বিশেষ সংখ্যা

কাছে-দূরে

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৬-২০১৮ ইং ০১:৫৪:৩৮ | সংবাদটি ৪৮ বার পঠিত

‘আর হাঁটতে পারছি না পরাগ, এবার একটা রিক্সা দেখো’-কথাগুলো বলে আশপাশে তাকালো সেঁওতি। পরাগ কিছু না বলে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে জ্বালিয়ে নিয়ে ধোঁয়া টানতে টানতে হাঁটছে আর বলছে-বুঝলে সেঁওতি, আজকাল রিক্সা ওয়ালারাও স্মার্ট অইয়া গেছে। ওরা রাস্তায় ইয়াং ছেলেদের সাথে যদি কোনো মেয়ে দেখে তাহলে ভাড়া বেশি দাবি করে। আমার মতো ওভারস্মার্ট ছেলেরা তাই তাগো গার্লফ্রেন্ডদের নিয়া হাঁইটাই যায়। এছাড়া তো কোনো উপায় নাই! বেকার মানুষ করবে কি? বাসা থেকে মা, বাবা অথবা বড় ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু টাকা আইন্যা একটু রিলাক্স মুড়ে থাকার জন্য গার্লফ্রেন্ড নিয়া ঘুরতে বেরোয়। পথে এই শালা রিক্সা ওয়ালারা সেই টাকায় ভাগ বসায়। কৌশলে নিয়া যায় অর্ধেক টাকা। কিন্তু সারা জীবনেও তার গরিবী যায় না। চার/পাঁচ মাস পরে ঠিক একই রাস্তায় সে-ই রিক্সা ওয়ালাকে তুমি দেখবে পচা জামাটা গায়ে নিয়া দাঁড়িয়ে আছে। লোকজন দেখলে বলছে-
‘যাইবেন কই’?
-যাইবো তার বাপের মাথায়। হাঁটো সেঁওতি, হাঁটো।
-হাঁটবো তো মিয়া কিপ্টা। সেঁওতি বললো।
-মোরে তুমি কিপ্টা কইওনা সেঁওতি, মুড় অফ অইয়া যায়। কারো মুড অফকরণ ভালা না। যত পারো মাইনষের মুড অন রাখনের চেষ্টা করবা। পৃথিবীতে মুড অফ আর মুড অন-এর খেলা এখন চলছে। কিছু মন্দ মানুষ ইচ্ছা করেই তাঁর আশপাশের মাইনষের মুড অফ করে রাখে। আর তাঁর নিজের মুড অন করে রাখে। খায়, স্ফুর্তি করে। তাঁর পাশের মানুষগুলো বইয়া বইয়া দেখে। কেউ কাঁদে, কেউবা কাঁদতেও পারে না। একেবারে পাথর অইয়া যায়। তবে শেষ পর্যন্ত নিয়তি মুড অফ লোকগুলোর পক্ষ নেয়। পানিশম্যান্ট দেয় মুড অন মানুষ যে তাঁরে। বলবে কিভাবে?
নানাভাবে দেয়, শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক সবদিক থেকে নিয়তি এদের পানিশম্যান্ট দেয়। আর মুড অফ মানুষগুলো বেঁচে থাকলে তখন বিরল হাসি হাসে।
-বিরল কেন? সেঁওতি’র প্রশ্ন।
-বিরল এই জন্য যে, একটা মানুষ প্যাঁচার মতো হয়ে যায় দুঃখ পাইতে পাইতে। আর সেই মানুষটা যখন দেখে যে তাঁরে পাথর বানিয়েছে, প্যাঁচার মতো তাকিয়ে থাকতে দিয়েছে, সে-ই শত্রু লোকটা হাসপাতালে আর বাড়িতে দৌঁড়াচ্ছে তখন সে আর পাথর থাকেনা। হাসে। আর এই হাসিকে বিরল হাসি বলে।
-পরাগ তুমি এতো ব্রিলিয়ান্ট। ভার্সিটি খোলার পর বান্ধবীদের নিয়া তোমারে দেখামো। এখন চলো হাঁইটাই রমনা পার্কে যাই।
সেঁওতি বললো।
-ঠিক আছে গো জান!
-জান না মিয়া ফান, হালার পুত। তোমারে লুইট্ট্যা খাওনের লাইগ্যা আমি তোমার লগে ফ্রেন্ডশীপ করছি। তুমি বেকার অইলেও তোমার বাবার মাল আছে। রিয়েল ফ্রেন্ডশীপ আমি কার লগে করুম তা এখনও ঠিক করি নাই। সেঁওতি বির বির করে বললো।
-আমারে কিছু কইতাছো সেঁওতি?
-না গো না। আমি বিদেশী রক গান গাইতাছি।
-রক কেন গাইবা সেঁওতি? বাংলা ফোক গান গাও।
-আচ্ছা ঠিক আছে তাইলে শোন
-‘কইলজার ভিতর গাঁথি রাইখুম তোয়ারে। শিনার লগে বান্ধি রাইখুম তোয়ারে ও ননাইরে। তুই হইলে মোর মধুর বাঁশি মনেরও আশা, তোয়ারে ছাড়া খোন্ডে ফাইমু ভালোবাসা। নিশি জাগি গান শুনাইমু তোয়ারে ও ননাইরে। কইলজার ভিতর গাঁথি রাইখুম তোয়ারে।
-ওহ্ সেঁওতি দারুন গান শোনাইলা! দারুণ! এই নাও এক হাজার টাকা। তোমার বকশিশ। সকালে বড় ভাইয়ার কাছ থেকে চাকরির ইন্টারভিউ’র খরচের কথা কইয়া পনেরশ’ টাকা আনছিলাম। পকেটে রইছে পাঁচশ টাকা। রমনা পার্কে গিয়া বাদাম খাইয়া রসের আলাপ করুম। এই তো আর বেশি দূরে নয়, আইয়া পড়ছি।
দুই.
বাদাম লাগবো স্যার? হালকা-পাতলা গড়নের ষোল বছরের একটা ছেলে এসে পরাগকে বললো। পঞ্চাশ টাকার দিয়া দে তোর ম্যাডামরে। হেয় খাইলে আমি শান্তি পাই।
-স্যার শান্তি পরে পাইবেন কিনা বুঝলেন ক্যামনে? মাইয়্যারা তো বড় জটিল। এ গো রে বুঝোন অতো সোজা না।
-মানে? পরাগ বললো।
-ঠিক আমনের মতো একটা লোক একটা মাইয়্যারে লইয়া রোজ পার্কে আইস্যা গল্প করতো। আমার কাছ থাইক্যা পঞ্চাশ ট্যাকার বাদাম কিনতো। মুই পেরায় এক বছর ওগোরে বাদাম খাওয়াইছি। লাভ আমার অইছে। লোকটার লাভ কিছুই অয় নাই। হেই মাইয়্যাডা এখন অন্য একটা পোলার লগে ফেরেন্ডশীপ করছে। এই ছ্যাঁকা সইতে না পাইরা লোকটা পাত্থর অইয়া গ্যাছে। হাসেও না, কাঁদেও না। ময়লা জামা-কাপড় পইরা রোজ রমনা পার্কে আইয়া বইয়া রয়। মোর লগে দুই-একটা কথা কয়। কথা কওনের সময় লোকটার মুখ থাইক্যা খালি বাজে গন্ধ বাইর অয়। মুই কতোদিন কইছি, স্যার আমনে ম্যাজিক টুথ পাওডার দিয়া দাঁত মাজবেন। দেখবেন গন্ধ-টন্ধ সব হাওয়া অইয়া গ্যাছে। লোকটা হুনে নাই। হয়তো দেবদাস অইবার ছায়। আমনে সাবধানে তাইক্যান স্যার। দেবদাস গো সিনারি দেখতে দেখতে মুই রাইতে ভাত খাওনের পর যখন ঘুমাইতে যাই তখন খালি কান্দি। মাইনষে কেন এতো স্বার্থপর অয় স্যার?
-অয় লাভের আশায়। এই নে পঞ্চাশ টাকা তুইও লাভের ধান্দায় ঘুরতে থাক। পরাগ বললো।
-যাইতাছি স্যার, যাইতাছি। ‘পিরিত রতনা, পিরিত যতন, পিরিত গলার হার, পিরিত কাঞ্চন যেজন পাইছে সফল জনম তার গো, দুনিয়া পিরিতের বাজার।’ গাইতে গাইতে বাদামওয়ালা ছেলেটা চলে গেলো।
তিন.
মাত্র তিন মাস পর এক সকালে বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পরাগ নিজেকে প্রশ্ন করলো-‘তুই না এক সময় ভার্সিটির সেরা ছাত্র ছিলে পরাগ? আর একটা মেয়ে সেঁওতি তোরে তিনটা মাস বোকা বানাইয়া সব লইয়া গেলো। তুই কিছুই বুঝবার পারলি না! বাদাম বিক্রেতা একটা ছেলে তোরে সাবধান করলো। তুই বুঝলি না ক্যান পরাগ? এতো বোকা তুই অইলি ক্যামনে? কথাগুলো বলে পরাগ এক সময় শিশুদের মতো কাঁদতে লাগলো। ট্যাপের ঝরঝর পানির শব্দে কেউ তাঁর কান্না শুনতে পেলো না।
চার.
রমনা পার্কের সে-ই জায়গাটায় সেঁওতি সাঁতারের হাত ধরে বসে আছে। বাদাম ওয়ালা ছেলেটা কাছে এসে বললো-
‘ম্যাডাম, আগের স্যার কই’?
-জানি না। টাইম পাইনা পচা
-মচার খবর রাখনের।
-জানো না মানে! সেঁওতি বাদাম ওয়ালা ছেলেটা এইসব কি বলছে?
-ঠিকই বলছে। পরাগ নামের একটা ছেলের লগে এক সময় আমার ফ্রেন্ডশীপ ছিলো। বর্তমানে সে অতীত। তুমিই বর্তমান সাঁতার। এখন তুমিই আমার সব।
-পরাগ বর্তমানে তোমার জীবনে নাই ক্যান?
-এই শালা দিল দরিয়া। তয় সমস্যা অইলো শালার শইল্যের দুর্গন্ধে মুই পাশে বইয়া গল্প করতে পারিনা। যে ছেলের শইল্যের গন্ধে পাশে বওন যায় না। বিয়ার পর হেই ছেলের পাশে রাইতে শুইয়া থাকুম ক্যামনে? মাথার বেরেন নষ্ট অইয়া যাইবো। অথবা মেজাজ খিট খিটে থাকবো। এই সমস্ত ব্যাপার চিন্তা কইর‌্যা শালারে আউট করলাম। মুই বড় হিসাবি মাইয়্যা। তোমার টেনশনের কিচ্ছু নাই। পরাগ রে শিনার লগে বান্ধি রাখতে পারি নাই। কারণ, গন্ধ! তোমার শইল্যে গন্ধ নাই। তোমারে কইলজার ভিতর গাঁথি রাখুম। শিনার লগে বান্ধি রাখুম। সময় নষ্ট না কইর‌্যা ছলো আইজ বিয়ার কাম সাইর‌্যা ফালাই। প্লাস-মায়নাস, টাকা-পয়সা যা লাগে সব আমি ব্যবস্থা করুম। চলো।
-সেঁওতি, আমার বিশ্বাস অইতেছে না। তুমি এতো ভালো ক্যামনে অইলা! আমার মতো ফকিরের পোলারে তুমি নিজের খরচে বিয়া করবার চাইতেছো। আর পরাগ ...
-শালার গন্ধে সব খাইছে। চলো মিয়া। সেঁওতি সাঁতারের হাত ধরে চলে যাইতেছে। বাদাম ওয়ালা ছেলেটা মুখ টিপে হাসছে। আর পার্কের ঝোঁপে বসে সে-ই ছ্যাঁকা খাওয়া পাত্থর হয়ে যাওয়া লোকটাও গাইছে-
-কত খেলা জানো গো
মওলা, কত খেলা জানো!
গলায় দিয়া প্রেমের ফাঁসি
আস্তে-ধীরে টানো রে।
রঙ্গিলা ভান্ডারি মওলা রে!
আমার রঙ্গিলা ভান্ডারি
মওলা রে ....

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT