উপ সম্পাদকীয়

সামাজিক অবক্ষয় এবং এর প্রতিকার

আবু মালিহা প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৬-২০১৮ ইং ০৩:০১:৩৫ | সংবাদটি ২৭ বার পঠিত

ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ একটি রাষ্ট্রের সমন্বিত রূপ। সমাজের শিক্ষা, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি একটি রাষ্ট্রের সফল পরিচালনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রভাব এবং ভূমিকা রাখে। সামাজিক জীবন যত বেশী সমৃদ্ধশালী হবে, একটি রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা তত বেশী সফল হবে। বিশ্বে যত দেশের সামাজিক জীবনযাত্রা যত বেশী উন্নত সেই দেশ সফলতার ক্ষেত্রে তত বেশী অগ্রসর এবং এ ব্যাপারে সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং শৃঙ্খলা সবচেয়ে বেশী অবদান রাখে।
আমরা বিশ্বের অনেক দেশকেই আদর্শ বা উদাহরণ হিসেবে দেখতে পাই। বস্তু জগতে যেভাবে সফলতার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে জীবন চলার ক্ষেত্রে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার বদৌলতে। পাশাপাশি বিজ্ঞান যাত্রা সে ক্ষেত্রে আরও বেগবান করে দিচ্ছে মানুষের উন্নত চিন্তাধারা এবং নব নব আবিষ্কারের মাধ্যমে। সাফল্যের স্বপ্নচূড়ায় পৌঁছুতে বিজ্ঞান সে ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। উদ্দীপনা ও উৎসাহ যোগাচ্ছে প্রতিনিয়ত এবং অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান এখন আমাদের সহযাত্রী। আর সে সবের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্বে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া, সভ্যতায়-ভব্যতায় এগিয়ে যাওয়া আর জাতি হিসেবে সমৃদ্ধ জীবনযাত্রায় সুখ-স্বপ্নের সৌধ রচনা করা। এগুলো মানুষের স্বভাবজাত চাহিদা এবং প্রচেষ্টালব্ধ। কিন্তু এতো কিছুর পরও সব বিফল হয় যদি কোন জাতির চরিত্রে নৈতিকতার মূল্যবোধ জাগ্রত না থাকে। অর্থাৎ যুব সমাজ সহ সমাজের সর্বস্তরের ব্যক্তি চরিত্রের নৈতিকতার অভাব থাকলে সে সমাজ অচিরেই ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়।
বলছিলাম সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠায় নৈতিকতার মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় সে ধরনের নৈতিকতারই ধ্বস শুরু হয়েছে। তার কারণ অনেক। তন্মধ্যে আকাশ সংস্কৃতি অন্যতম। বর্তমান বিশ্বের ইন্টারনেট জগৎ যেভাবে মানুষের গতি দিয়েছে শিক্ষা ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে, পাশাপাশি নৈতিকতার ধ্বসও নামিয়েছে সমানভাবে। যুব সমাজকে মৃত্যুর দুয়ারে যেন ঠেলে দিচ্ছে অপসংস্কৃতির সয়লাব ঘটিয়ে। মানুষের সম্ভ্রম, ইজ্জতসহ অনেক কিছু ছিনিয়ে নিয়েছে এ সমস্ত প্রযুক্তির অপব্যবহার। উগ্র সমাজ গঠনেও এ সমস্ত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার অনেকাংশেই দায়ী। আমরা যেন খেই হারিয়ে ফেলছি এ সমস্ত প্রযুক্তি নিপীড়নের যন্ত্রণায়। সমাজ দেহকে ভিতর থেকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। ছেলে, বুড়ো, কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতীসহ সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্বের জোয়ারে যেন সবাই ভেসে যাচ্ছে খড় কুটোর মত। এর থেকে যেন উদ্ধার পাওয়ার আর কোন রাস্তাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ যেন বুঝে-শুনে জাহান্নামের দিকে বেপরোয়া যাত্রা। হায় সমাজপতিরা! আজকে আমরা যাদেরকে সমাজের দায়িত্বে দেখি, তাদেরও যেন এ ব্যাপারে কোন মাথা ব্যথা নেই। দিকভ্রম উ™£ান্ত যুব সমাজের লাগাম টেনে ধরার যেন কেউ নেই। ঘরে ঘরে এবং সমাজে প্রতিটি ক্ষেত্রে যেভাবে নৈতিক অবক্ষয় শুরু হয়েছে, মনে হয় যেন কেয়ামতের আলামত স্পষ্ট হচ্ছে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হতে।
বিজ্ঞান আশির্বাদ হোক, এটা আমরা কামনা করি। তবে বিজ্ঞানের অপব্যবহার অবশ্যই সেটা অভিশাপ। তাই বিশ্বের ধ্বংস সাধনে আজ যেন উঠে পড়ে লেগেছে মানুষ বিজ্ঞানকে ধারন করে। এ সমস্ত নৈতিকতা বিবর্জিত মানুষের হাত থেকে বিজ্ঞানের অপ-প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে। নতুবা মানুষের আবাসযোগ্য এ সুন্দর পৃথিবী অচিরেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে পৌঁছবে।
আজকে সামাজিকভাবে যে সমস্ত অপরাধগুলো সংঘটিত হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-ছিনতাই, রাহাজানী, ধর্ষণ, অপহরণ সহ বিভিন্ন ধরনের হত্যাকান্ড। সামাজিক জীবনে নিরাপত্তাহীনতায় এক অশুভ বলয় সৃষ্টি হয়েছে। যা থেকে জনগণের নিষ্কৃতি পাওয়া দুষ্কর। এগুলো কেন হচ্ছে সে বিষয়ে সমাজ বিজ্ঞানীগণ কোন কূল-কিনারা পাচ্ছেন না এবং প্রতিরোধ করণীয়গুলোও বের করতে পারছেন না। সরকার এবং প্রশাসন চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে এসব নিয়ন্ত্রণের বা দমনের ব্যাপারে। যতই পুলিশ সহ এলিট ফোর্স নিয়োগ করা হোক না কেন, তা যেন কোনক্রমেই রোধ করা যাচ্ছে না বরং দিনে দিনে এসবের বিভৎসতা আরো প্রকট হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিকভাবে আরো নৈতিকতার অবক্ষয়গুলো হচ্ছে প্রশাসনিক দুর্নীতি, ঘুষ প্রদান, উৎকোচ গ্রহণ, স্বজনপ্রীতি, সরকারী সম্পদের লুটপাট, টাকার বিনিময়ে অদক্ষ লোকের নিয়োগ প্রদান, বড় বড় পদে আসীন থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনকে দুর্নীতিগ্রস্ত করা, যোগ্যতাসম্পন্ন দক্ষ লোককে অপসারণ করা, বিশেষভাবে যারা সৎ, কর্মঠ এবং নৈতিকতাসম্পন্ন লোকদের হেয় করে বিব্রত পরিবেশ সৃষ্টি করা, দলীয় লোকদের প্রাধান্য দেয়া এবং প্রশাসনের সর্বত্র তাদের নিয়োগ দেয়া সহ বিভিন্ন প্রকার দুর্নীতির বেড়াজালে প্রশাসনকে কলুষমুক্ত করা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সবধরনের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা সহ নৈতিক অবক্ষয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা।
একটি দেশের যুব সমাজ ধ্বংসের এ সমস্ত কারণগুলিকে যদি সামাজিকভাবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিরোধ করা না যায় তবে এদেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকেই ধাবিত হবে। আদর্শিক নৈতিকতা সম্পন্ন যুব সমাজ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ যদি গড়ে তোলা না যায় তবে দেশ ধীরে ধীরে জুলুমতন্ত্রের দিকেই এগিয়ে যায় এবং নৈতিকতার বাঁধন ছিন্ন হয়ে সমাজ গড্ডালিকা প্রবাহে ধাবমান হয়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধকার জাহেলিয়াত যুগে প্রবেশ করে এবং পরিণতিতে একটি দেশের নৈতিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে এবং জাগতিক তন্ত্রমন্ত্রের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়ে কর্ণধারহীন জাতিতে পরিণত হয়, অতএব তা থেকে উত্তরণ পেতে হলে আমাদেরকে এখন থেকেই চিন্তা করতে হবে এবং নৈতিকতা সম্পন্ন যুব সমাজ গড়ে তুলতে মনোনিবেশ করতে হবে এবং সেটি সম্ভব হবে আদর্শিক চরিত্র সৃষ্টি এবং নৈতিকতার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। বিশেষ করে আমাদের মুসলিম প্রধান দেশে তার একমাত্র আদর্শ লালন করতে হবে কোরআন সুন্নাহর দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে এবং উন্নত চরিত্র সৃষ্টি ও আদর্শ মানুষ গড়ার ক্ষেত্রে কোরআনের নির্দেশনা ব্যতিরেকে আদৌ সম্ভব হবে না।
লেখক ঃ কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কাবিনবিহীন বিয়ে, প্রতারণা ও আমাদের আইন
  • স্মার্টফোনে বন্দি জীবন
  • দৃষ্টিপাত নেশার নাম ড্যান্ডি!
  • আইনজীবী-সাংবাদিক আজিজুল ইসলাম চৌধুরী
  • সড়ক দুর্ঘটনায় লাশের মিছিল কবে শেষ হবে?
  • রাস্তাটির সংস্কার চাই
  • প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা জরুরি
  • শিক্ষা ব্যবস্থা
  • আবর্জনা সমস্যা : উৎপাদনের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে
  • উচ্চশিক্ষায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা প্রয়োজন
  • সিটি নির্বাচন : কাকে ভোট দেব?
  • রথযাত্রা
  • বিবেক দ্বারা হোক পথ চলা
  • মাদকাসক্তি ও তার প্রতিকার
  • পাহাড় বিষয়ে সচেতনতা দুর্ঘটনা রোধ করতে পারে
  • আপন ভুবন, অচেনা আকাশ
  • কওমি বোর্ডের রেজাল্ট পর্যালোচনা
  • স্পীকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী
  • পানি সংকট এবং ভবিষ্যত বাংলাদেশ
  • তুরস্কের নির্বাচন দেখে এসে
  • Developed by: Sparkle IT