শিশু মেলা

দাদুর ইশকুল

এম আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৬-২০১৮ ইং ০৩:০১:০২ | সংবাদটি ২২৪ বার পঠিত

পাঁচ বছরের সাল্লুকে নিয়ে দাদু গেলেন স্কুলে। বহুদিন হয় স্কুলে যাননি তিনি। সেই যে বি.এ পাশ করে চাকরি ধরলেন আর স্কুলমুখী হননি তিনি। বাচ্চা কাচ্চা স্কুলে ভর্তি, বইখাতা কেনা, সংসারের খরচ সবই করতেন দাদী। দাদু সেই ভোর সাতটায় বের হতেন আর ঘরে ফিরতেন সন্ধ্যে সাতটায়। মাস শেষে যা পেতেন তাই তুলে দিতেন ওনার স্ত্রীর হাতে। দীর্ঘ বত্রিশ বছর চাকরি করে রিটায়ার করেছেন। এখন হাতে অফুরন্ত অবসর। এরই মধ্যে সালাউদ্দিন সাল্লু স্কুল উপযোগী হয়েছে। ছেলের ঘরের নাতি। এই কাজ পাগল লোক হয়ে উঠলেন নাতি পাগল। ওকে খাওয়ানো পরানো, খেলানো, পড়ানো সবই যেন সমজে নিলেন। ভর্তিটা অবশ্য দাদীই করে দিলেন বাসা থেকে অনতি দূরে একটা কিন্ডার গার্টেন স্কুলে। এখন নাতিকে স্কুলে আনা নেয়ায় দায়িত্ব দাদুর।
এই প্রথম ঢুকলেন সাল্লুকে নিয়ে ক্লাসে। বাহঃ চমৎকার। ক্লাসের দেয়ালে দেয়ালে কি চমৎকার ফুল-পাখি-প্রজাপতির ছবি। বাংলা ইংরেজি অক্ষর অবিন্যস্ত করে লেখা। বেঞ্চ-ডেস্ক নেই। চেয়ার আর টেবিল। টেবিল চারকোণা নয় গোল। গোলটেবিল সেটি। দাদু গোলটেবিল বৈঠকের কথা শুনেছেন। কিন্তু সাল্লু যে ক্লাস গোল টেবিলে করবে, তা ছিল ধারণার বাইরে। টেবিলের নিচে ব্যাগ রাখার স্থান। আহারে। কী সুন্দর! দাদুর মনে হল তিনি নিজেই আবার ভর্তি হয়ে যান এই স্কুলে। উপরে ঝুলানো ফ্যান। তরতর করে ঘুরছে। সবাই যার যার শিক্ষার্থী নিয়ে এসেছেন। দাদু গুণে দেখলেন মাত্র চৌদ্দজন। আরও দুটো চেয়ার খালি। অর্থাৎ ১৬ জনেই ক্লাস সীমাবদ্ধ। আহ আমাদের সময় যদি এমন হত, কতই না মজা হত। এরই মধ্যে এক ষোড়শী তন্বী ক্লাসের সামনে আসলেন। সকল অভিভাবক বেরিয়ে যেতে উদ্যোগী হলেন। কিন্তু বাচ্চারা অনেককেই ছাড়ছে না। কাপড় ধরে রেখেছে। অর্থাৎ ওর সাথে ক্লাসে বসে থাকতে হবে অভিভাবককে। সাল্লুকে বুঝিয়ে সুজিয়ে দাদু বেরিয়ে এলেন। বললেন বাইরে দাঁড়ানো আছি। কোন অসুবিধা হলে আমাকে বলো। সাল্লু বলল- আচ্ছা।
দাদু বাইরে থেকে শুনেন ম্যাডামের ক্লাস সামলানো বাক্য। কত দরদ ভরা সে কন্ঠ। মায়াময় কথাবার্তা। তোমার নাম কি বলতো? সাল্লু বলে- আমার নাম সালাউদ্দিন। বাঃ বেশ সুন্দর নামতো। তোমার নাম কী- নাবিলা। এভাবে তিনি পরিচিত হন সবার সাথে। দাদু অভিভাবকদের শেডে বসে ভাবেন তার ছোট্ট বেলার সেই পাঠশালার কথা। আহমদপুর পাঠশালা। তার এখনও মনে আছে সেই প্রথম শ্রেণিতে যেদিন ভর্তি হন সেই দিনকার কথা। তখন তো আর ঘড়ি ছিল না সবার ঘরে। দু’একজন ছাড়া বাকী সবাই আন্দাজমত চলত। এই ধরো সূর্যের আলো ঘরের মাঝামাঝি এলে স্কুলে যাবার সময় হলো। গোসল করে প্রস্তুত হতেন তিনি। হ্যাঁ কেরোলিনের একটি শার্ট ছিল। দাদুর দাদু সেটি লন্ডন থেকে এনছিলেন। দাদুর সাথে দাদুর ভাইও স্কুলে যেতেন দু’জন প্রস্তুত হয়ে বই আর স্লেট-পেন্সিল নিয়ে আনন্দ যাত্রা করলেন স্কুলে গিয়েই সে আনন্দ মাটি হয়ে গেল। ১ম শ্রেণিতে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা প্রায় ৬০ জন। সীমিত বেঞ্চে সবাই বসেছে ডেস্ক নেই। নতুন আরো যারা আসছে- তাদের বসার জন্য কয়েকটি ইটের ব্যবস্থা হল। ইটে বসার কথা মনে হতেই দাদু আপনা থেকে হেসে উঠলেন। পাশে বসা অভিভাবকরা তার দিকে তাকালেন। একজন জিজ্ঞেস করলেন- কি ব্যাপার খুব খুশি মনে হচ্ছে। তিনিও তার নাতনিকে নিয়ে স্কুলে এসেছেন। দাদু বললেন না এমনিই। একটা কথা মনে পড়ে গেল। কি কথা। ঐ ছেলে বেলার একটি কথা। উনি বললেন ও আচ্ছা। এরকম আমারও মনে পড়ে। আমিও মাঝে মধ্যে আনমনা হয়ে যাই। কি থেকে কি করে বসি। বয়স হয়ে গেলে মনে হয় এরকমই হয়।
দাদু বললেন-দেখছেন কি সুন্দর ব্যবস্থা। আমাদের সময় কি এরকম ছিল? মোটেই না। আমরা বড় কষ্ট করে লেখা পড়া করেছি। স্কুলে বেঞ্চ-ডেস্ক ছিল সীমিত। কতগুলো ভাঙ্গা। স্কুলের চালা ছিল টিনের। কিন্তু বেড়া ছিল বাঁশের। অর্থাৎ বাঁশ হতে বেত বের করে সেই বেত দিয়ে তৈরি হতো বেড়া। সেই বেড়ার ফাঁক দিয়ে বাইরের অনেক কিছুই দেখা যেত। দরজা ছিল না। স্কুল ছুটি হয়ে গেলে স্কুল ঘর ছিল অরক্ষিত। বৃষ্টি বাদলে গরু-বকরি হরহামেশাই ঢুকত স্কুল ঘরে। বেশির ভাগ বকরি ঢুকত বলে- সবাই এর নাম দিয়েছিল বকরি স্কুল। এটা শুনেই অন্য অভিভাবক হাসতে হাসতে খুন। হ্যাঁ আমিও গ্রামের স্কুলে পড়েছি। স্কুলের বদনাম এরকম পশুর নামেই হতো। তবে মাস্টার বাবুদের আন্তরিকতার কমতি ছিল না। মাথা দুলিয়ে সায় দিলেন দাদু। তবে আমার এক ঘটনার কথা বলি- সেদিন ছিল সোমবার। রবিবারে স্কুল বন্ধ থাকতো হ্যাঁ। হ্যাঁ। তাতো জানি। অন্যজন কথাতে সায় দিলেন। আমি ও আমার ভাই খুব ভোরে উঠে স্কুলে গেলাম। তখনও স্কুলে কেউ আসেনি। আমাদের ক্লাসে ঢুকে দেখি শুধু পায়খানার গন্ধ। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি-ক্লাসের মাঝখানে কোন আদমের সন্তান পায়খানা করে রেখে গেছে। আমি আর আমার ছোট ভাই- তৎক্ষণাৎ ক্লাস থেকে বেরিয়ে এলাম। ছোট ভাই বলল ভাইয়া এতদিন শুনলাম গরু-বকরি ঢুকে আর পায়খানা করে এখন দেখি মানুষও ঢুকে আর পায়খানা করে। তাহলে মানুষ আর গরু-বকরিতে পার্থক্য কি? মনে হয় ওদের বাড়িতে লেট্রিন নেই। তাই এ কাজটি করেছে।
সেদিন মাস্টার মশাই নিজ হাতে কোদাল দিয়ে পায়খানা সাফ করতে দেখেছি। কিন্তু কোন বিরক্তি তাঁর মাঝে দেখিনি। হয়ত তিনি মানুষরূপী পশুকে পশুই ভেবেছেন। তিনি তো পশু মানুষ করার জন্যই মাস্টারি নিয়েছেন। কাজেই এটাও তাঁর দায়িত্বে বর্তায়। ১ম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সেখানে পড়েছিলাম। এই পাঁচটি বছরে শিক্ষকদের অনেক চড়াই উৎরাই পেরোতে দেখেছি। ঝড়ে একবার স্কুল খানা ভেঙে পড়েছিল। সেজন্য ক’দিন আমরা স্কুলে যাইনি। মাস্টার মশাই বিভিন্ন গ্রাম থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে সে ঘর আবার মেরামত করেছিলেন। আমরাও ঝাড় হতে একটা বাঁশ দিয়েছিলাম। দাদু থামলেন। নাবিলার অভিভাবক প্রশ্ন করলেন। আপনারা কতজন প্রাইমারি পাশ করেছিলেন? মাত্র একজন। আর সে হচ্ছি আমি। বাকীগুলো কোথায় গেল? বাকীগুলো ঝরে পড়েছে। ১ম শ্রেণি হতে ২য় শ্রেণিতে উঠতেই অর্ধেক উধাও। আবার ২য় শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে উঠতেই আরও অর্ধেক উধাও। অর্থাৎ চতুর্থ শ্রেণিতে উঠলাম মাত্র সাত জন। আর পঞ্চম শ্রেণি পাশ করে বের হলাম মাত্র একজন। এইভাবে প্রাইমারি পাশ করে বের হওয়া বেশ কঠিন ছিল। নাবিলার অভিভাবক আরেকটি প্রশ্ন করলেন-এত ছাত্র ঝরে পড়ার কারণ কি ছিল? দাদু বললেন-অভিভাবকরা মোটেই সচেতন ছিলেন না। ওরা পড়ালেখায় খোঁজ খবর নিতেন খুব কম। অনেকে দু’চার টাকা ফিও দিতে পারতেন না। লোকেদের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। মাস্টাররা পড়া আদায় করতে বল প্রয়োগে প্রাধান্য দিতেন। তাই অনেকে শাস্তির ভয়ে স্কুল ছেড়ে দিত। তবে যারা টিকে যেত তারা খুব ভালোভাবেই পাশ করত। পাঠশালা পাশ করেও সে অনেক জ্ঞান অর্জন করতে পারত।
নাবিলার অভিভাবক বললেন ঠিকই বলেছেন। ওরা স্কুল শুরু করেছিলেন বলেই আজ আমাদের সন্তান আমাদের নাতি নাতনিরা একটা পর্যায়ে এসেছে। আজ সবাই সচেতন হয়েছে। আজকে আর স্কুল পালাতে হয় না। শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক সবকিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তন এসেছে চিন্তা চেতনায়। আমাদের নাতি নাতনিরা যে সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে আমরা তা পেলে আরো অনেক এগিয়ে যেতে পারতাম। যাই হোক-আজকের স্কুলগুলো দেখে বুক ভরে যায়। সময়ে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। মাস্টার মশাইকে আর পায়খানা সাফ করতে হয় না। আর পশুর বাচ্চাকে মানুষ করতে হয় না। এখন মানুষের বাচ্চাকেই আরও উন্নতর মানুষ বানাতে চেষ্টা করা হচ্ছে। উন্নত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে একটা ডিজিটাল আধুনিক সোনার বাংলায় সোনার মানুষ গড়তে শিক্ষকরা বদ্ধপরিকর।
ইতোমধ্যে ঘন্টা বেজে উঠল। ছুটির ঘন্টা। দাদু গল্পে গল্পে ঠিক সময় পার করলেন। সাল্লু ছুটে এল দাদুর কাছে ব্যাগ নিয়ে। ম্যাডাম ব্যাগটাও ঠিক করে দিয়েছেন। সাল্লু বলে দাদু কাল থেকে তুমি আর আমার সাথে এসো না। দাদু বললেন কেন? সবার আম্মু কাছে বসা থাকে, আর তুমি কিনা ঐ দূরে বসেছ। কাল আম্মুকে নিয়ে ইশকুলে আসব। দাদু মনে মনে খুবই ব্যথা পেলেন। এতটুকু ছেলে বলে কী? বুকে একটা ব্যথা চিন চিনিয়ে উঠে। যাদের জন্য বাঁচা, ওদেরই পর হয়ে গেলাম? যতটুকু সাল্লুকে ভালবাসি ততটুকু ওর বাপকেও বাসিনি। দাদু ভাবেন আদরে আদরে মাথায় তুলেছি। তাইতো ওর এত সাহস। চিন্তায় চিন্তায় বাড়ি পৌঁছে গেলেন দাদু। সারা পথ জুড়ে একটি কথাও বলল না সাল্লু। পরদিন ভোরে সাল্লু মায়ের আঁচল ধরে স্কুলে গেল। দাদু পিছনে চেয়ে রইলেন। চশমার ফাঁকে আঙ্গুল ঢুকিয়ে চোখ মুছলেন। ও যেন চাকরি হারানোর অশ্রু...

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT