সম্পাদকীয়

বিশ্বকাপে কাঁপে বাংলাদেশও

প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৬-২০১৮ ইং ০১:৪২:৩৫ | সংবাদটি ২৮ বার পঠিত

মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উদযাপনে যখন মশগুল সবাই, সেই সময় শুরু হচ্ছে আরেকটি উৎসব। পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে চারদিক। নানা বর্ণের নানা আকৃতির ব্যানার, পতাকা, ফেস্টুন উড়ছে বাতাসে। ছোট বড় ভবন, অট্টালিকা, দেয়াল থেকে শুরু করে গাছের শাখা আর যান-বাহন; বাকি নেই কোথাও। শহর, নগর, গ্রাম জনপদ- সর্বত্রই একই দৃশ্য। নানান দেশের পতাকায় এখন ‘বর্ণিল’ বাংলাদেশ। এই সবুজ-শ্যামল বাংলায় ভিন দেশের পতাকা উড়ানোর মহোৎসব চলছে একটি কারণে, সেটা হলো ফুটবল বিশ্বকাপ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ বৃহস্পতিবার রাশিয়ায় উত্তেজনাকর বিশ্বকাপ ফুটবলের পর্দা উঠছে। বিশ্বকাপের উন্মাদনা বিশ্বময় । প্রতি চার বছর পর পর আয়োজিত এই বিশ্বকাপে এশিয়ার অংশগ্রহণ থাকলেও এশিয়ার কোন দেশ এখনও বিশ্বকাপ জিততে পারে নি। আর আমরা তো বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে অনেক দূরে। আমাদের ফুটবল আন্তর্জাতিক মানে কবে পৌঁছুবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। তাই, বাংলাদেশের মানুষ একটি ‘শূন্যতাকে’ পোষে রেখে প্রতিবারের মতো এবারও বিশ্বকাপ উৎসবে মেতে ওঠেছে।
বিশ্বকাপ উন্মাদনা বিশ্বজুড়ে। সারা বিশ্বের ৩২ টি দেশ এবার অংশ নিচ্ছে এই বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে। রাশিয়ায় আয়োজিত এই বিশ্বকাপের জোয়ার ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের আনাচে কানাচে। এই জোয়ার যেন একীভূত করে দিয়েছে বিশ্ববাসীকে। আমাদের এই ভূ-খ- উন্মাতাল এই জোয়ারে। দেশের এমন কোন এলাকা নেই, যেখানে লাগেনি বিশ্বকাপের হাওয়া। আনাচে কানাচে, পাড়া-মহল্লায় টেলিভিশনে বিশ্বকাপ দেখার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। প্রস্তুতি মানেই টিভি কেনা, প্রিয় দলের পতাকা উড়ানো, দেয়াল লিখন ইত্যাদি। ঘরে-দোকানে, পথে-ঘাটে, গত সপ্তাহ কয়েকের আলোচনার বিষয় ছিলো- কেমন খেলবে ব্রাজিল আর্জেন্টিনা। কে হবে চ্যাম্পিয়ন, কিংবা বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কি খেলা দেখার সব আয়োজন ভ-ুল হয়ে যাবে? এর পাশাপাশি একটি চাপা কষ্ট বিরাজ করতেই পারে প্রতিটি দেশ প্রেমিক বাঙ্গালীর মনে; এই ফুটবল প্রেমে উন্মাতাল দেশবাসী কি আশা করতে পারে না বিশ্বকাপের দেশগুলোর তালিকায় তাদের প্রিয় জন্মভূমির নামটিও যুক্ত হোক? কবে আসবে সেই দিন?
এই প্রসঙ্গে সঙ্গত কারণেই খতিয়ে দেখতে হবে আমাদের ফুটবলের বর্তমান অবস্থা কী, এর ভবিষ্যৎইবা কি? আমাদের ফুটবলের অতীত যে একেবারেই অনুজ্জ্বল, সাফল্যহীন, ধোঁয়াটে-এমনটি বলা যায় না। বাংলাদেশে অতীতে ফুটবলে অনেক গৌরবোজ্জল ঘটনা ঘটেছে, আছে ফুটবলের অনেক স্বর্ণালী অধ্যায়। কিন্তু এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়নি। ফলে এখন থেকে প্রায় দুই যুগ আগে যেখানে আবাহনী-মোহামেডান ফুটবল খেলা হলে দেশজুড়ে মানুষ দু’ভাগে ভাগ হয়ে যেতো, সেখানে এখন স্টেডিয়ামে মানুষ ফুটবল খেলা দেখতে আসে না। অনেক সময় বিনা টিকিটেও। কারণ আমাদের ফুটবলের উন্নতি হচ্ছে না। ফুটবলের এই দৈন্যদশার অন্যতম কারণ হচ্ছে মাঠ, অর্থ ও কোচিং তথা সূদৃরপ্রসারী পরিকল্পনার অভাব। অথচ ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দেশের ফুটবলাররা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিকভাবে পেয়েছেন প্রতিষ্ঠা। সরকারও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করেছে ফুটবলারদের। কিন্তু এরপর থেকে আমাদের ফুটবল চলে যেতে থাকে ক্রমাগত ‘অন্ধকারে।’
আসল কথা হলো, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে আর পেছনে যাওয়ার সুযোগ থাকে না; তখন এগোতেই হয় সামনে, যতো বাধাই আসুক। আমাদের ফুটবলের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার আগেই ফুট বলের পুনর্জাগরণের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। নানা উদ্যোগ চলছে ফুটবলকে টেনে তোলার। দর্শকরাও আস্তে আস্তে মাঠমুখী হচ্ছেন। দেশবাসী মেতে ওঠেছে বিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনায়। বিশ্বকাপের উত্তেজনাপূর্ণ খেলা দেখতে যেমন উন্মুখ এ দেশের সকল বয়সের মানুষ, তেমনি ঘরোয়া ফুটবল দেখার জন্যও তারা মাঠে যাবে। তবে সেই খেলা হতে হবে মানসম্পন্ন। আমাদের ফুটবলের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে যা যা করণীয়, তার সবই করতে হবে। আর যথাযথ পরিকল্পনা নিলে আমাদের ফুটবল একদিন বিশ্বমানে পৌঁছুবেই। বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনাকে ভিত্তি করেই নিতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ ফুটবলে এদেশের মানুষ ভিন দেশের পতাকা না উড়িয়ে নিজের প্রিয় মাতৃভূমির লাল সবুজ পতাকা নিয়ে মেতে উঠবে, সেই স্বপ্ন আমরা দেখি নিরন্তর। এবারের বিশ্বকাপের উত্তেজনায় যাতে কোন অনাকাক্সিক্ষত-অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেই প্রত্যাশাও আমাদের। সফল সুন্দর হোক বিশ্বকাপ ফুটবল উৎসব।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT