শিশু মেলা

আপুর বিয়ে

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৬-২০১৮ ইং ০১:৪৩:০৬ | সংবাদটি ৭৪ বার পঠিত

কাল আপুর বিয়ে। আজ গায়ে হলুদ। আঁখি অনেক কিছু ঠিক করে রেখেছে। আজ হলুদ শাড়ি পরবে। সেদিন আব্বু আড়ং থেকে একটা ছোট্ট হলুদ শাড়ি এনে ওয়াড্রবে রেখেছেন। সাথে ছোট্ট লাল ব্লাউজ ও লাল জুতো। মিনা, ছবি, সুনিয়া, ফাবু, আলিফা ওরা আজ বিকেলে আসবে। সবাই হলুদ শাড়ি পরবো, খুব মজা হবে। আঁখি চোখ বুঁজে ভাবে। একটা গায়ে হলুদের চিত্র মনে মনে একে ফেলে। আঁখি খালাতো বোনের বিয়েতে, মামাতো বোনের বিয়েতে ওভাবে হলুদ শাড়ি পরেছিল। আম্মু বলে ছিল ‘খুব সুন্দর লাগছে তোকে। আঁখি মনে মনে খুব খুশি হয়। এমনিতে তার গায়ের রং খুব ফর্সা। নাক-মুখও ছবির মতো সুন্দর। অনেকটা শিশু শিল্পী দিঘীর মতো। সাজলে এখনই যেন কনের মতোই মনে হয়। নিজের সৌন্দর্যে নিজেই অভিভূত। সাজগোজ করে স্যান্ডেল পায়ে সে চটর চটর হাঁটে। চুল কটা কপালে গড়িয়ে পড়লে হাত দিয়ে মাথার উপর দিয়ে নিয়ে আটকে রাখতে চেষ্টা করে। কিন্তু আটকে থাকে না। আবারও ফর্সা মুখের উপর এসে পড়ে। আঁখি আবারও চুল ঠিক করতে করতে হাঁটে। হাতে পরা রেশমী চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ ওকে যেন হাঁটায় তাল লয় ঠিক করে দেয়। কোন জড়তা নেই তার। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে ঝটপট উত্তর দেয়। লাজ রাঙা হয় না। যদিও হাসি হাসি মুখ তবুও হেসে হেসে কথা বলে না। কথা শেষ করে ছোট্ট করে হাসে তখন তাকে অপরূপ লাগে।
আঁখি আর সখি দুই বোন ওরা। ভাই নেই। সখি শ্যামলা আর আঁখি ফর্সা। এইচএসসি পাশ করার পর হতে একটার পর একটা প্রস্তাব আসছে আর যাচ্ছে। এ বছর সখি বিএ পরীক্ষা দিয়েছে। আর আঁখি ক্লাস ফাইভে। কয়েকদিন পর পর ঘটক মহিলারা আসে। এই প্রস্তাব ঐ প্রস্তাব দেয়। লোকজন আসে। সখিকে সাজিয়ে ওদের সামনে আনা হয়। বরাবরই এক কথা পরে জানাবো। আর জানায় না। আঁখি ভাবে আমার আপু শ্যামলা রঙ হলেও কতো সুন্দর। ডাগর আঁখি, দীর্ঘাঙ্গী, চলন-বলন কথনে কতো স্মার্ট। ওর হাঁটা ভারি সুন্দর। অনেকটা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। অবাক চোখে অনেক যুবককেই চেয়ে থাকতে দেখেছে আঁখি। কিন্তু কেন যে বিয়ে ঠিক হয় না বা ওকে বর পক্ষের পছন্দ হয় না, তা ভেবে কিনারা করতে পারে না আঁখি। এমনিতে অনেক সুন্দর সুন্দর ছেলে এখানে সেখানে ভিড় করে। কিন্তু আপুর বর যারা আসল তাদের একটিও আঁখির পছন্দ হয় না। কারো মাথায় চুল নেই। কেউ বেশি লম্বা আর কেউ আপু থেকে খাটো। কিন্তু সেদিন একজন লন্ডনী যুবক এসেছিল আপুকে দেখতে। তাকে আঁখির পছন্দ হয়েছিল। বেশ সুন্দর ছেলে। অতি দীর্ঘও নয় খাটোও নয়। আপুর সাথে বেশ মানাবে। কনে দেখে ওরা কিছু বলল না। চলে গেল। ঘটক মহিলা বলল ‘ওরা ফ্যামিলিতে বুঝে তারপর জানাবে। আঁখি মনে মনে অপেক্ষায় থাকে এই বুঝি ফোন করল। কিন্তু না আর ওদিক থেকে কোন ফোন এলো না। বরাবরের মতো আশা মিলিয়ে গেলো।
আঁখি সখির বাবা নূরুল সাহেব ব্যবসায়ী। মা সঞ্চিদা বেগম গৃহিনী। সংসারে ওরা সচ্ছলই বলতে হবে। অভাব নেই কোন কিছুর। আঁখি সখি যখন যা চায় তাই পূরণ করা হয়। ওর বাবা খুব ভালো লোক। আর ক’জন বাবা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। উনি আঁখি-সখিকে খুব ভালোবাসেন। সব সময় ওদের জন্য এটা ওটা নিয়ে আসবেন। প্রতি শুক্রবার পুরো পরিবার নিয়ে কোন না কোন দর্শনীয় স্থানে বেড়াতে যান তিনি। সব সময় আনন্দ ফুর্তিতে থাকেন। কিন্তু নিয়মিত নামায পড়েন তিনি। তার স্ত্রী সঞ্চিদা বেগমও ধর্ম-কর্ম করেন। প্রচুর টাকা পয়সার মালিক হলেও তিনি উগ্র স্বভাবের নয়। সব সময় তার মনে আল্লাহর ভয় কাজ করে। গরিব দুঃখীকে তিনি ভালোবাসেন। ছদকা খয়রাত করেন। আর দোয়া করেন দু’মেয়ের জন্য। আল্লাহ ছেলে দেননি, এতে তিনি অখুশি নন। দু’মেয়েই তার সংসারের আলো, দু নয়নের মনি। ওদের নিয়েই তার পৃথিবী। নূরুল সাহেব কখনও ছেলের অভাব বোধ করেন নি বা কোন দিন স্ত্রীকে এ বিষয়ে বলেনও নি। মেয়ে দুটো নিয়েই তিনি বেশ সুখি। ওরা সব সময় বাবাকে সেবা যতœ করে। ঘরে এসেই ডাক পাড়েন কইরে আঁখি সখি? কোথায় তোরা? ওরা একসাথে জবাব দেয় আসি বাবা।
ওরা দৌড়ে আসে। হাতের ব্যাগ-খরচপাতি আঁখি ধরে আর সখি গায়ের জামা-কাপড় খুলে দেয়। ওরা খুবই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসে। বাবার জামায় একটুও ঘামের গন্ধ পেলে উপায় নেই। বাবা তোমার জামায় ঘামের গন্ধ হয়ে গেছে। কাল এটা আর পরবে না। অন্য জামা বের করে দিয়ে সেটি লন্ড্রিতে পাঠায়। নূরুল সাহেব ওদের সংস্পর্শে খুব খুশি হন। ব্যবসার কাজ শেষ করেই চলে আসেন ঘরে। কোথাও গল্প গুজবে মাতেন না। তার ঘরে এলেই সুখ। খুব শান্তি পান তিনি। এ যেন তার নিজ হাতে গড়া সুখের স্বর্গ।
নূরুল সাহেব ইদানিং বেশ চিন্তিত আছেন মেয়ের বিয়ে নিয়ে। মানুষের উপর তার বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। তিনি যখন আঁখি সখির মাকে বিয়ে করেন তখন এরকম মহিলা ঘটকের বালাই ছিল না। গ্রামে গঞ্জে দু’একজন পুরুষ ঘটক ছিল। আর না হয় দাদা বাবা চাচা সম্পর্কের লোকেরাই ঘটকালি করে বিয়ে শাদি ঠিক করে দিতেন। কিন্তু এই সময়ে ব্যাপারটা হচ্ছে উল্টো। ডজন ডজন মহিলা ঘটক বাসা বাড়িতে ঢুকে বিবাহযোগ্য তরুণীদের খুজে বের করে এবং তাদের ঠিকানা সংগ্রহ করে। আর বিবাহযোগ্য পুরুষদের ঠিকানা বিক্রি করে। তার চোখে ঠিকানা বিক্রি একারণে যে, ছেলেদের ঠিকানা মেয়েদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েই হাত-খরচ গাড়ি ভাড়া ইত্যাদি বিষয়ে টাকা দাবী করে। একবার টাকা দিলেই সেরেছে। সপ্তাহ-দশ দিন পরপর একটার পর একটা ঠিকানা এনে দিবে আর খরচাপাতির দাবী তো আছেই। এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, সকাল নাই, দুপুর নাই, রাত নাই, যখন ইচ্ছা জোয়ান-বুড়ো লোক নিয়ে কনের বাড়িতে উপস্থিত। হাজির হয়েই মোবাইলের ওয়াটসআপ অপশনে ছেলের ছবি সহ বায়োডাটা দেখিয়েই খরচাপাতির দাবী ওঠে। নূরুল সাহেব ওদের দেয়া কয়েকটা ঠিকানায় যোগাযোগ করে দেখেন এই নামে কোন লোক নেই। থাকলেও অনেকের বিবাহ হয়ে গেছে। তাই কিছু দিন ধরে এই ঘটক মহিলাদের উপর এতোই চটেছেন যে, তিনি ঘরে বলে রাখেন ওদের যেন গেইট খুলে না দেয়া হয়। ৫০০/১০০০ করে অনেক টাকা তিনি ওদের দিয়েছেন। তারপর তার কোন দুঃখ ছিল না, যদি ওরা সঠিক তথ্য দিত। কিন্তু নূরুল সাহেবের কাছে এখন ওরা একটা জালিয়াত চক্র। ওদের কাছে পাত্র/পাত্রীর কোন অভাব নেই। লন্ডনী, আমেরিকান, কানাডিয়ান, সহ দেশী বিদেশী পাত্রের প্রোফাইল ওদের ওয়াটসআপে সংরক্ষিত। কবে কখন সংরক্ষণ করেছে কেউ বলতে পারে না। এই পুঁজি নিয়েই ওদের মিথ্যার বেসাতি। বিয়ে শাদির কথা মুখ থেকে বের করার সাথে সাথেই টাকার ডিমান্ড-লন্ডনী জামাই এক লক্ষ, কানাডিয়ান বা আমেরিকান হলে দুই লক্ষ টাকা কনে পক্ষ ঘটকদের দিতে হবে। তবেই না এ রকম উন্নত দেশের বাসিন্দা স্বামীর খোজ পাওয়া যায়। নূরুল সাহেব ওদের বললেন দেখো আমার টাকা আছে। টাকার জন্য চিন্তা কর না। যদি এ রকম জামাই যোগাড় করে বিয়ে সংঘটিত হয় তবে তখনই তোমরা টাকা পাবে। আর এখন এভাবে পথ খরচা হাত খরচা দিতে পারবো না। কিন্তু ঘটকরা এতে রাজি হয় না। বলে আমাদের নিজেদের খেয়ে আপনার মেয়ের জন্য জামাই খুঁজব? নূরুল সাহেবের রাগ মাথায় ওঠে। কিন্তু নিজেকে সংবরণ করে বলেন আচ্ছা আপাতত আপনারা আমার মেয়ের বিষয় স্থগিত রাখেন। পরে দেখা হবে। আমার মেয়ে লেখাপড়া শেষ করুক।
নূরুল সাহেবের এক বন্ধুর ছেলের সাথে সখির বিয়ে ঠিক হয়েছে। বিশিষ্ট রাজনীতিবীদ আসলাম সাহেব সেদিন ফোন করে নূরুল সাহেবকে বললেনÑ কেমন আছেন নূরুল সাহেব?
Ñভালোই আছি। আপনি কেমন আসলাম সাহেব? অনেক দিন ধরে কথাবার্তা হয় না। আমি ব্যবসার কাজে ব্যস্ততার কারণে ফোন করতে পারিনি। তা কী মনে করে ফোন করলেন? কোন কাজ না এমনি এমনি?
Ñহ্যাঁ কাজ তো একটা আছে। কাজেই ফোন করেছি। না হলে এমন রাজনৈতিক যে পরিস্থিতি, তাতে কি আর সময় বের করে ফোন করা যায়? সব সময় একটা না একটা টেনশন কাজ করছে। দেখ না ৮ তারিখে খালেদা জিয়াকে জেলে ঢুকালো? এখন আইনী জটিলতায় কারণে তাঁকে বের করা যাচ্ছে না। এদিকে আমরা আমাদের নানামুখী অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং সরকারের হার্ডলাইনের কারণে কোন আন্দোলন গজিয়ে তুলতে পারছি না। যে কারণে দেশনেত্রীকে সহসাই মুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে আমাদের ঘন ঘন মিটিংয়ে বসতে হচ্ছে। সময় পাচ্ছি না। তাই ফোন করাও হয়নি। সে যাকÑ এখন কাজের কথায় আসি। আপনি বাহুবলের বাবলা ভাইকে চেনেন?
Ñকোন বাবলা? ঐ যে থাই এ্যালুমিনিয়ামের ব্যবসা করে শাহপরাণ গেটে?
Ñহ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন।
Ñওতো আমার বাল্যবন্ধু।
Ñচিনতে পারছেন তাহলে?
Ñহ্যাঁ, চিনতে পারছি। তো তার কি হয়েছে?
Ñউনার কিছু হয়নি। উনার ছেলে একটা বিদেশ থেকে আসছে। ডুবাইতে থাকে। সেখানে ব্যবসা করে। এইচএসপি পাশ করে চলে গিয়েছিল মিডলইস্ট। বাবলা ভাই বলছিল একটা পাত্রী দেখতে। হঠাৎ করে আপনার কথা মনে পড়ল। তাই ভাবলাম আপনাকে একটা ফোন দেই। আমার সখি মা কেমন আছে? ভালো আছেতো।
Ñহ্যাঁ, ভালই আছে। আচ্ছা ওর ছেলে তো আমার চেনা জানা। তাছাড়া ও আমার বাল্যবন্ধু। একসাথে একই স্কুলে লেখাপড়া করেছি। কাজেই ও যদি রাজি থাকে তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই। আপনি আসতে পারেন।
Ñআচ্ছা। পরে কথা হবে। এখন রাখছি।
বিষয়টি নিয়ে নূরুল সাহেব স্ত্রীর সাথে আলাপ করলেন। তিনি বললেন ভালইতো। ছেলে এইচএসসি পাশ হলেও দেখতে সুন্দর। বিদেশে ভাল আয় রোজগার করছে। বাসা-বাড়ি নিজস্ব, ফ্যামেলিও ছিমছাম। উনাদের দুই ছেলে। ছোটটা লেখাপড়া করছে। আর বাবলা ভাইয়ের স্ত্রী তো অমায়িক মানুষ। সেবার যে গেলাম। কতো আদর আপ্যায়ন করলেন। কী সুন্দর ব্যবহার। মনে হয় সব সময় কাছাকাছি থেকে গল্প গুজব করি। আমার মনে হয় খুব ভাল হবে। যদি ওরা আগায় তাহলে শিক্ষার বিষয়টি না হয় একটু কমই হল। অন্যান্য দিক বিবেচনায় আমাদের সখি সুখেই থাকবে।
আসলাম সাহেবের মধ্যস্থতায় একদিন বাবলা সাহেব তার স্ত্রী ও ছেলেরা নূরুল সাহেবের বাসায় এলেন। নূরুল সাহেব আসলাম সাহেবকেও দাওয়াত দিতে ভুললেন না। সেদিন শুক্রবার, আসলাম সাহেবের কোনো মিটিং না থাকায় তিনিও দাওয়াতে এলেন। সেই ফাঁকে বর কনেকে আর কনে বরকে দেখে ফেললেন। বিদেশ ফেরত কামরুল হোসেন আড় চোখে বার বার সখিকে দেখতে লাগল। হ্যাঁ, এরকমই মেয়ে চাই। ও যেন শান্ত দিঘীর জল। ডাগর চোখে যখন তাকায়, যেন শান্তির বাণীই ঝরে। ওই চেহারায়, ভরসা রাখা যায়, বিশ্বাস করা যায়! ঘন কালো চুলের আবছা-আধারে শ্যামল মায়ার সুন্দর চাহনি সত্যিই অপূর্ব। কামরুল হোসেন একটু ভাবুক প্রকৃতির। ওর পছন্দ একটু ভিন্ন। শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যই তার কাছে বড় নয়। গায়ের রঙ চকচকে, কিন্তু নাক থ্যাবড়া, চলন-বলনে, আর্ট নেই। এ রকম, মেয়ে তার পছন্দ নয়। গায়ের রং একটু কম হলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু উচ্চতা, চলাফেরা, বাচনভঙ্গি, ঘন চুল সব মিলিয়ে বাঙালি শ্যামলিমার ঢংয়ে চলা শান্ত সুবোধ মেয়েই ওর পছন্দ। আজ সখিকে দেখেই চোখ জুড়িয়ে গেল তার। ঠিক আছে আর মেয়ে দেখার দরকার নেই। একেই বিয়ে করবে সে। এদিকে সখিও কম যায় না। বার বার পর্দার আড়াল থেকে দেখে কামরুলকে। হ্যাঁ, ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোক। অধিক স্বাস্থ্যও নয় আবার বেশ হালকাও নয়। উচ্চতার সাথে মানানসই স্বাস্থ্য। মাথা ভর্তি চুল। বুদ্ধিদীপ্ত দু’টি চোখ। পৌরুষদীপ্ত চেহারা। ঠিকই আছে। আর বেশি পছন্দের দরকার নেই। যদি ওদের পছন্দ হয় তাহলে আপত্তি করবে না সে। মনে মনে ঠিক করে রাখে।
আঁখি কোত্থেকে দৌড়ে এল। সখিকে একটা চিমটি কেটে বলল কী? পছন্দ হয়েছে? সখি ওকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে প্রশ্ন করে তোর কি পছন্দ হয়েছে? আঁখি বলেÑ ওমা বিয়ে বসতি তুই, আর পছন্দ করব আমি? তারপরও বলিÑ আমার পছন্দ হয়েছে। আপু প্লিজ তুই অমত করিস না। সখি মনে মনে যদিও পছন্দ হয়েছে তথাপি মুখে বলল না পছন্দ নয়, কেমন বোকা বোকা লাগছে। আঁখি আস্তে করে একটা চিমটি কেটে বলল ইস ঢংয়ে আর বাঁচিনা। চোখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে তুই খুব খুশি। বলেই চলে গেলো সে।
খানা পিনার পর আসলাম সাহেব কথা উঠালেন। তিনি বললেন ‘নূরুল সাহেব আপনি যেমন আমার পুরাতন চেনাজানা বন্ধু উনিও আমার খুবই ঘনিষ্ঠজন। কাজেই আশা করি উভয়পক্ষ আমার কথাটা রাখবেন। আমি চাই আপনার মেয়ে সখির সাথে বাবলা সাহেবের ছেলে কামরুলের বিবাহ দিতে। আপনারা কি বলেন? প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আসলাম সাহেব। সঞ্চিদা ও রুমানা (বাবলা সাহেবের স্ত্রী) মুখ চাওয়া চাওয়ি করে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তবে উভয়েরই মুখে সৌজন্যের হাসি। বাবলা সাহেব হঠাৎ বলে উঠলেন আসলাম ভাই আপনার কথায় আমি খুব খুশি হয়েছি। আমি চাই সখি মাকে আমার পুত্রবধূ করতে। অবশ্য যদি নূরুলের কোন আপত্তি না থাকে। নূরুল সাহেব একটু সময় নিয়ে বললেন ‘তুই আমার মেয়েকে তোর ছেলের জন্য পছন্দ করছিস আর আমি না করবো এটা ভাবলে কি করে? আসলাম ভাই আপনিই দিন তারিখ ঠিক করে দেন। ছেলেরও ছুটির দিন চলে যাচ্ছে। তাই যতো সম্ভব তাড়াতাড়ি বিয়েটা হয়ে যাক।
ফাগুনের একুশ তারিখ ধার্য্য হলো কামরুল আর সখির বিবাহের দিন। এর আগের দিন আঁখি ও তার মামাতো, খালাতো, চাচাতো, ফুফাতো বোনদের সাথে হলুদ শাড়ি পরেছে। মেহেদী অনুষ্ঠানে গান বাজছে। হলদে পাখির দল সেদিন সন্ধ্যায় মিলিত হয়েছে সেখানে। যেন এক সর্ষে ফুলের বাগান সেখানে। যেদিকেই তাকাও হলদে পাখির দল ছুটোছুটি করছে। একে একে মুরুব্বিরা গায়ে হলুদ দিয়ে চলে যাচ্ছেন আর সিরিয়েল আসছে কাঁচা ফুলের পাপড়ি সম কিশোরী যুবতীদের। গানে গানে মুখরিত সে অনুষ্ঠানে কি মিষ্টি খাওয়া-খাওয়ি, হাঁসা-হাঁসি, ঢলাঢলি। আখিও এরকমই একটা অনুষ্ঠানের অপেক্ষায় ছিল দীর্ঘ দিন থেকে। আজ সে আশা পূর্ণতা পেল।
পরদিন দুপুর হতে না হতে সবাই ছুটছে সিলেটের অভিজাত কমিউনিটি সেন্টারে। আত্মীয় স্বজন বন্ধু-বান্ধব কেউ অবশিষ্ট রইল না। সবাই এল সখির বিয়েতে। ধুমধামে খাওয়া দাওয়া, বিয়ের অনুষ্ঠান সবই হলো। কনের সাথে আঁখি চড়ল বিয়ের গাড়ি। হ্যাঁ, দুলাভাইয়ের এলিয়ন গাড়িতে করে দু’বোন চলল বাহুবল আবাসিক এলাকায়। আপুর শশুর বাড়ি। রাতে আঁখির ঘুম হলো না। কারণ আপু আজ তার সাথে ঘুমায়নি। কোথায় গেল আপু। হ্যাঁ, আপু তার নিজের ঘরে চলে গেছে। পরদিন হতে আঁখি রোজ রোজ একা শুতে যায়। আপুর অভাব বুঝে সে। যে আপু চুল বেনী করে দিত, গল্প শোনাত- রাক্ষস খোক্কসের গল্প, কাঞ্চন মালার গল্প, ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে ঘুম পাড়াত। আজ সবই যেন ফাঁকা মনে হয়। আঁখি মাকে কিছু বলে না। শুধু মন মরা হয়ে থাকে। যে আপুকে বিয়ে দেয়ার জন্য কতো না আকুতি। কতনা দোয়া করেছে সে-আল্লাহ একটা ভালো বর মিলিয়ে দাও। আজ ওকে ভিন্ন ঘরে ঠেলে দিয়ে আঁখি একা হয়ে গেল। বড় একা। দু’বোন সব সময় ঝগড়া আর খুনসুটিতে লেগে থাকত। আজ আপুর অনুপস্থিতি ওকে পীড়া দেয়। মনের অজান্তে দু গাল বেয়ে অশ্রু নামে। আনন্দাশ্রু। আমার আপুর বিয়ে হয়েছে... বিয়ে...। আপু সুখি হবে। অনেক সুখি...।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT