সাহিত্য

শব্দের রংধনু : জাগতিক ফ্রেমে জীবনের চোখ

পারভেজ রশীদ মঙ্গল প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৬-২০১৮ ইং ০১:৫১:৫২ | সংবাদটি ২৯৪ বার পঠিত

শব্দের রংধনু কবি মানসের আকাশে উদিত হলেই শব্দ কবিতা হয়ে ওঠে, কবিতা হয়ে ওঠে গান। অদৃশ্য মনের রং নানা রং ধারণ করে দৃশ্যমান হয়। তারপর এর প্রতিচ্ছবি আলো বিকিরণ করতে করতে ছড়িয়ে পড়ে হৃদয়ের অন্দরে বন্দরে- যেখানে চীরকালীন কবির নিবাস। হ্যাঁ সম্প্রতি এমনি একগুচ্ছ কবিতা গ্রন্থবন্দী হয়েছে অমর একুশে বইমেলায় (২০১৮)। কবি আবদুল মুমিন মামুন এর বইটি বাসিয়া প্রকাশনী থেকে প্রকাশ করেছেন নোয়াব আলী। কবির ২য় কাব্যগ্রন্থ এটি। এর স্বত্ব পেয়েছেন কবি পতœী কানিজ ফতেমা। উৎসর্গিত হয়েছে কবির অগ্রজ সাংবাদিক, গীতিকার ও কবি আবদুস সবুর মাখন এর নামে। প্রচ্ছদ ধ্রুব এষ। মূল্য ১০০ টাকা। ‘শব্দের রংধনু’ গ্রন্থে মোট ৪০ টি কবিতা স্থান পেয়েছে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এ গ্রন্থটি পাঠ করলে মন অনাবিল তৃপ্তিতে ভরে যায়। মানব জীবনের চিরন্তন প্রেম বিরহ সুখ দুঃখ হাসি কান্নার চাক্ষুষ দলিল যেন গ্রন্থিত কবিতা গুলো। বিষয় ও ভাবের উপর ভিত্তি করে কবির কবিতা গুলোকে বিভিন্ন ভাবে শ্রেণিকরণ করা যায়। যেমন- দেশাত্ববোধক কবিতা,আবহমান বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে কবিতা, নর নারীর প্রেম-বিরহ-আক্ষেপ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে কবিতা।
স্বদেশ প্রেম কবিতার একটি আদি বিষয়। প্রত্যেক সফল কবি এই বিষয়কে উপজীব্য করে কবিতা লিখেছেন, মা ও মাতৃভূমির জন্য ভালবাসা কবি হৃদয়ে প্রকট, তাই স্বদেশের স্বাধীনতায় তিনি উল্লসিত, এর বিজয়ে তিনি আপ্লুত। শুরুতেই তিনি স্বাধীন সুখের যাত্রী হয়ে বলেন-
‘বিজয়ের উল্লাসে আজ যে পতাকা ওড়ে/সুনীল মাঠে তার ছায়া পড়ে স্বাধীন স্বপন-ফসল/কৃষকের প্রাণভরে সুমধুর আহবানে।’
তারপর আজন্ম বাঙালি হয়ে তিনি বার বার ফিরে আসার কথা ভাবেন, পৃথিবীর অন্য কোথাও নয় চৌদ্দ পুরুষের ভিটে মাটি এই বাংলাদেশেই। এদেশের আলো, এদেশের বায়ূ তাকে শুধু হাতছানি দিয়ে নয়, সর্বাঙ্গে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে ডাকে। দুপুরের অলস বটতলা তাকে মুক্ত পথের উদাসী পথিকের সাথী করে। তাই তিনি ছুটে আসতে চান -‘নিঝুম অন্ধকার ঝিঁঝিঁ-ডাকা বনে/জীবনের সান্ত¦না ফিরে পাওয়া সব প্রাণিদের মাঝে।’
পাঠকের কাছে অজ্ঞাত কোনো এক নাম না জানা প্রেয়সীর অনুপস্থিতি প্রকৃতি ও কবিকে যেন বেদনা কাতর করে তুলেছে, যার শূন্যতায় প্রভাতের সূর্য হাসে না, সব খানে নেই নেই আবহ বিরাজমান। তাই চিরন্তন কবি মানস তাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে। যদিও সে শেষ পর্যন্ত অন্ধকারেই থেকে যায়।
‘বাগানে ফুল ফোটে আর ঝরে/তোমারই মতো বেদনার আকাশে তাই/আমরা সবাই তোমাকেই খুঁজি।’
‘সুখের আহবান’ কবিতাটি পুরাতনকে বিদায় ও নতুনের কাছে নতুন নতুন প্রত্যাশার ঢালী নিয়ে হাজির হয়েছে। অসুস্থ সময়ের আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসার তীব্র বাসনা নিয়ে মানুষ ও প্রকৃতি সবাই যেমনটি থাকার কথা ছিল সবাই যেন সেরকমই থাকে, তার প্রতিফলন দেখতে চেয়ে কবির কলম সচল হয় এভাবে -
‘অশুভ-বিনাশী বৈশাখ/জীর্ণতাকে মুছে ফেলে দিয়ে যাক প্রাণ/পুরোনো পথের রেখায়/রেখে যাক সুখের আহবান।’
প্রতিচ্ছবি কবিতাটি কবির যাপিত জীবনের পরোক্ষ বয়ান, যেখানে প্রতিনিয়ত সবুজ আর নীলে মিশে পৃথিবী বদলে যায়, বদলে যায় মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, প্রীতি রূপ নেয় তিক্ততায়। তবে এতে হতাশা এলেও ভেঙ্গে পড়ার কারণ নেই কেননা খালি চোখে এটাই জীবনের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি। ‘স্বপ্ন’ শিরোনামের কবিতাটি আমাদের ইংরেজ কবি শেক্সপিয়ারের Under the Greenwood Tree কবিতাটির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যেখানে কবি স্বার্থময় সামাজিক জীবনের রেষারেষি থেকে মুক্তির আশায় গভীর অরণ্যে স্বেচ্ছা নির্বাসনে যেতে চান। আর সে নির্বাসনে তার সাথী হতে ইচ্ছুক কাউকে আহবান জানিয়ে আশ্বস্থ করেন এভাবে। যেমন-
‘পাহাড়ের ওই চূড়ায় নিয়ে যাও আমাকে/যেখানে বসে পৃথিবীকে দেখব আপন করে।/সাহসী এই নির্বাসনে তুমি/যাত্রী হবে জানি, তাইত সাজাই/হৃদয়ের সাম্পান ---------।’
আলোচ্য কাব্যগ্রন্থের ‘রেখাচিত্র’ ‘নদী-আমার নদী’ ‘অভিমান’ ‘নীল নকশায় রক্তাক্ত তুলির বেদনা’ ‘নীরব অভিমান’ ‘অদৃশ্যে সন্ধানী মন’ ‘নন্দিত সুখ দেব’ ‘টুকরো বেদনা’ ‘মিশ্রণ’ ‘অমিল পঙক্তি’ ‘সময়ের প্রাচীরে সময়’ ‘দুঃখহীন পঙক্তি’ ‘হৃদ্যন্ত্রে টর্নেডো’ ‘অথচ তারপর’- বিষয় ও ভাবের বৈচিত্রে ভরপুর। হাজার পৃষ্ঠার উপন্যাসে যে বিরহ গাঁথা শেষ করা যায় না কবি তার ইতি টানেন অত্যন্ত সাবলীল্ভাবে -
‘অথচ তারপর থেকে যাবে/বেলারুশিয়ার আকাশে সেদিনের চাঁদ।’
শুধু তাই নয়, কবিতার অনিবার্য অনুষঙ্গ প্রেম-বিরহকে কবি নানাভাবে কাজে লাগিয়ে একের পর এক কবিতা সৃষ্টি করেছেন; কেননা তিনি ভাল করেই জানেন সকল মহৎ সৃষ্টির পেছনে না পাওয়ার বেদনা অনুঘটকের কাজ করে। অভাব না থাকলে যেমন উৎপাদনের দরকার হতো না, তেমনি বেদনা না থাকলে কবিতারও সৃষ্টি হতো না। যেখানে প্রেম সেখানে বেদনা, যেখানে বিরহ সেখানেই প্রেম। প্রেম বিরহের এই পারস্পরিক সম্পর্ক কবিতার ব্যারোমিটার বলে গণ্য হয়। তাই এর তাৎপর্য কবির কাছে অসীম, ‘হৃদ্যন্ত্রে টর্নেডো’ এর বাস্তব উদাহরণ। কুশল বিনিময়কালে হাজার কষ্টে থেকেও মানুষ - কেমন আছো? প্রশ্নের উত্তরে যেমন বলে - ভালো আছি; দুঃখহীন পঙক্তিগুলো দুঃখে পরিপূর্ণ থাকা সত্ত্বেও কবি সেগুলিকে দুঃখহীনতার লেবাস পরিয়েছেন।
আশা হচ্ছে বেঁচে থাকার প্রেরণা। শ্রাবণের দিন শেষে প্রকৃতির অঙ্গসজ্জায় পরিবর্তন আসে। থেমে যায় আকাশের কান্না। ঘুমন্ত বীজেরা আশার নিশান ওড়ায়, ভাবে এই বুঝিবা অঙ্কুরোদ্গম হবে। বেওয়ারিশ মাছগুলোও পুকুরে অভিযোজিত হয়। সর্বত্র বিরাজ করে সুখের আবহ আর -
‘পাহাড়ের কান্নারাও তখন ঝরণা হয়/স্রোতহীন নদীরা তাই স্বপ্ন দেখে সাগর-সঙ্গমের।’
আলোকিত জীবনের প্রত্যাশায় উঁকি মারে কবির মন। সম্ভাষণ কবিতায় তাই বিধৃত হয় জীবনের প্রত্যয়বাণী। সমৃদ্ধির ব্যানারে পশম-কোমল তুলিতে লেখা হয় আলোকিত জীবন চাই, আলোকিত জীবন। শিরোনামহীন কবিতায় দেখতে পাই ভেতরের মানুষের জন্য ভেতরের মানুষের সংযমী অথচ নিবিড় অপ্রতিরোধ্য টান। প্রকাশ করতে না চাইলেও প্রকাশিত হয়, বের করতে না চাইলেও বেরিয়ে আসে অন্তরের অনুরাগ -
‘এভাবেই এসো, ফিরে এসো/জীবনের রংধনু রঙে জ্যোৎস্নার আলোতে/দেখা যেন হয় কোনো নিশ্চুপ রাতের জোনাকির দলে।’
পরাধীনতার গ্লানি কোনোকালেই কারো কাম্য নয়। তাই পরাধীনতার নাগ পাশ থেকে মুক্তি লাভের জন্য সংগ্রাম প্রয়োজন কারণ সংগ্রাম ছাড়া বিজয় লাভ দূরুহ। দেশ-মাতৃকার ডাকে তার কোনো সন্তান নীরবে বসে থাকতে পারে না। কবিও এর ব্যতীক্রম নয়, তাঁর বিজয়ের ডাক কবিতায় তা-ই প্রমাণ করেছেন-
‘বিজয় আমায় ডাক দিয়েছে -/পরাধীনতার শৃঙ্খলুমুক্তির আহবান;/পেশিতে প্রবল শক্তি যোগায়/স্বপ্নময় দেশের লাল-সবুজের পতাকাটি যেন/বিজয়ের হাওয়ায় ওড়তে পারে সকাল-সন্ধ্যা।’
পরিশেষ : কবির স্বস্তি কবিতা কবির মুক্তির কবিতা। হৃদয়ের জগদ্দল পাথর অপসারণের মোক্ষম মাধ্যম কবিতার পয়োপ্রণালী। কবিতা হচ্ছে কবির ভাবের সুনিপুণ নিষ্কাশন ব্যবস্থা। কবির কবিতা পাঠককে আনন্দ দিক বা না দিক তা মুখ্য নয়, মুখ্য হচ্ছে কবির অন্তরের উত্তাপকে প্রশমন। কোনো কোনো সময় কবিতা পাঠককে আনন্দ দিতে পারে এবং যোগাতে পারে চিন্তার খোরাক। সব কবিতা পাঠকের ভাল লাগবে বা লাগতেই হবে এমন দায়বদ্ধতা কবির নেই। কবি আবদুল মুমিন মামুন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে কবিতা লিখছেন, নিজের মত করে নিজেকে শানিত করেছেন। নিজেকে করে তুলেছেন অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রম। এখানেই তাঁর স্বকীয়তা, এজন্যই তিনি নন্দিত।

এই বলে শেষ করতে চাই - গ্রন্থিত কবিতাগুলোর শব্দরাজি স্বচ্ছ, বাণীর প্রবাহ স্পষ্ট, কথামালা বিষণœ কিন্তু আশা ব্যঞ্জক। ভাব ব্যতীক্রমী হলেও সহজাত, ভঙ্গি সুখপাঠ্য। গভীরতা মানবীয় কিন্তু দুঃখজাত, অনুভবে হৃদয়গ্রাহী। বুনন সহজবোধ্য, শ্রুতিমধুর। শব্দের রঙধনু হলেও নানা রঙে রহস্যঘেরা। এ যেন জাগতিক ফ্রেমে জীবনের চোখ। রোমান্টিকতা অশ্রু আর বিদ্রোহের এক পল্লীতে বসবাস। বইটির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ শেষে অনুমিত হয় বিশেষ কয়েকটি শব্দের প্রতি কবির দুর্বলতা রয়েছে। যেহেতু কবিমানসকে চেনার জন্য কবির ব্যবহৃত শব্দ খুবই গুরুত্ব বহন করে, তাই আলোচ্য কবির কবিতায় বহুল ব্যবহৃত কয়েকটি শব্দ উল্লেখ করছি। স্বপ্ন, স্বাধীন, নীল, প্রাণ, রাত, আঁধার, নদী, সমুদ্র, মেঘ, চাঁদ, সূর্য, হাসি, কান্না, রাত, হৃদয়, নীরবতা এসব শব্দ একই কবিতায় এমনকি একই পঙক্তিতে বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে। অমিত্রাক্ষর আর মুক্তক ছন্দে রচিত এ কবিতাগুলো পাঠকের ভাল লাগবেই।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT