উপ সম্পাদকীয়

শিক্ষা ব্যবস্থার হালচাল

মোঃ রফিকুল ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৬-২০১৮ ইং ০১:৫০:১৪ | সংবাদটি ৩১ বার পঠিত

‘শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড’-এ কথাটা সর্বজন স্বীকৃত। কাজেই শিক্ষা ব্যবস্থাটি হতে হবে যুগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, টেকসই এবং বাস্তবধর্মী। আমাদের দেশে বিরাজমান শিক্ষা ব্যবস্থায় রয়েছে নানা অসঙ্গতি। যার ফলে আমাদের এই শিক্ষা ব্যবস্থা দেশে কেবল কেরানী তৈরি করছে-দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছেনা। এ কারণে দেশে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ তরুণ-যুবক বি.এ, এম.এ পাশ করে বেকারত্বের সংখ্যা বাড়ছে বটে, কিন্তু তাদের কপালে চাকুরী ঝুটছেনা।
সরকার বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রতি অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করেছেন-ইহা নিঃসন্দেহে একটি ভাল দিক। তবে এই দুই স্তরে কেবল অবকাঠামোগত অগ্রগতি ব্যতীত শিক্ষার তেমন উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। নয়া শিক্ষানীতি অনুযায়ী ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা এবং নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নয়া শিক্ষানীতির আলোকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি। নয়া শিক্ষানীতি অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাদান করার কথা এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি শিক্ষাদান করার কথা থাকলেও সরকার ২০১৮ সালেও নয়া শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে পারেননি। অথচ ২০১৮ সাল থেকে নয়া শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করার কথা ছিল। এখনও আগের মতই পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাদান করা হচ্ছে। অর্থের অভাবেই সরকার নয়া শিক্ষানীতির আলোকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস করতে পারেননি। তাই নয়া শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অথচ শিক্ষার উন্নয়নের স্বার্থে নয়া শিক্ষানীতির আশু বাস্তবায়ন প্রয়োজন। কাজেই শিক্ষার উন্নয়নের স্বার্থে যেকোন মূল্যে সরকারকে অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে।
আমাদের দেশের মাধ্যমিক স্কুল বিশেষ করে বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের চাপ খুব বেশি। অধিকাংশ বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের প্রতিটি সেকশনে ৮০/৯০ এমনকি শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। অধিক শিক্ষার্থীর কারণে শ্রেণিকক্ষে যথাযথ পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা গাদাগাদি করে প্রতিটি বেঞ্চে ৫/৭ জন করে বসে। যার ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের চেচামেচী এবং শিক্ষকের লেকচার একাকার হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কথা ভাল করে শুনতে পায় না এবং শিক্ষকও সঠিকভাবে পাঠদান করতে পারেন না। কিন্তু এ সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার বাস্তব কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তাই বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে শিক্ষাদান ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা সঠিকভাবে শিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কাজেই বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে সেকশন এবং সেকশন অনুপাতে শিক্ষকদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে শিক্ষাদানের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাহলে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন হবে এবং শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।
দেশের অধিকাংশ মাধ্যমিক স্কুল এবং কলেজ বেসরকারি। এসব বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অধিক এবং শিক্ষকদের সংখ্যা শিক্ষার্থী অনুপাতে কম। কিন্তু সরকার শিক্ষার্থী অনুপাতে বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষকদের সংখ্যা বৃদ্ধি করছেন না। যে কারণে বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। যার ফলে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ন্যায় পাবলিক পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করতে পারেনা। এতদিন বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব স্কুল পরিচালনা কমিটির হাতে ছিল। কমিটি ইন্টারভিউ নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী যে কোন সময় শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারত। তবে এখন শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব সরকারের হাতে চলে গেছে। কিন্তু সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ দেননা বরং দীর্ঘদিন যাবৎ সরকার বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ দান বন্ধ রেখেছেন। তাই বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে শিক্ষক সঙ্কট দেখা দিয়েছে এবং এসব স্কুলে হাজার হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। যার ফলে বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে পাঠদান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন শোনা যাচ্ছে যে, সরকার বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব আবার স্কুল পরিচালনা কমিটির হাতে ফিরিয়ে দেয়ার চিন্তা-ভাবনা করছেন। তবে সরকারের উচিত অনতিবিলম্বে শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব কমিটির হাতে ন্যস্ত করে বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক সঙ্কট দূর করা।
ঘনঘন সিলেবাস পরিবর্তন ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। কখনো বছরের মাঝখানে আবার কখনো বার্ষিক পরীক্ষার পূর্বে হঠাৎ করে সরকার সিলেবাস পরিবর্তন করেন। যার ফলে শিক্ষক শিক্ষার্থী সকলেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন এবং শিক্ষার্থীদের পড়া-শোনায় ব্যাঘাত ঘটে। এভাবে যখন-তখন সিলেবাস পরিবর্তনের কারণে ও শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করে থাকে। তাই ঘন ঘন সিলেবাস পরিবর্তন থেকে সরকারের বিরত থাকা উচিত।
পূর্বেই বলা হয়েছে যে, দেশের অধিকাংশ স্কুল-কলেজ বেসরকারি। বেসরকারি শিক্ষকরাই দেশের সিংহভাগ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করেন। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষকরা সরকারি শিক্ষকদের ন্যায় আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পান না। তারা সরকারের নিকট থেকে সামান্য বেতন-ভাতা পান, যা দিয়ে তারা পরিবারের ভরণ-পোষণ দিতে গিয়ে হিমসিম খান। শিক্ষকতা পেশায় বেতন-ভাতা পর্যাপ্ত না থাকায় মেধাবীরা এ পেশায় আসতে চান না। কাজেই বেসরকারি শিক্ষকদেরকে সরকারি শিক্ষকদের ন্যায় পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা দিতে হবে। তাছাড়াও শিক্ষকদের উচ্চতর বেতন স্কেল এবং পর্যাপ্ত আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে, যাতে মেধাবীরা এ পেশায় আসতে আগ্রহী হয়। তাহলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে এবং শিক্ষার মান উন্নয়ন হবে। আশা করি, সরকার শিক্ষার ক্ষেত্রে বিরাজমান অসঙ্গতিগুলো দূর করে শিক্ষা খাতে বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখবেন। যাতে শিক্ষার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছা যায়।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • তামাক : খাদ্যনিরাপত্তা ও উন্নয়নের পথে বাধা
  • প্রশাসনের দৃষ্টি চাই : শব্দদূষণ চাই না
  • যাতনার অবসান হোক
  • রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন জরুরি
  • যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণ ও প্রতিকার
  • বিশ্বকাপে অসহনীয় বিদ্যুৎ বিভ্রাট
  • মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই
  • মাদক থেকে দেশ উদ্ধারের অঙ্গীকার
  • পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগান
  • তোমাকে শ্রদ্ধা লেবুয়াত শেখ
  • সামাজিক অবক্ষয় এবং এর প্রতিকার
  • সোশ্যাল মিডিয়ার ভয়ঙ্কর রূপ
  • শিশুর জন্য চার সুরক্ষা
  • বিশ্ব ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের সংকট ও প্রতিক্রিয়া
  • সম্ভাবনার অঞ্চল সিলেট
  • স্বপ্নের বাজেট : বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ
  • বাচ্চাটা একটা খেলনা ফোন চেয়েছিল
  • স্থানীয় সরকার প্রসঙ্গে কিছু প্রস্তাবনা
  • চাই দূষণমুক্ত পরিবেশ
  • সিরিয়ার আকাশে শকুনের ভীড়-সামাল দিবে কে!
  • Developed by: Sparkle IT