উপ সম্পাদকীয়

যৌতুক, ইফতারি, আমকাঁঠলি বনাম নারী নির্যাতন প্রসঙ্গ

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৬-২০১৮ ইং ০১:৪৯:৩২ | সংবাদটি ১৩০ বার পঠিত

গত ২৬ মে ২০১৮ তারিখে সিলেটের ডাকে প্রকাশিত বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক মাজেদা বেগম মাজুর কলামটি মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। তাঁর সুক্ষ্ম বিচার বিশ্লেষণ আমাকে মুগ্ধ করে। সামাজিক অন্যায় আচার-আচরণ, কুসংস্কার, কু প্রথা ইত্যাদি পীড়া থেকেই তাঁর লেখাটি উৎসারিত। আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানাই এবং একজন নারী হয়েও সমাজ, জাতি নিয়ে চিন্তÍা করেন এ বিষয়টি আমাকে আন্দোলিত করে। এ বিষয়টি বহুদিন ধরে আমাকেও পীড়া দিচ্ছে। তাই দু’কলম লিখতে বসলাম।
গত রমজানের ২য় তারাবিটি পড়তে পারিনি সঠিক সময়ে। রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেছে, ঘোষণার পর মনে মনে ঠিক করেছিলাম এবার তারাবি মিস করবো না। যত কষ্টই হউক সবগুলো তারাবির নামাজ ইমামের পিছনে পড়ব। কিন্তু বিধিবাম। ১ম রোজাটি রেখে ইফতার করে বসেছি। ঠিক এই সময়ে খবর এলো আমার এক দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়ের বাড়ি যেতে হবে। ও নাকি গুরুতর অসুস্থ। ওর ভাই আমাকে সাথে নিয়ে যেতে চায়। এমন ভাবে ধরল যে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হতে হল। একটা সিএনজি নিয়ে এক ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছলাম সেখানে। দেখি অস্স্থুতা নয়, বউ-শাশুড়ির যুদ্ধ। রমজানের ইফতারি নিয়ে কথা কাটাকাটি করে শাশুড়ি একটা বিশাল আকারের ঝাড়– ছুঁড়ে মেরেছেন বউয়ের উপর। সেটা ওর চোখ ও গালে আঘাত করেছে। চোখের ভিতরে আঘাত না থাকলেও গাল ও চোখের ভুরু বেশ আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে। বেশ খানিকটা জায়গার ছাল উঠে গেছে। ওর মায়াভরা মুখ আহত হওয়ার কারণে আমাদের সাদর সম্ভাষণ জানাতে পারলো না। চোখ বন্ধ করে কেঁদেই চলেছে। সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতার করা হয়নি। হাড়ি পাতিল চড়েনি চুলোয়। বাচ্চারা না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। চুুলো চড়বেই বা কী করে? যে চুলো চড়াবে সে তো আহত হয়ে ছটফট করছে। কেনা বাবূর্চি তো আজ চুলোয় যায়নি বলে ওর চির পরিচিত রান্নাঘর খাঁ খাঁ করছে। বাড়ির সমস্ত লোক গত রাত তিনটা হতে এখন পর্যন্ত অর্থাৎ রাত ৯টা পর্যন্ত না খেয়ে আছে। এটাই আমাদের সমাজের চিত্র।
পণ প্রথা আর কৌলিন্য প্রথা হতে শুরু হয়ে আজকের যৌতুক প্রথা একটা সামাজিকব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। তবে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, আজকে নারী নির্যাতনের মূলে নারীরাই অগ্রণী ভূমিকায়। যৌতুক দাবি, ইফতারি দাবি, আম-কাঁঠলি দাবি এসব কিছুই মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজনের মধ্যে শাশুড়ি, ননদী হতে বেশিরভাগই উত্থাপিত হয়। শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের অন্যতম নিয়ামক হচ্ছেন সমলিঙ্গের লোকজন। পুরুষরা ভুলে থাকলেও নারীরা ভুলে না তাদের পূর্বতন নির্যাতন কাহিনী। শাশুড়ি যখন বউ হয়ে এ ঘরে এসেছিলেন তখন উনার শাশুড়ি যেভাবে শারীরিক বা মানসিক পীড়া দিয়েছিলেন- আজ এই ঘরে ছেলের মা হয়ে বউ এনে ঐ একই কায়দায় শোধ নেন। অবশ্য সব শাশুড়ি-ননদী যে এটা করছেন সেটা বলছি না। তবে সমাজের বৃহত্তর অংশে এটাই ঘটে চলেছে। যাক, সে বিষয়ে পরে আসছি।
ইসলামী শরীয়াহ বিধানে যৌতুক হিসেবে কিছু চাওয়া সাফ হারাম। ছেলেপক্ষ কিছু চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তবে মেয়েপক্ষ যে জিনিসটা চায় সেটি হচ্ছে তার দেনমোহর। এবং এটি শরীয়তসম্মত বিধান। বিয়ের আগে মেয়ের মোহরানা আদায় করা জরুরি। কিন্তু আমাদের দেশের সমাজ ব্যবস্থা ঠিক তার উল্টো। মেয়ের মোহরানার টাকা থাকে বাকি। আর ছেলের যৌতুক নগদ। হায়রে সমাজ, হায়রে প্রথা! ইসলামের সূতিকাগারে আমার অভিজ্ঞতা বেশ কয়েক বছরের। সেখানে একটা ছেলে বিয়ে করতে গেলে সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে হয়। মেয়েদের গায়ের রঙ আর শিক্ষা-দীক্ষার বিষয় বিবেচনায় মেয়েদের মোহরানা ঠিক হয়। আর সেই মোহরানার টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত কোনো বিয়ে হয় না। আর সেই টাকা নেন কনের বাপ বা ভাই। কনেকেট ছোট থেকে বড় করা, লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করা ইত্যাদির ব্যাপারে কনের অভিভাবক যথেষ্ট খরচাপাতি করেন। বিয়ের সময় কনের মোহরানা আদায় করে কনের একাউন্টে রাখলে সেটি তার নিরাপত্তা বিধান করে। কোনো কারণে যদি বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে তাহলে ঐ টাকাই সমাজে দাঁড় করাতে পারে। তাই সেখানে মোহরানার টাকা পরিশোধ করতে না পারলে কেউ বিবাহ করতে পারে না। মনে করুন আমাদের দেশের সাধারণ পরিবারের একটা মেয়ের মোহরানা দুই লক্ষ টাকা নির্ধারণ করা হলো। এটা যদি বিয়ের দিন পরিশোধিত হয় আর ছয়/ সাত বছর পর বিয়ে কোনো কারণে ভেঙ্গে যায় তখন এই দুইলক্ষ টাকাই ব্যাংকে থাকা অবস্থায় চার-পাঁচ লক্ষ টাকায় উন্নীত হয়। কিন্তু দেনমোহরের দুই লক্ষ টাকার একটি টাকাও আমাদের দেশে পরিশোধ তো হয়ই না উপরন্তু কনের অভিভাবক ঘর সাজানো থেকে শুরু করে এটা সেটা দিতে দিতে ফতুর হয়ে যায়।
আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, সমাজের বিত্তশালীরা নিজের দাপট, ক্ষমতা দেখাতে গিয়ে বরের পক্ষ কিছু দাবি করুক বা না করুক কনের বাবা পাঁচ লক্ষ-দশ লক্ষ টাকার ফার্নিচার এটা সেটা কিনে আভিজাত্য, জৌলুস ইত্যাদির প্রকাশ করেন। উদ্দেশ্য একটাই আমার মেয়ে অন্যের বাড়িতে গিয়ে কার জিনিস হাতে নেবে। তাই ওর প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছু দিয়ে দিলাম। এ বিষয়টির ধারণা এসেছে হিন্দু সমাজ থেকে। হিন্দু মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে বাবার বাড়িতে কোনো সম্পত্তি পায় না। তাই বাবা নিজ হাতে যতটুকু দেয়া যায় সেটা বিয়ের সময় দিয়ে দেন। কিন্তু মুসলিম আইনে মেয়েদের বিয়ে হলেও বাবার সম্পত্তিতে এক ভাইয়ের অর্ধেক সে পায়। আবার স্বামীর সম্পত্তিতেও দু পণ পেয়ে থাকে। কাজেই ইসলামী শরীয় বিধানে দেনমোহরের বিষয়টি সম্মানজনক। এবং মেয়েদের নিরাপত্তায় অত্যন্ত কার্যকর। তাই যে জিনিসটি বলতে চাই পূর্বে সমাজ অর্থাৎ আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে সমাজে যা প্রচলিত ছিল বর্তমানে তা প্রচলিত থাকার কথা নয়। কারণ সেই সময়ে শিক্ষার হার ছিল মাত্র ৮%-১০%। আর বর্তমান সময়ে তা উন্নীত হয়ে প্রায় ৭৭%-এ দাঁড়িয়েছে। নিশ্চয়ই মানুষের বোধশক্তি বেড়েছে। কোন বিষয়টি সমাজের জন্য মঙ্গলজনক আর কোনটি সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক সেটি বোঝার এখন আমাদের বয়স হয়েছে। কাজেই সচেতন সমাজের আজকে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা দরকার। আজকের যুবসমাজ অত্যন্ত চৌকস। বিশ্বের সামাজিক চিত্রটি তাদের চোখের সামনে। তুমি পুরুষ হয়ে একটা মেয়ের বাবা বা অভিভাবককে মানসিক নির্যান করে যৌতুক নেবে? প্রতিটি মানুষের বিবেক আজকে জাগ্রত হওয়া উচিত। কোনোকিছু চাইবার আগে দেখুন মেয়েপক্ষ কতটুকু সামর্থবান? বাংলাদেশের প্রায় ৮০% লোক এখনও দরিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। ইফতারি, আকাঁঠলি চাইবার আগে দেখুন মেয়ের বাবা ইফতার করলো কি না- আম-কাঁঠাল কিনে খেতে পারছে কি না? এখন সামাজিক প্রথার কারণে মেয়ের বাবা হয়েছে বলে কর্জ-ধার করে বিপদগ্রস্ত হয়ে বা অসৎপথে রোজগার করে ইফতারি-আমকাঁঠলি দিল আর আপনি বসে বসে খাবেন? আপনার পরম আত্মীয় বিপদগ্রস্ত হলে আপনারও তো কিছু করার থাকে। মেয়ের পক্ষ হলো বলেই কি সকল দায়িত্ব তাদের? মেয়েকে বড় করলো, লেখাপড়া করালো, অনেক খরচ-টরচ কওে বিয়ে-শাদী দিল, তোমার ঘরে একটা কামলা বানিয়ে পাঠালো। হর-হামেশা শ্বসুরবাড়ির জন্য খাটছে। ইদানীং বেশ চাকরিজীবী মেয়ে চাকরি করে আয়-রোজগার করছে। সেই টাকাও শ্বসুরবাড়ির লোকজন ভোজ করছে। তারপর ইফতারি-আমকাঁঠলির জন্য খোঁচা দেয়া, যৌতুকের জন্য চাপ সৃষ্টি করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? মেয়েপক্ষের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না হলে ছেলেপক্ষও তো দেখতে পারে। ওরা ও তো ইফতারি, আমকাঁঠলি শ্বসুরবাড়িতে দিতে পারে। কনের বাবা হলেই যদি বিপদে পড়তে হয়, তাহলে কেউ আর কনের বাবা হতে চাইবে না। তাহলে এই সমাজ-সংসার ঠিকবে কী করে? যদি এ সংসার থেকে সকল মেয়ে উধাও হয়ে যায় তবে ভবিষ্যতে কে বউ হবে আর কে মা হবে? কাজেই মেয়ে শিশুর প্রতি যেভাবে বাবার দায়িত্ব রয়েছে সেভাবে শ্বশুরবাড়ির লোকজনেরও দায়িত্ব অস্বীকার করা যায় না। একজন বিবেকবান মানুষ সবসময় মানুষের কল্যাণে ব্রতী থাকেন। কাজেই পুরুষশাসিত সমাজের পুরুষালি দায়িত্ব নেয়া উচিত। একজন মেয়ে মানুষের টাকা দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার চিন্তা-চেতনা অন্তর থেকে মুছে ফেলে পুরুষদেও মেরুদ- সোজা করে দাঁড়ানো উচিত। ইফতারিতে চাইতে গিয়ে কখনও ইস্তারিগাঁওয়ের মানুষ হওয়া উচিত নয়। (ইস্তারিগাঁওয়ের সে এক করুণ ইতিহাস, যারা এটা জানেন তাদের জন্য প্রযোজ্য।) ইফতারি আর আম-কাঁঠলি দিতে গিয়ে যদি মেয়ের বাবার কষ্ট হয় তাহলে কৌশলে তা এড়িয়ে যাওয়াই উচিত। পক্ষান্তরে ধনীক শ্রেণি বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। সমাজের কুপ্রথা, কুসংস্কার ইত্যাদি বদলে দিতে সমাজপতিদের এগিয়ে আসা উচিত। সমাজপতিরা যদি প্রকাশ্যে দেনমোহর পরিশোধ করে একটা মেয়েকে বউ করে নিয়ে আসেন, এটাই হবে সমাজের জন্য উদাহরণ। ইফতারি আম-কাঁঠলি যদি ছেলের বাবা পাঠান এতেও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হতে পারে। অথবা ব্যয়বহুল এসবকিছু যদি সমাজপতিরা এড়িয়ে চলেন তাহলেও সামাজিক নিষ্পেষণে জর্জরিত কনের বাবারা অনেক স্বস্তি পেতে পারেন। তাই সমাজ গড়ি নতুন করে। কিছুক্ষণ ভাবি এ সকল বিষয় নিয়ে। পথ বের করে নেই, সমাজহিতৈষী হই। পরিত্রাণ দেই সকল নীপিড়িত প্রাণকে। এটাই আজকে সাধারণ মানুষের নিরঙ্কুষ চাওয়া। লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সনদ অর্জনই কি শিক্ষার লক্ষ্য?
  • সড়ক দুর্ঘটনা
  • সিসিক মেয়র এবং আমাদের প্রত্যাশা
  • মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু
  • বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা
  • ১৫ আগস্ট ’৭৫ : ধানমন্ডি ট্রাজেডি
  • সেই দিনটির দুঃসহ স্মৃতি
  • মুক্তিযোদ্ধার দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু
  • মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু
  • চিরঞ্জিব বঙ্গবন্ধু
  • ক্ষমা করো পিতা
  • এক নেতা এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ
  • পোয়েট অব পলিটিক্স
  • শুধু সাক্ষরতা বৃদ্ধি নয়, প্রকৃত শিক্ষা চাই
  • নাগরিক সাংবাদিকতা ও দায়বদ্ধতা
  • শিক্ষার্থীদের আন্দোলন : আমাদের শিক্ষা
  • বঙ্গবন্ধু ও ১৫ই আগস্ট ট্র্যাজেডি
  • কান্নার মাস
  • ছাতকে সহকারী জজ আদালত পুনঃ প্রবর্তন প্রসঙ্গে
  • মধ্যপ্রাচ্য কেন এতো সংঘাত ও যুদ্ধ প্রবণ অঞ্চল
  • Developed by: Sparkle IT