শিশু মেলা

তেজপাতা গাছ

মুনশি আলিম প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৬-২০১৮ ইং ০৩:০১:১৭ | সংবাদটি ১১৪ বার পঠিত

রণি খুব ডানপিটে ছেলে। পরিবারের কারও কথাই সে গুরুত্ব দেয় না। নিজের মতো করেই চলতে চায়। একদিন সূর্য উঠার আগেই রণির ঘুম ভেঙে গেল। চোখ কচলাতে কচলাতে সে ডানেবামে তাকায়। সকলেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রণি চুপি চুপি উঠে দাঁড়াল। পরিবারের কাউকে কিছু বললো না। একটি পুরানো পলিথিন ব্যাগ হাতে নিয়ে চুপিচুপি বেরিয়ে গেল। পেছন থেকে মা রুবিনা ঘুমালু স্বরে বললোÑও মোর বাপ, এত সোহালে কনে যাচ্ছিস? রণি কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করল না। হনহন করে বেরিয়ে গেল।
চার বাসা পরেই আহাদ মঞ্জিল। তিনতলা বাসা। দেখতে বেশ সুন্দর। বারান্দার সামনে সারি সারি ফুলের গাছ। উত্তর দিকে রয়েছে কিছুসংখ্যক ভেষজ গাছ। বাড়ির মালিক লন্ডন যাওয়ার আগে একটি তেজপাতা গাছও রোপণ করেছিল। কয়েক বছরের মধ্যেই সে গাছটি বেশ সতেজ ও হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠেছে।
রণি চুপি চুপি সে গাছের নিচে এলো। নিচে পড়ে থাকা সবগুলো তেজপাতাই সে কুড়িয়ে নিল। এরপর চারদিকে ভালো করে তাকায়। না কোথাও কেউ নেই। তেজপাতা গাছটি আলতো করে ঝাঁকুনি দেয়। কিছু পাতা পড়ে। সে আবারও কুড়ায়। কিন্তু এতে তার মন ভরে না। সে ভাঙা পাথরের কিছু টুকরা সংগ্রহ করে। পাতার দিকে ঢিল ছুঁড়ে। এলোপাথাড়ি ঢিল! একটি ঢিল গাছের পাতা ভেদ করে দ্বিতীয় তলায় জানালায় গিয়ে লাগে। মুহূর্তেই বিকট শব্দ হয়। কাঁচের জানালাটি ভেঙে খানখান হয়ে যায়। বাসার মালিকের স্ত্রী ঘুম থেকে চেঁচিয়ে ওঠে। দরজা খুলে বাইরে তাকায়। কোথাও কেউ নেই। রাগে গড়গড় করতে থাকে। শেষটায় এলোপাথাড়ি বকাঝকা করতে করতে ভিতরে চলে যায়।
এভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। পরের সপ্তাহ। শুক্রবার। খুব ভোরে রণি এসে হাজির। যথারীতি গাছের নিচের কাঁচাপাকা তেজপাতা কুড়াতে লাগল। আশেপাশে ভালো করে তাকাল। ঘুম থেকে জেগে উঠা কোনো মানুষের আওয়াজ পাওয়া গেল না। সে সাহস করে আবারও ভাঙা পাথরের টুকরো হাতে নিল। অনুমতি ছাড়া অন্যের জিনিস ছিঁড়ে নেওয়া যে অন্যায় এ তার মাথাই এলো না।
সবুজ পাতায় গাছটি ছিল একেবারেই কানায় কানায় পূর্ণ। তবে বেশি পাতা ছিল উত্তরদিকে। একেবারে পাতার ঝোঁকা! সাহস করে সে ঝোঁকার দিকেই ঢিল ছুঁড়ল। মুহূর্তেই ঢিলটি পাতার ঝোঁকা ভেদ করে গেইটের কাছে গিয়ে পড়ল। আবছা অন্ধকারে কেউ একজন উহ্ করে উঠল।
রণি প্রচ- ভয় পেয়ে গেল। পাতার ঝোঁকার দিকে এখন তার কোনো খেয়াল নেই। তার পা কাঁপছে। আজ বুঝি আর রক্ষে নেই! ভয়ে ভয়ে সে মাথা উঁচু করে। দেখে গেটের কাছে এক মহিলা দাঁড়িয়ে রয়েছে। চোখ ভালো করে কচলিয়ে আবারও তাকায়। মহিলার কপাল ফেটে অঝোর ধারায় রক্ত বের হচ্ছে। তেজপাতার ব্যাগ ফেলে সে দৌড়ে মহিলার কাছে যায়। মহিলাকে জড়িয়ে ধরে বলেÑমা, মাগো, আমার ভুল অইয়া গেছে। আমি আর এইসব করুম না। রণিও কাঁদতে থাকে। বোবাকান্না। রণির অনুশোচনায় মা খুশি হলেন। নিজের মাথা ফাটার বেদনা ভুলে রণিকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। অভয়ের স্বরে বলেনÑআয় বাপ, ঘরে যাই।
অন্যের ক্ষতি করতে গেলে যে নিজের ক্ষতি হয় এটা সে এখন ভালোভাবেই জেনে গেল। এরপর আর কোনোদিনই তাকে তেজপাতা গাছের নিচে দেখা যায়নি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT