বিশেষ সংখ্যা

ঈদ : ভ্রাতৃত্বের ফোয়ারায় উদ্ভাসিত হোক জীবন

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন খন্দকার প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৬-২০১৮ ইং ০২:০১:২৫ | সংবাদটি ৮০ বার পঠিত

আমাদের সমাজে ছিন্নমূল, এতিম ও অসহায় অসংখ্য শিশু আছে যাদের দুয়ারে খুশির ঈদ আসে কিন্তু অভাবের কারণে ঈদের নতুন জামা তাদের কপালে জোটে না। গত বছর ঈদের দিন বৃষ্টি ভেজা সকালে রাস্তার ধারে ছিন্নভিন্ন কাপড়ে থর থর কাঁপা শরীরের একটি শিশু দেখে, দয়াল নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর কথা মনে পড়ে গেল। ঈদের দিন নামাজ শেষে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বাড়ি ফিরছিলেন। এমন সময় তিনি দেখলেন, ঈদগাহের এক কোণে বসে কান্না করছে একটি কোমলমতি শিশু। রাসূল (সঃ) কাছে গিয়ে শিশুটিকে বুকে টেনে নিলেন এবং কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। শিশুটি বলল, আমার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। তিনি পরম আদরে শিশুটিকে বাড়ি নিয়ে গেলেন। শিশুটিকে বললেন, আজ থেকে আমি তোমার বাবা, আয়েশা তোমার মা, ফাতেমা তোমার বোন। রাসূল (সঃ) কথা শুনে শিশুটির চোখেমুখে বয়ে গেল আনন্দের বন্যা। এই ছিল এতিমের প্রতি রাসূল (সঃ) এর ভালোবাসার বিরল দৃষ্টান্ত।
আমরা সেই নেতা খুঁজছি দ্বারে দ্বারে। এখন আমরা দেখি আমাদের সমাজের নেতারা মিডিয়ায় প্রচারিত হওয়ার জন্য এতিম ও দুস্থদের নিয়ে ইফতারের আয়োজন করে। অনেক নেতা আছেন, দুর্নীতি করে ধনকুবের হয়ে সমাজসেবক উপাধি নিয়ে আছেন। ঈদ আসলে তারা যাকাত প্রদানের কথা বলে গরীব-দুঃখী, দুস্থ ও অসহায় মানুষের সমাবেশ ঘটায় এবং ক্ষেত্রবিশেষে বৃদ্ধ নারী পুরুষের মৃত্যুর মহড়া প্রদর্শন করে। যাকাত আনতে গিয়ে অসহায় দরিদ্র মানুষগুলো পদপৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারায়। অথচ যাকাত দেওয়া আল্লাহর বিধান অর্থাৎ ফরজ। যাকাত প্রদানে ধনীদের ধন-সম্পদ পবিত্র এবং বৃদ্ধি হয়। যাকাত গরিবদের প্রতি ধনীদের করুণা নয়, যাকাত গরীবের প্রাপ্য অধিকার। এটি নিয়ে যতসব লোক দেখানো রাজনীতি বন্ধ করা উচিত। এই সংস্কৃতি থেকে মুসলমানদের বের হয়ে আসতে হবে।
ধনীরা কিছু লুঙ্গি, শাড়ি দিয়ে যাকাত প্রদানের দায়িত্ব শেষ করে। এটি কাম্য ছিলনা মুসলমানদের সমাজ ব্যবস্থায়। পরিকল্পিতভাবে যাকাত সংগ্রহ ও ব্যয় বন্টনের ব্যবস্থা করতে পারলে যে কোন সমাজের দারিদ্র্য দূরীকরণ ও দুঃস্থ মানবতার কল্যাণে বড় ভূমিকা রাখা সম্ভব। ঈদ আসলে আমরা আমাদের ছেলে-মেয়েদের জন্য নতুন জামা কাপড় ক্রয়ের বাজেট করি। আমরা একবারও কি চিন্তা করেছি, পাশের বাড়ির যে মানুষগুলো গরীব-দুঃখী, নিঃস্ব, অসহায় তাদের ঈদে বাজেট কি? কে তাদেরকে ঈদের জামা কিনে দিবে? নতুন জামাকাপড় পরে আমাদের ছেলেমেয়েরা যখন ঈদগাহে যায় তখন ঐ এতিম, সুবিধা বঞ্চিত শিশুগুলোর চোখের পানিতে ভেজা অপলক দৃষ্টি আমাদের হৃদয়ে কি দয়া-মায়া সৃষ্টি করতে পারে না। আমরা কি পারিনা তাদের পাশে দাঁড়াতে, অসহায়ত্বের বোঝা তাদের মাথা থেকে নামাতে। আপনার আমার ঈদ বাজেটের ছোট্ট একটি অংশ তাদের জন্য বরাদ্দ করলে কি ক্ষতি হবে আমাদের?
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ কিয়ামতের দিন বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ ছিলাম, তুমি আমাকে দেখতে আসনি। সে বলবে হে প্রভু! কিভাবে আমি আপনাকে দেখতে যাব, আপনি তো সারা জাহানের পালনকর্তা? তিনি বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল? তুমি তাকে দেখতে যাওনি। তুমি কি জানতে না যে, তুমি যদি তাকে দেখতে যেতে, তাহলে অবশ্যই তুমি আমাকে তার কাছে পেতে? হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে খাবার দাওনি। সে বলবে, হে প্রভু! আমি আপনাকে কিভাবে খাবার দেব, আপনি তো সারা জাহানের প্রভু! আল্লাহ বলবেন, তোমার কি জানা ছিল না যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাবার চেয়েছিল, কিন্তু তাকে তুমি খাবার দাওনি? তোমার কি জানা ছিল না যে, যদি তাকে খাবার দিতে, তাহলে অবশ্যই তা আমার কাছে পেতে? হে আদম সন্তান! তোমার কাছে আমি পানি পান করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে পান করাওনি? বান্দা বলবে, হে প্রভু আপনাকে কিরূপে পানি পান করাবো, আপনি তো সমগ্র জগতের প্রভু? তিনি বলবেন, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি চেয়েছিল, তুমি তাকে পানি পান করাওনি। তুমি কি জানতে না যে, যদি তাকে পান করাতে, তাহলে তা অবশ্যই আমার কাছে পেতে? (সহীহ মুসলিম)।
প্রতিবছর ঈদ আসলে রমজানের শিক্ষায় আলোকিত হওয়ার পরিবর্তে নতুন জামাকাপড়, সেন্ডেল, পাঞ্জাবি এবং বিদেশি সংস্কৃতির আদলে জামাকাপড় বানানোর জন্য আমরা দর্জির ঘুম হারাম করে দেই। একটি পাঞ্জাবি বা একটি থ্রি পিস বা একটি শাড়ি পাঁচ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে কিনতে কার্পণ্য করিনা। কে কত দামী কাপড় কিনলাম এই নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ি। অথচ ইসলাম অপচয় এবং অপব্যয় নিষিদ্ধ করেছে।
আমরা কি বেমালুম ভুলে গেছি, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্র নায়ক হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এর কথা। খলিফা ঈদে নিজের সন্তানদের নতুন জামা পর্যন্ত কিনে দিতে পারেননি। ঈদের পূর্বদিন তার স্ত্রী এসে বললেন, আমাদের জন্য ঈদের কাপড় না হলেও চলবে। কিন্তু ছোট্ট বাচ্চাটি ঈদের জামার জন্য কাঁদছে। হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) বললেন, আমার তো জামা কেনার সামর্থ্য নেই। তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের দায়িত্বে নিয়োজিত সাহাবী হযরত আবু উবায়দা (রাঃ) নিকট অগ্রীম এক মাসের ভাতা চেয়ে একটি পত্র প্রেরণ করলেন। মুসলিম জাহানের খলিফার এমন অসহায়ত্বের সংবাদ সম্বলিত চিঠি পেয়ে হযরত আবু উবায়দা (রাঃ) কেঁদে ফেললেন। তিনি পত্রবাহকে ভাতা না দিয়ে চিঠির প্রতিত্তোরে লিখলেন, আমিরুল মু’মিনিন আমি আপনাকে অগ্রীম ভাতা দিতে পারি। তবে আপনাকে দ’ুটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে হবে। প্রথমত আপনাকে আগামী মাস পর্যন্ত জীবিত থাকার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। দ্বিতীয়ত যদি জীবিত থাকেন তাহলে মুসলমানরা যে আপনাকে আগামী মাস পর্যন্ত তাদের শাসক রূপে মনোনীত রাখবে এর নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। ভাতার পরিবর্তে হযরত আবু উবায়দা (রাঃ) এর পত্র পেয়ে খলিফা হযরত ওমর নির্বাক! হতভম্ব! তিনি এতো বেশি ক্রন্দন করলেন যে, তার দাঁড়ি মোবারক অশ্রুতে ভিজে গেল। কি মহান নেতা! যিনি অভাবের কারণে নিজ সন্তানকে ঈদের জামা কিনে দিতে পারলেন না। আর আমাদের সমাজের নেতাদের ভিন্ন চিত্র।
অনেকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। ক্ষমতা ও স্বার্থের জন্য মানুষ খুন করা নেশা এবং পেশায় পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার মসনদ গড়ে উঠেছে ন্যায় নীতি এবং জবাবদিহিতার পরিবর্তে স্বেচ্ছাচারিতায়। ঈদকে মুসলমানেরা আনন্দ ও উৎসবের দিন হিসেবে গণ্য করে। আমাদের অনেকের জানা নেই ইবাদত এবং গুনাহ মাফের জন্য উত্তম রাত হল ঈদের রাত। ত্রিশটি রোজা যে শিক্ষা দিয়ে যায় তা ঈদের চাঁদ দেখার সাথে সাথে আমরা ভুলে যাই। রহমত, মাগফিরাত ও নাযাতের ছোঁয়া আমাদের জীবনে লেগেছে কিনা জানিনা।
অথচ খলিফা হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাবের জীবনীতে খুঁজে পাই এক মর্মস্পর্শী ঘটনা- ঈদের জামাতের সময় বয়ে যায়। কিন্তু যিনি ইমামের দায়িত্ব পালন করবেন সেই আমিরুল মু’মিনিন হযরত ওমর (রাঃ) তখনও আসেননি ঈদগাহে। সকলে চিন্তিত, বিচলিত! কোথায় গেলেন খলিফা? অন্বেষণে বের হলেন কয়েকজন। খুঁজতে খুঁজতে এক পর্যায়ে তাকে পাওয়া গেল ক্রন্দনরত অবস্থায় নিজ গৃহের অন্তরীণ এক কক্ষে। দেখা গেল তিনি আল্লাহর দরবারে দু’হাত তুলে অঝোর ধারায় চোখের পানি ফেলছেন। মুনাজাত শেষ হলে প্রশ্ন করা হলো, হে আমিরুল মু’মিনিন! আজ ঈদের দিন, খুশির দিন। অথচ আপনি কাঁদছেন? হযরত ওমর (রাঃ) কান্ন্ াজড়িত কন্ঠে বললেন, আজতো খুশি ঐ ব্যক্তির জন্য যে নিশ্চিত হয়েছে তার বিগত ত্রিশটি রোজা, তারাবীহ, কুরআন তেলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলিল আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে। আমি তো নিশ্চিত হতে পারিনি। আজ গোটা বিশে^ মানুষরূপী হায়নার হুংকারে বিপর্যস্ত মানবতা। কাশ্মীর, ফিলিস্তন, সিরিয়া, মায়ানমারে মুসলমানদের উপর চলছে গণহত্যা। লাখ লাখ শিশু হচ্ছে এতিম। বুলেট, কামান, রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারে বিধ্বস্ত লোকালয়। রমজানের মহিমা এবং ঈদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে প্রজ¦লিত হোক বিশ^ নেতাদের অন্তর। আমাদের প্রত্যাশা খোলাফায়ে রাশেদীনের সেই সোনালী যুগ ফিরে আসুক আবার। ভঙ্গুর সমাজ ব্যবস্থার উপর গড়ে উঠুক সত্যের ইমারত। হিংসা-হানাহানি, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, ভেদাভেদ ভুলে সাম্যের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ভ্রাতৃত্বের ফোয়ারায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক বিশ^ মানবতা। ধরিত্রীতে ফিরে আসুক শান্তির সুবাতাস। ধনাঢ্য, বিত্তবান, সামর্থ্যবানরা এগিয়ে আসুক মানবতার কল্যাণে, ঈদ হোক ঘুমন্ত মানবতার জেগে ওঠার অনুপ্রেরণা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT