শিশু মেলা

সুইচ

আবদুল্লাহ্ হারিস পাশা প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৬-২০১৮ ইং ০১:৩৯:৩৯ | সংবাদটি ১৬০ বার পঠিত

শ্রাবণের এক বৃহস্পতিবার। বাড়ির সকলেরই মাগরিবের নামাজ শেষ হলো। এ সময় বিদ্যুৎ চলে গিয়ে বাড়িটা তিমিরাচ্ছন্ন হয়ে গেলো।
হাসান রেগে মেগে বলে উঠল, ‘এই অসময়ে আবার..........! ভাল্লাগে না’।
ভালো না লাগার যথেষ্ট কারণ আছে। প্রধান কারণ, বৃহস্পতিবার রাতটা সে কিছুটা আরাম আয়েশেই কাটায়। শুক্রবারে কোন কাজ থাকে না বলে এর আগের রাতটা সে বিনোদনের জন্য বরাদ্দ রেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় বর্ষের ছাত্র হলেও তার পড়ালেখার ধরন স্কুলের বাচ্চাদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে সে নিয়মিত যায়। তার সহপাঠী অনেকে খালি হাতে বা বাতাস ভর্তি ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে গেলেও তার ব্যাগ ভর্তি থাকে বই-য়ে। টিএসসিতে সেও আড্ডা দেয়। তবে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে না, যখন বিরতি পায় তখন। পড়ালেখা ছাড়া আরও একটা কাজ সে ভালো জানে, সেটা হলো মাউথ অর্গান বাজানো। এই খানেই তার প্রতিভার বর্ণনার ইতি টানতে হয়। কেননা, জীবনটাকে সে একটা ছোট্ট সীমানায় বেঁধে রাখতে পছন্দ করে।
বৃহস্পতিবার রাতে হাসান একটা মুভি দেখবে। সপ্তাহের আলোচিত মুভিটা সে তার ল্যাপটপে ইন্টারনেটের সাহায্যে দেখে। বিদ্যুৎ না থাকায়, আবার ল্যাপটপে চার্জ না থাকায় সে ঘরে পায়চারি করতে থাকলো। তার অবস্থা দেখে হাসি এসে বলল, ‘ভাইয়া, এই নাও চার্জার লাইট। এটা দিয়ে কষ্ট করে পড়তে বসো।’ উত্তরটা হাসান চোখের মাধ্যমেই দিলো। হাসান জ্যেষ্ঠ বলে তার চাহনি হাসির কাছে অজগরের মতো ভয়ঙ্কর লাগলেও অপ্রত্যাশিত হাসি দিয়ে হাসি বলল, ‘ওহ্হো, আজতো বৃহস্পতিবার, আমার একটুও মনে নেই। ইশ্, ভাইয়া, তোমার জন্য আমার কষ্টও হয়। সপ্তাহে একটা দিন তুমি......।’ হাসির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে হাসান বলল, ‘তাই আমাকে সহানুভূতি দিতে এসেছিস। দূর হ এখান থেকে।’
এবার হাসি গেলো হোসেনের রুমে। হোসেনের অবস্থা হাসান থেকে কিঞ্চিত বিবর্তিত। হোসেন সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র। সবাই তাকে এতটাই ভালো ছাত্র মনে করে যে, তার জ্ঞানের পরিসরকে সাগরের সাথে তুলনা করলেও বস্তুত হোসেন সাঁতারই জানে না। পড়ালেখা তার কাছে দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথমটা হলো কলেজে পড়ালেখা আর পরেরটা স্যারের বাসায় গাদাগাদি করে বহু কষ্টে কোনোমতে স্যারের কথা নোট করার পড়ালেখা। কলেজ থেকে বাসায় ফেরে বিকেল পাঁচটায়। দুপুর দেড়টায় কলেজ ছুটির পর রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেয়ে, পানি না খেয়েই সে বাসে উঠে পড়ে। ঠিক দুইটায় স্যার দরজা আনলক করবেন। ‘আগে গেলে আগে বসবেন’- রীতিতে এখানে ছাত্র পড়ালেখা করে। পড়ালেখা না বলে শুনালেখা বলাই শ্রেয়। কেননা, স্যার যে কথাটা বলবেন তা শুনার সাথে সাথে লিখতে না পারলে, ‘বন্ধু বন্ধু’ বলে সহপাঠীর খাতা ধার নিতে হয়। সেক্ষেত্রে, স্যার কি বললেন তা বুঝতে হয় নিজের বাসায় গিয়ে। এক স্যারের বাসায় শুনালেখা শেষ হলে আরেক স্যারের বাসায় হুমড়ি খেয়ে ঢুকতে হয়। মাঝে মধ্যে ‘সিট শেয়ারিং’ করতে হয়। ঘনিষ্ট বন্ধু ছাড়া কেউ নিজের চেয়ারের এক তৃতীয়াংশ কাউকে বসার জন্য দিতে চায় না। এই সকল ঝক্কি শেষে হোসেন যখন বাসায় ফেরে তখন তাকে দেখলে মনে হয় সে এমন একটা রোবট যার চার্জ শেষ হয়ে গেছে, এখন তাকে চার্জিং এ দিতে হবে। তবেই সে পরদিন আবার ফুল চার্জ নিয়ে কাজ করবে। এখানে, পরদিন যদি শুক্রবার হয়, তবে বৃহস্পতিবারের রাতটুকু আসলেই সপ্তাহের আর ছয়টা রাত হতে আলাদা। শুক্রবারে কলেজ বন্ধ, সেই সাথে স্যারের বাসাও। এই তো একটুখানি ভাবনার সময়, মানুষের মৌলিক অধিকার যে চারটি নয়, পাঁচটি। বিনোদন যে হাসানের মৌলিক অধিকার সেটা তার মনে আসে বৃহস্পতিবার রাতে। সে তার অধিকার ভোগ করে ভিন্ন আঙ্গিকে। না সে মুভি দেখে না। সে ভার্চুয়াল জগতে সময়টা কাটায়। বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ফেসবুক, ওয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করাটাই তার বিনোদন। সেই রাতেই যদি লোডশেডিং হয় তবে হোসেনের উচিত বিদ্যুৎ অফিসে হামলা করা। না, আগেই তো বললাম সে একটা রোবট। তার মধ্যে এ জাতীয় প্রোগ্রাম সেট করা না থাকায় সে নীরবে তিমির রাতকে বরণ করে নেয়।
হাসানের ঘরে ঝাড়ি খাওয়ার পর হাসলেও হোসেনের ঘরে ঢুকেই অট্টহাসি দেয় হাসি। তারপর বলে, ‘তোমারও খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই না ভাইয়া।’
হোসেনের মধ্যে ঝাড়ি দেওয়ার কোড থাকলেও সে ঝাড়ি না দিয়ে বলে, ‘আরে নাহ। ভালোই লাগছে। মশারা আজকাল রবীন্দ্রসঙ্গীত ছেড়ে ব্যান্ডের গান ধরেছে।
-সেটা আবার কেমন?
আজকাল মশারা কানের কাছে এসেই খুব দ্রুত চলে যায়। এতে করে তাদের মারা কষ্ট হয় এবং তাদের গানটা ব্যান্ডের গানের মতো শুনায়।
-‘তুমি কেমন করে এতো কিছু বুঝো হে জ্ঞানী।’- গাইছে আর হাসছে হাসি।
-রবি ঠাকুরের গান বিকৃত করবি না।
হোসেনের সাথে কথা বলতে হাসির ভালোই লাগে। তাদের কথায় ছেদ পড়ে বায়োজিদ সাহেবের ডাকে। তিনি হাসিকে ডাকলেও হোসেনও সঙ্গে যায়।
বায়োজিদ সাহেবের ঘরখানাকে একটা ছোটখাট লাইব্রেরি বলা যায়। লাইব্রেরির পাঠক মাত্র দুইজন। তিনি নিজে এবং তার স্কুল পড়–য়া মেয়ে হাসি ছাড়া বইয়ে কেউ হাত দেয় না। হাত দেওয়া যে নিষেধ তা নয়। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত থাকে। বায়োজিদ সাহেব পেশায় ব্যাংকার। তার পেশার সাথে বই পড়ার নেশাটা কেমন জানি বেমানান। ঢাকার কোথাও বই মেলা হচ্ছে- এমন খবর পাওয়া মাত্রই তার মন হাঁস-ফাঁস করতে থাকে। সুযোগ পেলে হাসিকে সঙ্গে নিয়ে বই মেলায় যান। হাসি ক্লাস এইটে পড়লেও তার বইয়ের প্রতি আকর্ষণ অনেক বেশি। বায়োজীদ সাহেব বই কিনে প্রথমে নিজে বইটি পড়বেন। পড়া শেষে বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় এসে মার্কিং করবেন। তার অনেক প্রিয় বইয়ে তিনি দশে দশ দিয়েছেন। বই পড়া শেষ হলে তা হাসি পড়বে। তবে তার গতি মন্থর। তার বাবা যে বই পড়বেন দু’দিনে, সেই বই পড়তে হাসির লাগবে সপ্তাহ খানেক। বই পড়বে আর বাবাকে প্রশ্ন করবে- বাবা, উদরপূর্তি কী, এই কবিতাংশের মানে কী, আরও কত কী। সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন না তার বাবা। তখন তার সরল প্রতিউত্তর হয় আমিও জানি না মা। এভাবেই চলে, তাদের বই পড়া।
হোসেন ও হাসি যখন বাবার ঘরে বা লাইব্রেরিতে যায় তখন হোসেনকে দেখে বায়োজীদ সাহেব খানিকটা হাসি মুখ করে বললেন, ‘আরে বিদ্যা সাগর যে, আপনি আবার কি মনে করে’।
তাকে নিয়ে যে মশকরা হচ্ছে তা নীরবে হজম করে হোসেন বসে পড়ে কিন্তু হাসি বসে না। সে আবার চলে যায় হাসানের ঘরে। গিয়ে দেখে পায়চারি বন্ধ করে হাসান এবার বারান্দায় চলে গেছে।
-ভাইয়া, তুমি বারান্দায় কী করছো?
-ধ্যাৎ, আমার নতুন মোজাটা উড়ে গেছে, বারান্দায় ছিলো।
তোমার মোজার জন্য আমিও শোকাহত ভাইয়া। খুব জোরে বাতাস বইছে। এমন সময় অনেকের ঘরের চাল উড়ে যায় আর তোমার মোজা...
-তুই কি শুধু আমার সাথে ফাজলামি করিস?
-না, তোমার ছোট ভাইয়ের সাথেও করি। লাইব্রেরীতে চলো, সেখানে আজ আড্ডা হবে। আর যদি না যাও, তবে আমি আবার আসবো। বলেই হাসতে হাসতে হাসির প্রস্থান।
হাসান বাবার ঘরে যায় তবে একা নয়। সাথে মাকে নিয়ে যায়। ঘরের মধ্যেও গ্রুপিং আছে। হাসানের পক্ষে তার মা আর হাসির পক্ষে তার বাবা। হোসেন হলো সুবিধাবাদী।
হাসানের মা উচ্চ শিক্ষিত, উচ্চ বংশের, উচ্চাভিলাশী হলেও উচ্চতায় খাটো। বেকার নন, তিনি গৃহিণী। গৃহের কোন কাজ তিনি করেন বললে পাল্টা প্রশ্ন করবেন, কোন কাজটা তিনি করেন না। তার বিশেষত্ব হলো তার হাতটাকে সৃষ্টিকর্তা এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, ওই হাতে রান্না করা খাবার যে একবার খেয়েছে তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়াটা স্বাভাবিক। ঠিকই ধরেছেন তিনি ঝালটা একটু বেশিই পছন্দ করেন। সপ্তাহে বেশি হলে দুই থেকে তিনবার তিনি ‘রান্না রান্না’ খেলেন। যখন তিনি রান্না ঘরে ঢুকেন তখন সবার মনে হয়, আজই বোধ হয় কাজের মেয়েগুলো বিদেয় হল। কাজের মেয়ে একটা নয়, দুইটা। সপ্তাহে ওই দুই বা তিনবার ছাড়া বাকি পুরো সপ্তাহেই তারা খাবার সরবরাহ করে। তাদের কাজে সর্বদাই নাখোশ হাসানের মা। সর্বোচ্চ এক বছর টিকেছিলো যে কাজের মেয়েটা- তার কার্যকাল ছিলো বায়োজীদ সাহেবের বিয়ের প্রথম এক বছর। আস্তে আস্তে খোলস ফেটে বের হয় হাসানের মায়ের আসল রূপ। হাসানের মায়ের অবসর কাটে টিভি দেখে। ভারতীয় কিছু চ্যানেলের মধ্যে তার আসা যাওয়া হয়।
হাসান তার মাকে নিয়ে লাইব্রেরী ঘরে আসার পর বায়োজীদ সাহেব ইজি চেয়ার হতে উঠে মাদুরে বসেন, এবং সবাইকে একসাথে গোল হয়ে বসতে বলেন। সবাই মাদুরে বসলে হোসেন বলে, ‘কয়েকটি ব্যাঙের ছাতা এভাবে বৃত্তাকারে অবস্থান করে, একে ‘ফেয়ারি রিং’ বলে।’ হাসানের কথা শুনে হাসি বলে, আমাদেরকে কী তুমি ব্যাঙের ছাতা মনে করো?’
হোসেন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে আর ভিতরে ভিতরে একটা কঠিন ইংরেজি শব্দ মনে করতে চেষ্টা করে তবে উচ্চারণে ভুল হওয়ার ভয়ে চুপ করেই থাকে সে।
কিন্তু হাসি চুপ থাকে না। সে হোসেনকে নিয়ে রসিকতায় মেতে ওঠে।
বায়োজিদ সাহেব হাসিকে চার্জার লাইট পাল্টিয়ে মোমবাতি আনতে পাঠান। তার মতে, মোমবাতির আলোয় আড্ডা জমবে ভালো। হাসি মোমবাতি নিয়ে আসে। মোমবাতিটা মধ্যখানে রেখে সবাই গোল হয়ে বসে রয়েছেন।
ঘরে বিদ্যুৎ নেই। সবার রুটিনমাফিক কাজে ব্যাঘাত ঘটায় সবাই অবসর পেয়েছেন। তবু কাজের মেয়েগুলোর কথা আলাদা। বিদ্যুৎ না থাকলে কী হবে, গ্যাসতো আছে। তারা রান্না ঘরেই কাজ করতে থাকে। বুঝাই যায়, বিদ্যুৎ না আসা অবদি লাইব্রেরিতে আড্ডা চলবে। আড্ডার উদ্বোধন করা উচিত বায়োজিদ সাহেবের অথবা তার খাটো স্ত্রীর। কিন্তু উদ্বোধনী বক্তব্য দেয় হাসি। সে বলে উঠে- ‘আজকের রাতটা আলাদাভাবে কাটানো যায়। আব্বু, আম্মু দু’জনের কাছ থেকেই আজ গল্প শুনবো।’
সাথে সাথেই হাসানের মা বলতে শুরু করলেন, ‘আমার আবার গল্প! আমি নাকি রান্না বান্না কিছুই করি না। আবার করলেও তা নাকি অখাদ্য। আমার সারাটা জীবন গেলো শুধু....।’
হাসানের মাকে থামিয়ে হাসির বাবা বলেন, ‘ভাঙ্গা রেকর্ড আর বাজিয়োনা। মেয়েটা দুটো গল্প শুনতে চায়, এখানেও তুমি শুরু করে দিলে....।’
বাবাকে থামায় হাসি। সে বললো, ‘খুব সুন্দর লাগলো তোমাদের গল্প। আর শুনতে চাই না।
বায়োজিদ সাহেব শান্ত গলায় বললেন, ‘আমি আজ আমার শৈশবের কিছু গল্প করতে চাই। তোরা অনেক কিছুই জানিস, আজ নতুন করে শোন।’ বায়োজিদ সাহেব কথা বলেন খুব গুছিয়ে। তার শৈশবের গল্প বলার সময় তিনি ঠিক যেনো সেই ছোট্ট মামুন হয়ে ওঠেন। বায়োজিদ সাহেবের ডাকনাম হলো মামুন। শৈশবে তার দুষ্টুমির বর্ণনা সবাই মন দিয়ে শুনে। একটা সময় তিনি বলেন, ‘তোদেরকে কখনো কালির কথা বলেছি?’
হাসান, হোসেনের মুখে তালা। হাসি বলে, ‘কালি আবার কী?’ বায়োজিদ সাহেব বলেন, ‘তাহলে আজকে আমার কালির কথা বলি’। হাসানের মা উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘লাইলী মজনুর প্রেম কাহিনী তোরা শুন’। কালির কথা তিনি বেশ কয়েকবার শুনেছেন। তাই তিনি লাইব্রেরি ঘর হতে চলে যান। তার চলে যাওয়ায় হাসানেরও উঠে পড়া উচিত। কিন্তু না, সে বসে থাকে। সে আগ্রহ নিয়ে কালির গল্প শুনবে।
এদিকে বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। শ্রাবণ মাসের বৃষ্টি। বৃষ্টির প্রভাব লাইব্রেরি ঘরে না পড়লেও রান্নাঘরে পড়েছে। হাসানের মা কিছুটা হঠাৎ করেই রান্না ঘরে ঢুকেন। তার হাতে ফ্রিজ থেকে বের করা ইলিশ মাছ। বৃষ্টির দিনে মাছ ভাজা খেতে সবারই খুব ভালো লাগে। আজকে কেমন জানি সবকিছু অন্যরকম লাগছে। রান্নাঘরে রান্না করছেন হাসানের মা। যে কিনা রান্না ঘরে ঢুকলে....। অথচ আজ রান্নাঘর নীরব। অপরদিকে, বায়োজিদ সাহেবের ‘কালির’ গল্পে লাইব্রেরি ঘর সরব। হাসির বাবা শুরু করলেন, ‘কালি ছিল আমাদের একটা গরু। আমি একটা বিড়ালের পাশাপাশি এই গরুও পুষতাম।
এবার হাসির শব্দে লাইব্রেরি ঘরে প্রতিধ্বনি শুনা যায়। না, এবার হাসি হাসেনি। হাসান ও হোসেন হাসছে। তারা দাঁত না দেখিয়ে হাসলেও হাসির শব্দ অনেকদূর পর্যন্ত যায়।
-হাসি বলে, ‘আশ্চর্য এখানে হাসির কী হলো!’
হাসান ও হোসেনের মুখে তালা হাসবার সময় খুলেছিলো। পরক্ষণেই তা বন্ধ হয়ে যায়।
হাসির বাবা আবার শুরু করলেন, ‘আমি প্রথম থেকেই গরু পুষতাম না। বরং গরু দেখলেই ভয় পেতাম। আস্তে আস্তে আমার ভয় কেটে যায়। কালির প্রতি প্রচন্ড টান অনুভব করি। আমার স্থির বিশ্বাস ছিলো যে, কালি আমার কথা বুঝতো।’
-হাসি প্রশ্ন করে, ‘কালি নামটা কে দিয়েছে?’
বায়োজিদ সাহেব বলেন, ‘আমিই দিয়েছি। কালির গায়ের রং ছিল কালো। তাই নাম দিয়েছিলাম কালি। তারপর থেকে সবাই কালি বলেই ওকে চিনতো। আমি কালি বলে ডাক দিলে আমার দিকে তাকাতো।’
-‘কালি কতোদিন বেঁচেছিলো?’ হাসির এই প্রশ্নে তার বাবা কিছুটা বিরক্তির সুরে বললেন, ‘আর প্রশ্ন করিস না। সব প্রশ্ন কথা শেষে করবি।’
বাবার কথায় চুপ হয়ে যায় হাসি; বায়োজিদ সাহেব বলতে লাগলেন, ‘কালির সাথে দিনের খানিকটা সময় কাটাতাম। শৈশবে আমার অনেক বন্ধু ছিলো। তার মধ্যে কালিও আছে। আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। কোরবানির ঈদের দিন ঘনিয়ে আসছে। হঠাৎ একদিন বাবা বললেন, এবার কালিকে কোরবানি দিয়ে দিবো। বাবার এমন সিদ্ধান্তে আমার তখন খুব খারাপ লাগে। বাবাকে কিছু বলতে ভয় পেতাম। মাকে গিয়ে বলেছিলাম, যাতে কালিকে কোরবানি না দেন। মা আমার কথার কোন পাত্তাই দেননি। ঈদের আর চার পাঁচ দিন বাকি। সাহস করে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাবাকে বললাম, আমাদের তো আরেকটা গরু কিনে কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য আছে। কালিকে এবার কোরবানি দিয়ো না। ‘বাবা আমার পিঠে হাত বুলিয়ে বুঝালেন, ‘কোরবানি দিতে হয় প্রিয় জিনিসটা। আমি জানি, কালি তোর বন্ধুতুল্য। কিন্তু বাবা, এখানেই তো কোরবানী দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য নিহিত। এই পশুকে কোরবানী দিলে আল্লাহতা’আলা অনেক বেশি খুশি হবেন। দু’দিনের দুনিয়ায় অনেক মায়া কাটাতে হয়। আমার ধারনা তুই বুঝতে পেরেছিস। যা, বাবা পড়তে বস। এসব বিষয় মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল।’- বাবার কথায় সেদিন নিজেকে পোষ মানাই। ঈদের দিন যত এগিয়ে আসে আমার কষ্ট ততো বাড়তে থাকে। ঈদের আগের রাতে আমার ঘুম আসে না। ইচ্ছে করে, কালিকে যে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে, তা খুলে কালিকে বলি, ‘তুই চলে যা কালি। তোকে এরা বাঁচতে দিবে না।’ নানান উদ্ভট চিন্তা আমার মধ্যে ভর করে। তার পরদিন ঈদের নামাজ থেকে এসে কালিকে কোরবানি দেওয়া হয়। আমি কালির মৃত্যু দেখেছিলাম অনেক দূর দাঁড়িয়ে। সেই দৃশ্য আসলেই ভুলার নয়।’
কালির কথা শুনে প্রথমে হাসান ও হোসেন হাসলেও এখন তাদের চোখে জল আসে। হাসিও কষ্টটা অনুভব করে।
তখন হাসানের মা সবাইকে খেতে ডাকলেন। রাত তখন সাড়ে দশটা বাজে। সবাই খাবার ঘরে যাওয়ার জন্য উঠে পড়ে। হাসি তার বাবাকে বলে, ‘ব্যাপারটা হানিফ সংকেতের ‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠানের মতো হয়ে গেলো। তোমার শৈশবের মজার মজার গল্প তুমি শুনালে। শেষদিকে দুঃখের গল্প শুনালে, যা শিক্ষণীয়।
রকমারি খাবারের মধ্যে ভাজা মাছটাই সবচেয়ে ভালো হয়েছে। মাছের রাজা ইলিশ কাঁটা বেশি হলেও, সবার খুব পছন্দ। হাসানের মা একাধিকবার সবাইকে জানালেন, মাছ ভাজাটা তিনি নিজ হাতে করেছেন। খাওয়ার সময় বায়োজিদ সাহেব প্রস্তাব করলেন, ‘আগামীকাল তো সবার ছুটি। কোথাও বেড়াতে গেলে কেমন হয়?’ ‘সবাই তার কথায় সায় দিলো। এবার, কোথায় যাওয়া যায় তা নিয়ে মতবিরোধের সৃষ্টি হলো। একেকজন একেক জায়গায় যেতে চায়। হাসি বলেছিলো; ফ্যান্টাসি কিংডম, পার্কের কথা। বিস্ময়ের ব্যাপার, হাসিকে সমর্থন দিলেন তার মা। তখন বায়োজিদ সাহেব বলেন, ফ্যান্টাসি কিংডম পার্কেই যাই। এর পরের শুক্রবারে অন্য জায়গায় যাওয়া যাবে। এরপর সবাই পরিকল্পনা করে কীভাবে দিনটা সুন্দরভাবে কাটানো যায়।
খাবার শেষে সবাই উঠে পড়ে। রাত সাড়ে এগারোটা বাজতে আর দশ মিনিট বাকি। আজ আর বিদ্যুতের আশা কেউ করে না। সবাই ঘুমোতে যায়। যদিও বারবার সবাই হা-হুতাশ করতে থাকে বিদ্যুতের জন্য, দিনশেষে সবার মনে একই কথা, রাতটা মন্দ কাটেনি। রাত প্রায় একটা বাজে। হাসি ছাড়া বাড়ির সবাই তখন ঘুমে। হাসি অপেক্ষা করছিলো, সবাই যাতে ঘুমিয়ে পড়ে। এবার হাসি উঠে দাঁড়ায়। টর্চের আলোয় সে বৈঠক ঘরে যায়। সেখানেই ঘরের বিদ্যুতের মেইন সুইচ। সন্তর্পণে

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT