উপ সম্পাদকীয়

মাদক থেকে দেশ উদ্ধারের অঙ্গীকার

মিল্টন বিশ্বাস প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৬-২০১৮ ইং ০৩:০৩:৪০ | সংবাদটি ৭৯ বার পঠিত

৩ মে, ২০১৮ র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জঙ্গি দমনের পর এবার দেশ থেকে মাদক নির্মূলে কঠোর হওয়ার ঘোষণা দেন; বলেন, 'আমরা যেমন জঙ্গিবাদকে দমন করেছি। আমরা অঙ্গীকার করেছি, এই মাদক থেকেও দেশকে উদ্ধার করব।' এর পরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে বলেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশিস্নষ্ট সবাইকে। জনপ্রতিনিধিদের প্রতিও আহ্বান জানান মাদকের বিরুদ্ধে একাট্টা হওয়ার জন্য। গণভবনের এক অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেছেন, 'মাদকের জন্য একেকটা পরিবার কষ্ট পায়, একেকটা পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। কাজেই এবার মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান।' তার নির্দেশের পরই সমস্ত আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং র‌্যাবকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়। যেখানেই মাদক, সেখানেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়। ফলে ২ জুন পর্যন্ত শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী এনকাউন্টারে পড়ে নিহত হয়। আর দশ হাজারের বেশি অপরাধীকে গ্রেফতার করেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। মাদকবিরোধী অভিযানকে তরুণ সমাজকে সর্বনাশা ধ্বংসের পথ থেকে ফিরিয়ে আনার একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন অনেকেই। তাদের দাবি, এই অভিযানে সারাদেশের মানুষ খুশি হয়েছে। প্রতি বছর ২৬ জুন মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালিত হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মাদকদ্রব্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করতে ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় দিনটিকে মাদকবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ওই দিবসের আগেই বাংলাদেশ মাদকমুক্ত হতে যাচ্ছে বলে আমাদের বিশ্বাস।
ধূমপান থেকেই ধীরে ধীরে মাদকের প্রতি আসক্তি শুরু হয়। এদেশে উন্মুক্ত স্থানে ধূমপান নিষিদ্ধ হলেও তার বিরুদ্ধে কাউকে সোচ্চার হতে দেখা যায়নি। বরং র্সর্বত্রই ধূূমপানের উৎসব চলছে নির্বিবাদে। ধূমপানের মতোই স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত রয়েছে মাদকের বিস্তৃতি। আসক্তি শুরুর পর টাকা জোগাড় করতে কিশোর-তরুণরা নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে মাদকসেবীরা দিন দিন হয় উঠছে আরও বেপরোয়া। দেশে বর্তমানে প্রায় দুই কোটি মাদকসেবী রয়েছে। এর মধ্যে দেড় কোটি মাদকাসক্ত। তারা প্রতিদিন গড়ে ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন করে থাকে। সেই হিসেবে মাসে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা মাদকে ব্যয় হয়। নারী মাদকাসক্তদের মধ্যে ৪৩ শতাংশই ইয়াবাসেবী। দেশে সুঁই-সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এ মাদকাসক্তরা শিরায় মাদক গ্রহণ করায় এইচআইভি ঝুঁকির মধ্যে বেশি থাকে। সন্তানের প্রতি পারিবারিক অবহেলা আর শিক্ষার যথোপযুক্ত পরিবেশের অভাবে শিশুদের জন্য মাদক ভয়ঙ্কর সমস্যা হয়ে উঠেছে। পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশের কারণে মধ্যবিত্ত ও উচ্চচিত্ত পরিবারের কিশোররাও মাদকাসক্ত হচ্ছে। তারা মাদকদ্রব্য হিসেবে সবচেয়ে বেশি গ্রহণ করছে ইয়াবা ট্যাবলেট। অনেক পুলিশ সদস্য মাদক ব্যবসায় জড়িত, সেবনও করেন। ইতিমধ্যে দু'চারজন ধরাও পড়েছে, চাকরিও চলে গেছে এবং মামলার আসামি হয়েছে।
এক সমীক্ষা মতে, মাদক গ্রহণকারীদের ১৫ শতাংশের বয়স ২০-এর নিচে, ৬৬ শতাংশ ২০-৩০ বছরের মধ্যে, ১৬ শতাংশ ৩০-৪০ বছর এবং ৪ শতাংশ ৪০ থেকে তদূর্ধ্ব বয়সের। অন্যদিকে দেশে প্রায় ৫০ লাখ মাদক ব্যবসায়ী প্রতিদিন কমপক্ষে দুইশ' কোটি টাকার মাদক কেনা-বেচা করে। মাদক পাচারের বদৌলতে প্রতি বছর বিদেশে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। অবৈধ মাদক আমদানির জন্য প্রতি বছর ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি দেশি মুদ্রা পাচার হচ্ছে। প্রতি বছর ভারত থেকে প্রায় ৩৪৭ কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য দেশে আসে। এরমধ্যে শুধু ফেনসিডিলই আসে ২২০ কোটি টাকার। শতকরা ৬০ ভাগ মাদকাসক্ত মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে। দেশের সর্বত্র সন্ত্রাসী কার্যক্রম, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করা, হত্যা কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার আধিক্যে মাদকাসক্তির ভূমিকাই বড়। নারী মাদকাসক্তদের মধ্যে পারিবারিক কলহের কারণে ৩৭ শতাংশ, বন্ধুদের প্ররোচনায় ৩৩ শতাংশ মাদকগ্রহণ শুরু করেন। অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ নানা কারণে মাদকাসক্ত হয়। অন্যদিকে পুরুষ মাদকাসক্তদের মধ্যে ৪১ শতাংশ ইয়াবা ও ৩৮ শতাংশ গাঁজা সেবন করেন। এ ছাড়া ৭ শতাংশ হেরোইন, ৫ শতাংশ ইনজেকশন ও বাকিরা অন্য মাদক সেবন করে। এদের মধ্যে নিজ আগ্রহে ৪২ শতাংশ, বন্ধুদের প্ররোচনায় ৩৭ শতাংশ মাদক গ্রহণ শুরু করে। অবশিষ্টরা পারিবারিক কলহসহ অন্য কারণে মাদকসক্ত হয়।
দেশব্যাপী মাদক বিরোধী অভিযানে শতাধিক মানুষ নিহত হলেও উদ্ধার হয়েছে বিপুল মাদকদ্রব্য এবং অবৈধ অস্ত্র। আমরা জানতে পেরেছি বর্তমানে ৩২ ধরনের মাদক সেবন চলছে এদেশে। এ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন নামের যেসব মাদক উদ্ধার হয়েছে সেগুলো হলো- হেরোইন, গাজা, চোলাই মদ, দেশি মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার, রেক্টিফায়েড স্পিরিট, কেডিন, ফেনসিডিল, তাড়ি, প্যাথেডিন, টিডি জেসিক, ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড, ওয়াশ (জাওয়া), বনোজেসিক ইনজেকশন (বুপ্রেনরফিন), টেরাহাইড্রোবানাবিল, এক্সএলমুগের, মরফিন, ইয়াবা, আইসপিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট, মিথাইল, ইথানল ও কিটোন। এ ছাড়া ইনোকটিন, সিডাক্সিনসহ বিভিন্ন ঘুমের ট্যাবলেট, জামবাকসহ ব্যথানাশক ওষুধ কিংবা টিকটিকির লেজ পুড়িয়ে কেউ কেউ নেশা করে থাকে। এসব দ্রব্যের নেশাজনিত চাহিদা থাকায় বেশিরভাগই ভেজাল উৎপাদিত হচ্ছে দেশেই। তবে আধুনিক বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কম-বেশি মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়। কোনো দেশে কম আবার কোনো দেশে অনেক বেশি। যেমন, গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (লাওস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড), গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরান), গোল্ডেন ওয়েজ-এ তিন স্থানে পপি উৎপাদিত হয়। এই পপি ফুলের নির্যাস থেকে আফিম এবং এই আফিম থেকেই সর্বনাশা হেরোইন তৈরি হয়। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, কলাম্বিয়া, গুয়াতেমালা, জ্যামাইকা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, ঘানা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও থাইল্যান্ডসহ ১১টি দেশে মারিজুয়ানা উৎপন্ন হচ্ছে। দক্ষিণ আমেরিকার পেরু, কলাম্বিয়া, ব্রাজিল, বলিভিয়া প্রভৃতি দেশ কোকেন উৎপাদনে বিখ্যাত। তাছাড়া এশিয়া মহাদেশের প্রায় অনেক দেশেই আফিম, হেরোইন ও হাসিস উৎপন্ন হয়। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসছে চোরাগোপ্তা জল ও স্থল পথে। ফলে দেশের মধ্যে মাদক ব্যবসায়ীকে বিচারের সম্মুখীন করার সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। কেবল আইন করে মাদক নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। তবে দেশের মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেয়া প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন, 'আমাদের ছেলেমেয়ে লেখাপড়া শিখবে, সুন্দর জীবন পাবে, সুন্দরভাবে বাঁচবে।' তারা যেন বিপথে গিয়ে নিজের জীবন ও পরিবারকে ধ্বংস না করে- এটাই তার প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশার জন্যই মাদক ব্যবসায়ী, সরবরাহকারী এবং ব্যবহারকারী টার্গেটে পরিণত হয়েছে। তাদের অপতৎপরতা রোধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জিরো টলারেন্সের যে ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রশংসিত হচ্ছে। যদিও কমিশনার একরাম হত্যাকা- এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তবে তার সংখ্যা খুব একটা বেশি নয়।
লেখক : অধ্যাপক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে আগস্টের শোকাবহ ঘটনাবলী
  • সংযোগ সেতু চাই
  • টিবি গেইট ও বালুচরে ব্যাংকিং সুবিধা চাই
  • হাসান মার্কেট জেল রোডে স্থানান্তর হোক
  • ২৭নং ওয়ার্ডের কিষণপুর-ঘোষপাড়ার রাস্তা মেরামত প্রসঙ্গে
  • প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
  • দেশীয় রাবার শিল্প বাঁচান
  • পরিবর্তিত হও : ছকের বাইরে ভাবো
  • শিক্ষা ও চিকিৎসায় প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ
  • কতটা ভালোবাসি দেশ?
  • রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান আন্তর্জাতিক চাপেই সম্ভব
  • শুধু একবার বলুন : আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি
  • শরৎকাল
  • বাংলাদেশের সঠিক জনসংখ্যা কত?
  • বিশ্ব-বরেণ্যদের উপাখ্যান আতাউর রহমান
  • মিয়ানমারের একগুঁয়েমি ও মিথ্যাচার
  • টেলিকমিউনিকেশন দৌড়ে বাংলাদেশ ইতিহাস গড়লো
  • সড়কপথে শৃঙ্খলা কত দূর?
  • বৃক্ষসখা দ্বিজেন শর্মা
  • নারীদের জন্য নিরাপদ হোক গণপরিবহন
  • Developed by: Sparkle IT