শিশু মেলা

অসীম অপেক্ষা

মোঃ মনজুর আলম প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৬-২০১৮ ইং ০১:৪০:১৩ | সংবাদটি ১১৪ বার পঠিত

হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করেও রহিমা বিবি তার দুই সন্তানের আহার জোগাড় করতে হিমশিম খান। ঠিকমত আহার দিতে পারেন না বলে রহিমা বিবির মনে বড় কষ্ট, স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনিই সংসারের হাল ধরেছেন। গ্রামে এখনো অভাব, ভালো থাকা ও ভালো খাবার জন্য রহিমা শহরে আসতে চায়। অনেকের মুখে গল্প শুনেছে শহরে এলে তার এমন দিন থাকবে না, রহিমা আশায় বুক বাঁধে। সে শহরে আসবে বাড়ি বাড়ি কাজ করবে। আর সুযোগ হলে তার মেয়েও কাজ করবে এবং ছেলেকে কোন বাড়িতে লজিং দেবে। রহিমার মেয়ে কুলসুমা বড় এবং ছেলে রানা ছোট। একদিন রহিমা বিবি আর মেয়ে কুলসুমা শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। অজানা অচেনা জায়গায় আসতে কেমন যেন ভয় ভয় করছে। যুবতী মেয়ে সাথে মায়ের মনে উৎকন্ঠা করছে কি জানি কি হয়ে যায়। ঈদের সময় এমনিতে শহরে ভীড়। কাজ পাব না মেয়ে খোয়াব এই শঙ্কায় রহিমা বিবির পা আর চলে না। তবুও রহিমা বিবি চলতে থাকে। মনে তার বড়ই আশা কাজ না পেলে তো ঈদের সময় যাকাত-ফিতরা পাব। দমেনা রহিমা বিবি, মেয়ে কুলসুমাকে সাথে নিয়ে হেটে হেটে দুপুরের পরে শহরে প্রবেশ করল। বাহ! কি সুন্দর শহর, বড় বড় বিল্ডিং, সুন্দর সুন্দর গাড়ি ভেঁপু হর্ণ মানুষের কত কোলাহল। এসবই তারা মা ও মেয়ে দেখছেন। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে শহরে আসা তা কেমনে পূরণ হবে। বড় বড় মানুষ দেখছেন, টাকাওয়ালাদের দালান দেখছেন কিন্তু কাজ কোথায় পাব। কাজ না পেলে যাকাত-ফিতরা কার কাছে চাইব ভেবে ভেবে অস্তির। হাঁটতে হাঁটতে তারা এক মসজিদের কাছে পৌঁছাল। এখানে দেখে অনেক ল্যাংড়া, কানা ফকিরের জটলা। আসরের আযান হচ্ছে, মুসল্লিগণ নামাজে আসছেন। রহিমা বিবি ও কুলসুমা তাদের ভিক্ষা করার অভ্যাস নেই তারা হাত পাততে লজ্জা বোধ করেন। তারা এককোণে দাঁড়িয়ে। কিন্তু মানুষের দান-খয়রাত দেখে রহিমা বিবি খুশি। শুধু মনে জোর আসছে না। কুলসুমারও মন সায় দিচ্ছে না হাত পাতার, তবুওতো টাকার জন্য এ পর্যন্ত এই অচেনা জায়গায় আসা। ওইদিকে রানা বাড়িতে অপেক্ষা করছে, মা ও বোন কোথায় গেল, রমজানের দিন ইফতারের সময় হয়ে যাচ্ছে আজ এখনো ঘরে কিছুর জোগাড় নেই। রানার মনে নানান কথা। মা আর বোন নানার বাড়িতে যায়নি তো। গেলেওতো এভাবে আমাকে কিছু না বলে যাবে কেন? রানা শান্তি পাচ্ছে না। মনের কোণায় নানা জিজ্ঞাসা। রানা অনুমানে বুঝে নেয় ৪/৫ দিন পর ঈদ হয়তো কোন আত্মীয়’র কাছে আমার ও বোন কুলসুমার জন্য কিছু চাইতে গেছে। এভাবে রানা ভাবতে ভাবতে অপেক্ষা করতে থাকে। ওই দিকে রহিমা বিবি ও কুলসুমা কিংকর্তব্য বিমূঢ়। কি করবে বিবেক কিছুতেই ভিক্ষার হাত বাড়ানোয় সায় দিচ্ছে না। মুসল্লিরা আসরের নামাজ সেরে যার যার অবস্থানে চলে যেতে শুরু করেছেন। আর ফকিরগুলো কিছু টাকা চাওয়ার সময় ছড়ার মতো করে অনেক বুলি আওড়াতে থাকল। মুসল্লিগণ ১০/২০ টাকা করে ভিখারীর হাতে দিতে থাকলেন। রহিমা বিবি কুলসুমাকে বলে মা কুলসুমা তারাতো অনেক টাকা পাচ্ছে আমরা এভাবে হাত পাতব না শরীরে শক্তি আছে কাজ করে টাকা কামাই করব। আর এখানে দেখছি ল্যাংড়া, লোলা ফকির বেশি তারা কিছু করতে পারে না বলে এভাবেই হাত পেতে টাকা নিচ্ছে। মা ও মেয়ে সংকল্প করল ভিক্ষা করবে না কেহ যদি দয়া করে হাতে তুলে দেয় যাকাত-ফিতরা তবে নেব সাহায্য হিসেবে, তবে ভিক্ষা করব না, শহরে আসাটাই যেন অসার হয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে মা ও মেয়ে বাড়ি ফিরে যেতে চায়। তারা এসেছে একদম খালি হাতে। বাড়ি যেতে ভাড়া নেই, এসেছে হেঁটে হেঁটে। যুবতী মেয়ে নিয়ে এভাবে যাওয়াটা কি ঠিক হবে! রহিমা বিবি চোখে অন্ধকার দেখছেন। তার দু’চোখে অশ্রু গড়ায়। ইফতারের একেবারে কাছাকাছি। হঠাৎ এক দরদি মনের লোক তাদের দেখে তার গাড়ি থেকে তাদের কাছে ডাকলেন। রহিমা বিবি কাছে গিয়ে সব বললেন গাড়িওয়ালা দয়া ভেবে তার গাড়িতে উঠতে বলল, কিন্তু তারা ভয়ে উঠতে চায় না। গাড়ির ভেতর থেকে ঐ লোকের স্ত্রী ডাক দিতেই মা ও মেয়ে গাড়িতে চাপল। গাড়িটি ইফতারের ৬/৭ মিনিট আগে বাসায় পৌঁছাল। টেবিলে ইফতার সাজানো। বস্ বললেন রফিক আরো দুই প্লেট ইফতার তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো। কুলসুমা ও রহিমা বিবি এতো খুশি, তাদের মনোবাসনা হয়তো পূর্ণ হতে যাচ্ছে। ইফতারীর পর বস্ শহরে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে রহিমা বিবি সব খুলে বলল। বস্ তাদের অভাব মনোযোগে শুনলেন এবং স্বভাব দেখে মুগ্ধ হলেন। তিনি তাদের তার যাকাতের টাকা থেকে বিশ হাজার টাকা দিয়ে রফিককে বললেন তাদের এগিয়ে দেয়ার জন্য। বস্ এর হুকুম মতো রফিক তাই করতে বের হয়ে পড়ল। বস্ ও সাহেবানকে সালাম করে রহিমা বিবি ও কুলসুমা রফিকের সাথে নিজ বাড়িতে যেতে বের হয়ে পড়ল। রফিক কিন্তু বড়ই সৎ, যুবতী, টাকা কোন কিছুর প্রতি তার লোভ নেই। মানুষ ভালো হয়, মানুষ খারাপ হয় সঙ্গ দোষে, রফিক মানুষের মতো মানুষ হয়েছে ভালো বস্ এর সংস্পর্শে এসে। এদিকে রাত আটটা। রানার উৎকন্ঠার শেষ নেই, সে কেবল পায়চারি করছে আর অতীতের কথা স্মরণ করছে মা তাকে নিয়ে বড় হবার স্বপ্ন দেখেছেন। কোথায় গেলেন মা ও বোন অপেক্ষা করছে আর ভাবছে। হয়তো এখন এসে যাবেন নতুবা একটু পরে। রফিক এগিয়ে চলছে তার দায়িত্ব পালনে। তাদেরেকে বাড়ি পর্যন্ত পৌছে দিবে। পথিমধ্যে একদল মানবপাচারকারী রফিককে সে দায়িত্ব পালন করতে দেয়নি। রফিক সহ বন্দী হয় ঐ চক্রের হাতে। তারা তিনজন বন্দী। একটি অন্ধকার ঘরে বন্দী। ঈদের পর পাচার হবে দূর কোথায় কোন এক দেশে। রহিমা বিবি বলে ও বাবারা আমার কাছে যাকাতের বিশ হাজার টাকা আছে এগুলো নিয়ে ছেড়ে দাও। পাচারকারী বলে হাজারে হবে না আমাদের লক্ষ লক্ষ দরকার। ঈদের পর তারা পাচার হয়ে গেলেন। রানা অপেক্ষা করতেই থাকল। অসীম অপেক্ষায় রানা। অপলক অপেক্ষায়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT