সম্পাদকীয়

হাওরের সুগন্ধি ধান

প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৬-২০১৮ ইং ০১:৩৯:০৯ | সংবাদটি ৯১ বার পঠিত

হারিয়ে যাচ্ছে হাওরের সুগন্ধি দেশি ধান। উচ্চ ফলনশীল জাতের ধানের আগ্রাসনে দেশিয় সুগন্ধি ও সুস্বাদু ধান আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। চিরায়ত বাংলার ঐতিহ্য অনুযায়ী বছরে সাধারণত তিনটি মওসুমেই ধান চাষ করা হয় এ দেশে। অগ্রহায়ণ, বৈশাখ এবং ভাদ্র মাসে ঘরে তোলা হয় আমন, আউশ এবং বোরো ধান। এক এক মওসুমের ধানের বৈশিষ্ট্য এক এক রকম। ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ, স্বাদ ও গন্ধে এই সব ধান চাষ, পরিচর্যা ও ঘরে তোলা নিয়ে সারা বছরেই বাস্ত থাকতেন কৃষক। ধানের সুগন্ধে মাতোয়ারা হয়ে উঠতো গ্রাম বাংলা । এখন কৃষকরা ঘরে ধান তুলছেন ঠিকই আগের মতো; প্রতি মওসুমে তাদের গোলা ভরে উঠছে ঠিকই, তবে এই সব ধান দেশিয় প্রজাতির সুগন্ধি ধান নয়। এগুলো হয় দেশিয় বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল কোন জাত কিংবা বিদেশি জাতের ধান।
একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে দেশিয় প্রজাতির অনেক ধান এখন আর উৎপন্ন হয় না। স্বাধীনতার পর থেকে এই বিলুপ্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মূলত তখন ‘সবুজ বিপ্লব’ আন্দোলনের মাধ্যমে কম জমিতে বেশি ফসল উৎপাদনের দিকেই ঝুঁকে পড়ে সরকার। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয় উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান চাষের প্রতি। আর তখন থেকেই দেশিয় জাতের অনেক ধানের অস্তিত্ব হারিয়ে যেতে থাকে। অথচ দেশি ধানের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যেমন বেশি তেমনি বন্যার ঝুঁকিমুক্ত। তাছাড়া, এই ধানের ফলন কম হলেও স্বাদ ও সুগন্ধের কারণে এই ধানের চালে দাম বেশি পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারে এই ধান। যা উফশী ধানের পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া, উচ্চ ফলনশীল ধান পাকেও দেরীতে। যে কারণে আগাম বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয় এই ধান প্রতি বছর। সে তুলনায় বন্যার পানি আসার আগেই কৃষকরা দেশি জাতের ধান ঘরে তুলতে পারে।
দেশে ধান উৎপাদনের বৃহত্তম অঞ্চল হচ্ছে সুনামগঞ্জ। বিশেষ করে এই ভাটির জনপদে হাওরগুলোতে অতীতে অসংখ্য দেশি প্রজাতির ধান উৎপন্ন হতো। প্রায় দু’শ ২৮ ধরণের বোরোধান চাষ হতো এই অঞ্চলে। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু হয় নব উদ্দীপনায় কৃষি আন্দোলন। আর সেই সুযোগে উচ্চ ফলনশীল জাতের ধানের প্রচলন শুরু হয়। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে থাকেন ধানের নতুন নতুন জাত। বিদেশ থেকেও আমদানী করা হয় নতুন জাতের ধান। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয় এইসব ধান চাষে। সেই সঙ্গে উফশী জাতের ধানের ফলন বৃদ্ধির জন্য রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের জন্যও কৃষকদের অনুপ্রাণিত করা হয়। এতে সার কীটনাশক উৎপাদনকারী বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর একটা বাজার তৈরি হয়। এভাবেই দেশীয় জাতের ধান হারিয়ে গেছে।
কালের পরিক্রমায় দেশে জনসংখা বেড়েছে দ্বিগুনের বেশি। স্বাধীনতার প্রাক্কালে জনসংখ্যা ছিলো সাড়ে সাত কোটি। এখন ১৬ কোটি। তাই স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে গেছে খাদ্য চাহিদা। পাশাপাশি কৃষিজমির পরিমাণ বাড়ছেনা, বরং কমছে। স্বাধীনতার পর দেশে যা কৃষিজমি ছিলো তার অর্ধেকের বেশি এখন নেই। এই অবস্থায় বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য কম জমিতে বেশি ফসল উৎপাদন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। আর আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীদের উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান উদ্ভাবন এবং কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশে ফসল উৎপাদন দ্বিগুন তিনগুন বৃদ্ধি করাও সম্ভব হয়েছে। তাই বলে আমাদের দেশি জাতের ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু ও সুগন্ধি ধানের জাত হারিয়ে যাবে, তা হতে পারে না। শুধু সুনামগঞ্জ নয়, দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও হারিয়ে যাওয়া ধানের জাত ফিরিয়ে আনতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এগিয়ে আসবে বলেই আমরা আশা করছি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT