বিশেষ সংখ্যা

ঈদুল ফিতর আস্সালাম

এডভোকেট কয়ছর আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৬-২০১৮ ইং ০১:৫৬:৩৯ | সংবাদটি ২১ বার পঠিত

মুমিনরা প্রভুর আদেশে আদিষ্ট হয়ে রমজান মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা, দান খয়রাত এবাদত বন্দেগী দ্বারা তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণের পর একটি আনন্দ ও আধ্যাত্মিক উৎসব হলো ঈদুল ফিতর। আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য যে রমজান তারই মহামিলন এ ঈদ। ‘আহলান সাহলান, মাহে রমজান’ দিয়ে যার শুভাগমন, আল বিদা দিয়ে ১১ মাসের জন্য বিদায় জানানো হয়। এ বিদায়ে মনবেদনা আসলেও, ঈদুল ফিতরের আনন্দের হাতছানি পুলকিত করে তুলে। ঈদ হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর সর্বজনীন, ঈদ উৎসব অনন্য, আনন্দ অসাধারণ এর তাৎপর্য সুদুর প্রসারী।
শব্দগতভাবে ঈদ হচ্ছে খুশি, আনন্দ, উৎসব। ফিতর হচ্ছে প্রত্যাপন। এখানে ভঙ্গ অর্থে ব্যবহৃত। কারো কারো মতে এ দিবসের সদগায়ে ফিতর (ফিতরা) প্রদানকে উপলক্ষ্য করে ফিতর শব্দ ব্যবহৃত। মসহুর মতে ঈদুল ফিতর বলতে মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার পর রোজা ভঙ্গের উৎসবকে বুঝানো হয়। অন্যগুলো তার অনুসর্গ মাত্র। শ্রেষ্ঠতম মাস রমজানের প্রেক্ষাপট ধর্মীয় সামাজিক তাৎপর্য, পারস্পরিক সৌহার্দ্য সম্প্রীতি ঐক্য সর্বোপরি আল্লাহপাক প্রদত্ত পুরস্কার প্রাপ্তির এ আনন্দ উৎসব। প্রকৃতপক্ষে রোজাদার ঈমানদারদের জন্য খাস এ উৎসব। প্রভুর রূহে বান্দারা একটি মাস সিয়াম সাধনা, সৎকর্ম দ্বারা আল্লাহপাকের সন্তুষ্ট চিত্তে সে ত্যাগ তিতিক্ষার দুর্গম পথ অতিক্রম করেছে। ধৈর্য্য ধরেছে, তাকওয়া অর্জন করেছে, আল্লাহ পাক কুদরদি হস্তে তার প্রতিদান দেবেন, নাজাত দিবেন। ঈদের নামাজের মুহূর্তে রোজাদারদের ক্ষমা ঘোষণা, জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়। ঈদ আনন্দ উৎসব, তবে শুধু পার্থিব উৎসব নয়।
ঈদ আনন্দের মধ্যে এবাদতও বটে। ঈদ আত্মিক উৎকর্ষ ও পরিচ্ছন্ন পরিতৃপ্তির পবিত্র উৎসব। সে সাথে মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের সেতু নির্মাণ করে। সুতরাং ঈদ আনন্দ উৎসব ঠিকই, কিন্তু কোন ধরনের পাপাচার যেন কলুষিত না করে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি আবশ্যক।
ঈদে আছে প্রতীক্ষা, সংযমের পথ পরিক্রমা, ত্যাগের মহিমা আর প্রাপ্তির আনন্দ। এ দিন সমাজের কথিত উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্র, গ্রাম, শহর-বন্দরে লোকজন আনন্দে হয়ে ওঠে আত্মহারা। আয়োজন চলে সজ্জা আর আপ্যায়নের। নামাজের পর সালাম কোলাকুলি, কুশলবিনিময়, শুভ কামনা, ঈদ মোবারক। ঈদগাহে বা রাস্তার মোড়ে মোড়ে তোরণ, চাঁদ তারা পতাকা, কালেমা বা ঈদ মোবারক লিখা দৃষ্টিনন্দিত বটে। শিশু কিশোরদের ঈদ আনন্দ, কোলাকুলির নির্মল আনন্দ ঈদের সুন্দরতম দিক। ‘কঁচি মুখে, কঁচি বুকে, করে কোলাকুলি/স্বর্গীয় সুধা যেন করে লুকোচুরি।’
ফজিলতে ভরপুর ঈদের রাত্রি জাগ্রত থেকে এবাদত বন্দেগী অতি পুণ্যের।’ তার অন্তরের সেদিন মৃত্যু হবে না, যেদিন অন্যান্য অন্তরের মৃত্যু ঘটবে।’ হাদিসে আরও বর্ণিত ঈদের দিন সহ চার রাত যে এবাদত করে, সে জান্নাত লাভ করবে। ঈদের দিন চাশতের সময় ঈদের দুরাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করা হয়। কিছু আহার, আতর ব্যবহার, পায়ে হেটে ঈদগাহে যাওয়া উত্তম। যানবাহন, পাকিং, প্রতিবন্ধকতা অনুচিত ও বিবেক বর্জিত বটে। নামাজের পূর্বে গোসল, উত্তম পরিচ্ছদ পরিধান, ওয়াজিব ফিতরা আদায় সুন্নত। জাকাত ফিতরা দান খয়রাত এর মাধ্যমে গরীব অভাবগ্রস্তরা ঈদের আনন্দে সানন্দে শরীক হন। কিছুটা হলেও তাদের অভাব দূর হয়। সবাইকে ভালবাসলে, সবাই মিলে আনন্দ উৎসবে শরীক হতে পারলে এ মর্তের জীবন যে কত সুন্দর, কত না আনন্দময় হতে পারে তার বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে ঈদ উৎসব। ঈদ সকল মানুষকে আপন করে, মিত্র করে একই উঠানে দাঁড় করায়। সকলকে গলায় গলায় একাকার করে, এক আনন্দ সৌকর্য বিমন্ডিত হৃদয় দেয়া নেয়ার অনন্য অনুভব জাগিয়ে দেয়। বন্ধন হয় ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, আন্তরিকতার। ঈদ উৎসবের মধ্যে আছে একটি শাশ্বত বিশ্বমানবতার মর্মবাণী যা অপরাপর ধর্মীয় সম্প্রদায়কেও আপ্লুত না করে পারে না। সৌভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির সেতু বন্ধনে ঈদের মর্মবাণীটি সর্বত্র প্রতিফলিত হোক। জাতীয় কবি বলেন ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ।’
ইসলাম যেমন উৎসব বিমুখ নয়, তেমনি অনুষ্ঠান সর্বস্ব নয়। লাগামহীনতা, অপচয়, অশালীনতার সুযোগ নেই, বরং নিষিদ্ধ। তদুপরি বৈষম্যমূলক অর্থব্যবস্থা চাঁদাবাজি, কালোটাকা, ঘুষ-দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, ক্ষমতা পদবীর দাপট যেমনি দৃষ্টিকটু পীড়াদায়ক, তেমনি নির্যাতিতদের আর্তনাদ মর্মান্তিক বটে। সিয়াম সাধনায় তাকওয়ার ইজম গড়ে, তেমনি সব অপকর্ম, পাপাচার থেকে বিরত রাখে। নিরন্নের দুঃখকষ্ঠ জঠের জ্বালা কিছুটা হলেও উপলব্ধি ও সহমর্মিতা জাগ্রত হয়। বিত্তশালীদের সম্পদ অর্থের কিয়দংশ বিলিয়ে দিয়ে অনুপম তৃপ্তি উপভোগ করা যায়। অতি ভোগের চেয়ে বিলিয়ে দেবার এ তৃপ্তি অনেক বেশি। অভাবগ্রস্তদের অভাব দূর করে। তাদের মুখে অন্ন জুগিয়ে, মুখে হাসি ফুটিয়ে, বুকে বুকে আলিঙ্গনে একাকার হয়ে, ঈদের প্রকৃত আনন্দ সকলে তৃপ্ত সহকারে উপভোগ করাই রমজানের মূল শিক্ষা ও ঈদুল ফিতরের মুখ্য উদ্দেশ্য। যারা রোজাহীন ছিল, কৌশলে কাঙ্গালের ধন ছুরি করে, দাপট দেখায় তারা আর যাই হোক এর বিপরীততো বটেই।
মুসলিম উম্মার জাতীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। ইহা মিল্লাতের আনন্দ ও ঐক্যের প্রতীকও বটে। মহানবী এরশাদ করেন প্রত্যেক জাতির উৎসব রয়েছে, আর ঈদ হচ্ছে আমাদের উৎসব। প্রতি বৎসর সে ঈদ আনন্দের বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয়। ‘চিরকাল থাকে যেন খুশীর এ ঈদ/ভোর হবার আগে যেন ভেঙ্গে যায় নিদ।’ ঈদের আবেদনে গড়ে উঠুক সাম্য মৈত্রী ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। রমজানের আত্মশুদ্ধির এক মাসে আমরা যেটুকু তাকওয়া (আল্লাহভীতি) হাছিল করেছি তার বিচার বিশ্লেষণ মূল্যায়ন করি। লালন করি পরবর্তী এগার মাস। নিজেকে গড়ি ঈমানদার নেককার হিসেবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নির্যাতিতদের প্রতি সহমর্মিতা সহযোগিতার হস্ত হোক সম্প্রসারিত।
এবারের ঈদুল ফিতরের আনন্দ উৎসবে কবির ছন্দে বলি ‘পথে পথে আজ হাকিব বন্ধু ঈদ মোবারক আস্সালাম/ফুলে ফুলে আজ বিলাবো বন্ধু/ঈদ মোবারক বুল কালাম।’ ঈদের পবিত্রতা আর আনন্দের পরশে জেগে উঠুক মুসলিম মিল্লাত, নেড়ে যাক বিশ্ব। ঘরে ঘরে ছড়িয়ে যাক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। ঈদ মোবারক। ঈদুল ফিতর আস্সালাম।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT