সম্পাদকীয়

কে ভেজাল-খাদ্য নাকি মানুষ?

রুদমিলা মাহবুব প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৬-২০১৮ ইং ০২:০৯:৩৪ | সংবাদটি ৬০ বার পঠিত

‘ভেজাল ভেজাল ভেজালরে ভাই, ভেজাল সারা দেশটায়, ভেজাল ছাড়া খাঁটি জিনিস মিলবে নাকো চেষ্টায়!’ সুকান্ত ভট্টাচার্য যেন বর্তমান সময়কে উৎসর্গ করেই লিখেছিলেন ‘ভেজাল’ কবিতাটি, যার প্রতিটি লাইন চিত্রিত করে আমাদের বর্তমান অবস্থাকে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫নং অনুচ্ছেদে খাদ্যকে জীবনের মৌলিক উপকরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও ব্যক্তিস্বার্থের জন্য তা এখন পরিণত হয়েছে অখাদ্যে। নিত্যদিনের চাল, ডাল, মাছ, মাংস, শাক-সবজি থেকে শুরু করে মিষ্টি বা ফলমূল, রান্নায় ব্যবহূত মসলা কোনো কিছুই এর ঊর্ধ্বে নয়। এমনকি খাঁটি শব্দটি বললে যে দুধের কথা আমাদের মাথায় আসে সেই দুধেও ভেজাল।
সম্প্রতি ঢাকা সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের পরীক্ষায় উঠে এসেছে খাদ্যে ভেজালের ভয়াবহ চিত্র। খাদ্যে ব্যবহূত হচ্ছে মনোসোডিয়াম, ইথোফেন, কার্বাইড, ফরমালিন, ইউরিয়া, ডিডিটি, ন্যাপথলিনসহ নানা রাসায়নিক পদার্থ যা মানবদেহের জন্য হুমকিস্বরূপ। ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী যে সাইক্লোমেটকে খাদ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, খাবারকে সুস্বাদু করার জন্য তা এখন ব্যবহূত হচ্ছে এদেশে। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল এবং সরকারি হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। ভেজাল খাদ্য আর কীটনাশকের বরাতে এ সংখ্যা বছরে দঁড়িয়েছে ৮৪ হাজারে। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা (ডব্লিওএইচও) এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য মতে, খাদ্যে বিষক্রিয়ায় বাংলাদেশে প্রতিবছর ৪৫ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন রোগে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গবেষণায় বর্তমানে লিভার, কিডনি ও হূদরোগে আক্রান্ত হবার জন্য বিষাক্ত খাদ্যকে দায়ী করা হয়েছে। আর মানবদেহের প্রায় ৮০% রোগের জন্য দায়ী করা হয়েছে অনিরাপদ খাদ্য ও পানিকে।
মানুষের প্রতি গ্রাম রক্তে ০.২ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত জৈবযৌগ সহনীয় হলেও বাংলাদেশের মানুষের শরীরে তার পরিমাণ বহুগুণ বেশি। এমনকি মুরগির মাংসে মানবদেহের সহনীয় মাত্রার চেয়ে ১৩৬ গুণ বেশি ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। আরও আশঙ্কার বিষয় হলো, মানবদেহে সর্বোচ্চ ৫০০-১০০০ মাত্রার এন্টিবায়োটিক দেওয়া হলেও বয়লার মুরগিতে এর পরিমাণ ২০০০ এমজি। ফলে একজন ভোক্তা যখন এ খাদ্যটি দীর্ঘসময় ধরে গ্রহণ করেন তখন তার শরীরে এন্টি এন্টিবায়োটিক রেসিস্টেন্স তৈরি হয়, ফলে কোনো ধরনের এন্টিবায়োটিক তার শরীরে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করতে না পারার কারণে ধীরে ধীরে সে অগ্রসর হয় চরম পরিণতির দিকে। এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে আমাদের উটপাখি সাজার প্রবণতা, উপরের দিকে তাকিয়ে হাঁটার অভ্যাস, যেন সবকিছু চলছে স্বাভাবিকভাবেই। বাঙালির এই উদাসীনতা দেখেই বুঝি রবিঠাকুর লিখেছিলেন ‘আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান/ প্রাণেরও আশা ছেড়ে সঁপেছি প্রাণ’।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যানানুযায়ী দেশটির ১ কোটিরও বেশি মানুষ ১০০ বছর বাঁচে তাদের উন্নত জীবন ব্যবস্থা ও চিকিত্সার কল্যাণে, পক্ষান্তরে ভেজালের জালে জড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষের আয়ু যেন থমকে গেছে। মজার বিষয় হলো, একজন বিক্রেতা ভোক্তার কাছে ভেজাল খাদ্য বিক্রিত অর্থ দিয়ে নিজ পরিবারের জন্য যে খাদ্যটি কিনেন তাতেও ভেজাল। এ যেন ‘চালাক-বোকা’-র খেলা। আজকাল মাছে অনেক সময় ফরমালিনের অস্তিত্বই পাওয়া যায় না কারণ ৫ পিপিএম এর নিচে ফরমালিন দিলে শনাক্তকারী সরঞ্জাম দিয়ে তা শনাক্তকরণ সম্ভব নয়। ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ যেন একেই বলে। সর্বশেষ ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯’-তেও শাস্তির বিধান রয়েছে। অতিসম্প্রতি শাস্তি বাড়িয়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই) আইন ২০১৮-র খসড়া অনুমোদিত হয়েছে মন্ত্রিসভায় যা এতদিন ১৯৮৫ সালে জারি করা একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে চলছিল। নতুন আইনের ২৭-ধারায় লাইসেন্স ছাড়া স্ট্যান্ডার্ড মার্ক ব্যবহার করলে সর্বনিম্ন দুই বছরের জেল এবং সর্বোচ্চ ১ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয়দ-ের বিধান হয়েছে। অর্থাত্ আইন বাংলাদেশেও আছে কিন্তু প্রয়োজন এর সঠিক প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা। এক্ষেত্রে খুচরা বাজার তদারকির পাশাপাশি প্রয়োজন আমদানিকৃত সামগ্রী দেশে আনার পর যেখান থেকে সরবরাহ করা হয় সেখানে পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা থাকা।
সর্বোপরি সংবিধানের ১৮নং অনুচ্ছেদে জনগণের পুষ্টিস্তর ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নকে রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্য বলে উল্লেখ করলেও জনগণের সচেষ্ট সচেতনতা এবং উদ্যোগ এক্ষেত্রে পালন করতে পারে সহায়ক ভূমিকা।
লেখক : প্রভাষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT