ইতিহাস ও ঐতিহ্য

জামালপুর একটি সমৃদ্ধ জনপদ

মোহাম্মদ জুয়েল প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৬-২০১৮ ইং ০১:৩৬:৫৬ | সংবাদটি ১৩৯ বার পঠিত

বালাগঞ্জ উপজেলার দেওয়ান বাজার ইউনিয়নের একটি প্রাচীন জনপদের নাম জামালপুর। ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে ওলিকুল শিরোমনি হযরত শাহজালাল (রহ.) সিলেট আগমন করেন। ইতিহাস বলে ১৩০৩ সালে হযরত শাহজালাল (রহ.) এবং সেনাপতি সিকন্দর গাজীর নিকট রাজা গোবিন্দ পরাজয় বরণ করলে পরেই তৎকালীন গৌড় রাজ্য মুসলমানদের দখলে আসে। কথিত আছে হযরত শাহজালাল (রহ.) এর সঙ্গি আউলিয়ার কারণেই সিলেটকে তিন’শো ষাট আউলিয়ার দেশ হিসেবে আমরা বলে থাকি। হযরত শাহ্ জালাল (রহ.) সফর সঙ্গী ৩৬০ আউলিয়াগণ সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। ৩৬০ আউলিয়ার বেশ কয়েকজন ওলি আউলিয়ার মাজার বালাগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে। এসব আউলিয়াদের নামে অনেক গ্রামের নামকরণ হয়েছে। হযরত শাহ্ জামাল (রহ.) মাজার জামালপুর গ্রামের মসজিদের পাশ্বে রয়েছে। হযরত শাহ্জামাল (রহ.) নামানুসারে জামালপুর গ্রামের নামকরণ হয়েছে। গহরপুরের মধ্যে আয়তন ও জনসংখ্যার দিক দিয়ে জামালপুর একটি বৃহৎ ও সমৃদ্ধ গ্রাম। মহান মুক্তিযুদ্ধে জামালপুর গ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। জামালপুর গ্রামে ১০ জন ব্যক্তি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। জাতির এ শ্রেষ্ঠ সন্তানগণ জীবন বাজী রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে গ্রামকে আলোকিত করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে জামালপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁরা হলেন; বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত আখতার আহমদ, প্রয়াত আব্দুল খালিক চৌধুরী, প্রয়াত মোঃ আজিজুর রহমান আজিজ, আলহাজ্ব আব্দুল খালিক, মনির উদ্দিন আহমদ, মজির উদ্দিন আহমদ, মোঃ আব্দুল মন্নান, প্রয়াত চান্দ আলী, হোসেন আলী ও আফতাব আলী। সময়ের প্রয়োজনে এবং আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তি, মূল খুঁজে পেতে যাতে সহজ হয়; সেজন্যে সেই সব মহান ব্যক্তিবর্গের মধ্যে থেকেই কিছু কিছু উপস্থাপন করার ক্ষুদ্র প্রচেষ্ঠা আমার। সিলেটের রাজনীতির অঙ্গনে একজন সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আখতার আহমেদের নামটি উচ্চারিত হয়। তিনি ১৯৪৩ সালের ২৪জুলাই সিঙ্গাপুরের একটি ব্যাংকারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিলেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিল, ৬দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের আইয়ুব খাঁন বিরোধী গণআন্দোলন সহ সিলেটের ন্যায্য দাবি দাওয়া আদায়ে প্রথম সারির নেতা ছিলেন। ১৯৬৬-৬৭ সালে বৃহত্তর সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট (বি.এল.এফ) সিলেট জেলা প্রধান হিসাবে ভারতের দেরাদুন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুজিব বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আখতার আহমদ একজন সৎ, চরিত্রবান নীতি নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন নেতা হিসেবে দলমত নির্বিশেষে সকল মহলের কাছে সমাদৃত ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন।
তিনি ১৯৮৬ সালে ৫ আগস্ট মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় লন্ডনের রয়েল ফ্রি হাসপাতালে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্ত্রী শামীম আক্তার একজন শিক্ষিকা। তিনি জাসদ সিলেট জেলা কমিটির সাথে সংশ্লিষ্ট। বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালিক চৌধুরী ১লা এপ্রিল ১৯৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৯ সালে সদর মহকুমা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। বালাগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ৪ঠা মে ২০০৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার পুত্র আবু জায়েদ চৌধুরী রাহী জাতীয় ক্রিকেট দলের অন্যতম খেলোয়ার। বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আজিজুর রহমান আজিজ, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ বিমান সিলেটে চাকুরী করেন। তিনি ৪ আগস্ট ২০১০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। আলহাজ্ব আব্দুল খালিক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর পিতা মৌলভী আব্দুল মুতলিব। তিনি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুক্তরাজ্যে চলে যান। মনির উদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় সৈনিক ছিলেন। তাঁর পিতা হাজী নূর মুহাম্মদ। তিনি সপরিবারে আমেরিকায় বসবাস করছেন। তাঁরই ভ্রাতা মজির উদ্দিন আহমদ, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ৩১ আগস্ট ১৯৫৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অফিস স্টেশনারী আমদানীকারক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক, অংশীদারী শিল্প প্রতিষ্ঠান মাওলা জুট মিল লিঃ এর চেয়ারম্যান। মোঃ আব্দুল মন্নান বীর মুক্তিযোদ্ধা তিনি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বেশ কিছু দিন জার্মানীতে ছিলেন। দেশে এলে বালাগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এডভোকেট নূর উদ্দিন আহমদ, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সদস্য। তিনি ষ্টেশন ক্লাব লিমিটেডে’র প্রাক্তন সভাপতি ছিলেন। তাঁরই অনুজ সিলেটের সাংবাদিকতার উজ্জ্বল নক্ষত্র মহিউদ্দিন শীরু ২৫শে জুলাই ১৯৫৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিলেট প্রেস ক্লাবের দু’বার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৩ সাল থেকে (প্রতিষ্ঠালগ্ন) বালাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৯ সালে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্ত্রী হাসিনা বেগম চৌধুরী ‘সাপ্তাহিক গ্রাম সুরমা’ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। তিনি সিলেট বিভাগীয় মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক। জামালপুর গ্রামে অনেক গুণীজন তাঁদের নিজ নিজ প্রতিভা দিয়ে এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রেখে গেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রয়াত মুহাম্মদ গোলাম জকি, প্রয়াত আজির উদ্দিন আহমদ, প্রয়াত আফতাব উদ্দিন আহমদ, প্রয়াত হাজী নূর মুহাম্মদ, মন্তাজ আলী মাষ্টার, হাজী নুরুর রহমান (নুনু মিয়া), জমির আহমদ চৌধুরী (এলেমান মিয়া), ওয়াহিদুর রহমান চৌধুরী, খছরুজ্জামান চৌধুরী, সমুজ আলী প্রমুখ। প্রয়াত মোঃ আব্দুল মতিন একজন শিক্ষাবিদ। তিনি দেওয়ান আব্দুর রহিম হাই স্কুল এন্ড কলেজের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তাঁরই ভ্রাতা আব্দুর রশিদ (কুতুব) দেওয়ান বাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।
মোঃ সাদিক উদ্দিন তিনি নগরীর সৈয়দ হাতিম আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক। তাঁরই ভ্রাতা মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম বাংলাদেশ ব্যাংক সিলেট শাখার উপ-ব্যবস্থাপক ছিলেন। তিনি বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী। মো. আব্দুল মুকিত আজাদ গোয়ালাবাজার মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ। হাফিজ মাওলানা আজিজুর রহমান একজন আলেম। তিনি রায়পুর মামরকপুর মাদরাসার শিক্ষক। এডভোকেট মইনুল হক ফারুক আইনজীবী। তিনি জজ কোর্ট সিলেটে এপিপির দায়িত্ব পালন করছেন। এডভোকেট মোহাম্মদ জুয়েল, জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর উপজেলা আইনজীবী পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক। এছাড়া জামালপুর গ্রামের প্রবাসীরা এলাকার শিক্ষাসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে সহিদ আহমদ চৌধুরী (রেহাদ) শাহ্ জামাল (রহ.) নূরীয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও ভূমিদাতা। তিনি দেওয়ান আব্দুর রহিম স্কুল এন্ড কলেজের আজীবন দাতা। আব্দুল বাহার শেলু ও মোহাম্মদ বাহরাম খান দেওয়ান আব্দুর রহিম হাই স্কুল এন্ড কলেজের আজীবন দাতা। মো. মিনার আলী দেওয়ান আব্দুর রহিম হাই স্কুল এন্ড কলেজ উন্নয়ন কমিটি ইউ.কে’র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও অত্র প্রতিষ্ঠানের আজীবন সদস্য। মিসবাহ উর রহমান উদ্যমী সমাজসেবক। তিনি বার্মিংহাম সিটি যুবলীগের প্রাক্তন সভাপতি। মো. শরিফ সাত্তার, ইংল্যান্ডে পি.এইচ.ডি করেছেন। তাঁর ভ্রাতা মো. তোফায়েল সাত্তার সলিসিটর। খিজির আহমদ লন্ডন সিটি যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। মো. তজম্মুল আলী বালাগঞ্জ উপজেলা দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ও দেওয়ান আব্দুর রহিম হাই স্কুল এন্ড কলেজ গভর্ণিং বডির সদস্য। মো. মাহমুদ আলী (কাচা) দেওয়ান বাজার ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক। মো. আলাউদ্দিন, শিক্ষক এইডেড হাইস্কুল, সিলেট। মো. মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সাখায়াত হোসেন সুমন বেসরকারি ব্যাংক অফিসার। এমরানুর রহমান ইমরান, বালাগঞ্জ উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার যুগ্ম সম্পাদক। সিরমান উদ্দিন, ক্রীড়া ও যুব সংগঠক। তিনি দেওয়ান বাজার ইউনিয়ন ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক। ঐতিহ্যবাহী এ গ্রামে জামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাহ্জামাল রহ. দারুস সুন্নাহ ইসলামীয়া মাদরাসা, জামালপুর ডাকঘর-৩১২৮ ও কমিউনিটি ক্লিনিক ছাড়া সরকারি বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। পরিশেষে আমি আশা করবো আগামী প্রজন্ম জামালপুরের সুনাম বৃদ্ধি করে জামালপুরের ঐতিহ্য আরো সুদৃঢ় করবে।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • সিলেটে মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সাহিত্য সাময়িকী
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • Developed by: Sparkle IT