বিশেষ সংখ্যা

হিমশীতল স্পর্শ

আবদুস সবুর মাখন প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৬-২০১৮ ইং ০১:৫৮:৪৫ | সংবাদটি ১১৭ বার পঠিত

কলিংবেল বাজতেই ঘুম ভাঙে বাড়ির কর্তার। দরোজা খুলেই ঘুম ঘুম চোখে দেখেন মেয়েটিকে। হলুদ-কালোয় ছাপার মলিন শাড়িপরা নাদুস-নুদুস গড়নের মেয়েটির বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের মধ্যে। দারিদ্র্য-অপুষ্টি তাঁর চেহারার লাবন্যকে ঢেকে রেখেছে। এমন একটি মেয়ে সচ্ছল ঘরের বউও হতে পারতো। মুহূর্তেই এতোকিছু ভেবে ফেললেন বাড়ির কর্তা রাজীব চৌধুরী। ভোর ছ’টায় ঘুম ভাঙানোর জন্য ভেতরে ভেতরে একটু বিরক্তও হয়েছেন তিনি। মাথা নীচু করে কাচুমাচু অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে জমিরুন।
: কী চাই?-কর্তার প্রশ্নে আরও জড়োসড়ো হয়ে পড়ে জমিরুন।
: জ্বি না, আমি আফনানারার ঘরো কাম করতাম আইছি। কাইল খালাম্মায় কইছইন আইজ থাকি আইতাম।
: আচ্ছা ঠিক আছে, ঘরে আসো। এভাবেই শুরু হয় জমিরুনের ‘কাজের বুয়া’ হিসেবে নতুন পরিচয়ে নতুন জীবন।
রাজীব চৌধুরী আর ঘুমোতে পারেননি। স্ত্রীকে ডেকে তুলেন ঘুম থেকে। নতুন কাজের বুয়াকে কাজকর্ম বুঝিয়ে দিতে হবে। বাইরে কুয়াশা। প্রচন্ড ঠান্ডা কয়েক বছর পর এবার বুঝি বেশ শীত নামলো। বোঝা-ই যাচ্ছে যে, সূর্য উঠতে আজ একটু বিলম্বই হবে। লেপের নীচে আরও কিছু সময় শুয়ে থাকার ইচ্ছা থাকলেও পারেন নি। কারণ অফিসে যেতে হবে। এই ডিসেম্বর মাসে ব্যাংকে ষান্মাসিক ক্লোজিং। প্রতিদিন একটু আগেভাগেই যেতে হয় অফিসে। রাজীব চৌধুরী যে শাখায় কাজ করেন সেখানে ম্যানেজারের দায়িত্বে রয়েছেন। ঘন্টা খানেকের মধ্যেই তিনি রেডি হয়ে চলে গেলেন অফিসে।
জীবনের নতুন মোড়। সচ্ছল নয়, তবে মোটামুটি সারা বছর খেয়ে পরে বেঁচে থাকা যায়-এমন একটি ঘরের মেয়ে জমিরুন। তাকে অন্যের ঘরে কাজ করে পেটের ক্ষুধা মেটাতে হবে, এমন কোনদিন ভাবতে হয়নি। কিন্তু নিয়তি তাকে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে। তার ঘর-সংসার সবই ছিলো। স্বামীর নিজের জমি না থাকলেও অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করতো। ভাটির জনপদে-হাওরে একটি মাত্র ফসলই চাষ হয়। যে বছর ফসল ভালো হয় সে বছর খুশীর সীমা থাকে না হাওরবাসীর। এক মওসুমের ফসল দিয়েই চলে তাদের প্রায় সারা বছরেরই ভরণপোষণ। কিন্তু এবারের সর্বনাশা বন্যা সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। বন্যা হয় প্রায় বছরই; তবে কখনও বাড়ির উঠোনে, আবার কখনও ঘরের মেঝেতে দু’য়েকদিন থাকে বানের পানি। পরে নেমে যায়। হাওরের