পাঁচ মিশালী

অনুসরণযোগ্য এক ক্ষণজন্মা

আবু বকর আল-আমিন প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৬-২০১৮ ইং ০১:১৪:৩৪ | সংবাদটি ৫৬৭ বার পঠিত

আবুল কাশেম দুলাল আমার বড় ভাইয়ের নাম। যাকে আমরা হারিয়েছি অনেকটাই অকালে। তাঁর বিদায়ে আমরা যতোটুকু না ভেঙে পড়ি, তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তির সঞ্চার হয় তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা দেখে।
২০১২ সালের ডিসেম্বরের ঘটনা। কী একটা কারণে বিকেল থেকেই সিএনজি অটোরিক্সা কমে গেছে রাস্তায়। সিলেটের বন্দরবাজার পয়েন্টে রাত ৯/১০টা হবে। গাড়ির সামনে বসা ড্রাইভার আর পাশের সিটে ভাইয়া, পিছনে আমি। সম্ভবত কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফিরছিলাম। হঠাৎ করে তিনি গাড়ি সাইড করতে বললেন। ড্রাইভার গাড়ি থামালো। ভাইয়া বললেন, দ্যাখ পেছনে গাড়ির জন্যে দাঁড়িয়ে আছে সন্তোষ, তাকে ডাক দে। সন্তোষ আমাদের এলাকায় সেলুনে কাজ করে। সেলুনের জিনিসপত্র নিতে বন্দরবাজার এসেছিলো। তাকে ডাকতেই চলে আসলো। ভাইয়া তাকে পিছনে উঠতে বললেন। বেচারা সম্ভবত বিশ্বাস করতে পারছে না যে, কেউ তাকে প্রাইভেট কারে উঠতে বলছে। তাই ইতস্ততবোধ করলো হয়তো। কি আর করা ভাইয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাধ্য হলো গাড়িতে উঠতে। কিন্তু আমার কাছে ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক-ই লাগলো। কারণ পরিচিত তরকারি বিক্রেতা থেকে মাছওয়ালা অনেককেই এর আগে বিভিন্ন সময়ে ভাইয়ার গাড়িতে উঠতে দেখেছি। আবার মাঝরাতে অসুস্থ কাউকে নিয়ে নিজে ড্রাইভ করে মেডিকেল নিতেও দেখেছি অনেক। ড্রাইভারের বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে খুব দূরে না। তারপরেও রাতে কোনো কারণে তাকে ডাকা যাবে না। কারণ সে সারাদিন কষ্ট করেছে, এই ছিল ভাইয়ার কথা। এই কাজগুলো কেন করতেন বুঝেছিলাম ভাইয়ার মৃত্যুর পর এই মানুষগুলোর বুকফাটা আর্তনাদ দেখে।
পাড়ায় ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছে ছেলেরা। প্রথম রাউন্ড থেকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা বাঁধলো ফাইনালে। পুরস্কার কেনা এবং অতিথি নিয়ে। যিনি পুরস্কারের টাকা দিয়েছেন তিনি ভাইয়াদের রাজনৈতিক আদর্শের উল্টো দিকের মানুষ। এজন্যে ভাইয়ার সাথের অনেকেই থাকবেন কি না তা কেউ পরিস্কার করছেন না। নানা কথা বলাবলি চলছে। ভাইয়া পাড়ার ছেলেদের সাথে গিয়ে খেলার পুরস্কার কিনে নিজের গাড়িতে করে আনলেন। খেলার দিন খেলার শুরু থেকেই মাঠে উপস্থিত। তার উপস্থিতির খবর পেয়ে যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আসবেন না তারাও আস্তে আস্তে মাঠে আসা শুরু করলেন। খেলা শেষে সফলভাবে শেষ হলো পুরস্কার বিতরণী।
ছোটদের সাথেও ছিলো তাঁর অসাধারণ বন্ধুত্ব। ভাইয়ার প্রতিও ছিলো তাদের অনেক ভালোবাসা। যা এখনো আছে বলেই আমার বিশ্বাস। তাদের নির্ণয়হীন ভালোবাসার নমুনা পাই ভাইয়া মারা যাবার ৫/৭ দিন পর। দশ বারো বছরের কয়েকটি ছেলে আসলো বাড়িতে দাওয়াত নিয়ে। আগামীকাল তারা নিজেরা চাঁদা তুলে ভাইয়ার জন্যে দোয়া-মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছে, আমরা যেন উপস্থিত থাকি। তাদের চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছিলো তারাও যেন খুব আপন কাউকে হারিয়েছে।
শেখঘাটের মকবুল মামা। খুব কাছের আত্মীয় কেউ নন আমাদের। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। তাঁর একটা বড় সমস্যা হলো, যতো অসুস্থ-ই হোন না কেন ডাক্তার দেখাতে চান না। নিজের ছেলে নেই, তাই ভাইয়াকে উনার ছেলের মতো-ই ভাবতেন, মান্য করতেন। একবার কয়েক দিনের অসুস্থতায় ভুগছেন মামা। পরিবারের সবাই ডাক্তারে নিয়ে যেতে ব্যর্থ। একদিন বিকেলে ভাইয়া গাড়ি নিয়ে হাজির, বললেন মামা চলেন এক জায়গায় বেড়াতে যাবেন আমার সাথে। গাড়িতে তুলে সোজা ভাইয়ার ডাক্তার বন্ধু খলিল ভাইয়ের চেম্বারে। ডাক্তার দেখিয়ে ঔষধ নিয়ে আবার বাসায়। মামার আর কিছুই নাকি বলার ছিলো না। ভাইয়া মারা যাবার দিন এসে লাশ দেখে এর পরের কয়েক মাস মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যান মকবুল মামা। আত্মীয়-স্বজন কিংবা দূরের করো অসুস্থতার খবর শুনলে যেকোনো ভাবে তাকে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা না করলে যেন তিনি শাস্তি পেতেন না নিজের ভিতর।
ভাইয়ার অনেকগুলো গুণের মধ্যে যে গুণটি অবাক করে আমাকে তা হলো, এতো ব্যস্ত থাকতেন চাকুরি, ব্যবসা, পরিবার ও সামাজিক নানা কর্মকান্ড নিয়ে। তারপরেও প্রতিদিন রাতে ফোন দিয়ে বোনদের খবর নেয়া ছিলো দৈনিক রুটিন মাফিক। সপ্তাহে কোনো কাজ ছাড়াই বন্ধুদের খোঁজ নেয়া কিংবা কারো বাসায় হাজির হয়ে খবর নেয়া এটা একমাত্র ভাইয়ার দ্বারাই সম্ভব ছিলো। আর যতোই ব্যস্ত থাকেন না কেন, কারো একটা মিসড কল ফোনের স্ক্রিনে দেখলে দিনের যেকোনো সময় তা ফিরতি কল দিয়ে খবর নেয়া কিংবা কারণ জানাটা যেনো ছিলো তার দায়িত্ব। শতবার শপথ নিয়েও ভাইয়ার এই গুণটা আমি নিজের মাঝে ধারণ করতে ব্যর্থ।
অনেকে এভাবে বলতেন, ভাইয়ার সামনে যতো মন খারাপ নিয়েই কেউ আসতো, তার মন ভালো হয়ে যেতে বাধ্য। সিরিয়াস বিষয় ছাড়া হাসিমাখা কথা ছাড়া যেন বের হতো না মুখ দিয়ে। ভাইয়ার কোম্পানীর এমডি বলেছিলেন, দুলালের মুখের হাসি দেখে মনে হয় তার জীবনে যেন কোনো দুঃখ নেই।
আর এভাবে হাসতে হাসতে হাজারো মানুষকে অশ্রুসাগরে ভাসিয়ে ২০১৩ সালের ৫ জুন ছেড়ে যান এই পৃথিবী। চোখের সামনে তিনি নেই কিন্তু তার আদর্শ যেকোনো জীবনকে একটা সফল জীবনে পরিণত করতে যথেষ্ট বলেই আমি মনে করি। ভাইয়া অপারে স্বর্গীয় কাননেই হোক তোমার বসতি। এ প্রার্থনাই করি।
আবুল কাশেম দুলাল ১৯৭৭ সালের ১০ অক্টোবর সিলেট শহরতলীর সোনাতলা চাতলীবন্দ গ্রামে মো. লাল মিয়া ও ময়মুন নেছা দম্পতির ঘর আলোকিত করে পৃথিবীতে আসেন। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তিনি হাজী আব্দুস সত্তার হাই স্কুল থেকে ১৯৯৩ সালে এসএসসি, শাহ খুররাম ডিগ্রী কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং সিলেট সরকারি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। তারপর শুরু হয় কর্মজীবন। নিজের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রুপসি বাংলা ক্যাবল নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত। একই সাথে পপুলার লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সিনিয়র ম্যানেজার ছিলেন। উত্তর সুরমার শিক্ষার প্রসার, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। মসজিদ মাদরাসা পরিচালনায় নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। একজন সামাজিক সংগঠক, তরুণ সমাজকর্মী হিসেবে তিনি ছিলেন এক অনবদ্য নাম। ২০১৩ সালের ৫ জুন এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে তিনি পরপারকে পাড়ি জমান। তার মৃত্যুর মাসখানেক পর জন্ম নেয় তার একমাত্র কন্যা নুজহাত দুলাল দ্বোহা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT