শিশু মেলা

দুধ চুরি

জসীম আল ফাহিম প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৬-২০১৮ ইং ০৩:০২:৫৫ | সংবাদটি ১০০ বার পঠিত

আজ খুব ভোরে চুচংয়ের ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম থেকে জেগে সে কেমন যেন মনে একটা ধাক্কা খেল। ঘুম ভেঙে গেছে সেই কখন। কিন্তু সে চোখ মেলে তাকাতে পারছে না। কেমন যেন ব্যথা ব্যথা লাগছে চোখে। তারপর অনেক কষ্টে চোখ মেলে সে তাকাল। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। দুনিয়াটাই তার কাছে অন্ধকার বলে মনে হল। ব্যাপার কী? আগে তো কোনোদিন এমন হয়নি। আজ হঠাৎ এমন লাগছে কেন? নিশ্চয়ই কোথাও কিছু একটা গোলমাল আছে। গোলমালটা যে আসলে কী ভুতুড়ে ছেঁড়া কাঁথার ভেতর শুয়ে ভাবতে লাগল চূচং।
ভোরের পাখিরা যে যার মত গলা ছেড়ে গান করছে। মৃদু বাতাস বইছে। কোথা থেকে যেন ফুলের মিষ্টি সুবাস ভেসে আসছে। ফুলের সুঘ্রাণ চূচংয়ের নাক ছুঁয়ে গেল। এমন সময় ভূচংয়ের ডাকে চেতনা ফিরল তার। ভূচংয়ের উপস্থিতি টের পেয়ে সহসা হাউমাউ করে ওঠল সে। বলল, দোস্ত! আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আমার কী হয়েছে। চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
ভূচং বলল, দেখতে পাওয়ার তো কথা না। মনে নেই, গতকাল একঝাঁক শকুন এসে আমাদের ঘিরে ধরল। ঠোকরের পর ঠোকর দিল। শেষে তোর একমাত্র চোখটা পেট থেকে ওরা খাবলে নিল। কপাল ভালো যে আমরা ভূত জাত। তাই বেঁচে গেছি। নইলে প্রাণটাই হয়ত হারাতে হত।
ভূচংয়ের কথা শুনে চূচংয়ের মনে পড়ে গেল গতকালের ঘটনাটা। তারপর কান্নাভেজা কন্ঠে সে বলল, দোস্ত! আমি তো জনমের তরে অন্ধ হয়ে গেছিরে। এখন আমার কী হবে?
ভূচং বলল, হবে আর কী! আমার চোখটাই এখন দু’জনে পালাক্রমে ব্যবহার করব।
ভূচংয়ের কথা শুনে খুশি হয়ে চূচং বলল, দোস্ত! তোর চোখটা তাহলে এখন আমাকে লাগিয়ে দে। বাইরে থেকে আমি একটু ঘুরে আসি। সেই কখন সকাল হল। অথচ আমার কিছুই দেখা হল না। একটু হাত মুখ ধোয়া, নাস্তা-পানি করা, কত কাজ বাকি আছে। তাড়াতাড়ি লাগিয়ে দে তোর চোখটা। আমি তৈরি হয়ে নিই। আজ আবার কিছু একটা দুষ্টামি করতে বের হতে হবে না?
ভূচং তার চোখটা খুলে চূচংকে লাগিয়ে দিল। তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছ, চোখ আবার খুলে কীভাবে? আর একজনের চোখই বা অন্যজন কোনো প্রকার অপারেশন ছাড়া লাগায় কীভাবে? লাগাতে পারে। ভূতদের পক্ষেই কেবল এটা সম্ভব। ভূতেরা আরো কত কী-ই না পারে!
চূচং এখন সব কিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। সকালের কাজকর্ম সারতে সে বেরিয়ে পড়ল। এদিকে ভূচং-চূচংয়ের ভূতুড়ে ছেঁড়া কাঁথার ভেতর শুয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এল চূচং। ওর হাতে একটি থালা। থালা ভরা রসগোল্লা। রসে টইটম্বুর এক একটা রসগোল্লা। থালাটি এনে সে ভূচংয়ের সামনে রাখল। বলল, নে ধর, রসগোল্লা খা। মরণ চাঁদের দোকান থেকে গত পরশু এনেছিলাম। খেয়ে নাস্তা কর। তারপর দু’জন বের হব।
খেতে খেতে ভূচং বলল, জানিস। আজ আমার মাথায় একটি নতুন আইডিয়া এসেছে।
চূচং বলল, তাই নাকি?
ভূচং বলল, তো আর বলছি কী?
চূচং মিনতির সুরে বলল, আইডিয়াটা কী দোস্ত? বল না শুনি।
ভূচং বলল, আজ আমরা খাঁটি দুধ খাব।
চূচং বলল, খাঁটি দুধ! খাঁটি দুধ পাবি কোথায়?
ভূচং বলল, পাব। পাব। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে। গেলেই বুঝতে পারবি।
খাওয়া শেষে চূচং চোখটা ভূচংকে ফিরিয়ে দিল। বলল, দুধ খেতে যে বের হব- আমি তো অন্ধ। যাব কীভাবে?
ভূচং বলল, এটা কোনো সমস্যা না। তুই আমার কাঁধে চড়ে বসবি। তোকে আমি কাঁধে নিয়ে যাব। তুই আমার প্রাণের বন্ধু। তুই সাথে থাকলে দুষ্টামি করে আমি খুব মজা পাব। একা একা দুষ্টামি করার মধ্যে কোনো মজা নেই।
কথামত ভূচংয়ের কাঁধে চড়ে বসল চূচং। তারপর দু’জন দুধ খাওয়ার উদ্দেশে রওয়ানা দিল। যেতে যেতে ওরা খোলা এক মাঠে এসে থামল। দিগন্তজোড়া খোলা মাঠ। ঘন সবুজ ঘাসে ঢাকা। চূচংকে কাঁধ থেকে নামাল ভূচং। তারপর হাত ধরাধরি করে দু’জন আরো কিছুদূর হাঁটল। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল ভূচং। বলল, পেয়েছি দোস্ত। পেয়েছি।
চূচং জিজ্ঞেস করল, কি পেয়েছিসরে?
ভূচং বলল, একটা দুধেল গাভী। কুচকুচে কালো। বড়ই নাদুস নুদুস দেখতে। শুনেছি কালো গাভীর দুধ খুব সুস্বাদু হয়। আমরা এখন কালো গাভীর মিষ্টি দুধ খাব দোস্ত।
চূচং বলল, তোর চোখটা আমাকে আবার লাগিয়ে দে তো। দেখি গাভীটি কেমন? সত্যি নাদুস নুদুস নাকি গোল মারছিস।
ভূচং তার চোখটা চূচংকে লাগিয়ে দিল। চোখ লাগিয়ে তো চূচং রীতিমত চিৎকার করে ওঠল। বলল, খুবই সুন্দর গাভী দেখছি। কিন্তু আমরা ওর দুধ খাব কীভাবে? দুধ খেতে হলে আগে দুধ দোহন করতে হয়। দুধ দোহন করার জন্য একটা পরিষ্কার পাত্র চাই। আমরা এখন পাত্র পাব কোথায়?
ভূচং বলল, পাত্র লাগলেও লাগাব না। আমরা মুখ লাগিয়েই খাব। চূচং বলল, গাভী যদি আমাদের গুঁতো দেয় তখন কি করব?
ভূচং ভেংচি কেটে বলল, বোকা কোথাকার! গুঁতো দেবে কেন? গাভীর মালিক যখন দুধ দোহন করে তখন গুঁতো দেয় নাকি? গুঁতো দিলে কী কেউ গাভীর দুধ দোহন করতে পারত? গাভীর কাছে আমরাই এখন মালিক। তাছাড়া, গাভীরা খুব শান্ত-শিষ্ট হয়, বুঝলি?
চূচং বলল, কিন্তু আমার বুক কাঁপছে। ভয় ভয় লাগছে। ভূচং মৃদু হেসে বলল, ভয় করছে কেনরে? আমি তোর সঙ্গে আছি না।
তারপর দু’জন হাত ধরাধরি করে এগিয়ে গেল গাভীর কাছাকাছি। ওদের ভাবসাব দেখে কী করে যেন গাভীটি আগেই কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছিল। মনে মনে সে প্রস্তুতিটা নিয়েই রেখেছিল। চূচংকে গাভীর গলায় ধরিয়ে দিয়ে ভূচং বলল, তুই ওর গলায় হাত বুলোতে থাক। আমি আগে দুধ খেয়ে নিই। তারপর তুই খাবি।
ভূচংয়ের দুধ চুরি করা দেখে ওদের আসল মতলবটা এতক্ষণে গাভীর কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল। ওর কা- দেখে রেগে গেল গাভী। তারপর মনে মনে বলল, দুধ চুরি করে খেতে এসেছিস! দাঁড়া। দেখাচ্ছি মজা। গাভী ভূচংকে এমন জোরে এক লাথি মারল, লাথি খেয়ে তো বেচারা ভূচংয়ের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। অনেক দূরে গিয়ে সে ছিটকে পড়ল। হাঁপানী রোগীর মত হাঁপাতে লাগল ভূচং।
এদিকে অন্ধ চূচং কিন্তু ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। ওর বুঝে উঠার আগেই ক্রুদ্ধ গাভী তাকেও আক্রমণ করে বসল।
ধারালো শিং দিয়ে গাভী চূচংকে কয়েকটি গুঁতো মারল। গুঁতো খেয়ে বেচারা চূচং মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল। মাটিতে শুয়ে পড়ায় বলা যায় এক প্রকার প্রাণে রক্ষা। নইলে ক্রুদ্ধ গাভী তার ধারালো শিং দিয়ে গুঁতিয়ে ওকে মেরেই ফেলত।
শোয়া থেকে উঠে চূচং প্রাণপণে দিগি¦দিক ছুটতে লাগল। আর গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, ওরে বাবারে। ওরে গেলামরে। বাঁচাও রে। মেরে ফেললরে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT