সাহিত্য

রমাকান্ত টাইপিস্ট

সেলিম আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৬-২০১৮ ইং ০১:৫৪:৫৬ | সংবাদটি ১২৩ বার পঠিত

মাত্তর পাঁচ-সাত বছরে শহরের আদালতপাড়ার এতো পরিবর্তন হয়েছে, জাবেদ ভাবতেই পারেনি। লন্ডন যাবার ওর সাত বছর হলো। সাত বছর আগেও দেখেছে সিলেটের আদালতপাড়ায় ব্রিটিশ আমলের লালরংয়ের কয়েকটি একতলা পুরনো বিল্ডিং। টিনশেডের বার লাইবে্িরর। মুহুরি শেড, টাইপিস্ট শেড। পুরনো সেই শেডগুলোর অনেকটিই এখন আর নেই। পাহাড়ের মতো বিশাল পাঁচতলা একটি বিল্ডিং। বিল্ডিংটা নতুন হলেও, পুরনো ধাচে বানানো। বিল্ডিংয়ের সামনে বিশাল একটি প্যান্ডেল। সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির বার্ষিক ভোজ। জাবেদ সমিতির বার্ষিক ভোজে এসেছে। ও সমিতির সদস্য নয়। ওর মামা সমিতির সভাপতি, মামা পার্সোনাল গেস্ট হিসেবে তাকে দাওয়াত করেছেন। অবশ্য জাবেদও ইংল্যান্ডের একজন সলিসিটর, মানে আইনজীবী। আর শখের ঘোড়া দৌড়ানোর মতো একটা হরর পত্রিকা বের করে। কোর্টের নতুন বিল্ডিংটার প্রতিটি ফ্লোরেই একটি দুটো করে লাইট জ¦লেছে। আলো তেমন নেই। ফ্লোর গলিয়ে যেটুকুন বাইরে আসছে, তাতে বারান্দাটাও ঠিকমতো আলোকিত হচ্ছে না। এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পুরনো বিল্ডিংয়ের একটি দুটোতে টিম টিম করে লাইট জ্বলছে। লাইট জ্বললেও ক্যামন আবছা অন্ধকার। সেইসব বিল্ডিংয়ের চারপাশ ভালোভাবে দেখতে আরো আলো দরকার। প্যান্ডেলের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে জাবেদ প্যান্ডেলের ভেতর-আশপাশ খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে। জাবেদ অবাক হয়, চেয়ার টেবিল সাজানো, প্যান্ডেলের বিভিন্ন স্থানে বাল্ব লাগানো থাকলেও বিশাল প্যান্ডেলে মাত্তর দুটো লাইট জ্বলছে। লোকজনও নেই। খালি চেয়ারগুলো খাখা করছে। প্যান্ডেলের সামনের সোফায় একটি লোক বসে। নীল রংয়ের ইউনিফর্ম পরা, মনে হয় গার্ড হবে। জাবেদ প্যান্ডেলের মধ্যিখানের রাস্তা দিয়ে হাটে। দু’পাশের অসংখ্য খালি চেয়ার পার হয়ে লোকটার কাছে আসে। লোকটা চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে জাবেদকে সালাম দেয়। বুকের নীল রংয়ের প্লাস্টিক ব্যাজে নাম লেখা মন্তাজ। মন্তাজই জানায় জাবেদ ভুল করে আগের দিন বৃহস্পতিবারে চলে এসেছে, আসলে বার্ষিক ভোজটা পরের দিন মানে শুক্রবারে।
জাবেদের খুব একটা খারাপ লাগে না, ছোট্ট ভুলটার জন্যে নিজেকে নিয়ে নিজেই হাসে। ও শুধু শুধু বার্ষিক ভোজে ভাত খেতে আসেনি। তার আরেকটা কাজও আছে। টাইপ রাইটার দিয়ে কিছু কাগজ টাইপ করাবে। টাইপ রাইটারের প্রতি ওর প্রচন্ড দুর্বলতা। ভেবেছিলো এইচএসসি পাশ করার পর শিখবে। কিন্তু পরীক্ষার রেজাল্ট বেরুবার পরই বার্মিংহামের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জাবেদের এডমিশন হয়ে যায়। তারপর তার ইংল্যান্ড যাত্রা। ইংল্যান্ডে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি, আর শখের ঘোড়া দৌড়ানোর মতো একটি হরর পত্রিকা বের করে। ওর সাহস কম না, অনেক খেটে খুটে হরর পত্রিকাটি আমাজন দিয়ে বের করাচ্ছে। জাবেদের সবসময়ই ব্যতিক্রমী একটা কিছু করার ইচ্ছে। হরর পত্রিকা তো, এজন্যে যতো বেশী পুরনো জিনিসপত্র ব্যবহার করা যায় ততো ভালো। এবার শখ চেপেছে পত্রিকাটির কিছু পৃষ্ঠা বাংলা টাইপ রাইটারের হরফে লেখবে। কিন্তু ইংল্যান্ডে বাংলা টাইপ রাইটার পাবে কোথায়। এজন্যে দেশে আসার সময় ইমেইলে আসা দুটো গল্প প্রিন্ট করে নিয়ে এসেছে। কোর্টের টাইপিস্টদেরকে দিয়ে টাইপ করিয়ে নেবে।
জাবেদ এজন্যে ডিনারে আসার সময় ব্যাগে করে লেখা দুটোও নিয়ে এসেছে। নতুন বিল্ডিংয়ের সাথে পুরনো অনেকগুলো বিল্ডিং এখনো রয়ে গেছে। এগুলোর কোনটিতে ছিলো টাইপিস্টদের শেড। দেশে থাকতে টাইপিস্ট শেডে জাবেদ কয়েকবার আসলেও সে শেডটা কোথায় ছিলো মনে করতে পারছে না। একে ওকে জিগ্যেস করে। একজন দেখিয়ে দেয় এক নম্বর বার লাইবে্িররর পেছনে। ওখানে গিয়ে দেখে কোথাও টাইপ রাইটার নেই, সবগুলোই কম্পিউটার। সবাই চলে গেছে একজন কম্পিউটার সাট ডাউন দিচ্ছে, আরেকজন কম্পিউটারে কম্পোজ করছে। যে লোকটা কম্পিউটার সাট ডাউন দিচ্ছে জাবেদ তাকে জিগ্যেস করলো কোথায় টাইপ রাইটিং করা যায়। লোকটা ভেবেছে ও বোধ হয় কম্পিউটারে কিছু লেখাবে। নিজের কম্পিউটার দেখিয়ে বললোÑমেশিন দেখতেছেন না। এইতো এখানে টাইপ হয়।
Ñভাই এটা তো কম্পিউটার। ওই টাইপ রাইটার মেশিন আছে না, আমি ওইসব মেশিনে কাজ করাতে চাই। লোকটা জাবেদকে দেখে একটু পর্যবেক্ষকের মতোÑ পুরানা দলিলে মেরামত করবেন।
তারপর হাতটা একটু উঁিচয়ে বললোÑওইদিকের শেডে যান। আজকাল এইসব মেশিন উঠে গেছে। দেখেন রফিক নামের একটা লোক মাঝে মধ্যে আসে, ও শুনছি টাইপ করে।
জাবেদ নিজের পুরনো ঠাহরে টাইপ রাইটার শেডটা খোঁজতে থাকে। পুরনো বিল্ডিংগুলোতেই খোঁজে। দুয়েকটা রুম খোঁজতেই পেয়ে যায়। রং খসা একটা সাইন বোর্ডে লেখা টাইপ রাইটার শেড। শেডটার সাইনবোর্ড যেমন জীর্ণ, বিল্ডিংটাও তেমনি জীর্ণ এবং একটি লোকও নেই।
জাবেদের এখনো মনে আছে সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত কী জমজমাট থাকতো টাইপ রাইটার শেডটা। ও বারান্দায় হাঁটছিলো আর এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলো, কাউকে যদি পাওয়া যায়। হঠাৎ মনে হলো টাইপ রাইটারের শব্দ। কানটা একটু সজাগ করে, বন্ধ রুমটার ভেতরে কে যেন টাইপ করছে। আগে তো কেউ এভাবে রুম বন্ধ করে টাইপ করতো না। সব সময় দরজা জানালা খোলা থাকতো। আওয়াজটা খুব স্পষ্ট নয়। জাবেদ কি ভুল শুনছে। ও ভালো করে কান পাতে। কট কট আওয়াজ। এটা তো টাইপ রাইটারেরই শব্দ। ভালো করে কান পাতে, হ্যা ভেতরে টাইপ রাইটিং হচ্ছে। এবার স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। যথেষ্ট স্পিডে টাইপ হচ্ছে, তবে আগের দিনের মতো নয়। স্পিডটা একটু কম মনে হচ্ছে। কিন্তু রুমটার দরজা জানালা তো বন্ধ। একতলা টিনশেডের বারান্দাটা বেশ লম্বা। শেষ মাথার দরজাটা ভেজানো। ও ভেবেছিলো টয়লেট বোধ হয়। শব্দটা ওই দিক থেকেই আসছে। আস্তে আস্তে সামনে এগোয়। ভালো করে তাকায় দরজাটা চার আঙ্গুলের মতো ফাক আর এই ফাক গলিয়ে একটু আলোও আসছে। জাবেদের মনে আনন্দের একটি ঝিলিক খেলে যায়, রফিক নামের লোকটা বোধহয় এসেছে। তাহলে সন্ধ্যেটা আজ মাটি হচ্ছে না। জাবেদ আস্তে আস্তে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। টাইপ রাইটারের শব্দ ছাড়া আশেপাশে আর কোন শব্দই নেই। লোকজন তো আর নেই-ই। এমন কি বিল্ডিংটায় একটা গার্ডও নেই। হয়তো গার্ড আছে, রাত নটা দশটার দিকে আসবে। জাবেদ দরজার একটি কপাট ধরে টান দেয়। ক্যামন ক্যাচ ক্যাচ একটা শব্দ হয়। মনে হচ্ছে অনেকদিন দরজা খোলা হয় না। দরজার কবজায় একটু তেল দিলে এভাবে শব্দ হতো না। জাবেদ দরজার কপাটটায় জোরে একটি টান দেয়। মানুষের কান্নার একটি শব্দ তুলে দরজার কপাট খুলে।
সারা ঘর জুড়ে আন্ধার। দূরে একটি নিবু নিবু মোমবাতি জ্বালিয়ে কে একজন কট কট শব্দ তুলে টাইপ করছে। লোকটাকে ঠাহর করা যাচ্ছে না। দরজা খোলার শব্দ শুনে খুব গম্ভীর গলায় অথচ নীচু স্বরে ভেতর থেকে কে একজন জিগ্যেস করেÑকে? মনে হচ্ছে বয়স্ক কেউ কথা বলছে। জাবেদ কাউকে দেখতে পায় না। সে রুমের ভেতরের সেই লোকটাকে খুঁজতে খুঁজতে নিজের স্বরটা একটু চড়িয়ে বলেÑভাই আমি কিছু কাগজ টাইপ করাবো।
Ñদরজা বন্ধ করে ভেতরে আসেন।
জাবেদ দরজা বন্ধ করে। একটু ফাঁক থেকে যায়। ভেতর থেকে লোকটা আবার বলে, দরজাটা ভালো করে বন্ধ করেন। জাবেদ আবার দরজাটায় টান দেয়। তারপর রুমের ভেতর তাকায়। এখন আগের চেয়ে আরেকটু ভালো দেখা যাচ্ছে। রুমের মাঝামাঝি একটা টেবিলের একপাশে মোমবাতিটি জ্বলছে। জাবেদ ভাবে মোমবাতির আলো ধরেই তাকে হাঁটতে হবে। রুমটা ভালো করে দেখে। দুটো না তিনটে টেবিলে টাইপ রাইটার আছে বাকীগুলো খালি। ওর মনটা কেন জানি এমনি এমনিই খারাপ হয়ে যায়। একদিন কী জমজমাট ছিলো এইসব শেড।
জাবেদ এইসব ভাবছিলো আর আলোর দিকে হাঁটছিলো। লোকটা ভাবে জাবেদ তাকে মনে হয় দেখছে না। সেখান থেকেই হাক দেয়Ñএই যে উত্তর দিকে আসেন। ও একটু পা চালিয়ে মোমবাতির আলো দেখে দেখে লোকটার কাছে আসে। একজন বুড়ো মতোন লোক। টাইপ রাইটারের ভেতর থেকে কাগজ বের করছিলেন। অন্ধকারে চেহারাটা বুঝা যাচ্ছে না। লোকটা বোধ হয় খুব শীতকাতুরে। এখনো তেমন শীত নামেনি, কিন্তু মাথাটাথা মুড়ে বসে। মোমবাতির আলোটা যথেষ্ট নয়। তবে কাজ চলছে। মোমবাতিটা এমনভাবে সেট করা, যে কাগজ দেখে টাইপ হচ্ছে শুধু সেই কাগজ আর টাইপ রাইটারের রোলারে বসানো কাগজটা ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে।
জাবেদ কাছে যেতেই, লোকটা কথা না বলে পাশে রাখা চেয়ারটা দেখিয়ে ইশারায় বসতে বলে। জাবেদ চুপচাপ বসে। তার সাথে থাকা অক্সফোর্ড ব্যাগ থেকে গল্প দুটোর পান্ডুলিপি বের করে। লোকটা কোন কথাই বলছে না। ব্যাগ থেকে ওর কাগজ বের করা দেখছিলো। জাবেদই কথা শুরু করেÑএই কাগজগুলো টাইপ করাবো। কতো লাগবে?
Ñএখানে দরদাম নাই। এক পাতা সাড়ে তিন টাকা হবে।
Ñকোন সাইজ? এ ফোর তো?
Ñবাবা এ-ফোর বি-ফোর বুঝি না। বরাবর যে সাইজের কাগজে কাজ করছি, ওইগুলাতেই করবো। ফুলস্কেপ সাইজে করবো। দেখেন পুষালে করান, না হয় আমার অন্য কাজ আছে।
কাজের রেইটটা খুব সস্তা। এতো কম হবে জাবেদ ভাবতেই পারেনি। তবু মনের মধ্যে একটা খুতখুতে। লোকটাকেও বড়ো খিটখিটে মনে হচ্ছে। হালকা উল্টা পাল্টা কিছু হলেই এই ধরনের লোক রাগ করে ফেলে, বলবেÑকাজ করবে না।
ÑÑচাচা, কাগজের সাইজটা একটু দেখাবেন?
ÑÑবাবারে দেখে তো মনে হচ্ছে লেখাপড়া করছো। আর কথা শুনে পড়ালেখা কী যে করেছো বুঝতে পারছি না। ফুলস্কেপ সাইজ কাগজই চেনোনা। এই যে টাইপ রাইটারের পাশে রাখা লম্বা কাগজগুলা এইগুলা হলো ফুলস্কেপ সাইজ কাগজ। টেবিলের পাশে রাখা কাগজগুলো দেখে। এ-ফোর সাইজের চেয়ে একটু লম্বা সীট। কাগজটা মন্দ না। জাবেদের চলবে। জাবেদ সম্মত হয়Ñহ্যা চাচা শুরু করেন। টাইপিস্ট দুটো ফুলস্কেপ কাগজ হাতে নিয়ে কাগজ দুটোর মধ্যিখানে একটি কার্বন পেপার ঢুকান। তারপর কার্বনসহ কাগজদুটো টাইপ রাইটারের ভেতর ঢুকান। কাগজের মাথাটা টাইপ রাইটার মেশিনের একটি রোলারের উপর বসে। তারপর টাইপিস্ট কী বোর্ডে লেখা অক্ষরগুলোতে আঙ্গুল দিয়ে ঠোকা দেন। ঠোকা দিতেই কাগজে সেই অক্ষরটা ফুটে ওঠে। আবার দুটো কাগজের মধ্যিখানে কার্বন পেপার বসানোয় একসাথে দুটো কাগজে লেখা হয় যাচ্ছে।
ভদ্রলোক কটকট শব্দ করে টাইপ করছিলেন। জাবেদ খানিকটা তার কাছ ঘেষতেই বললেনÑÑআরে শরীরের উপর পড়ে যাচ্ছেন। একটু সরে বসেন। জাবেদ বুঝে এই লোকটা একটু খুঁতখুঁতে আর রগচটা। খামোখা রাগিয়ে লাভ নেই। সে চেয়ারটা নিয়ে আগের চেয়ে একটু সরে বসে। তবে টাইপ রাইটারের লেখাগুলো পড়া যাচ্ছে। লোকটার ভালো স্পিড। সময় যতো গড়াচ্ছে স্পিড ততই বাড়ছে। যতোটুকু পড়া যাচ্ছে, বানান টানানে ভুল নেই। তবে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলো লোকটা গল্পের সব চলিত ভাষাকে সাধু করে ফেলছে। জাবেদ হই চই করে উঠেÑ চাচা করছেন কী, সব চলিত ভাষাকে সাধু ভাষা করে ফেলছেন?
লোকটা ক্যামন খিটখিটে মেজাজে বলে, চলিত ভাষা একটি ভাষা হলো? চলছে বলছেÑ এইগুলা ভদ্রলোকের ভাষা? চলিয়াছেন, বলিয়াছেন এইগুলা পড়তে ভালো লাগে, শুনতেও ভালো লাগে। ভালো কাগজে লেখছো ভালো ভাষায় লেখো।
জাবেদ বুঝলো লোকটার সাথে তর্ক জুড়ে কাজ হবে না। তার চেয়ে টাইপ করানোটা বাদ দিয়ে দেয়াই ভালো। টাইপ করানো বন্ধ করবে কি না ভাবছে, হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি আসে, থাক না ভূতের গল্পের সাথে পুরনো গন্ধের সাধু ভাষার আলাদা একটা মজা আছে। সাধু ভাষায় ভূতের গল্পটা খুব জুৎসই হবে। এইসব ভাবতে ভাবতে লোকটা এক পেইজ টাইপ করা কমপ্লিট করে ফেলে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো কাগজের নীচের দিকে বাম পাশে ঝটপট নিজের নামটা লিখে ফেলে ‘রমাকান্ত কামার’ টাইপিস্ট।
Ñচাচা ? আপনার নাম লেখছেন কেন। এটা তো একজন লেখকের লেখা। লেখকের নাম তো উপরে লিখেছেন।
Ñঠিক আছে তো, লেখকের নাম লেখকের জায়গায় লিখেছি। আর টাইপিস্টের নাম টাইপিস্টের জায়গায় লিখেছি। বুঝলেন, আমার নামটা হেলাফেলার নাম নয়। বাপ মা যে আমার জ্ঞানী আছিলো, নামের মাঝেই এর প্রমাণ আছে। এই যে লেখলাম, বাম দিক থেকে পড়ে যান রমাকান্ত কামার। আবার ডান দিক থেকে পড়েন রমাকান্ত কামার।
জাবেদ মজা পায় সত্যিই তো ডান দিক থেকে পড়লে রমাকান্ত কামার আর বামদিক থেকে পড়লেও রমাকান্ত কামার। জাবেদ ভাবে অসুবিধে নেই, টাইপ করা পাতাগুলো পরে স্ক্যান করে টাইপিস্টের নামটা ডিলেট করে দেবে। দেখতে দেখতে ঘন্টাখানেকের মধ্যেই গল্প দুটো টাইপ হয়ে যায়। টাইপ করা কাগজগুলো ডানপাশে টাইপ রাইটারের কাছে রাখা। লোকটা আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করেÑনেন আপনার কাগজ।
জাবেদ হাতে নিয়ে কাগজগুলো গুনে ষোল পৃষ্ঠা। রমাকান্ত টাইপিস্টের হিসেবে বিল হয়েছে ছাপান্ন টাকা। বুড়ো মানুষ এতো সময় কাজ করলো। ঠিক ছাপান্ন টাকার দরকার নেই একশ টাকারই একটি নোট দিয়ে দেবে। টাইপ করা কাগজগুলো জাবেদ কাধের অক্সফোর্ড ব্যাগে ঢুকায়। তারপর মানিব্যাগ থেকে একশ টাকার একটি নোট বের করে লোকটার দিকে বাড়ায়। লোকটা ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো ঝট করে জাবেদের থেকে আরেকটু দূরে সরে দাঁড়ায়। ক্যামন খ্যাক খ্যাক করে উঠে, না না টাকা লাগবে না। অনেকদিন পর কিছু কাগজ টাইপ করেছি। শরীরটা ঝরঝরে লাগছে।
Ñএটা কী বলছেন? আপনি মুরব্বি মানুষ এতো কষ্ট করলেন, আর টাকা নেবেন না। না চাচা টাকা আপনাকে নিতেই হবে। কথাটা বলে নোটটা লোকটার হাতে গুজে দেবার জন্য তার হাত ধরতেই জাবেদ আঁতকে উঠে। রমাকান্তের শরীরটা বরফের চেয়েও ঠান্ডা। লোকটার মুখের দিকে তাকাতেই দেখে তার সামনে কাপড়ে ঢাকা একটি কংকাল দাঁড়িয়ে। আরে এটা তো একটা ভূত!
‘ও আল্লাহ, আমাকে বাঁচাও’ বলেই জাবেদ ব্যাগটা হাতে নিয়ে দে দৌড়। তারপর রাস্তায় বেরিয়ে একটি খালি রিকসায় চেপেছিলো। কখন যে বাসায় এসেছে খেয়াল নেই। হাতের সেই একশ টাকার নোটটি নেই। ড্রাইভারকে বোধ হয় দিয়ে ফেলেছে। ব্যাগের ভেতর দেখতে ইচ্ছে করে কাগজগুলো কি সত্যি সত্যি আছে। ভয়ে ভয়ে দোয়া দুরুদ পড়ে ব্যাগটা একটু ফাক করে, ব্যাগের ভেতরে তো কাগজ দেখা যাচ্ছে। না আজ আর ব্যাগটা খুলবে না।
সকালে নাস্তা সেরেই সেই অক্সফোর্ড ব্যাগটা কাধে ঝুলিয়ে ছুটে শাহিন মামার বাসায়। সেখানে ব্যাগ খুলবে, কাগজগুলো যদি ততোক্ষণ ব্যাগে থাকে তবে পুরো ঘটনা মামাকে বলবে। না হয় এমনি এমনি সাত পাঁচ গল্প করে চলে আসবে।
শাহিন মামাকে চেম্বারেই পায়। মক্কেল টক্কেল নেই, মামা একা একা বসে লোকাল একটা পত্রিকা পড়ছেন। শুক্রবার সকালে-সন্ধ্যায় মক্কেল আসা নিষেধ। জাবেদকে দেখে মামা পত্রিকাটি টেবিলে রাখেন।
Ñকী ভাগনা আজ আমাদের ডিনারে যাচ্ছো তো?
জাবেদ হাসেÑযাবো মামা।
মামার সামনের চেয়ারটায় বসতে এক ফাঁকে ব্যাগের ভেতরের কাগজগুলো দেখে। কাগজ তো আছে দেখা যাচ্ছে। ঝট করে ব্যাগ থেকে কাগজ বের করেই মামার সামনে রাখে। তারপর মামাকে গত সন্ধ্যের ঘটনাটা বলে। মামা কাগজগুলো হাতড়াতে হাতড়াতে ঘটনা শুনেন।
Ñভাগিনা, বড়ো তাজ্জুবের ব্যাপার। ঘটনাটা আমি বিশ্বাস করি না কিভাবে! কারণ এই কাগজগুলার সাইজ হলো আট ইঞ্চি বাই তের ইঞ্চি। এইসব কাগজ আজকাল পাওয়া যায় না। মামা এক সীট কাগজ জাবেদের চোখের সামনে তুলে ধরে বলেন, এই দেখো কাগজে একটা জলছাপ দেখা যাচ্ছে না?
জাবেদ ভালোভাবে তাকায় কাগজটায় টুপি পরা একটা পশুর মুখ। তবে জলছাপÑ হ্যাঁ টুপির মতো কী একটা জলছাপ দেখা যাচ্ছে।
Ñহ্যাঁ এইগুলো হচ্ছে গাঁধা আর গাঁধার টুপি। কোম্পানি তার কাগজের গুরুত্ব বাড়াতে প্রতিটি সিটে ফুলস্ ক্যাপ মানে গাধার টুপির জলছাপ দিয়েছে। এজন্যে এইসব কাগজকে ফুলস্কেপ সাইজ বলে। এই যে রমাকান্ত কামার নামটা, এই নামে একজন টাইপিস্ট ছিলেন। আমি অবশ্য দেখিনি। শুনেছি রমাকান্তের কাছে এক ভদ্রলোক কিছু মূল্যবান দলিল রেখেছিলেন। ভদ্রলোকের ছিলো এক মেয়ে। মেয়ে যখন প্রাপ্ত বয়স্কা হয়, তখন মেয়ের সম্পত্তি দখলে লিপ্সু কিছু লোক দলিল নেবার জন্যে রমাকান্তের গলা টিপে মেরে ফেলেছিলো। তাহলে কি সেই রমাকান্ত ভূত হয়ে এসেছিলেন!

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT