বিশেষ সংখ্যা

রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ

নওরোজ জাহান মারুফ প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৬-২০১৮ ইং ০২:০৪:২৯ | সংবাদটি ৬৩ বার পঠিত

যুগ যুগ ধরে মানুষের জন্য আনন্দের বারতা নিয়ে ঈদ আসে। প্রতিবছর পুরো এক মাস সিয়াম সাধনার (রমজান) পর মুসলিম বিশ্বে বর্ণিল ঈদ’ আনন্দ ও খুশির সাওগাত নিয়ে হাজির হয়। মুসলিম উম্মার সবচেয়ে বড় ধর্মীয় এ উৎসবের নাম ঈদ। চন্দ্র মাসের প্রথম শাওয়াল ঈদুল ফিতর। এ দিন মুসলিম বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলিম জাতি মাসব্যাপি রমজানুল মোবারক মানে রোজা পালন শেষে এ দিনের অপেক্ষায় থাকে। মহা ধুমধাম আর মহানন্দের এই ঈদ ধর্মপ্রাণ সব মুসলিমগণ চাঁদ দেখা সাপেক্ষে একসাথে ঈদ পালন করে থাকেন। ঈদের আগের রাতকে এখন বলা হয় চাঁদরাত। ঐ দিনেরও আলাদা মর্তবা আছে। যদিও মানুষ এই চাঁদ রাতে হৈ হুল্লোর করে কাটায়। আসলে ধর্মীয় দিক থেকে এবাদত বন্দেগীর মাঝে রাত কাটানোর তাগিদ আছে। মুসলিমদের জন্য এটা খুবই ফজিলত পূর্ণ রাত। সাধারণত; মানুষ ঈদের চাঁদ দেখা হয়ে গেলেই আনন্দে বিভোর হয়ে যায় আর সারা রমজান মাসের পূর্ণতাকে (এবাদত) প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলে। পবিত্র রমজানুল মোবারকের এই মাসে মহান আল্লাহপাক তাঁর সওয়াবের ভান্ডার ৭০ গুণ বাড়িয়ে দেন। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিগণ আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থেকে সিয়াম সাধনার ব্রত এবং তাকওয়া অর্জনের মহান ইচ্ছা নিয়ে পুরো রমজান মাস বিশেষ করে রমজানের শেষ দশদিন এতেকাফের মাঝে থেকে আল্লাহর দেয়া অসীম সওয়াব গ্রহণ করেন।
আগের দিনের ঈদ আর বর্তমানের ঈদের মাঝে বিস্তর ফারাক লক্ষ করা যায়। আনন্দের এই দিনে শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ, আবাল বৃদ্ধবণিতা এবং মানুষে মানুষে সৌহার্দ ও শান্তি বয়ে নিয়ে আসার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, তাকওয়া অর্জন করেন এটাই সকলের চাওয়া-পাওয়া। ঈদের দিন ভোরে সবাই পুত-পবিত্র হয়ে নতুন জামা-কাপড় পরে মাঠে, ময়দানে বা ঈদগাহের উদ্দেশ্যে পায়ে হেটে গমন করেন। মুসল্লিগণ দু’রাকাত ঈদুল ফিতরের ওয়াজিব নামাজ আদায় করেন আর খুৎবা পাঠের পর বিশ্ব শান্তি তথা সমগ্র বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের মুক্তি কামনায় দোয়া করে থাকেন। তার আগে সাত সকালেই ঈদগাহের উদ্দেশ্যে ঈদের নামাজ আদায় করতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষের ঢল নামে। শিশু থেকে শুরু করে অশিতীপর বৃদ্ধও ঈদের ওয়াজিব নামাজে শরিক হতে ঈদগাহে তসরিক রাখেন। সবার ইচ্ছা থাকে অশেষ সওয়াব হাসিল করা, নামাজ আদায় করা, সালাম করা, ভাববিনিময় আর কোলাকুলি করা এবং কুশল কামনা করা। লাল, নীল, সবুজ বা সাদা ধবধবে কাপড় আর মাথায় নতুন টুপি পরে মুসল্লিগণ ঈদগাহের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। ঈদগাহ ময়দানে অগণিত মানুষের ঢলে ঈদগাহ প্রাঙ্গন যেন মহামিলন মেলায় রূপ লাভ করে।
আগের রাত (চাঁদরাত) সন্ধ্যায় মানুষ ধুম উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে শাওয়ালের এক ফালি চাঁদকে পশ্চিমাকাশে খুজতে ব্যস্ত হয়ে উঠেন এবং নতুন ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় ঈদ উদ্যাপন প্রস্তুতির শেষলগ্ন।
ঈদকে সামনে রেখে পুরো রমজান মাস ব্যাপি এবাদত বন্দেগীর ফাঁক-ফোকরে নারী-পুরুষ ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত হয়ে উঠেন। শিশু-কিশোরসহ সব শ্রেণীর মানুষ সবাই যার যার সাধ্যানুযায়ী কাপড়-চোপড়, পায়জামা-পাঞ্জাবী, টুপি, জুতা-সেন্ডেল, কিলিপ, ফিতা ইত্যাদি কিনতে মার্কেটে মার্কেটে গিয়ে দোকানগুলোতে ধর্না দেন। একটা জিনিস লক্ষ করা গেছে, রোজা বা ঈদকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা সব জিনিসের দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনে উঠে পড়ে লেগে থাকেন। এটা ঠিক নয়। আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন আর সুদকে করেছেন হারাম। কিন্তু ব্যবসার নামে অতিরিক্ত মুনাফা জুলুমের সমান। সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় থাকতে ব্যবসা-বাণিজ্যে আপনি যেটুকু লাভ না করলেই নয় সেরূপ লাভেও আল্লাহর বরকত নিহিত থাকে। পুত পবিত্র এই মাসে অধিক মুনাফা গ্রহণ করে ব্যবসায়ীগণ সিয়াম-সাধনা বা তাকওয়া অর্জনের পরিবর্তে রমজানের মাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেন। এতে ধনী, গরীব, নি¤œ আয়ের মানুষ ঈদের কেনাকাটায় হিমশিম খায়। ঈদকে সামনে রেখে বাজারগুলি অগ্নীমূল্যে পরিণত হয়। সাধারণ মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না ঈদের সময়। আমরা দেখেছি সৌদি আরবে রমজান মাসে নিত্য পণ্যসহ সব জিনিসের দাম কমিয়ে দেয়া হয় অথচ এই পবিত্র মাহে রমজানে আমাদের দেশে ভোগ্যপণ্য সহ যাবতীয় জিনিসের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়া হয় যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। অতিরিক্ত লাভ বা মুনাফা ধর্মের দিক থেকে কতটা গ্রহণযোগ্যতা আছে সেটা ব্যবসায়ীদের ভেবে দেখার খুবই প্রয়োজন আছে।
ঈদের দিনে ছোট বড় ধনী-গরীব সকলেই যার যার মত করে নতুন কাপড় পরে ভালো মন্দ কিছু খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে দিয়ে ঈদ উদ্যাপন করে। এটাই ঈদের রীতি। এখনকার তুলনায় আগেকার দিনের ঈদ ছিল সাদামাটা। তবে প্রাণের উচ্ছ্বাস ছিল, আন্তরিকতা ছিল। ঈদের নামাজ পড়া, কোরমা, পোলাও, সেমাই-পরটা ফিরনী খাওয়া ছিল ঈদের আনন্দ উচ্ছাসের একটা অংশ। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের সাথে ঘুরাঘুরি, বাড়িতে বাড়িতে বেড়ানোই যেন ছিল ঈদের সৌন্দর্য। তাছাড়া গত একযুগ আগেও ঈদের আনন্দের মাঝে ছিল বিটিভি’র নানা অনুষ্ঠান। বাংলাদেশ টেলিভিশনে গান, নৃত্য, নাটক আর সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিল ঈদের আনন্দমেলা। তখন একটাই টিভি ছিল বিটিভি। সাদাকালোর যুগে কোন কোন অনুষ্ঠান কিন্তু রঙ্গিন হত। রাত দশটার ইংরেজী সংবাদের পর শুরু হত আনন্দ মেলা। সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে আনন্দমেলা উপভোগ করতেন। আনন্দ মেলার পর মধ্যরাতে শুরু হত বাংলা ছায়াছবি।
এখন প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। এখন আনন্দ, খুশিতে যেন সেই আগের ফুর্তি বা মজা নেই। কারণ একটাই যুগ পাল্টে গেছে। এখন নয়া জমানা। এখন সবকিছু প্রযুক্তি নির্ভর। এখন ইন্টারনেট সব দখল করে নিয়েছে। সব আনন্দই যেন ইন্টারনেট ভিত্তিক হয়ে গেছে। আইফোন, আইপ্যাড, স্মার্টফোন, ফেসবুক, ডিজিটাল চ্যানেল ইত্যাদি এখন সহজ করে নিয়ে এসেছে ঈদের আনন্দকে। প্রায় সব শ্রেণীর মানুষের চোখ থাকে এখন মোবাইল স্ক্রীনে। স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের বদৌলতে মানুষ এখন থাকে নানামুখী আনন্দে বিভোর। সে কারণে এখন কেউ আর পাড়াপ্রতিবেশীর বাড়ী বা আত্মীয় বাড়ী বেড়াতে যেতে চায় না। আগের সীমিত সুযোগ সুবিধার মধ্যেও মানুষ প্রচুর আনন্দিত হত। পরিতৃপ্ত হত। এখন মানুষ অল্পতে খুশি হতে পারে না। এখন খুশির জোয়ার বিস্তৃত। নানামুখী বিনোদনে মানুষ ব্যস্ত তাই ভিন্ন জনের কাছে ভিন্নভাবে আনন্দও দেখা যায়।
এখনকার ঈদে ঝাকঝমক বেশী, খরচাপাতি বেশী, সুযোগ সুবিধাও বেশী তারপরও কেন জানি সেই পুরনো ঈদের আমেজ বা রেশ চোখের সামনে ভেসে উঠে! এখন সবকিছু সব সময় নাগালের মধ্যে মিলে যায়। ঈদ যে বাড়তি একটা কিছু মনেই হয় না অনেক সময়। পরিবর্তনটা এখন চোখে লাগে বেশী। বেশী চাওয়া-পাওয়া ঠিক নয়। সীমা থাকা ভাল। পবিত্র কোরআন কারীমে পরিষ্কারভাবে বলা আছে তোমরা সীমা লঙ্গন করনা, আল্লাহ সীমা লঙ্গনকারীকে পছন্দ করেন না। ঈদের সেকাল-একালের ফারাকটাই এখন বেশী মনে হয়। তবুও যার যার মত সবার ঈদ আনন্দের হোক, ঈদ হোক বিশ্ব শান্তি ও সমৃদ্ধির।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT