সম্পাদকীয় যে ব্যক্তি ক্রোধ দমন করে, আল্লাহ তার হৃদয়ে নিরাপত্তা ও ভরসা দেন। আল হাদিস

হাওর অঞ্চলের সম্ভাবনা

প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৬-২০১৮ ইং ০১:০০:৩৯ | সংবাদটি ১৬৬ বার পঠিত

হাওর অঞ্চলকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। হাওর অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষজ্ঞগণ এই ধরনেরই মন্তব্য করছেন। বিশেষ করে ধান এবং মাছের জন্য হাওর অঞ্চল একটি উর্বর ক্ষেত্র। ধান এবং মাছের চাহিদা পূরণে যুগে যুগে অবদান রেখে আসছে ভাটি বাংলার মানুষ। অথচ বাংলাদেশের অনেক মানুষ জানেনা হাওরবাসীর সুখ-দুঃখ সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা। হাওর অঞ্চলে বছরে ছয়-সাত মাস থাকে পানি। বাকি সময় শুকনো। এই শুকনো মওসুমে ফসল চাষাবাদ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় হাওরবাসীকে। তারা বছরে উৎপাদন করে একটি মাত্র ফসল। যা দিয়ে চলে তাদের সারা বছর। অথচ মৎস্য চাষ আর কৃষি ভিত্তিক প্রকল্প গড়ে তোলার অপার সম্ভাবনা রয়েছে এই অঞ্চলে। অনেকের মতে, হাওরের উৎপাদিত ফসল ঠিকমতো ঘরে তুলতে পারলে দশ বছরে পাল্টে যাবে দেশের সার্বিক অর্থনীতির চেহারা। এক কোটির অধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই হাওর অঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে সেভাবে ভাবছে না কোনো সরকারই।
নদ নদী, হাওর-বাওর বিল-ঝিল, পুকুর-ডোবা নিয়ে গঠিত আমাদের এই বাংলাদেশ। সিলেট বিভাগের চারটি জেলাসহ নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় রয়েছে কমপক্ষে পাঁচ হাজার হাওর-বাওর, বিল-ঝিল। এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ৯০ ভাগ কৃষি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাকীরা মৎস্য চাষসহ ব্যবসা-বাণিজ্য করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এই অঞ্চলে বছরে একটি মাত্র ফসল উৎপাদিত হয়, সেটা হচ্ছে বোরো। বছরে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিকটন ধান উৎপাদিত হয় এই অঞ্চলে। এই অঞ্চলের আরেকটি মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ হচ্ছে মাছ। দেশে আহরিত মাছের ২৫ শতাংশই হাওরাঞ্চল থেকে আহরণ করা হয়। যার মূল্য প্রায় একশ’ কোটি টাকা। এছাড়া, এই অঞ্চলের আরেকটি সম্পদ হচ্ছে জলজ উদ্ভিদ। এর মধ্যে রয়েছে, নল খাগড়া, জিংলা, ইকর, বাঁশ, হিজল, করচ ইত্যাদি। এগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা যেতে পারে দেশীয় শিল্পকারখানা।
শুকনো মওসুমে মৎস্য আহরণ হাওরাঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসবই বলা যায়। এই অঞ্চলের প্রতিটি জলমহালে বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণ করা হয়। বিশেষ করে, দেশীয় প্রজাতির মাছগুলো পাওয়া যায় এই অঞ্চলে। সেই সঙ্গে বিরল প্রজাতির পাখির অভয়ারণ্য হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে এই হাওরাঞ্চল সারা বছর। বিশেষ করে সুনামগঞ্জে অবস্থিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ টাঙ্গুয়ার হাওর হচ্ছে বিপন্ন প্রজাতির দুই শতাধিক পাখির অভয়াশ্রম। এছাড়া, এখানে বিপন্ন প্রায় দেড়শ প্রজাতির মাছের সমাগম রয়েছে। এতোসব সম্পদ থাকা সত্ত্বেও হাওরবাসীর জীবনমান উন্নত হচ্ছে না। এই অঞ্চলের মানুষের আর্থিক দূরবস্থার পাশাপাশি রয়েছে স্থায়ী কর্মসংস্থানের অভাব, যোগাযোগের দূরবস্থা, বিদ্যুৎসহ আধুনিক সুযোগ সুবিধার অভাব। আরও আছে আকস্মিক বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ; যা অকস্মাৎ মানুষের সব স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ করে দেয়।
আসল কথা হলো হাওর অঞ্চলে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত যেসব মূল্যবান সম্পদ রয়েছে, এগুলো কাজে লাগিয়ে একটি সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা সম্ভব। শুধু তাই নয়, এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা সম্ভব পর্যটন কেন্দ্র। এই সবকিছুর জন্য দরকার যথাযথ উদ্যোগ। অবশ্য উদ্যোগ যে মাঝে মাঝে নেয়া হচ্ছে না, এমন নয়। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিচ্ছিন্নভাবে নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন সময়। তবে তাতে কোনো সমন্বয় নেই। ফলে এতে স্থায়ী কোনো সুফল আসছে না। এ প্রসঙ্গে ইতোপূর্বে গঠিত হাওর উন্নয়ন বোর্ডের কথা উল্লেখ করা যায়। এই বোর্ড হাওর উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। বছর কয়েক আগে ‘হাওর উৎসব’ বলেও একটা কথা শোনা গিয়েছিলো। কিন্তু তারও দৃশ্যমান কোনো ফলাফল নেই। এই ধরনের লোক দেখানো প্রচারণার পরিবর্তে হাওর উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হোক।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT