সম্পাদকীয়

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাস্থ্যবীমা

প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৬-২০১৮ ইং ০১:৩৫:৪২ | সংবাদটি ১৪১ বার পঠিত

সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু করার কথা বছর কয়েক ধরে শোনা গেলেও তার বাস্তবায়ন নেই। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় মুষ্টিমেয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরীক্ষামূলক এই বীমা চালু করা হলেও তা স্থায়ী রূপ পায়নি। বলা যায় এটি এখনও পরীক্ষাগারে। বিদেশী অর্থায়নে ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি’ নামে দেশের হতদরিদ্র মানুষের জন্য হেলথ কার্ড দেয়া হচ্ছে দেশে একটি অঞ্চলে। পরীক্ষামূলকভাবে টাঙ্গাইল জেলার তিনটি উপজেলার এক লাখ মানুষের মধ্যে দেয়া হচ্ছে এই কার্ড। এর আওতায় কার্ডধারী প্রত্যেক পরিবারকে বছরে এক হাজার টাকা প্রিমিয়াম দেয়া হবে। কার্ডধারীরা ৫০টি রোগের সেবা পাবেন উপজেলা ও জেলা হাসপাতাল থেকে। তাছাড়া স্বাস্থ্য অর্থ ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী দেশের এক শতাংশের কম মানুষ স্বাস্থ্যবীমার আওতায় এসেছে। কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট হাউস ও বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু রাখলেও এসব বীমায় সব ধরনের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিতে পারছেনা। এছাড়া, ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আসার প্রবণতা নেই বললেই চলে।
চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষজন। বিশেষ করে সীমিত আয়ের লোকজন চিকিৎসার জন্য নিজেরা আলাদা করে কোন টাকা বরাদ্দ রাখেনা। ফলে জরুরি চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে তাদের হিমশিম খেতে হয়। জানা গেছে, এদেশে স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে বছরে ৬৪ লাখ মানুষ গরীব থেকে আরও গরীব হচ্ছে। এর মধ্যে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে ১৫ শতাংশ মানুষ। কারণ, এদেশের মানুষের স্বাস্থ্যব্যয়ের ৬৭ শতাংশ নিজের পকেট থেকেই করতে হয়। এই প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যখাতকে বীমার আওতায় নিয়ে আসার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞগণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়ন করতে হলে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি নিশ্চিত করতে হবে। দেশের কোন মানুষ যেন চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত না হয় সেজন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু করা খুবই জরুরি। স্বাস্থ্যবীমা করার উদ্দেশ্যই হচ্ছে ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যয় মেটানো। স্বাস্থ্য সেবার সামগ্রিক ঝুঁকি ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ব্যয়ের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী একজন বীমাকারী বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যবীমা গ্রহণ করতে পারেন।
বিশ্বের অনেক দেশেই স্বাস্থ্য বীমা চালু রয়েছে অনেকদিন ধরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা মূলত বেসরকারি স্বাস্থ্যবীমার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যা বেশিরভাগ আমেরিকানের জন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির মূল উৎস। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস একটি সরকারিভাবে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। যেখানে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী সবাই স্বাভাবিকভাবেই এই স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকেন। পার্শ্ববর্তী ভারতেও বেশ কিছু স্বাস্থ্যবীমা চালু রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যবীমা ‘যোজনা’। প্রকল্পটি দরিদ্র মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। সেখানে গরীব মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসা পাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে। নেপালেও আছে সর্বজনীন স্বাস্থ্যবীমা। কিন্তু আমরা এর থেকে পিছিয়ে।
বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ। দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। কমছে দারিদ্র্যের হার। মূলত এই ধরনের মুখরোচক কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার কিছুটা হলেও উন্নতি হয়েছে। কিন্তু নানা ক্ষেত্রে এখনও পিছিয়ে রয়েছি আমরা। বিশেষ করে চিকিৎসা ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি আশানুরূপ। সরকারি চিকিৎসা সেবা প্রত্যাশিতভাবে না পেয়ে মানুষ শরণাপন্ন হচ্ছে বেসরকারি খাতের। আর তাই বেসরকারি ব্যয়বহুল সেবা নিতে গিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। অনেকে জমানো অর্থ সম্পদ বিক্রি করে চিকিৎসা ব্যয় মেটাচ্ছে। এই অবস্থায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যবীমার আওতায় নিয়ে এসে চিকিৎসা সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা জরুরি। আমরা আশা করি সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সবার আগে স্বাস্থ্যবীমাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT