বিশেষ সংখ্যা

ঈদ, আনন্দের ঝর্ণাধারা

মোঃ মনজুর আলম প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৬-২০১৮ ইং ০২:০০:০৬ | সংবাদটি ৩৩৩ বার পঠিত

ঈদ বিশ্ব মুসলিমের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেয় এক নির্মল সুখ ও আনন্দের বার্তা। মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা ও সহমর্মিতা প্রকাশ্যে দেখা যায় ঈদে। ধনী-দরিদ্র, আপন-পর, উঁচু-নিচু সবাই একাকার হয়ে যায় এই ঈদে। ঈদের দিন এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয় পরস্পরে কুলাকুলির মাধ্যমে। মহানবী (সঃ) প্রবর্তীত ঈদ উৎসবে একে অন্যের প্রতি মমত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিভেদ, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা মুছে ফেলে আত্মিক মিলনে আবদ্ধ হয়। আফসোস ঈদের এই ভ্রাতৃত্ব দীর্ঘ স্থায়ী না হওয়ার জন্য। ঈদ আমাদের শিক্ষা দেয় পরস্পরে ভালোবাসা, উদারতা, উপলব্ধির। বছর জুড়ে ঈদের আনন্দের ঝর্ণাধারা বইতে থাকুক এমনটা আমার প্রত্যাশা।
ঈদুল ফিতরের এক ফালি চাঁদ দেখার জন্য সন্ধ্যার পরপরই পশ্চিম আকাশে সবাই তাকিয়ে থাকে এই বুঝি চাঁদ দেখা যাইবে। চাঁদ দৃষ্টিগোচর হলেই মহা খুশিতে আনন্দ চিৎকার। ঈদ মোবারক! ঈদ মোবারক! কাল ঈদ। ছেলে, বুড়ো সবার মুখে আনন্দের উচ্ছ্বাস। মা-বোনেরা চাঁদ দেখার খবর শুনেই বসে পড়েন ঈদের দিনের রসনা তৃপ্তির কাজ নিয়ে। চালের গুড়ির পিঠা, পায়েশ, সন্দেস, কত কি তৈরী করেন। দিনভর রোজা রেখে রাতে আবার পিঠা, পায়েশ তৈরীতে বিরক্তির কোন ছাপ মুখে নেই। যেন সবাইকে খাবাতে পারলে মা-বোনের আনন্দ এখানেই যেন তাদের তৃপ্তি। ঘরের কয়েকজন মিলে তারা এ কাজ করে থাকেন। কেহ চাল বা আটা ময়দার গুড়ি দিয়ে কাই তৈরী করেন, কেহ ঐ কাই বেলে পিঠার আকৃতি করে তাতে আবার বিভিন্ন নকশা আঁকেন। এভাবে গভীর রাত পর্যন্ত চলে পিঠার আয়োজন। একে অন্যের ঘরে গিয়ে বিভিন্ন কাজে সাহায্যের মধ্যেও আলাদা আনন্দ খোঁজে পান। ঈদের রসনার আয়োজন ঘর বাড়িতে শুধু বানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রমজানের ২৭ বা ২৮ তারিখ থেকেই শুরু হয়ে যায় বাজার থেকে কিনে আনা মুরগী, গরুর মাংস, সেমাই, নুডুলস, বাদামসহ আরো কত খাবার। অর্থাৎ ঈদের দুই, তিন দিন আগে থেকেই ঈদের দিনের খাবার আসতে এবং তৈরী হতে থাকে
এর কিছু আগে থেকে ঈদের অন্যতম আকর্ষণ ঈদের পোষাক অর্থাৎ নতুন জামা কাপড় কিনতে সবাই ব্যস্ত হয়ে যায় সাধারণত ১৫ অথবা ১৮ রোজা পার হলেই নতুন জামা কাপড়ের জন্য এ দোকান থেকে ও দোকান, এ মার্কেট থেকে ও মার্কেট চষে বেড়ান। পছন্দের জামা পছন্দ সহজে হয় না। তাইত ঘুরাঘুরি। দেখতে দেখতে আর ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে পছন্দের কাক্সিক্ষত জামাটি ধরা দেয়। ঈদের আগের রাতের মধ্যেই সকল অবস্থাশালীদের জামা কেনা শেষ হয়ে যায়। ঈদের দিনে বাহারী খাবার ও নতুন জামা-কাপড় ঈদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হীনজনরাও এ থেকে বঞ্চিত নয়। বিত্তবানরা তাদের যাকাত, ফিতরা গরীবের মধ্যে বন্টন করে থাকেন। অনেকে টাকা-পয়সার সাথে শাড়ী, লুঙ্গি ও ঈদের খাদ্য সামগ্রীর প্যাকেট বিতরণ করে থাকেন। তাইত ঈদের দিন গরীব-ধনী সবাই নতুন সাজে সাজতে পারেন, ভালো ভালো বাহারী খাবার মোটামুটি সবাই খেতে পারেন। সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঈদ।
ঈদ এমনি এক খুশি ও আনন্দের মিলন ঘটায় নাড়ীর টানে মানুষ ঘরমুখি হতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নিজ বাড়িতে ঈদ করতে মানুষ ব্যবসা ও চাকুরীর থেকে ছুটি নিয়ে হলেও বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনের সাথে ঈদ করতে চলে আসে। গাড়ীর অগ্রিম টিকেট সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় পার করেন। শত কষ্ট, ঝামেলা উপেক্ষা করে টিকেট সংগ্রহ করতে চায় মানুষ। নিজ স্থানে বাড়িতে গিয়ে ঈদ করতে। ঈদ মানুষের মনে কি যে টান বা আকর্ষণ সৃষ্টি করে গোটা মুসলিম জাহানে এক নতুন জাগরণের সৃষ্টি করে উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে কেমন যে জোয়ার সৃষ্টি হয়। এ জোয়ারে ভাসতে ভাসতে মানুষ একে অন্যকে বুঝতে পারে, একে অন্যের মধ্যে প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করে নেয়। একে অন্যকে উপলব্ধি করতে শেখে। ঈদ এমনি একদিন আমির-ফকির, টাকাওয়ালা-ভিখারি, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, কালো-ধলো সবাইকে এক কাতারে শামিল করে। অন্তত ঈদের দিনে আমরা দেখতে পাই কাঁধে কাঁধে ধরাধরি করে বুকে বুকে জড়াজড়ি করে সবাই একাকার হয়ে যায়। এমন সাম্য, মৈত্রী সারা বছর কি ধরে রাখা যায় না?
ঈদের রাত অথবা ঈদের চাঁদ রাতের মধ্যে সাধারণত কেনাকাটা ও পিঠা তৈরীর কাজ শেষ হয়ে থাকে দুরদুরান্তের আত্মীয়-স্বজনও চাঁদ রাতের মধ্যেই যার যার গন্তেব্যে এসে হাজির হয়ে থাকেন। রাত পোহালেই আনন্দের ঝর্ণাধারায় সবাই ¯œাত হবেন তাইত খুব ভোরে উঠে গোসল করতে সবাই ব্যস্ত হয়ে যান। গোসল সেরে ফজরের নামাজ শেষে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে নতুন জামা পরে দল বেঁধে ঈদগাহে সবাই ছুটেন। অনেকে দেখা যায় নতুন জামা কিনে লুকিয়ে রাখেন যেন ঈদের আগে কেহ না দেখেন। পাছে ঈদের খুশি যেন নষ্ট হয়ে যাবে। তাই ঈদের দিন নতুন জামা, পায়জামা, পাঞ্জাবী, লুঙ্গি, শাড়ী, টুপি, থ্রী-পিছ ইত্যাদি বের করেন। নতুন কাপড় পরে ঈদগাহে এক পথে যাওয়া অন্য পথে আসা, মুখে মুখে তাকবির বলা কি যে এক আনন্দ। ঈদের নামাজ শেষে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভ্রাতৃত্ব প্রকাশের মাধ্যম কোলাকুলি আহ! কি মনোমিলন যেন আজ সবাই আপন, সবাই ভাই ভাই। ঈদগাহ থেকে এসে বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠদের কদমবুছি করা, জড়িয়ে ধরা, দোয়া নেয়া কি অপূর্ব দৃশ্য। বড়রা এ সুযোগে ছোটদের কিছু টাকা-পয়সা দেয় যাকে ঈদের সেলামী আমরা বলি।
ঘরে ঘরে দাদা, দাদি, চাচা, চাচী, আব্বু, আম্মুকে সালাম করা জড়িয়ে ধরা, চুমু খাওয়া এ এক স্বর্গীয় ভাবধারা ফুটে উঠে। বাড়ি বাড়ি বেড়াতে যাওয়া, কুশল জিজ্ঞেস করা, খোঁজ খবর নেয়া, যেখানেই যাওয়া যায় শুধু আদর আপ্যায়ন আর সেলামী পাওয়ার সংস্কৃতি এ ধারা আনন্দের। যারা দূর দূরান্ত থেকে কষ্ট করে এসেছে আমাদের মাঝে তাদের পেয়ে আনন্দ আরো বেড়ে যায়। ঈদ আনন্দের ঝর্ণাধারা যদি সারাবছর বইতে থাকত তবে মমত্ববোধ বৃদ্ধি পেত। হানাহানি দূর হত।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT