উপ সম্পাদকীয়

শিক্ষা খাত ও জাতীয় বাজেট

সোনিয়া খান লিমা প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৬-২০১৮ ইং ০১:২০:১০ | সংবাদটি ৫১ বার পঠিত

২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া খাতের শীর্ষ দশে থাকছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা খাত। বরাদ্দ বিবেচনায় শিক্ষা রয়েছে পঞ্চম স্থানে এবং শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। এদিকে শিক্ষাখাতে বরাদ্দের টাকার অংক বাড়লেও শতাংশ হিসেবে কমছে যা খুবই দুঃখজনক।
একটু লক্ষ করলেই আমরা দেখতে পাই, উন্নয়নশীল দেশেও শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়, বলা হয়ে থাকে সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে যেখানে সেখানে তাদের শিক্ষার মান উন্নয়ন বাজেটে মোট জাতীয় আয়ের শতকরা ৬ ভাগ ব্যয় করা হয়, আমরা উন্নয়নশীল দেশের কথা বাদ দেই, আফ্রিকার অনেক গরিব দেশও শিক্ষাখাতে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে সেখানে বাংলাদেশে এখনও শতকরা ২-এর মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচন কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় হলো ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। একটি দেশের মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশ কিংবা প্রতিবছরের জাতীয় বাজেটের ২০% পরিমাণ অর্থ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে জিডিপি’র ২% ব্যয় হয়ে থাকে যা খুবই হতাশাজনক।
শিক্ষা খাতে যে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে যা কিনা চাহিদার চেয়েও অপ্রতুল। শিক্ষা বাজেটের সঙ্গে প্রযুক্তি, খেলাধুলা, স্বাস্থ্য, ধর্মসহ নানাবিধ খাতকে জুড়ে দেওয়া হয়। এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেটে সামরিক বাহিনী পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের বরাদ্দও ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ফলে বরাদ্দকৃত স্বল্প অর্থটুকুও ভাগাভাগি হয়ে যায় অন্যান্য খাতের সঙ্গে। ২০০৭-০৮ ও ২০১১-১৩ অর্থবছরে শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তি এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তির সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতকেও জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, এর ফলে এ খাতে বরাদ্দ বেশি থাকা দরকার।
বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় শিক্ষার অন্যান্য ক্ষেত্রে বরাদ্দ থাকলেও কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে ২ ভাগের বেশি বরাদ্দ থাকে না। কারিগরি শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার কারণ বর্তমানে যে অদক্ষ জনশক্তি আমরা বিদেশে রপ্তানি করছি তাদেরকে যদি কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করে পাঠাতে পারি তাহলে তারা অনেক বেশি বেতনের চাকরি করতে পারবে, দেশও অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে। বর্তমানে যে বৈদেশিক রেমিট্যান্স আসছে তার চেয়ে পঞ্চাশ গুণ বেশি রেমিট্যান্স আসবে। অন্তত ১৫ শতাংশ পরিমাণ অর্থ শিক্ষাখাতের জন্য বরাদ্দ করার মাধ্যমে শুরুটা করতে পারে সরকার। পরবর্তী বছরগুলোতে ১ শতাংশ করে বরাদ্দ বাড়িয়ে তা ২০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব।
উচ্চশিক্ষাখাতে অর্থায়নের বিষয়টি আরো অপর্যাপ্ত। বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে মানোন্নত শিক্ষার বিকল্প নেই। এছাড়া গবেষণায় সিরিয়াস না হলে দেশ এগুবে না, বিশ্বায়ন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। গবেষণা খাতে আলাদা বাজেট বরাদ্দ সময়ের দাবি। বাংলাদেশ মঞ্জুরী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী শিক্ষাখাতের সমগ্র ব্যয়ের মাত্র ১১% ব্যয় করা হয় উচ্চশিক্ষা অর্থাত্ বিশ্ববিদ্যালয় খাতে প্রতিবছর, যা জিডিপি’র মাত্র ০.১২%। তাদের হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার গুণগত মান যথাযথ পর্যায়ে উন্নীত করতে হলে তার পরিমাণ হওয়া উচিত মোট জিডিপি’র ০.৩%। উচ্চশিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গবেষণা কার্যক্রম, শিক্ষার এই খাতটির অবস্থা খুবই লজ্জাজনক যার প্রমাণ এক শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫টি গবেষণাগারের জন্য বরাদ্দ ছিল সাড়ে ২৪ লক্ষ টাকা। যা কিনা মানসম্মত গবেষণা কাজ পরিচালনার জন্য নিতান্তই অপ্রতুল। বাংলাদেশে প্রতি বছর যে সংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা পাস করে বের হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতি বছর চাকরির যে সুযোগ সৃষ্টি হয়, তার অনুপাত অতিমাত্রায় অসম। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রতি বছর এ কারণে বেড়েই চলেছে। এ সংকট নিরসনে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। এবং সেই অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো জোরদার কল্পে এখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।
শিক্ষাকে জাতির মেরুদ- বলা হয়। শিক্ষা ছাড়া কোনো অগ্রগতিই সম্ভব নয়। অন্য সেক্টরের উন্নয়ন-অগ্রগতির ক্ষেত্রেও শিক্ষার ভূমিকা অপরিহার্য। যদিও শিক্ষাক্ষেত্রে এ সরকারের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। প্রাথমিক শিক্ষায় বিদ্যালয়ে শিশুদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে, দুপুরে খাবারের ব্যবস্থা করে শিশু-শিক্ষার্থীদেরকে বিদ্যালয়মুখী করার ফলে ঝরে পড়ার হার হ্রাস পেয়েছে। প্রাথমিকে ৫ম শ্রেণি এবং ৮ম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করে মেধা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে, মেধা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গ্রাম-শহরের মেধা মূল্যায়িত হচ্ছে। যুগান্তকারী এসব উদ্যোগ চার দশকের শিক্ষাচিত্রে অনন্য সংযোজন। সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা আর শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে রীতিমতো ঘটে গেছে বিপ্লব, যা বিশ্বের বহু দেশের কাছে অনুকরণীয়। সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতভাগ, ছাত্র-ছাত্রীর সমতা, নারী শিক্ষায় অগ্রগতি, ঝরে পড়ার হার দ্রুত কমে যাওয়াসহ শিক্ষার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোল মডেল এখন বাংলাদেশ হয়ে যাচ্ছে বিশ্বব্যাংক, ইউনেস্কো এর মতো। এই সকল দিক বিবেচনায় শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচন কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় হলো ভবিষ্যতের বিনিয়োগ।
শুধু শিক্ষাখাতে বাজেট বাড়ানোই শেষ কথা নয়, শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন আসে, শিক্ষার মান নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। বরাদ্দ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যদি শিক্ষামানের উন্নয়ন হয় তাহলে সে বরাদ্দ হবে যথার্থ। এর পেছনে লেগে থাকতে হবে, বরাদ্দের টাকার যেন অপচয় না হয় সেজন্য দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাজের জবাবদিহি থাকতে হবে। বিশিষ্টজনদের মতে শিক্ষাখাতে বাজেট বাড়ানোই শেষ কথা নয়, শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন আসে শিক্ষানীতির সঠিক বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা মনিটরিং করার জন্য দক্ষ লোকবল নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল তৈরি করতে হবে, যাতে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা কর্মজীবনে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়। শিক্ষকরা জাতির বিবেক, তাদের প্রধান কাজ পাঠদান, জ্ঞান বিতরণ। তাদের হাতেই গড়ে উঠবে মেধাবী শিক্ষার্থী, মেধাবী মানুষ যারা হবে সমাজের চালিকাশক্তি। আমাদেরকে শতভাগ শিক্ষিতের দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষকদের নিতে হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা; শিক্ষাক্ষেত্রে কোনো ফাঁকিবাজি, জোড়াতালি চলবে না, শিক্ষা হবে স্বচ্ছ আয়নার মতো তবে দেশ ও সমাজ উপকৃত হবে, গড়ে উঠবে আলোকিত জাতি। এর ফলে সমাজের বিভিন্ন অনিয়ম আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যাবে।
শিক্ষার প্রতিটি স্তরকে টার্গেট করে আমাদের বাজেট প্রণীত হওয়া উচিত। শিক্ষার জন্য যে বাজেট হবে, তা অন্যান্য খাতের মতো ব্যয় নয় এটি ভবিষ্যতের বিনিয়োগ, যা পৌনঃপুনিকভাবে ফিরে আসবে। তাই শিক্ষা সংক্রান্ত বাজেটের অংশকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া উচিত। মেধাবীরা যাতে সারা দেশে মেধা অন্বেষণ করতে পারে সেজন্যে তার পরিচর্যার মাধ্যমে মেধাবী জাতি গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ সংস্থার মাধ্যমে এ বিরাট কর্মসূচি পালনের ব্যবস্থা থাকবে হবে। বিভিন্ন সেক্টরে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় যেসব মেধাবী ব্যক্তিত্ব কাজ করছেন, তাদের একত্রিত করে মেধাবিকাশ ও পরিচর্যার বিশাল কর্মযজ্ঞ চালু করা হলে বাংলাদেশ শিক্ষা উন্নয়ন ও কারিগরি শিক্ষার মডেল হিসেবে পরিগণিত হবে। বিশিষ্টজনদের মতে, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বাছাই করে তাদেরকে বিভিন্ন টার্গেট দিয়ে পরিচালিত করতে হবে। যাতে করে শিক্ষাপ্রাপ্ত মেধাবীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশকে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করবে। আমাদের টেক্সটাইল ইউনিভার্সিটিকেও আলাদা নজরে আনা যাতে করে এই খাতটি যেন কিছুতেই পিছিয়ে না পড়ে। অবশ্য আমরা এর জন্য প্রস্তুতও রয়েছি। মানুষের প্রয়োজন যদি দেশে মেটানো যায়, তাহলে সে বিদেশে যাবে কেন? বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কমে আসবে প্রত্যেকটি সেক্টরে যদি দক্ষ জনবল গড়ে তোলা যায়, তাহলে বাংলাদেশকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। তাই সেই লক্ষ্যকে মাথায় রেখে সরকারকে সামনে আগাতে হবে। তার জন্য চাই শিক্ষাখাতে বাস্তবায়নযোগ্য, কাঠামোগত সুন্দর একটি বাজেট কারণ মেধা ছাড়া জাতির কি মূল্য? তাই সুনির্দিষ্টভাবে বলতে চাই জাতীয় আয়ের ন্যূনতম ৬ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ২০ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ থাকা উচিত। তা সম্ভব না হলে আমরা একটি শিক্ষিত জ্ঞানভিত্তিক সমাজ তৈরি করতে পারবো না, যার ফলাফল হবে একুশ শতকের যে বিশ্ব বাস্তবতা সেখানে কিন্তু আমরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়তে থাকবো।
লেখক : কলামিস্ট

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা
  • ১৫ আগস্ট ’৭৫ : ধানমন্ডি ট্রাজেডি
  • সেই দিনটির দুঃসহ স্মৃতি
  • মুক্তিযোদ্ধার দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু
  • মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু
  • চিরঞ্জিব বঙ্গবন্ধু
  • ক্ষমা করো পিতা
  • এক নেতা এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ
  • পোয়েট অব পলিটিক্স
  • শুধু সাক্ষরতা বৃদ্ধি নয়, প্রকৃত শিক্ষা চাই
  • নাগরিক সাংবাদিকতা ও দায়বদ্ধতা
  • শিক্ষার্থীদের আন্দোলন : আমাদের শিক্ষা
  • বঙ্গবন্ধু ও ১৫ই আগস্ট ট্র্যাজেডি
  • কান্নার মাস
  • ছাতকে সহকারী জজ আদালত পুনঃ প্রবর্তন প্রসঙ্গে
  • মধ্যপ্রাচ্য কেন এতো সংঘাত ও যুদ্ধ প্রবণ অঞ্চল
  • শিক্ষার মান ও লক্ষ্য নিয়ে যত প্রশ্ন
  • মৃত্যুঞ্জয় বঙ্গবন্ধু!
  • স্বাধীনতার ইতিহাস ও আমাদের প্রত্যাশা
  • শিশু নির্যাতন বাড়ছে কেন
  • Developed by: Sparkle IT