ইতিহাস ও ঐতিহ্য

জীবন নিয়ে খেলছেন এডলিন মালাকারা

তাজুল মোহাম্মদ প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৬-২০১৮ ইং ০১:৩৬:৩১ | সংবাদটি ৭৭ বার পঠিত

১৯৭১ সাল। বাঙালির জীবনে সর্বাধিক ভয়ানক সময়। প্রাণের মায়ায় সেদিন সে সময় এডলিন মালাকার হয়েছিলেন মিসেস আহমেদ। ছেলে সৌমিত্র মালাকার সাগর এবং সুপ্রিয় মালাকার শুভও থাকলেন না স্ব নামে। রাজনীতি কিংবা ধর্ম বিষয়ে সম্যক জ্ঞান অর্জনের আগেই পরিবর্তন করতে হলো নাম। হয়ে গেলেন তারা যথাক্রমে শাহীন আহমেদ ও শামীম আহমেদ। তাদের পিতা তখন ভারতের জমিনে অবস্থান করে করে মুক্তিযুদ্ধের নানা পর্যায়ে কাজ করেছেন। মা ও দু ছেলে আহমেদ নাম ধারণ করে যেতেন স্কুলে। শিক্ষার আলো বিতরণ করতেন মা। আর ছেলেরা গ্রহণ করতেন শিক্ষা। কিন্তু পাকিস্তানিরা তা পছন্দ করতো না। ওরা চায় না জ্ঞানের আলোক রশ্মি ছড়িয়ে পড়–ক বাঙালির ঘরে ঘরে। তাতে তাদের বড়ই অসুবিধে। মানুষকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন রেখে, ধর্মীয় উন্মাদনায় বিভোর করে শোষণ করা খুবই সহজ। শিক্ষিত মানুষদের যা করা এতোটা সহজ হবে না। তাই, শিক্ষিতদের উপর ক্ষোভ ছিল অধিক পরিমাণে। প্রথম প্রহরেই আক্রমন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর হল সমূহ, আবাসিক শিক্ষকদের ওপর। হত্যা করেছে, অধ্যাপক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিকদের। অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবিরা থাকলেন হত্যা তালিকাল ওপরে। কে জানে শিল্পী গোপেশ মালাকার ও তাঁর স্ত্রী এডলিন মালাকারের নামও তালিকায় ছিলো কি না। তবে, তাদের বাসস্থান তেজগাঁওয়ের তেজকুনি পাড়ায় গিয়েছে সৈন্যরা। বাড়িওয়ালার কাছে জানতে চেয়েছে গোপেশ মালাকারের অবস্থান। সংবাদ শুনে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলেন সাবেক মন্ত্রি এবং আওয়ামী লীগ নেতা নূরুর রহমান চৌধুরী ও নাসির উদ্দিন। নূরুর রহমান ছিলেন গোপেশ মালাকারের পরম সুহৃদ এবং নাসির তাঁর বন্ধু (শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের শ্যালক)। পাঠিয়ে দিলেন তাঁকে ভারতে। এরও অনেক আগে অর্থাৎ ২৭ মার্চ থেকেই গোপেশ মালাকার-এডলিন মালাকার দু’পুত্র নিয়ে অবস্থান করছিলেন ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ৭ নম্বর রোডে নূরুর রহমান চৌধুরীর বাড়িতে। কিন্তু নিরাপদ ভাবতে পারেননি কেউ-ই নিজেকে। নুরুর রহমান চৌধুরী দু’ ছেলে রুহেল আহমদ চৌধুরী বাবু এবং সোহেল আহমদ চৌধুরী সোহেল তখন প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।
বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণা করে অফিস-আদালত, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান সবই বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এক সময় প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে খোলা হয় স্কুল-কলেজ। এডলিন মালাকার শিক্ষকতা করতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদয়ন স্কুলে। সে স্কুলও খোলে গেছে। যদিও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সংখ্যা অতি অল্প। কিন্তু স্কুলে যাতায়াত করা কঠিন। এমনিতেই রাস্তায়-রাস্তায় চেক পোস্ট। পরিচয়পত্র দেখাতে হয়ে স্থানে স্থানে। তার ওপর এডলিন মালাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য। যাদের সহ্য করতে পারে না পাকিস্তানিরা। ওরা মনে করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক মানেই আওয়ামী লীগের ভোটার। পাকিস্তানের সংহতি বিরোধী, বাংলাদেশের স্বাধীনতাপন্থি। তাই, কাতারে কাতারে হত্যা করছে সংখ্যালঘুদের। আর, এডলিন মালাকার শুধু আর্ট ইন্সটিটিউট থেকে পাশ করা শিল্পী বা উদয়ন স্কুলের শিক্ষকই নন। রয়েছে তাঁর আরো অনেক পরিচয়। তিনি রাজনীতি সচেতন এবং পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত। পরোক্ষ এবং কখনো কখনো প্রত্যক্ষভাবে কাজ করছেন পার্টির। যে কারণে বিপদ তাঁর জন্যে অনেক বেশি। তা হলে কি স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেবেন? ভারতে চলে যাবেন স্বামীর কাছে? তা তো করা যাবে না।
ঢাকা শহরে অপারেশনে অংশ নেবার আগে পরে বহু সোনার ছেলে আশ্রয় পেয়েছেন এসব মায়েদের কাছে। মায়েরাও আশ্রয় দিয়েছেন তাদেরকে সন্তান ভেবে। এসব কাজের জন্য ছুটোছুটি করতে হয়েছে এডলিন মালাকারকে নানা স্থানে। এর জন্যে প্রয়োজন ছিলো পরিচয়পত্র বা আইডেনটিটি কার্ড। পাকিস্তানীরা উর্দু ভাষায় বলতো ডান্ডি কার্ড। আর এডলিন মালাকার তখনই হয়ে যান মিসেস আহমেদ। ছেলেদেরও করে নিলেন শাহিন আহমেদ ও শামীম আহমেদ। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী এডলিন মালাকার তখনই হয়ে যান মুসলিম নামের আদলে মিসেস আহমেদ।
মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন গ্রুপ দেশের ভেতরে প্রবেশ করতে থাকে। এক সময় ঢাকা নগরীতেও অবস্থান নিতে থাকেন সোনার ছেলেরা। তাদের থাকা-খাওয়া অর্থের যোগান দেয়া এসব কাজ করেছেন দেশের ভেতরে অবস্থানরত স্বাধীনতাপন্থিরা। এমনিতেও ভারতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে অর্থ সংগ্রহ অভিযান চলেছে সব সময় এবং খুবই গোপনে। সে কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন এডলিন মালাকার প্রথম থেকেই। আর গোপনীয়তা রক্ষা করে অর্থ সংগ্রহ করার অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর আগে থেকেই। কমিউনিস্ট পার্টির জন্যে করেছেন তা অনেকবার। অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি বিতরণ করতেন গোপন পত্রিকা। ভারত থেকে প্রকাশিত এসব পত্রিকা আন্ডারগ্রাউন্ড পথে আসতো দেশের ভেতর। তারপর প্রবেশ করতো ঢাকা নগরীতেও। এ কাজটি করতে গিয়ে এক সময় পৌঁছে যান জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
এডলিন মালাকার ছিলেন গাড়িতে। সেই যন্ত্রদানবের পেটের ভেতরে করে বহন করছেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের পত্রিকা। পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে রেখে আসছেন তা নির্দিষ্ট স্থানে। প্রায়ই করতেন এ কাজটি তিনি। কিন্তু সে দিন পড়ে গেলেন বিপদে। চলতে চলতেই প্রত্যক্ষ করলেন সামনে রাজাকার বাহিনীর চেকপোস্ট। চেক করছে ওরা প্রতিটি যানবাহন। কোথাও কোথাও ভেতর থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দেহ তল্লাশী করছে। তা হলে কি হবে? যদি গাড়ি তল্লাশী করে রাজাকাররা কিংবা পাকিস্তানী সেনা সদস্যরা? এ ক্ষেত্রে অবধারিত ভাবেই মৃত্যু। এডলিন মালাকার দেখলেন আগ-পিছ। প্রত্যক্ষ করে নেন ডান-বাম। কিন্তু বেরিয়ে যাবার উপায় নেই কোনো। যেখানে পৌঁছেছেন সেখান থেকে পেছনে বা ডানে বায়ে যাবার কোনো উপায় নেই। গত্যন্তর নেই সামনে অগ্রসর হওয়া ব্যতিত। কি আর করা, ঈশ্বরের নাম নিয়ে বসে থাকেন নির্বিকারভাবে। বুকের ভেতর তোলপাড় হোক বাইরে থাকলেন একেবারেই শান্ত হয়ে। যেন পরোয়া করেন না কিছুই।
গাড়ির গতি একেবারেই কম। সামনে অগ্রসর হচ্ছে ধীর গতিতে। ডানে একটু পর পরই খাকি পোশাকপরা চকচকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে রাজাকার সদস্য। একটু পর পরই রাজাকার। দেখলেন ডান ও বাম দিকেও রাজাকার। ইচ্ছে করলেও এখন আর পালাবার সুযোগ নেই। ধুক ধুক করছে বুক। পত্রিকাগুলো কি ফেলে দেবেন। হঠাৎ এমন কথাও মনে হয়েছে। তা তো হবার জো নেই আর। তখন সেটি করতে গেলেই বিপদে পড়ে যেতেন সেদিন। আর নেমে যাওয়া, পত্রিকা ফেলে দেয়া, গাড়ি ঘুরিয়ে নেয়া কারো বাড়িতে প্রবেশ-এ সবই ছিল বিক্ষিপ্ত মনের এলোমেলো ভাবনা। হয়তো এ সব নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেছেন আপন মনে। এমন কি গাড়ি চালকের সঙ্গেঁও শেয়ার করেন নি কিছুই। যানখানার গতি মন্থর হলো আরো একটু। সামনে অনেকগুলো গাড়ি। প্রতিটি তন্নতন্ন করে তল্লাশী করে তবেই ছাড়ছে। কাউকে কাউকে আটকে দিচ্ছে রাজাকার সদস্যরা। কোনো কোনো গাড়ির যাত্রীকে রেখে গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে। কি ভয়াবহ অবস্থা। ভাবতেই পারছেন না যেন এডলিন মালাকার। শুকিয়ে গেছে গলা। অস্থির লাগছে নিজের মনে। কিন্তু বাইরে থাকতে হচ্ছে একেবারে স্বাভাবিক। এসে গেছেন চেকিং পয়েন্টে। তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ওরা গাড়ির ভেতর। এডিলন মালাকার একেবারেই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেন। চালকের প্রতি নির্দেশ ওদের নামতে হবে গাড়ি থেকে। আর সাথে নিতে হবে ড্রাইভিং লাইসেন্স। তা করলেন চালক। সবই সম্পন্ন হচ্ছে নিরবে। পরখ করে দেখলো ওদের লাইসেন্স। আরো যেন কি কি। দু’একটি প্রশ্নও করলো তাঁকে। তারপর চলে যাবার নির্দেশ। মুক্তির আনন্দে আত্মহারা এডলিন মালাকার। তা ও বাইরে প্রকাশ করা যাবে না। মুখ ফোটে বললেন না কিছু। যেভাবে ছিলেন বসে সেভাবেই থাকলেন তিনি গাড়িতে। টের পেলোনা কেউ গাড়ি তল্লাশী করলে কি পেতো ওরা এবং এর পরিণতি কি হতে পারতো। জানতে দিলেন না চালাককেও। মনে মনে ধন্যবাদ জানালেন শুধু ঈশ্বরকে।
শীত আসার অনেক আগে থেকেই শীতের প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন অনেকেই। ১৯৭১ সালের শরতেরও আগ থেকে এডলিন মালাকার শুরু করেন শীত মোকাবেলা করার প্রস্তুতি। শীতের বস্ত্র বুনতে আরম্ভ করছেন। না, নিজের তরে নয়। সোয়েটার, মাফলার, গলাবন্ধ, গ্লাভস ইত্যাদি তৈরি করে চলেছেন মুক্তিসেনাদের জন্যে। ওগুলো পাঠাবেন ভারতে। ব্যবহার করবে মুক্তিযোদ্ধারা। তিনি একা নন- সহকর্মীদের দ্বারাও তা করিয়ে নিয়েছেন গোপনে গোপনে। বাড়িতে যতোক্ষণ থাকতেন, ততোক্ষণই সেলাই করতেন উলের সোয়েটার বা মাফলার। স্কুলের পথেও সঙ্গে থাকতো সুঁই-সূতো। একটি ক্লাস শেষ করে অন্য ক্লাস শুরুর আগে অবধি চালিয়ে যেতেন এই কাজ। সহকর্মিরা দেখতেন। অনেকেই বুঝতেন। তাদের কেউ কেউ উদ্বুদ্ধ হয়েছেন-নিজেও কাজটি ধরেছেন। অবদান রেখেছেন তারাও। আবার বাঁকা চোখে তাকাবার মতো সহকর্মিরও অভাব ছিলো না। সেটিও বিপদমুক্ত ছিলো না। তবে, বড় রকমের বিপদ আসার আগেই অর্জিত হয়ে যায় স্বাধীনতা। এ প্রসঙ্গে এডলিন মালাকার জানান তাঁর দু’জন সহকর্মির কথা। ওরা দু’বোন। ওদের পিতা পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক মূখ্যমন্ত্রি নুরুল আমিন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকালের মূখ্যমন্ত্রি ১৯৭১ সালে শান্তি কমিটির প্রভাবশালী কেন্দ্রিয় নেতা। পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর সমস্ত যুদ্ধপরাধমূলক কর্মকান্ডের সমর্থক এবং সহযোগী। কিন্তু মেয়েরা সব জেনেও কোনো সমস্যা করেন নি। এমনকি এডলিন মালাকারকে ছদ্মনামে ডান্ডি কার্ড তৈরি করার কাজে সহায়তা দিয়েছেন। ওরা দু’বোনই (সেলিনা খান রুনু এবং হালিমা কবির রেখা) উদয়ন স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। রেখাতো প্রিন্সিপাল হয়েছিলেন। আর এই যে বুনন কাজ সেটি সে সময়ই শিখিয়ে দিয়ে ছিলেন শহীদ ডাঃ আলীম উদ্দিন চৌধুরীর শাশুড়ি স্মৃতিকনা দেব।
মালাকার দম্পতির কনিষ্ঠ সন্তান শুভ। বয়স ৬ বছর। সে বয়সেই এঁকেছেন প্রচুর ছবি। অসহযোগ আন্দোলনকালের মিছিলের ছবি, ইয়াহইয়া খানের বিকৃত ছবি। আরো কতো কি। কিন্তু ২৫ মার্চের পর সে সব ছবি পিতার নির্দেশে একটি গর্তে ফেলে দেয়া হয়। শিল্পী দম্পতির সন্তান হয়েও শুভ রক্ষা করতে পারেন নি নিজের শিল্পকর্ম। এই যে দীর্ঘকাল জেলখাটা পিতা তিনিও প্রাণের ভয়ে ধ্বংস করে ফেলেন পুত্রের অসাধারণ সব শিল্পকর্ম। এর জন্যে দুঃখ বোধ রয়েছে শিল্পী এডলিন মালাকারের। বাড়ির ছাদ থেকে স্বাধীন বাংলার পতাকা নামাতেও কষ্ট পেয়েছিলেন তিনি।
ধানমন্ডিতে অপারেশন চালায় মুক্তিযোদ্ধারা। মারা গেছে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা। কে জানে সে অপারেশনে থাকতে পারে নূরুর রহমান সাহেবের পুত্র বাবু, সোহেল বা দু’জনই। রাতেই ক্যাপ্টেন (নূরুর রহমান চৌধুরীর ছদ্মনাম) সতর্ক করে দিলেন আমাদের সবাইকে। বললেন পাকিস্তানি আর্মি আসতে পারে বাড়িতে। তাদের প্রশ্নের কি কি উত্তর দিতে হবে তাও বলে দেন। ভোর হতে না হতেই তিনি ডেকে পাঠান আমাদেরকে নিচে। সবাই থাকলাম বারান্দায়। ক্যাপ্টেন গেইটে। ঠিকই আসলো পাকি সৈন্যরা। উর্দু ভাষায় বাতচিত করলেন ক্যাপ্টেন। মুক্তি, বাংলাদেশপন্থি হিন্দু ও ভারত নিয়ে কৃত্রিম বিশোধগার তাঁর। পাকিস্তানির চেয়েও বড় পাকিস্তানি হিসেবে নিজে প্রতিপন্ন করার প্রয়াস। নিখুঁত অভিনয় তাঁর। বিশ্বাস করতেই হলো পাকিদের। আমাদেরকে দেখিয়ে বললেন, দেখো ওরা আমার আত্মীয়। দুষ্কৃতিকারীদের ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছে সবাই। অভয় দিয়ে চলে গেলো হানাদার সৈন্যরা। আর আমাদের ক্যাপ্টেনের উপস্থিত বুদ্ধি এবং নিখুঁত অভিনয়ের কারণে প্রাণ রক্ষা পেলো এতোগুলো লোকের।
ভয়াবহ অভিজ্ঞতার ঝাপি খুলে ধরেন এডলিন মালাকার। প্রকাশ হতে থাকে সে সব দিনের নানা ঘটনা দুর্ঘটনার কথা এবং ঘটনা থেকে সঞ্চিত অভিজ্ঞতার গাথা। প্রচন্ড যুদ্ধ হয়েছে মুক্তিবাহিনী এবং পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর মধ্যে। সে যুদ্ধে শহীদ হলেন ঢাকা কোম্পানী বা ক্র্যাক প্ল্যাটুন কমান্ডার রেজাউল করিম মানিক, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু এবং তাদের গ্রুপের অন্যান্য সদস্যরা।
বিপদ কখনো একা আসে না। আর ১৯৭১ সালের প্রতিটি দিন প্রতিটি মূহূর্ত কেটেছে আতঙ্কে। প্রতিটি মুহূর্তে সৃষ্টি হয়েছে নানা রকম বিপদ। আমার ছেলে সাগরকে সাঁতার শেখাতে চান নূরুর রহমান। প্রতিদিন তাকে নিয়ে নামতেন পুকুরে। আর মজা পুকুরের পানি গেছে পেটে। ফলশ্রুতিতে আক্রান্ত হয় প্যারা টাইফয়েডে। দৌঁড়াতে হলো হাসপাতালে। ছদ্মনামে নিতে হয়েছে তাকে চিকিৎসা। তারপর আবার চেয়ার থেকে পড়ে হাত ভেঙে ফেলে ছোট ছেলে শুভ। আরো বড় বিপদ। বলতে হবে কেমন করে হাত ভাঙলো। দু’ ভাই মারামারি করে তা করেছে বলে প্রতিষ্ঠা পাইয়ে দিয়েছি। কিন্তু কথাগুলো যতো সহজে বলা যাচ্ছে কাজগুলো ততো সহজ ছিলো না। জীবন বাজি রেখেই করতে হয়েছে। যেমন জীবন নিয়ে খেলা।
শ্যামলী চৌধুরীর বাড়িতে দেখা দিয়েছিল অন্য একটি বিপত্তি। সে বাড়ির নিচ তলায় তখন উঠেছে মাওলানা আব্দুল মান্নান। সাগরকে ওরা দেখেছে। পরিচয় জানতে চেয়েছে। সন্দেহ ও করেছে ওরা। এভাবেই দিন গড়িয়ে দিন আসতে থাকে। আসে ডিসেম্বর। তখন আর বাড়িটি নিরাপদ ছিলো না। ক্যাপ্টেন নিজেও উঠলেন জাতিসংঘ অফিসে। আমরা সবাই মনসুর সাহেবের বাড়িতে। আরো পরে পাগলার উল্টো দিকে বাঘৈর গ্রামে। নাসির উদ্দিন সাহেবের সমন্ধির বাড়িতে উঠলাম নাসির উদ্দিনের পরিবারসহ। প্রচুর লোক বাড়িতে উঠেন। রাতে আবার সেখানে আসতেন মুক্তিযোদ্ধারা। দিনের বেলা রাজাকারদের আনাগোনা। মুক্তিযোদ্ধারা তখন কোথায় যে চলে যেতো। রাজাকাররা হম্বি তম্বি করে বলতো- তোমরা মুক্তিদের খাওয়াচ্ছ এবং হাগাচ্ছ। সবই আমরা জানি। এর পরিণাম ভালো হবে না। এ সবের মধ্যে কাটিয়েছেন নয় মাস সময়।
এডলিন মালাকারের পৈত্রিক নিবাস নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ উপজেলায়। সেখানকার করপাড়া গ্রামের ডানিয়েল ডায়াস ও এলমি ডায়াসের সন্তান। জন্ম ১৯৩৯ সালের ৩রা মে। ৩২ বছর বয়সে ২ সন্তান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে এভাবেই অবদান রেখেছেন তিনি। খেলেছেন জীবনকে হাতে নিয়ে। তিনি বলেন, স্বামী-স্ত্রী দু’জনই ছিলেন চারুকলা থেকে পাশ করা শিল্পী। তাদের সন্তান শুভ সেই বয়সেই একেঁছিল অনেকগুলো ছবি। যা রক্ষা করতে পারেন নি মুক্তিযুদ্ধের কারণে। এ কষ্ট এখনও কুরে কুরে খাচ্ছে তাঁকে। পুত্র শুভ নিজেও কষ্ট পান সেই ছবিগুলোর জন্য।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • উনিশ শতকে সিলেটের সংবাদপত্র
  • হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশঝাড় চাষের নেই উদ্যোগ
  • হারিয়ে যাচ্ছে বেদে সম্প্রদায়ের চিকিৎসা ও ঐতিহ্য
  • একটি হাওরের অতীত ঐতিহ্য
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • Developed by: Sparkle IT