বিশেষ সংখ্যা

ছেলেবেলার ঈদ

সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৬-২০১৮ ইং ০২:০৫:০১ | সংবাদটি ৩৪১ বার পঠিত

অনেকদিনের অভ্যাস, ঈদের দিন ঈদগাহ থেকে ফিরে ঘুমিয়ে থাকি সারাদিন। মনে মনে বলি, প্রকৃত অর্থে আমার কোন ঈদ নেই। ঈদ উপলক্ষে নেই কোন আনন্দ। যখন ছোট ছিলাম, অবোধ-নির্বোধ ছিলাম, তখন ঈদে আমার আনন্দ খুব ছিলো। আমার বাড়ির পাশে এশিয়ার সবচে আকর্ষণীয় ঈদগাহÑসিলেটের শাহি ঈদগাহ। এই ঈদগাহ মোগল কালেক্টর ফরহাদ খার সময়ে তাঁর নিজের উদ্যোগে করা। ঈদগাকে নতুন সাজে সাজানোর জন্য অনেকেই চেষ্টা করেছেন পুরাতন স্ট্রাকচার ভেঙে নতুন করতে, কিন্তু ঈদগাহ কমিটি এতে রাজি হননি। ঐতিহ্য রক্ষার জন্য ঈদগাহ কমিটি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন। বিগত প্রায় ষাট বছর থেকে একই পরিবারে রয়েছে এই ইদগাহের মুতাল্লির দায়িত্ব। কাজিটুলার হাজী মোবারক বক্ত (র.)-এর পরিবার। আমি কাজিটুলার হাজী মোবারক বক্ত (র.)-কে খুব কাছ থেকে দেখেছি। তিনি একজন আল্লাহর খাছ লোক ছিলেন। উলামায়ে কেরাম বিশেষ করে আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (র.), হাফেজ মাওলানা আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়া (র.), মাওলানা আব্দুল্লাহ শায়খে হরিপুরী (র.) প্রমুখের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিলো। তখন সিলেট শহরে এত মাদরাসা কিংবা আলেম-উলামাদের বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিলো না। বেশিরভাগ আলেম সিলেট আসলে থাকতেন হাজী মোবারক মিয়ার হোটেল মোবারকে। অনেক আলেম আমাদের বাসায়, হাওয়াপাড়ায় হাজী গোলজার মিয়া মরহুমের বাসায়, ফাজিলচিশত হাজী সোলেমান খান মরহুমের বাসায় থাকতেন। দরগাহ মাদরাসা কেন্দ্রিক বিদেশী আলেমরা থাকতেন মহিসুন্নাহ চৌধুরী অর্থাৎ সুন্নত চৌধুরী মরহুমের বাসায়। তবে বেশির ভাগে থাকতেন হোটেল মোবারকে। হাজী সাহেব তখন বন্দরবাজার জামে মসজিদের মুতাওয়াল্লিও ছিলেন।
আমাদের ছোটবেলা বন্দরবাজার জামে মসজিদের খতিব ছিলেন আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (র.)। তবে তাঁকে নিয়ে আমার স্মৃতি-বিস্মৃতি একাকার হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন থেকে ঈদগাহের ইমামতির একটি নিয়ম হলো যিনি সিলেট বন্দরবাজার জামে মসজিদের খতিব, তিনি ঈদগাহেরও ইমাম এবং খতিব। আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (র.)-এর ইন্তেকালের পর কিছুদিন এই দায়িত্বে ছিলে শায়খুল হাদিস শফিকুল হক আকুনি (র.)। এরপর এই দায়িত্বে আসেন শায়খ আব্দুল্লাহ হরিপুরী (র.)। তাঁর সময়টা আমাদের পূর্ণাঙ্গ স্মরণে রয়েছে। সেই সময়েও কিছু দিন হাজী মোবারক বক্ত বেঁচে ছিলেন। হাজী সাহেবের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলেরা একের পর এক মুতাল্লির দায়িত্ব আদায় করে যাচ্ছেন।