ফসল ডুবলেও ধানের সবুজ পাতা দেখা যায়। পানির ওপরে বাতাসে দোল খায়। একটা সময় পানি কমে যাওয়ার পর জেগে ওঠে ধানগাছগুলো। কিন্তু এবার এই ধরণের ঘটনার পূণরাবৃত্তি ঘটেনি। বানের পানিতে হাওর-গ্রাম-বাড়িঘর একাকার হয়ে গেছে। ভেসে গেছে টিনের চালা, ধানের গোলা, বাসন-কোসন, আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড় সবকিছু। পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে তারা কলাগাছের ভেলায় চড়ে গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়া সড়কে আশ্রয় নেয়। এখান থেকেই তারা পাড়ি জমায় শহরে। এখন তাদের ঠিকানা বস্তির ঝুপড়ি।
অন্যের ঘরে প্রথম দিন কাজ করার অভিজ্ঞতা খুব একটা স্বস্তিদায়ক এমন নয়। কারণ সবই তো নতুন। নতুন ঘর নতুন সংসার, এক কথায় জীবনের নতুন শিক্ষা, নতুন উপলব্ধি। মানিয়ে নেয়ার একটা ব্যাপার আছে। ঘর-গেরস্থালীর নানা কাজকর্ম যেমন-ঘর ঝাড়–, কাপড় ধোঁয়া, বাসন মাজা, রান্না-বান্না ইত্যাদি। এই কাজগুলো তো তাকে সব সময়ই করতে হয়েছে, তবে সেটা নিজের ঘরে। স্বামীর ঘরে আসার পর গত ছয়-সাত বছর ধরেই সে নিয়মিত এই কাজগুলো করে আসছে। কিন্তু নিজের মাটির ঘরে পানি ছিটিয়ে ঝাড়– দেয়া আর মোজাইকের মেঝে ঝাড়– দেয়ার মধ্যে পার্থক্য অনেক। বাড়িতে পুকুরে নিজের স্বামী সন্তানের কাপড় ধোঁয়া আর টেপের পানিতে অন্যের কাপড়চোপড় ধোঁয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য। মাটির চুলায় কাঠ-খড় পুড়িয়ে অতি সাধারণ খাবার রান্না আর গ্যাসের চুলায় মুখোরোচক আইটেম রান্নার মধ্যে পার্থক্যও অনেক।
জমিরুন তার বস্তির ছোট্ট ঘরে ফিরে সন্ধ্যার পর পরই। তার স্বামী আর ছেলে অপেক্ষা করছে মোমবাতি জ্বালিয়ে। বৈদ্যুতিক বাতি থাকলেও মেইন সুইচ বন্ধ করে রেখে দিয়েছে বস্ত্রির মালিক। দু’দিন হয় তারা এখানে এসেছে। জেনেছে এখানে আগে থেকে যারা রয়েছে তাদের অনেকেই এক মাসের ভাড়া দেয়নি বলে তাদেরকে বিদ্যুৎ দিচ্ছে না মালিক। সে নাকি এভাবেই বস্তিবাসীদের যন্ত্রণা দেয়। ভাড়া দিতে এক দু’দিন দেরী হলেই সে বৈদ্যুতিক লাইন বন্ধ করে ফেলে। তখন বস্তির ১৭টি পরিবারই থাকে বিদ্যুৎহীন। অর্থাৎ এক দু’টি পরিবার ভাড়া না দিলে দুর্ভোগ পোহাতে হয় পুরো বস্তিবাসীকেই। এছাড়াও আরও অনেক উৎপাত রয়েছে বস্তির মালিকের।
নগরীর উপকন্ঠে সরকারী খাস জমি দখল করে গড়ে ওঠা বস্তির পাশেই ছড়া। সেখানে কচুড়িপানা আর ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধ। একটু বৃষ্টি হলেই ছড়ার ময়লা পানি ঘর ছুঁই ছুঁই। কখনও এই পানি ঢুকে যায় ঘরে। যন্ত্রণা আরও আছে। কিছুদিন পর পরই সিটি কর্পোরেশনের লোকেরা আসে অবৈধ বস্তি উচ্ছেদ করতে। তারা এসেই বস্তিবাসীদের ঘরে ঢুকে জিনিসপত্র বাইরে ছুঁড়ে ফেলে। বস্তির বাসিন্দাদের সঙ্গেও তারা খারাপ আচরণ করে। মেয়েদের গায়ে হাত দিতে চায়। শেষ মেষ বস্তির মালিক এসে তাদের সাথে একটা সমঝোতায় আসে। তারপর পকেটে কিছু টাকা পুরে চলে যায় উচ্ছেদকারী লোকজন। জমিরুনের কাছে এইসব খবরাখবর নতুন। তারা দিব্যচোখে অনুভব করে, সামনের দিনগুলো যে কতো কঠিন! কিন্তু তাই বলে যে তারা এখান থেকে চলে যাবে অন্য কোথাও সেটা তো হবার নয়।
যেটা হবার, তাই হয়ে যাচ্ছে। অন্যের ঘরও একদিন নিজের ঘর মনে হয়। একটি ঘরে দিনের পর দিন কাজ করতে করতে এক সময় সবকিছুই নিজের বলেই মনে হয় জমিরুনের। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যেসব জিনিসপত্রের সঙ্গে বসবাস, সেগুলো জমিরুনের কাছে আপন হয়ে যায়। আপন হয়ে যায় ঘরের মানুষগুলো-তার খালাম্মা, খালু রাজীব চৌধুরী, তাদের কলেজ পড়–য়া একমাত্র মেয়েটি। বরং বস্তির ঝুপড়ি ঘরেই যেন দিনের কম সময়টুকুই কাটে জমিরুনের। স্বামী-সন্তানকে সে সময় দিচ্ছে ওই সন্ধ্যার পর থেকে বলা যায় সূর্যোদয় পর্যন্তই। দিনের পুরোটাই কাটে রাজীব চৌধুরীর বাড়িতে। আর বস্তির ওই ঘরে সারাদিন থাকে তার স্বামী ও ছেলেটি। তারা কী করে, কী খায় না খায় তার কোনই খবর রাখতে পারেনা। সন্ধ্যায় ঘরে যাওয়ার সময় রাজীব চৌধুরীর বাসা থেকে যে খাবারটুকু দেয়া হয়, তা দিয়েই রাতের খাবার খায় তিনজনে। এতে হয় না তাদের। অনেক দিনই আধপেটা থাকতে হয় তাদের। এভাবে কাটে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। তার স্বামী অনেক দিন অনেক জায়গায় ঘুরোঘুরি করে কাজ খুঁজেছে, পায়নি। রিক্সা চালানো, ঠেলাগাড়ি চালানো, ক্বীনব্রীজে রিক্সা ঠেলা কিংবা রেলস্টেশনে কুলি-মজুরের কাজ করতে চেয়েছে। কিন্তু কোথাও তার ঠাঁই হয়নি। সবখানেই ‘পুরনো পাগলের ভাত নেই, আবার নয়া পাগল’Ñএই অপবাদ শুনে ফিরে আসতে হয়েছে। জমিরুন মাস শেষে যে বেতন পায় তার প্রায় পুরোটাই চলে যায় ঘর ভাড়ায়। কাটলো প্রায় সাত আট মাস। তার নিজের দিকে চাওয়ার সময় নেই। সময় নেই যেন স্বামীর দিকেও তাকানোর। তাদের একমাত্র আদরের ধন ছেলেটির দিকে তাকালে হৃদয়টা হাহাকার করে ওঠে। না খেতে পেয়ে একেবারে কংকালসার হয়ে গেছে ছেলেটা। জমিরুন ভাবে, এভাবে কতোদিন থাকা যায়। ক্ষুধার তাড়নায়ই তো তার এতো কষ্ট করা উদয়াস্ত! ক্ষুধা মেটানোর জন্যই তো তার ‘কাজের বুয়া’ সাজা! কিন্তু সেই পেটের ক্ষুধা যদি না মেটে তা হলে এতো কষ্ট করার মানে কী?
মানে কিছু থাকুক বা না থাকুক, রুটিন মাফিক কাজগুলো তো তাকে করতেই হবে; তা না হলে মাস শেষে মাথা গোঁজার ঠাঁই যে ঘরটি আছে তার ভাড়া দেবে কীভাবে? বস্তির মালিক যে খচ্চর, একদিন দেরী হলে তো বের করে দেবে ঘর থেকে। তাছাড়া সেদিন তার দিকে যেভাবে বাঁকা চোখে চেয়েছিলো লোকটি সেটা মনে হলে তো যেন তার প্রাণপাখীই উড়াল দিয়ে যায়-এই অবস্থা। এতো কিছু ভাবতে ভাবতে মনটা অস্থির হয়ে যায়। এখন আর কাজে মন বসাতে পারছে না। সকালের কাজটুকু করতে করতে দুপুর হয়ে যায়। আবার দুপুরের নির্দিষ্ট কাজগুলো করতেও প্রায় বিকেল হয়ে যাবে। দুপুরের খাবার রান্না বান্নাও করতে হবে। কীভাবে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না সে। ড্রইং রুম থেকে ডাক দেয় তার খালাম্মা।
: রান্নার কেমন দেরী? তোমার খালুর চলে আসার সময়তো হয়ে গেলো প্রায়।
: জ্বি না, খালাম্মা, আইজ দেরী অইজার। কামো মন ভোর নাÑপরণের কাপড় দিয়ে চোখ মুছে। তার খালাম্মা ভাবেনÑ‘এমন তো হয় না জমিরুনের কখনও; নিশ্চয় কোন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।’-এমনি সময় দেখেন তার সামনে দাঁড়ানো জমিরুনের হাত পা কাঁপছে। তিনি একটু ধমক দিয়েই বললেন-
: বল কী হয়েছে?
: নয়া করি কোনতা অইছে না খালাম্মা; আমার তো পুরানা কিচ্ছা। আফনে তো কিছু কিছু জানোইন। দিন দিন তো আমরার অবস্থা আরও খারাপ অইজার। নিজেরা না খাইয়াও যদি কইলজার টুকরা পুয়ার মুখো খানি তুইল্লা দিতাম পারতাম, তইলে কিছু অইলেও শান্ত¦না আছিল। বাইচ্ছাটার বায় চাইলে বুক ফাইট্যা কান্দন আয়।
: আচ্ছা ঠিক আছে। এখন কী করতে চাও তুমি?...সেটা বাবা তোমার বিষয়। আমি কিছু জানি না। আমার কাজটা যদি ঠিকমতো না হয়, তবে তো তোমাকে রেখে লাভ নেই। আমাকে অন্য বুয়া দেখতে হবে। কথাগুলো একনাগাড়ে বলে ফেললেন জমিরুনের গৃহকর্ত্রী। এতোদিন তার মধ্যে যে সহানুভূতিশীল মমতাময়ী আচরণ লক্ষ করা গেছে, তা যেন পাল্টে গেলো মুহূর্তে।
কষ্ট বেড়ে যায় জমিরুনের। ক্ষুধার কষ্ট, মনের কষ্ট, ছেলের কষ্ট-সবই যেন একাকার হয়ে যায়। সেদিন কাজ শেষ করতে একটু দেরী হয়। অন্যদিন যেখানে সন্ধ্যার পর পরই মোটামুটি চলে যেতে পারতো ঘরে। সেদিন তার চেয়েও ঘন্টা দেড় ঘন্টা দেরী হয়ে যায়। আষাঢ় মাস। মুষলধারে বর্ষণ শুরু হয়েছে সন্ধ্যা থেকে। জমিরুন রাস্তায় বের হয়েই ভিজে একাকার। কিন্তু তারপরেও যেতে হবে; ঘরে ছেলেটি একা। একে তো পেট ভরে খাবার পাচ্ছে না, তার ওপর জ্বর দু’দিন ধরে; একেবারে হাড্ডিসার হয়ে গেছে ছেলেটি। বাটিতে ঠান্ডা ভাত আর ডাল দিয়ে বলে এসেছিলো এগুলো খেয়ে ঘরে শুয়ে থাকতে।
সকালে দেখে আসছে ছড়ার পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, আরও একটু বাড়লেই ঘরে ওঠে যাবে ময়লা পানি। সন্ধ্যা থেকে যেভাবে বৃষ্টি নেমেছে, তাতে এতোক্ষণে বুঝি সারা বস্তিই পানিতে ডুবে গেলো! অপরদিকে তার স্বামীও বলেছে আজ যেন কোথায় যাবে কাজের সন্ধানে; ফিরতে দেরী হবে। এতো সব ভাবনায় রক্ত-মাংসের মানুষটি যেন হয়ে পড়ে একটি জড় পদার্থ। যতো দ্রুত হাঁটতে চায়, ততোই যেন পা আটকে যায়। প্রতিটি পদক্ষেপে সর্বশক্তি নিয়োগ করে সে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়, বজ্রপাত হতে পারে। ছোট গলি ধরে হাঁটছে জমিরুন। আশেপাশে জন মানুষ নেই। পরণের ভিজাকাপড় লেপ্টে আছে তার শরীরে। বস্তির মালিক বা অন্য কোন দুষ্ট লোক যদি সামনে এসে পড়ে! স্ট্রিট লাইটগুলো জ্বলছে না, বিদ্যুৎ নেই। আকাশে কালো মেঘ জমলেই শহরে বিদ্যুৎ চলে যায়। রাস্তার দু’পাশের বাসাবাড়ির ইমার্জেন্সি বাতির ঠিকরে পড়া মৃদু আলোতে পথ চিনে হাঁটছে সে। বস্তির মালিক ওই লম্পট লোকটির বাসার সামন দিয়েই যেতে হয় তাকে। প্রতিদিনই তাকে এই পথে আসা যাওয়া করতে হয়। তবে আজ বিদ্যুৎহীন ঝড়বিক্ষুব্ধ অন্ধকার রাতে ভিজে জবুথবু অবস্থায় এই বাসার পাশ দিয়ে যেতে অজানা ভয়-শংকায় পেয়ে বসে তাকে। কোন মতে পায়ে পায়ে পৌঁছে সে বস্তির কাছে। ঝড়-বৃষ্টি একটু থেমেছে।
পাকা রাস্তা থেকে বস্তির রাস্তায় নামে। অন্ধকারে কাদাপানি মাড়িয়ে দরোজার কাছে আসে। আকাশের বিদ্যুতের ঝলকে দেখতে পায় ঘরের দরোজা খোলা। ডাকতে থাকে ছেলেকে ‘রতন-রতন...’ বলে। কোন সাড়াশব্দ নেই। হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে ঘরের ভেতরে। অন্ধকারে হাতড়ায় হারিক্যান, মোমবাতি, ম্যাচ। পায়না কোন কিছুই। আকাশের বিদ্যুৎ ঝলকের সামান্য ছটাও ঘরের মধ্যে ঢুকে না; তাহলে হয়তো অন্তত ম্যাচটা খুঁজে পাওয়া যেতো। আবার ডাকে ছেলেকে ঘরের বেড়ার একটা বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে। কিন্তু এবারও কোন শব্দ নেই রতনের। ভাবলো এতো ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙ্গছেনা কেন! মেঝেতে বসে পড়ে জমিরুন। মনে করলো ঘরের মাঝখানে হয়তো ঘুমিয়ে আছে। এমনি সময় পায়ের মধ্যে কী যেন একটা শীতল ছোঁয়া অনুভব করলো। বুঝতে পারে না কিছুই। আবার মেঝেতে পানিও গড়িয়ে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত খুঁজে পায় ম্যাচটি। হারিক্যান জ্বালায়। চোখে পড়ে দু’দিকে দুই হাত ছড়িয়ে উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে আছে ছেলেটি। পাশেই ভাতের বাটি; ভাত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ডালের বাটিও খালি। সব ডালই পড়ে গেছে মেঝেতে। ছড়ানো ভাত ও ডাল-এ একাকার হয়ে আছে। তার ওপর শুয়ে আছে ছেলেটা। আবার ডাক দেয়। মাথায় হাত দিয়ে দেখতে চায় জ্বর ছাড়লো কি না। কিন্তু না! মাথা ঠান্ডা, প্রচন্ড রকম ঠান্ডা। হাত ধরে; বাঁকাতে পারে না। কোলে নিতে চায়। শক্ত কংকালসার ছোট্ট নিথর দেহটিকে দু’হাতে বুকে জড়িয়ে নেয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলে জমিরুন। চিৎকার দেয়। ঝড়ের গতি বাড়ে। শাঁ শাঁ শব্দে চাপা পড়ে যায় জমিরুনের গগণবিদারী আর্তনাদ।
বাড়তে থাকে ছড়ার পানি। পানি ঢুকে জমিরুনের ছোট্ট ঘরেও।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT