উপ সম্পাদকীয়

মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৬-২০১৮ ইং ০১:৪১:৩৯ | সংবাদটি ১৩৩ বার পঠিত

শ্রম অভিবাসন বাংলাদেশের নাগরিক, পরিবার এবং সমাজের মানুষকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, কখনও কখনও কোনো অসাধু ব্যক্তি এবং অপরাধী চক্র সহজ-সরল লোকদের অপব্যবহার করে তাঁদের প্রত্যাশা ও স্বপ্ন ভঙ্গ করে। আশার কথা হলো, প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার এবং নিরাপদ অভিবাসনের বিভিন্ন পথ আছে। এসব কিছু জানার পূর্বে আসুন আমরা জেনে নিই, মানব পাচার কি? কিভাবে মানব পাচার হয় এবং বাংলাদেশের আইনে মানব পাচারের শাস্তির বিধানটাই বা কি রকম।
২.
বাংলাদেশের মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ অনুযায়ী, ‘মানব পাচার’ অর্থ কোন ব্যক্তিকে ভয় দেখিয়ে, বল প্রয়োগ বা প্রতারণার মাধ্যমে তাঁর আর্থ-সামাজিক, পরিবেশগত বা অন্য কোন অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে এবং টাকা-পয়সার বিনিময়ে বা অন্য কোন সুবিধা লাভের জন্য তাঁর উপর নিয়ন্ত্রণ আছে এমন কারো সম্মতি নিয়ে এবং বাংলাদেশের ভিতরে বা বাইরে যৌন শোষণ, শ্রম শোষণ অথবা অন্য কোন শোষণ বা নিপীড়নের উদ্দেশ্যে ক্রয় বা বিক্রয়, সংগ্রহ বা গ্রহণ, নির্বাসন বা স্থানান্তর, চালান বা আটক করা বা লুকিয়ে রাখা বা আশ্রয় দেয়া। উল্লেখ্য, পাচারের শিকার ব্যক্তির বয়স ১৮ বছরের কম হলে বলপ্রয়োগ, প্রতারণা বা প্রলোভন দেয়া হয়েছে কি না তা বিবেচনা করার দরকার নেই বরং শোষণ বা নিপীড়ন হলেই তা মানব পাচার প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট।
৩.
মানব পাচার হয় মূলত ঃ প্রতারণার মাধ্যমে। যেমন- বিয়ে বা প্রেমের সম্পর্কের মিথ্যা প্রস্তাব, শিশুদের ভালোভাবে যতœ এবং শিক্ষা দেয়ার মিথ্যা আশ্বাস, ভালো চাকরির বা কাজের প্রলোভন (ভালো খাবার, অধিক উপার্জন, উন্নত আবাসন), উচ্চ শিক্ষার মিথ্যা আশ্বাস, জবরদস্তি (অপহরণ, ধর্ষণ, মারধর, আটক রাখা, মানসিক নির্যাতন), বল প্রয়োগ (হুমকি, পতিতাবৃত্তি বা ভিক্ষা করতে বাধ্য করা, জবরদস্তি শ্রম বা সেবা আদায়, ঋণ-দাসত্ব, অঙ্গহানি করা)। মানব পাচার বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে বা বাইরেও হতে পারে। আসল প্রশ্ন হলো ঃ আপনার সাথে যা ঘটতে যাচ্ছে তা আপনি বোঝেন কি না তাতে আপনার সম্মতি আছে কি না অথবা আপনাকে প্রতারণা বা বল প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না?
৪.
বাংলাদেশের আইনে মানব পাচার একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যেমন-মানব পাচারকারী কোনো একক ব্যক্তি হলে তার শাস্তি ‘যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং কমপক্ষে ৫ (পাঁচ) বৎসর সশ্রম কারাদন্ড এবং কমপক্ষে ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা জরিমানা।’
আবার, মানব পাচারকারী কোনো সংঘবদ্ধ দলের সদস্য হলে তার শাস্তি ‘মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা কমপক্ষে ৭ (সাত) বৎসর সশ্রম কারাদন্ড এবং কমপক্ষে ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা জরিমানা।’
৫.
নিজেকে এবং অন্যদেরকে পাচারের হাত থেকে রক্ষা করুন, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে সহায়তা করুন। যেমন-
আপনার অধিকারগুলো জানুন এবং সব সময় সেগুলো আদায় করার চেষ্টা করুন। পছন্দের দেশ বা চাকরিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে ঝুঁকিগুলো যাচাই করুন। আপনার ভবিষ্যৎ আপনি নিজেই স্থির করুন এবং জেনে ও বুঝে আপনার সিদ্ধান্ত নিন। নিবন্ধিত শ্রম অভিবাসী উপায়গুলো জেনে নিন এবং এজেন্ট বিশ্বস্ত কি না যাচাই করুন। আপনার পরিবার ও বন্ধুদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করুন এবং আপনি যা জেনেছেন এবং বুঝেছেন মা-বাবা, ভাই ও বোনদের তা বুঝাতে সাহায্য করুন। মনে রাখবেন, নদীর এপার কয় ছাড়িয়া নিঃশ্বাস, ওপারেতে সব সুখ আমার বিশ্বাস। এক পর্যায়ে দেখা যাবে ওপাড়ে কোনো সুখ নাই! তাই বড় লোক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কখনো দালালদের খপ্পড়ে পড়বেন না । সঠিক প্রক্রিয়ায় শুরু হওয়া শ্রম অভিবাসন ও যে কোনো সময় মানব পাচারের পরিস্থিতিতে চলে যেতে পারে। তাই দেশের বাইরে যাওয়ার পূর্বে এটা অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে নিন যেসব ব্যক্তি আপনার সাথে যোগাযোগ করছে এবং আপনাকে দিক নির্দেশনা দিচ্ছে তারা আপনার নিয়োগদাতার বৈধ এবং আইনগত স্বীকৃত প্রতিনিধি কি না। নইলে ভালো কাজের কথা কইয়া আপনাকে কষ্টের জীবনে ঠেলে দিতে পারে। দারিদ্র্য এবং আপনার অসহায়ত্বের সুযোগটাই কিন্তু মানব পাচারকারীরা নিয়ে থাকে। কর্মহীন নারীদেরকে ভালো কাজ করার সুযোগ আছে বলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গৃহশ্রমিক হিসেবে পাঠায়। পরে সেখানে গিয়ে নারীরা যৌন নিপীড়ন বা সেক্সুয়াল হ্যারাজমেন্ট এর শিকার হয়।
৬.
শ্রমিক হিসেবে দেশ ত্যাগ করার পূর্বে, আপনি যে দেশে এবং যে কাজে যাচ্ছেন তা আপনার ইউনিয়ন পরিষদের তথ্যকেন্দ্রে নিবন্ধন করতে ভুলবেন না। পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট, বিমানের টিকেট পূরণ করা এমবারকেশন কার্ড, ভিসা, কাজের অনুমতিপত্র, কাজের চুক্তিপত্র, বিএমইটি থেকে প্রাপ্ত বহির্গমন ছাড়পত্র / স্মার্ট কার্ড, গন্তব্য দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস এবং আপনার কর্মস্থলের যোগাযোগের ঠিকানা এবং টেলিফোন নম্বর বা মোবাইল নম্বর। আর ঘর থেকে বের হওয়ার পূর্বে অত্যন্ত সজাগ দৃষ্টি দিয়ে প্রতিটি ব্যাগের গায়ে আপনার নাম ও গন্তব্যের ঠিকানা স্পষ্ট করে লিখুন। বিমানে ভ্রমণ করলে ব্যাগেজ রুল সম্পর্কে জানুন এবং নিয়ম অনুসরণ করুন।
৭. যে কোন ধরণের শ্রমিক হিসেবে বিদেশে কাজ করার সময় কোনো সমস্যা হলে বা আপনার কাজের স্থান বা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সাথে কোনো সমস্যায় পড়লে সাথে সাথে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করুন এবং এ ব্যাপারে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের সাহায্য নিন। ভ্রমণ এবং চাকরি সংশ্লিষ্ট সমস্ত কাগজপত্র অভিযোগ দায়েরের অংশ হিসেবে দূতাবাসের মাধ্যমে বিএমইটিতে লিখিত অভিযোগ দায়ের করার সময় উপস্থাপন করতে পারেন। এছাড়া, সে দেশের মানবাধিকার সংস্থার সাথে যোগাযোগ করে সাহায্য চাইতে পারেন।
৮.
পাচার হয়ে ফিরে আসা ব্যক্তিদের মানসিক অবস্থা বোঝার জন্য পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এবং সমাজের লোকদের এগিয়ে আসতে হবে। তাঁদের চিকিৎসা সেবা, মনোসামাজিক কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা, জীবন ধারণের দক্ষতা উন্নয়ন ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে পরিবার, বন্ধু এবং সমাজের লোকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৯.
গরিব পরিবারের মহিলা সদস্য বিদেশে যেতে চাইলে তাঁকে অবশ্যই বুঝিয়ে বলতে হবে যে, নারী শ্রমিক হয়ে সেখানে গিয়ে তুমি ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। যার মধ্যে যৌন নিপীড়ন অন্যতম। এই সব পরামর্শ পরিবার এবং সমাজের সচেতন ব্যক্তিদের বুঝিয়ে বলতে হবে।
১০.
সবশেষে আমাদের চারপাশের অসহায়, দরিদ্র নারী, কিশোর-কিশোরী এবং বেকার যুবকদের বলবো- বিদেশ যাওয়ার পূর্বে সবকিছু জেনে বুঝে যান। তা না হলে আপনি মানব পাচারের শিকার হতে পারেন। ‘ভিকটিম’ হয়ে যেতে পারেন! আর গরিব মহিলাদের বলবো নিজের দেশে ডাল দিয়ে ভাত খান, কর্মসংস্থানের আশায়, উন্নত জীবন-যাপনের আশায় গৃহশ্রমিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে না যাওয়াই ভালো। ভয়, মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে দেশে আসতে হবে, কিছুই পাবেন না। কেবল, হারাবেন। পথ খুঁজে পাবে না পালানোর। এমন জীবন বেছে নিবে কেন?
লেখক : আইনজীবি-কলামিস্ট

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • যুব সমাজের অবক্ষয় রোধে যা করণীয়
  • জাতিসংঘ দিবস আজ
  • নির্বাচনী ইশতেহার এবং ভোটারদের করণীয়
  • ইয়েমেন সংকট : কে কার সঙ্গে লড়াই করছে?
  • বৃটিশ আমলে সিলেটের প্রথম আইসিএস গুরুসদয় দত্ত
  • ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব
  • প্রবীণদের যথাযথ মূল্যায়ন কাম্য
  • ইতিহাসের একটি অধ্যায় : প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান
  • সড়কে মৃত্যুর মিছিল কি থামানো যাবে না?
  • স্বাস্থ্যসেবা : আমাদের নাগরিক অধিকার
  • কে. আর কাসেমী
  • আইনজীবী সহকারী কাউন্সিল আইন প্রসঙ্গ
  • শিক্ষা হোক শিশুদের জন্য আনন্দময়
  • ফরমালিনমুক্ত খাবার সুস্থ জীবনের বুনিয়াদ
  • জামাল খাসোগী হত্যাকান্ড ও সৌদি আরব
  • শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য কী হওয়া উচিত
  • ব্যবহারিক সাক্ষরতা ও বয়স্ক শিক্ষা
  • সুষ্ঠু নির্বাচন ও যোগ্য নেতৃত্ব
  • জেএসসি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে
  • অন্ধকারে ভূত
  • Developed by: Sparkle IT