শায়খ আব্দুল্লাহ হরিপুরী (র.) আজীবন ঈদগাহর খতিব ছিলেন। তাঁর দেহের গঠন ছিলো আরও দশজন বাঙালি থেকে ভিন্ন। তিনি বেশ লম্বা প্রকৃতির ছিলেন। শহরে রিক্সায় বসলে তাঁকে বেশ দূর থেকে দেখা যেতো। পরিচিত কেউ কেউ তাকে এ যুগের ওমর বলতেন। তাঁর উচ্চতা ছিলো ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। বুকের চওড়া ছিলো ১৬ ইঞ্চি, বের ছিলো ৪২ ইঞ্চি। তাঁর গায়ের রঙ মায়াবী কালো ছিলো, যেন নূর চমকাতো। ঘরের বাইরে তিনি সার্বক্ষণিক মাথায় রুমাল রাখতেন। তিনি সবসময় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতেন। কোন প্রকার নোঙরামি তাঁর মধ্যে কোনদিন দেখা যায়নি। মনে হতো তিনি খুব নরম তবিয়তের, বাস্তবে তিনি ছিলেন দৃঢ় এবং প্রত্যয়ী মানুষ। সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় বয়ান করতেন। বয়ানে আঞ্চলিক অনেক নি¤œমানের শব্দ থাকতো। তবে শ্রোতাদের কাছে সেগুলো উচ্চমার্গীয় হয়ে যেতো তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, আমল এবং জ্ঞানের গভীরতার কারণে। তিনি কারো মুখ দেখে কথা বলতেন না। মন্ত্রী, এমপি কিংবা বৃত্তশালীদেরকেও তিনি কথা বলতে একটুও কাপতেন না। তাঁর জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিলো সৎসাহস। শাহী ঈদগাহে ঈদের জামায়াতে সিলেটের মন্ত্রী, এমপি, নেতা, আমলা, প্রশাসনিক ব্যক্তি, ধনী উপস্থিত থাকেন। তিনি এদের সামনেই এদের সমালোচনা করতেন। চাকুরীর ভয়, প্রাণের ভয় কিংবা পদ-পদবী আর অর্থের লোভ তাঁর মধ্যে ছিলো না। মোটকথা জ্ঞানী মানুষের যত বৈশিষ্ট্য, সবগুলোই তাঁর মধ্যে ছিলো।
শায়েখ আব্দুল্লাহ হরিপুরী (র.) ইন্তেকালের পর ঈদগাহের খতিব হন মাওলানা আব্দুর রহমান, তাঁর বাড়িও কানাইঘাট এবং তাঁর বাবার নাম মুশাহিদ। তিনি আমাদের বাসায় ভাড়া থাকতেন এবং এখানেই তাঁর ইন্তেকাল হয়। তাঁর সাথে আমার খুব গভীর সম্পর্ক ছিলো। মাওলানা আব্দুর রহমানের ইন্তেকালের পর তাঁর আপন ভাই এবং মাওলানা মুশতাক খান হলেন জামে মসজিদ এবং ঈদগাহর খতিব।
আমাদের এলাকার নাম শাহি ঈদগাহ, এই ঈদগার নামে। ছোটবেলা ঈদের দিনে আমাদের মনে কত আনন্দ খেলতো। আমরা ঈদের আগের রাতে মহল্লার সবার ঘরে ঘরে দলবেধে ঘুরতাম। মা, চাচি, খালা, আপারা পিঠা তৈরি করতেন, আমরা সেগুলো দেখতাম। তখন আজকের মতো বাড়িতে বাড়িতে দেওয়াল ছিলো না। আমাদের মহল্লায় রাত থেকেই উৎসব জমে উঠে শাহী ঈদগাহকে কেন্দ্র করে। দুদিন আগ থেকে লেগে যেত ঈদগাহের পরিস্কারের কাজ, মাইক তৈরি করা ইত্যাদি। ঈদ উপলক্ষে বিশাল মেলা জমে উঠতো। আগের রাতে প্রচুর দোকান আসতে রাস্তার দু’ দিকে। আমরা ঈদের জামায়াত শেষে দোকানে দোকানে ঘুরতাম এবং আইসক্রিম, চালতার আচার, হজমি ইত্যাদি খরিদ করে খেতাম। বিভিন্ন রকমের খেলনা খরিদ করতাম। তখন ক্লাস টুর পাঠ্য বইতে একটা পাঠ ছিলো, ‘আজ ঈদ, মদীনার ঘরে ঘরে আনন্দ...। ঈদের দিনে মনে হতো আজ ঈদ, বাংলার ঘরে ঘরে আনন্দ। কিন্তু বড় হয়ে এই আনন্দ আর ধরে রাখতে পারিনি। এখন যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই দারিদ্রের অভিশাপে মানুষের আর্তচিৎকার। মানুষের ঘরে ভাত নেই, কাপড় নেই, চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, স্কুলে পড়ার খরচ নেই, মেয়ে বিয়ে দিতে টাকা নেই, আর ঈদের দিনে মিথ্যা চিৎকার রামজানেরই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।
মনের দিকে আমি কোন অন্ধ নই, আমি চোখ বন্ধ করলেও মনোচোখে দেখি। এ দেশের বড়লাট নেতারা এসির ভেতর থেকে বলতে পারেন দারিদ্র স্পর্শ করে না আমাদের দেশ ও জাতিকে, কিন্তু আমার তো কোন চোখই বন্ধ নয়। আমি তো আমার ছোটবেলার মতো নির্বোধ আনন্দ-উপভোগী নই। আমি তো দেখছি কতটুকু আমাদের গরীবত্ব আল্লাহ প্রদত্ত আর কতটুকু আমাদের হর্তাকর্তাদের কর্তৃক তৈরিকৃত। নিজেদের নেতা-কর্তাদের কর্তৃক তৈরিকৃত দারিদ্রের অভিশাপে মানুষ যখন আর্তচিৎকার করে তখন চোখকে বলি তুমি অন্ধ হও আর কানকে বলি হও বধির। কারণ, আমার করার কিছু নেই। কেন নেই? কারণ ওদের সাথে এদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পারেননি, আমি তো পুঁটি মাছ।
দীর্ঘ দুই শ’ বছর যুদ্ধ ও আন্দোলন সংগ্রাম এবং ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে নয় মাস ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধ করে আমরা স্বাধীন হলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। আমাদের স্বপ্ন ছিলো অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে সুখ-শান্তি। কিন্তু আমরা তা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছি সঠিক নেতৃত্বের অভাবে। বাঙলার স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা আমাকে বারবার নাড়িয়ে যায়। তিনি ১১ জানুয়ারি ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে কুমিল্লায় বাংলাদেশ সামরিক একাডেমির প্রথম ব্যাচের শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘নিশ্চয় ইনশাল্লাহ পারবো এই বাংলার বুক থেকে দুর্নীতিবাজ, ঘোষখোর, মুনাফাখোর, চোরাচালানিদের নির্মূল করতে। কয়েকটা চোরাকারবারী, মুনাফাখোর, ঘোষখোর দেশের বাইরে সম্পদ দিয়া আসে, জিনিসের দাম বৃদ্ধি করে মানুষকে না খাবিয়ে মারে, ওদেরকে নির্মূল করতে হবে’। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘এ জন্য জীবন যৌবন নষ্ট করি নাই, এ জন্য শহীদরা রক্ত দিয়ে যায় নাই। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, তোমরাও প্রতিজ্ঞা নাও, বাংলার জনগণও প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করো। ওদেরকে উৎখাত করতে হবে বাংলার বুক থেকে। দেখি ওরা কতদুর টিকতে পারে। চোরের শক্তি বেশি না ঈমানদারের শক্তি বেশি আজ প্রমাণ হয়ে যাবে।’
বঙ্গবন্ধুর বলেছিলেন, ‘চোরের শক্তি বেশি না ঈমানদারের শক্তি বেশি আজ প্রমাণ হয়ে যাবে’। তিনি স্বপরিবারে প্রাণ দিলেন, অতঃপর কি প্রমাণিত হলো? বঙ্গবন্ধুর এই বক্তব্যটা কানে বারবার ধ্বনিত হয়। এই বছরই তাঁকে স্বপরিবারে হত্যা করা হলো। অতঃপর ইচ্ছে করে বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করি, বলুন হে স্থপতি, এদেশে কার শক্তি বেশি; চোরের না ঈমানদারের? হে স্থপতি আজও কি এখানে দূর্নীতিবাজ, ঘোষকুর, মুনাফাকুর, চোরাচালানিদের শক্তি বেশি নয়?

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT