বিশেষ সংখ্যা

ঈদুল ফিতর : তাৎপর্য ও শিক্ষা

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৬-২০১৮ ইং ০১:৫৪:০৬ | সংবাদটি ৯৬ বার পঠিত

‘ঈদ’ আরবী শব্দ। এর মানে খুশি, আনন্দ। ‘ফিতর’ আরবী শব্দ। এর মানে ভঙ্গ করা, ভেঙ্গে টুকরা টুকরা করা। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর পবিত্র শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে রোজা ভেঙ্গে যে আনন্দ উৎসব পালন করা হয় তাকে ‘ঈদুল ফিতর’ বলে। আবার কারো কারো মতে ‘ফিতর’ শব্দ ফিতরা থেকে এসেছে। এই দিনে ধনী ব্যক্তিরা গরীবদেরকে ফিতরা দিয়ে তাদেরকে ঈদের আনন্দে শরীক করেন বলে এই দিনকে ‘ঈদুল ফিতর’ বলে, আবার কারো কারো মতে-দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর রোজাদারগণ ঈদগাহে নামাজের জন্য এলে আল্লাহ পাক রোজাদারগণকে একবাক্যে ক্ষমা ঘোষণা করেন। এই ক্ষমা প্রাপ্তিটাই হচ্ছে মহানন্দের। আর এটাই হচ্ছে-রোজাদারদের জন্য বড় প্রাপ্তি। যেহেতু রোজাদারগণ ঈদুল ফিতরের দিন আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা পেয়ে থাকেন। আর এটাই তাদের বড় পুরস্কার, শাওয়ালের পহেলা তারিখে রোজাদারগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘পুরস্কার’ লাভ করেন বলে এই দিনকে ‘ঈদ’ বলা হয়েছে। যেহেতু পুরস্কার পেয়ে রোজাদারগণ আনন্দিত হয় তাই আনন্দের এই দিনকে ‘ঈদ’ বলা হয়েছে। প্রতি বছর ঘুরে আসে এই আনন্দের দিন। ঈদুল ফিতর আনন্দের দিন। ইহা সর্বজনীন উৎসব।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম, হযরত আউস আনসারী (রা:) বলেন, রাসুর (সা:) ইরশাদ করেছেন-ঈদুল ফিতরের দিন সকালে সকল ফেরেস্তা রাস্তায় দাঁড়িয়ে যান এবং মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন, হে মুসলিমগণ! তোমরা দয়ালু প্রতিপালকের দিকে এগিয়ে এস। উত্তম প্রতিদান ও বিশাল সওয়াব প্রাপ্তির জন্য এগিয়ে এস। তোমাদের রাত্রিবেলার নামাজের নির্দেশ দেয়া হলে তোমরা সে নির্দেশ মেনে নামাজ পড়েছ। তোমাদের দিনগুলোতে রোজা রাখতে বলা হলে তোমরা সে নির্দেশও পালন করেছ। এক মাস রোজা রেখেছ। গরীব-দুঃখীদের পানাহারের মাধ্যমে নিজ প্রতিপালককে তোমরা পানাহার করিয়েছ। এখন নামাজ পড়ার মাধ্যমে এগুলোর প্রতিদান ও পুরস্কার গ্রহণ কর ঈদের নামাজ পড়ার পর ফেরেস্তাগণের মধ্যে একজন ঘোষণা দেন, শোন নামাজ আদায়কারীরা, তোমাদেরকে মহান আল্লাহপাক ক্ষমা করে দিয়েছেন, সকল গুনাহ থেকে মুক্ত অবস্থায় নিজ নিজ আবাসে ফিরে যাও। আর শোন, এই দিনটি হচ্ছে পুরস্কার প্রদানের দিন। আকাশে এই দিনের (ঈদুল ফিতরের দিনের) নামকরণ করা হয়েছে ‘পুরস্কারের দিন’। (তাবরাণী)। হযরত আবু উমামা (রা:) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা:) ইরশাদ করেন-যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে সারারাত ইবাদতে মশগুল থাকবে, তার অন্তর সেদিন জিন্দা থাকবে, যেদিন অন্যদের অন্তর মরে যাবে (আল আযকার-ইমাম নবনী (র:)। এভাবে অগণিত হাদীসে ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য বর্ণনা করা হয়েছে। ঈদুল ফিতরের ফজিলত সম্পর্কে হযরত আনাস (রা.) বর্ণিত একখানা হাদীসে রাসুল (সা:) ইরশাদ করেন-শবে কদরে জিব্রাইল (আ:) একদল ফেরেস্তাসহ অবতরণ করেন। তাঁরা এমন প্রত্যেক বান্দার জন্য রহমতের দোয়া করেন, যে দাঁড়িয়ে ও বসে আল্লাহর জিকির করতে থাকে। এরপর ঈদের দিন আল্লাহতায়ালা ফেরেস্তাদের সামনে গর্ব করে বলেন-ফেরেস্তাগণ! বলো সেই মজুরের কি প্রতিদান হবে, যে তার কাজ পূর্ণ করেছে? তখন ফেরেস্তাগণ আরজ করবে-হে আল্লাহ! তার প্রতিদান হচ্ছে তাকে পুরোপুরি বদলা দেয়া। আল্লাহ বলেন-হে ফেরেস্তাগণ আমার বান্দাগণ তাদের অপরিহার্য কর্তব্য পূর্ণ করেছে। অর্থাৎ রোজা পালন করেছে। এখন কাকুতি-মিনতি সহকারে দোয়া করার জন্য (ঈদের নামাজে) বের হয়েছে। আমার ইজ্জতের কসম! আমি অবশ্যই তাদের দোয়া কবুল করবো। এরপর বান্দাহদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন-আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করলাম এবং তোমাদের অসৎ কর্মসমূহকে সৎকর্মে রূপান্তরিত করলাম। এরপর বান্দারা ঈদগাহ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্ত অবস্থায় গৃহে ফিরে যায় (বায়হাকী)।
ঈদ উৎসব একান্তই সর্বজনীন। এই উৎসব সকলের জন্য বয়ে আনে অনাবিল আনন্দ। গরীব-দুঃখীরা যাতে এই আনন্দ উপভোগ করতে পারে সেজন্য ধনীদেরকে ঈদের নামাজের পূর্বে ফিতরা আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল (সা.) রোজাকে অনর্থক ও অশালীন কথার গুনাহ থেকে পবিত্র করার জন্য এবং নিঃস্বদের মুখে খাবার দেয়ার জন্য সদকায়ে ফিতর নির্ধারণ করেছেন (মিশকাত)। অন্য হাদীসে রাসুল (সা:) ইরশাদ করেন-তোমাদের মধ্যে যে ধনাঢ্য ব্যক্তি তার (ফিতরার) দ্বারা আল্লাহ তাকে পবিত্র করেন। আর যে কেউ গরীবকে যা কিছু দান করে আল্লাহ তাকে তদপেক্ষা অনেক বেশি দান করেন। (আবু দাউদ)
ঈদ বলতে আমরা আনন্দ ছাড়া আর কিছুই বুঝিনা। তবে সেই আনন্দের নামে আমাদের সমাজে যে বিলাসিতা, অকারণ জৌলুস, অপব্যয়, নগ্নতা ও বেহায়াপনা চলে তা কোনোক্রমেই মেনে নেয়া যায়না। খেল-তামাশা করা, সুন্দর পোশাকে সুসজ্জিত হওয়া, যৌন সুড়সুড়িমূলক গান শোনা, নায়ক-নায়িকাদের উলঙ্গ দেহে নৃত্য দেখতে পারলেই অনেকে তাদের ঈদ সার্থক হয়েছে বলে মনে করেন। আসলে ঈদের নামে শুধু খেল-তামাশা করা, নগ্ন ছবি প্রদর্শন করাই হচ্ছে বিধর্মী জ্ঞান পাপীদের কালচার। এটা প্রকৃত মুসলমানের কালচার হতে পারে না। ঈদ উৎসবের সূচনার ইতিহাস হচ্ছে এই-‘নবী করিম (সা:) হিজরতের পর মদীনায় এসে দেখলেন তারা (নওরোজ ও মেহেরজান নামক) দু’দিন খেল-তামাশার মাধ্যমে উৎসব পালন করছে। নবী করিম জিজ্ঞাসা করলেন-তোমরা এ দুদিনে কি কর? তারা বলল-জাহেলী যুগ থেকে আমরা এ দু’দিন খেল-তামাশা করে উৎসব পালন করি। নবী করিম (সা:) বললেন-এ দু’দিনের পরিবর্তে উত্তম দুটি উৎসব আল্লাহ তোমাদের দান করেছেন। একটি হচ্ছে ‘ঈদুল আজহা’, অপরটি হচ্ছে ‘ঈদুল ফিতর’। উক্ত আলোচনা থেকে দিবালোকের ন্যায় এটাই প্রমাণ হল যে, জাহেলী যুগে তাদের উৎসব উপলক্ষে তারা কেবল খেল-তামাশাই করতো। নবী করিম (সা:)-এর চরম বিরোধীতা করলেন এবং ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা নামের দুটি উত্তম উৎসবের কথা ঘোষণা করলেন। যে উৎসবে কোনো নগ্নতা নেই, বেহায়াপনা নেই, খেল-তামাশাও নেই। মুসলমানের ঈদে-উৎসবে নেই কোনো নগ্নতা, নেই কোনো বেহায়াপনা। মুসলমানদের ঈদ হবে তাদের ইতিহাসের আলোকে ও ঐতিহ্যের আলোকে। মুসলমানদের ঈদ হবে ইবাদত, রিয়াজত ত্যাগের মাধ্যমে। সর্বোপরি আনন্দের মধ্য দিয়েই ঈদ উদযাপন হবে।
ঈদের আগমনই ঘটে শান্তির বার্তা নিয়ে আনন্দের বার্তা নিয়ে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে আমাদের এ আনন্দ উপভোগ ব্যাহত হয়। ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন পত্রিকা বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে থাকে। যাতে শুধু নায়ক-নায়িকার নগ্ন ছবি, অবৈধ প্রেম কাহিনীর বর্ণনা থাকে। এসব শুধু আমাদের মনকে কলুষিত করেনা; বরং চরিত্র ধ্বংস করে আমাদের যুব সমাজের। ইহা মোটেই কাম্য নয়। এসব অশ্লীলতার বিরুদ্ধে আমাদেরকে অবশ্যই রুখে দাঁড়াতে হবে।
ঈদ আমাদের আনন্দের উৎসব। আমাদের সকলকে ঈদের তাৎপর্য বুঝতে হবে। ঈদের নামে অশ্লীলতায় জড়িয়ে পড়া উচিত নয়। শরীয়ত সম্মতভাবে আমাদের সকলকে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT