়ালের মতে এখানে সুরমস নামে সুরমা-উপত্যকাকে বোঝানো হয়েছে। আগরওয়ালের মত মেনে নিলে খ্রিস্টের জন্মের অন্তত পাঁচশত বছর আগেই আর্যভারতের সঙ্গে সুরমা-উপত্যকার পরিচয় ও যোগাযোগ ছিল বলে প্রমাণিত হয়।
প্রাচীন সিলেটের এ সব প্রমাণ বা নিদর্শন পাওয়া গেলেও খ্রিষ্টীয় প্রথম থেকে পঞ্চম শতাব্দী সময় কালের সিলেটের কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শন বা প্রমাণপত্র এখনো অজানা আছে বলা যেতে পারে। সৈয়দ মুর্তাজা আলীর ভাষায় “সিলেটের পুরানা ইতিহাস বিশেষ জানা যায় না। হিউয়েন সাং এর ভারত বিবরণী (৬২৯-৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ) তে আছে সমতট থেকে উত্তর পূর্বদিকে সাগরের তীরভূমি বরাবর এগিয়ে পাহাড় ও উপত্যকা ডিঙ্গিয়ে আমরা ‘শিলি চটল’ দেশে পৌঁছলাম। এই শিলিচটল দেশই শ্রীহট্ট। সিলেট জেলার দক্ষিণ পশ্চিমাংশ ও ময়মনসিংহের পূর্বাংশে পূর্বে একটি বৃহৎ হ্রদ ছিল। এই হ্রদকেই চৈনিক পরিভ্রাজক সাগর বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। অষ্টম ও নবম শতাব্দীর কোনও কোনও তাম্রশাসনে ও মধ্যযুগের কোনও কোনও গ্রন্থে হরিকেল রাজ্যের উল্লেখ আছে। চন্দ্রবংশীয় নৃপতি শ্রীচন্দ্রের রামপাল শাসনে ও ধুল্লা শাসনে হরিকেল রাজ্যের উল্লেখ আছে। অনেকের মতে হরিকেল শ্রীহট্টেরই নামান্তর। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় মনে করেন, ‘মনে হয় হরিকেল সপ্তম-অষ্টম শতক হতে দশম-একাদশ শতক পর্যন্ত বঙ্গ ও সমতটের সংলগ্ন কিন্তু স্বতন্ত্র রাজ্য ছিল। এ হিসেবে হরিকেল বা হরিকোলা যে শ্রীহট্ট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তা স্বীকার করতে আপত্তি থাকার কারণ নেই।’
সিলেটের ভূমিগঠন বাংলার পলল অঞ্চলের তুলনায় প্রাচীনতর, যে কারণে এ অঞ্চলের জনবসতিও প্রাচীনতর হতে বাধ্য। অন্য দিকে বাংলার সীমান্তবর্তী অঞ্চল হলেও হাওর-নদী-পাহাড় বেষ্টিত হবার কারণে সামাজিক যোগাযোগ-সীমাবদ্ধতা হেতু সামাজিক সংশ্রয় ভাষা অনেকটাই অপরিবর্তিত রয়ে গেছে এ অঞ্চলে; সৃষ্টি করেছে বৈচিত্র্যময় পৃথক ও দূরবর্তী উপভাষা। একই কারণে প্রতিবেশি বাংলা-অসমীয়া-খাসি-ককবরক ভাষা তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি এখানকার আঞ্চলিক ভাষার ওপর। আবার ভৌগোলিক কারণেই প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এ অঞ্চলে প্রতিবেশি শাসকগণ যেমন আক্রমণ চালিয়েছেন, তেমনি আর্য-আরব-ইউরোপীয় বণিকগণও আকৃষ্ট হয়েছেন।
তাঁদের অভিযান-আক্রমণ আর এখানকার ভূমি পুত্রদের সাথে সংঘাত-সংঘর্ষ সৃষ্টি করেছে এ অঞ্চলের ব্যতিক্রমী ইতিহাস। সে ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় এসব বহিরাগতগণের এ অঞ্চলে বসবাস আর এখানকার ভাষা-সংস্কৃতি আয়ত্ত করার আয়াস। স্থানীয় সংস্কৃতিকে লালন করতে গিয়ে কিংবা নিজেদের শাসন সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে এঁরা কখনো মৈথিলি ব্রাহ্মণ অভিবাসন ঘটিয়েছেন, আবার কখনো বাঙালি কিংবা অসমীয়া অভিবাসনে আগ্রহী হয়েছেন। বংশানুক্রমে এখানে বসবাসের কারণে স্থানীয় ভাষার প্রভাবে নিজের ভাষা হারিয়েছেন একই সাথে নিজেদের মাতৃভাষার উচ্চারণ-বৈশিষ্ট্য দিয়ে সিলেটের উপভাষাকে করে তুলেছেন বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ। ইতিহাসের সুপ্রাচীন যুগ থেকে আমরা দেখি সিলেটের সা¤্রাজ্য বা রাজ্য সীমা কোনো কালেই স্থির বা সুনির্দিষ্ট ছিল না। কখনো প্রাগজ্যোতিশ-কামরূপ-ত্রিপুরা-বর্মা ইত্যাদি সা¤্রাজ্যভুক্ত হয়েছে, কখনো বঙ্গ-সমতট-হরিকেল রাজ্যে মিশে থেকেছে, আবার কখনো স্বাধীন স্বতন্ত্র সিলেট ভূমি হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • সিলেটে মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সাহিত্য সাময়িকী
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • Developed by: Sparkle IT