পাঁচ মিশালী

বিড়ম্বিত অতিথি

নিশেন্দু চক্রবর্তী রাজু প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৬-২০১৮ ইং ০১:১৩:১১ | সংবাদটি ৯৫ বার পঠিত

বিয়ের এক বছরের মাথায় চাঁদের মতো এক ছেলের জন্ম হলো সব্যসাচীর। সন্ধ্যায় ছেলেটি জন্মেছিলো। মধ্যরাতে নবজাতকটি চুরি হয়ে গেলো।
বিষাদগ্রস্ত সব্যসাচী ভোর রাতের দিকে, নদীতে এক অবাক দৃশ্য দেখে। সব্যসাচী ভাবছে ‘দৃশ্যটি অলৌকিক, ইংরেজিতে যাকে বলে মিরাকল।’ দৃশ্যে সব্যসাচী দেখছেন, একটি কলস নদীর ¯্রােত টেলে উজাচ্ছে। এডভেঞ্চার অনুভব করেন তিনি। ভাবেন, ‘কি আছে এই কলসে? চোখের অশ্রুতে ভাবেন বিরহীটি, কি যাচ্ছে কুলের কাছ দিয়ে?’ কোন প্রেমাস্পদের বউ? না কি মানুষের কাজে লাগানোর কোন ঔষধ? নিজেকে উপহাস করতে আরো ভাবেন সাচী। ফুল গাছের এই লতা দিয়ে কলসটি আমি কুলে হয়তো আনতে পারি তবে আমার বউ কলসটি গাছে তুলে গলায় দড়ি দিয়ে মরবে নাতো? আমি মরতে যাচ্ছিনে এ সত্য। তবে দেখি এ কলস ধরা যায় কি না। দেখি এ কলসের ভেতর কিছু আছে কি না।
কলসটি লতা দিয়ে ধরতে না পেরে জলে নামলেন পুত্রহারা। আপন মনে বলতে বলতে এগিয়ে যান, ‘এ কলসটি কার? সুন্দর টানে যাচ্ছি কলসিতে। প্রাণের দরে প্রাণ দিতেছি, আয়গো কলস দেখি তোর ভেতর কি? তরুণটি ভাবেন, ‘একি আরোগ্য শোভার জ্বালা’ না কী হিল্লোলে মূর্ছনায় অনাগত সুন্দর মূর্তি ধরে লোকানো? একি ফুল মধুর দ্বার? সাতরে কলসটি ধরলেন যুবক। কলসের মুখে একটি ঢাকনি আর ঢাকনিতে প্রায় পাঁচ/ছয় ইঞ্চি দৈর্ঘ্য ছোট্ট একটি খেলনা মই দেখলেন সব্যসাচী। আরো ভাবালো হয়ে ভাবলেন তিনি, ‘মইয়ে মইয়ে কোথায় যাবো? উপরে নাকী নিচে? নাকী কলসীর ভেতরে হাত দেবো, এ মইয়ের ভাষা ইঙ্গিতে?
প্রথম ঢাকনিটি কোমল হাতে তুলে বিস্ময় লাগলো নবীনের। মইটি পকেটে রাখতে রাখতে দেখেন আরেকটি ঢাকনি কলসে। দ্বিতীয় ঢাকনিতে একটি কলম এবং ছোট্ট একটি খাতা। খাতার উপর লেখা ‘ভেতরে এসো’।
লেখা দেখে আরো আগ্রহ বাড়লো সব্যসাচীর। কলসটি পারের দিকে নিয়ে আসতে আসতে ভাবলেন, কলসটির ভেতর কি থাকতে পারে? সাপ? নাকী সাপের মণি? কি অর্থ- অর্থ আছে এই কলসে, লড়াই তো করছি। দ্বিতীয় ঢাকনিটা তুলবো। রোদ আঙ্গিনায়, বাগানে, কাশের গুচ্ছে। শিশিরে হাসি, শীতের রাতের উপহারের মতো দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয় ঢাকনি তুললেন লড়াকু। একঝাক তোয়া উড়ে গেলো তার চোখে তখন। সবিস্ময়ে, আনন্দে দেখলেন, আরেকটি মাটির ঢাকনিই কলসের ভেতর। তৃতীয় ঢাকনিটিতে একটি মাটির ব্যাংক। মধুর হেসে কুটীর শিল্পটি তুললেন শোক ভোলা। স্বগত বললেন, ‘যে ধনে ধনী, তা মনই। আলোর ফুলকি জ্বলছে এ সন্ধানীর ভেতর। আনন্দ বাড়ছে, কলস নিয়ে পারে উঠলেন। মাটির ব্যাংকটি মাটিতে আচড়ে ভাংগতেই অনেকগুলো টাকা বেরিয়ে এলো।
তৃতীয় ঢাকনিটি তুলে দেখেন চতুর্থ ঢাকনি। কিছু ফুল ও ছোট্ট একটি বাঁশি। বাঁশিটি সোনার বলে মনে হলো এ আলোক তৃষ্ণাতুরের। গান ধরেন তিনি, ‘এ ফুল সুন্দরে দেবো ভোর পাত্রে ভালো ফল পাবো।’
বাঁশিতে ছয়টি ফোকর। স্বগত কথা বলতে থাকেন সব্যসাচী, ‘এ ফুলে যার ভুষণ হবে, সেই সেজেছে বহুরূপে। সেইতো প্রভাত বারী দিচ্ছে আনি কুলে কুলে। পলে পলে তার প্রেমের বাঁশি উঠছে হাসি সর্বনেশে। ওগো আমার তারার মেলার হীরক ফুল মালার সুন্দর একেলা, সুরের বাঁশি সোনা ও বিলায়, হীরা ও বিলায় কিন্তু মন চায়, মন মণি, মন রতন। সে চেয়েছে হীরা, মণি, ধরেও দেখায় বাহাদুরী, তারেই দিও যতœ মণি, মুক্তা ভরে। আমিতো মনের টানে, পিরীত বুঝে, সুন্দর তোমায় বুঝে ধন্য হই। যে সেবাতে মুক্তি মিলে, বাঁধন টলে প্রেমের রাগে, তার জন্যে এ বঁংশীবাদন ঢাকনা দিয়ে দিয়েছো সাঝি।
মনি মুক্তার টানে, মুক্তি মিলে না,
মুক্তির টানে মুক্তা বিলাই।
ভোরের বেলা বাঁশিটিতে উপচে সুর এ হরির পাঘলে, দিয়েছে ভেলা যতœ করি। ছড়িয়ে দিতে, সুরের ঢালি আমার ব্যাথায় কানাকানি, উঠছে সুরের তুফান কাল ভৈরবী আর পাই মুক্তা ধন। চতুর্থ ঢাকনি তুলে দেখি কি পাওয়া যায়।
চতুর্থ ঢাকনি তুললেন চতুর, চোখে প্রেমের অশ্রু খেলছে তখন। পঞ্চম ঢাকনি চোখে পড়লো। দেখেন কলসের একেবারে তলা একটা আলোর পঞ্চম ঢাকনির ছিদ্র দিয়ে তার চোখে এসে পড়ছে। আলোর উল্লাসে ডগমগ করছে। প্রাণ তরুণ দীপ্তিতে। প্রাণের আলো উপচে উঠছে মৌন শতদলে, পরাগ ভরে দীপ্ত হাসি উপচে উঠছে কুলে। নদীর জলের গভীর হতে উঠছে যেন হাসি, ফুল্ল কুসুম বাঁশির মতো আলো রাশি রাশি।
সব্যসাচী ভাবলো, ‘তা থৈ করে দুলছে হিয়া ফুল ভরে, কুল ভরে। আমার হিয়া রস প্রাতের আলো দ্যোতনায় উঠছে ফুটে। তীরে তীরে ছড়াবো ধন, মুক্তো দিশা ধরে ভরে। তোমরা যারা বিষয় মাতাল, সোনার মাথা কামিয়ে নিও। মন ব্যাপারী প্রেম চেয়েছে, প্রেম বাড়তে প্রাণ ধরেছে। প্রেম বাড়াতে দেহ নীলাম, বিষয় ভোগে থাকি না। সুখী করেই সুখী হিয়া। এই হিয়াটাই অনন্ত জুড়ে।
পঞ্চম ঢাকনিতে প্লাস্টিকের ছোট্ট একটি খেলনা নৌকা। সব্যসাচী বিস্ময়ানন্দে ধরাশায়ী হলো যেন। নৌকা দুলে, নৌকা দুলে, বলে নৌকাটি কলস থেকে বের করলেন দুর্লভ তরুণ। নৌকাটি বড় হতে উনার কাছে, তা লাগলো চোখের জলে। নৌকাটি যেন গগনে উঠলো, তা উঠলো চোখের কোণে, মনে।
বাতাসে মাতম, গায়ে জয় জয়। কি এলো কলসী করে, জলে কলরোল। উতুঙ্গ শব্দ কানে প্রাণে ছেয়ে আছে। আনন্দ অশ্রু ফুটে উনার চোখে। তাতে যেন বিশাল অম্বুধ ফেনিল উচ্ছ্বাসে মাতে। তরঙ্গ মাতাল সিন্ধু ছাপায়ে উঠিয়াছেন ভালোবাসি, সব্যসাচী। তিনি আপন মনে সে নির্জনে প্রার্থনা করেন। ‘ছন্দে হৃদ্য তব খেলাঘরে, কনক কুমকুমে সাজালে আমারে। হৃদয়ের বাতায়নে কাম কাঞ্চন হাসিতেছে নব নব। আবার হারছে বেতালে, তাল মেরে। আমি আপন তালে সাজিয়াছি, প্রেম কাঙ্গাল নটবরে। হৃদয়ে দহে, দহিয়া উঠি, আপনার গৌরবে পারে, গগনে। কলসে এতো ঢাকা রলো, গৌরব শিখায় দীপ্ত। আমি প্রদীপ্ত হাসিতে ভুলি কামিনী কাঞ্চনের টান। কমল আখি ফুটায়ে তুলি করি শোভা বিরচণ, কাঙ্গাল আপনার লাগি। সুন্দর তোমারে পূজিতে কুমুদবনের ললিত হাস্যখানি ফুটেছে অমিয় তৃষায় দেখে, লুটিয়ে পড়ি পারে, যেন কমল বনের ধারে।
সব্যসাচী প্রেমাশ্রুতে চেয়ে ভাবলেন, কোথা সে পবর্ত, চন্দ্রকানন, সূর্য মদীরায় রাহু। দুটো চোখে ভাসে খেয়ার, মূর্ত শ্যামলে, প্রেম বিমল, অমল অমিয় ঢাকনা দিয়ে লুকিয়ে নৌকাটি বড় হতে হতে অসীম আভায় মিলিয়ে গেলো এ সন্ধানীর কাজল কালো বড় চোখে।
এবার ষষ্ঠ ঢাকনি চোখে পড়লো আনন্দপাত্রের। ঝলমল করে উঠলো তীব্র আলো। আনন্দ আলো ষষ্ঠ ঢাকনি থেকে উপচে উঠলো কলস থেকে। সব্যসাচী দেখে পুলক অশ্রুতে সমগ্র বিশ্ব ঢাকা এ আলোয়।
সব্যসাচী বলতে থাকে, তুমি প্রাণের আলো অর্থাৎ শক্তি আলো। বেদান্তের ঈশ্বর, কোরানের দীপ্ত তেজে, পবিত্র সুন্দরতম আলোয় ছাপানো। তুমি প্রভু, বিভু, আপনার আকর্ষণে আপনি গড। কালাকালে, পারাপারে গতি মতি সব স্থির করি আপনার ভাবখানি আপনি দিচ্ছো উজাড় করি। সাজিয়া মানস পটে দেখালে এখানে সুমহান, আপনার আলো হাস্যে, লাস্যে মন্ডিত সর্বব্যাপ্ত আনন্দ বস্তুর প্রেম উত্থান। আপনিই দিয়াছো আপনার পথ ও পাথেয়।
ষষ্ঠ ঢাকনি তোলাতে সপ্তম ঢাকনি দেখা দিলো। সপ্তম ঢাকনিতে শুধু জল, আর কিছু নয়। সব্যসাচী ভাবেন, বিপুল জলধী ভেংগে, এসে দাড়িয়েছি পারে, আর মেঘে মেঘে জানায় আসন্ন ঠিকানায় বৈভব। জলে আপনার মুখ দুলছে সুন্দরের ছায়ায়। আঁখি নীরে চাই তার সেবাতে তাকে ধরা চাই। ভাস্বর জয়টীকা পরায় সে প্রিয়রে। তুলছো-শ্যাম পুত্র তুফানে হাসি, যেন গভীর এক সঙ্গীত হতে ভাবে মূর্ছিত আলোবাসী।
আপনার মুখ যে আপনার লাগি এই বোধদয়ে রয়েছি। দেখি জলে অবয়ব হাসি কান্নায়, সাদা মেঘে সাদা চুল, এ আমার দেহ বামে যেন উড়ে এলো, উড়ে গেলো পাহাড়ে জলে। মরু থেকে চাঁদ পেরিয়ে আপনার উঞ্চিষ উঠছে গগনে।
তার চরণে ডুবাবো বা কি, তুলবো বা কি ফুল। মনের মাঝে ভীষণ রাতে তার জাগরণে ভরা কুল। দোহাই তোদের সবুর কর, তার সেবাতে আমি, সেই এসেছে পর্ণ কুটিরে। তারই মাঝে হাসছি গো চন্দ্র ভানু সাথী। তোমাদের রাতি ফোটা ফোটা, আমার মাথায় ডাকি উঠলো ডেকে কল কলিয়ে পিতা পিতা করে। জলে আমার মুখাবয়বের কাছে, দেখি শ্যামলা মুখ আছে, শ্যাম গজনে উদ্ভাসে, আমায় ডাকে পিতা রতন আভাষে আনন্দে। মনের কথা চোখে, দেহে ফুটে উঠে চায়, আমায় ডাকে পিতা বলে শান্ত গরিমায়। বলে প্রাণে গানে, ‘তুমি কি আর পালক? শিশু মরি নিজের জ্বালায় তোমার কুসুম আলোয়। কি রেখেছো ফুটন্ত বায়, উঠন্তি প্রাণে দাহ! নদীর জলে তাই এসেছি তুলতে আমায় পারো। সব্যসাচী ভাবেন, ধরা যায় না, ছুয়া যায় না কেবল দেখা শুনা। সেবা বাঁধনে, ধরছি আঁখির নোনা জলে সেই আশাতে কলস চলছি আপন ঘরে।
ঘরে পৌছে সপ্তম ঢাকনিটি উঠালাম। দেখি ঢাকনি বিহীন কলস। পেলাম সাত বাহনের কড়িও, আর এক গাহনের যাদুও।
দেখি স্থির, ধীর সুশান্ত, নবজাতক। দু’চোখের জলে, নিলাম কুলে, চিনতে ভুল নেই, এ আমার শিশু, এ আমার যীশু, যে খন্তে হারিয়ে ছিলেন, সে অজান্তে এসেছে ফিরে, আমার পুত্র রূপে, নদীয়ার গৌরাই।
এতো পুত্র মোর, কি জানি কোথায় ছিলাম, ভুলিয়া করে হাবু ডুবু। সব্যসাচী ভাবেন পুত্র ‘তুমি কি মথুরায় গিয়েছিলে, নাকী মদীনায়? তুমি তিব্বতে বৌদ্ধ, বেথেল হেমে, মেরিয়ার ফুলে কুলে, যীশুর ক্রশে, জগৎ পালক।
ফুলের লক্ষ্যে তারার পানে জাগাতে মানবে, আসিয়াছে ঘরে, প্রাণ ভরে। হাসিতেছে হৃদয়ে, ফুল পল্লবে, শত ধারে দেখি সে সুন্দরে। এ আমার শিশু, তাকেই পেয়েছি হৃদয়ে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT