উপ সম্পাদকীয়

যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণ ও প্রতিকার

মোঃ দিলশাদ মিয়া প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৬-২০১৮ ইং ০১:০৩:৫৪ | সংবাদটি ১২৩ বার পঠিত

আজকের শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ। আর শিশুরাই ক্রমে ক্রমে কিশোর ও যুবকের পরিণত হয়। এভাবেই তারা একটি প্রবীনদের স্থান দখল করে নেয়। দেশের যুব সমাজ যদি জ্ঞানে, কর্মে, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে উন্নত মানসিকতায় গড়ে উঠতে পারে তাহলে দেশের সমৃদ্ধি অবধারিত। আর যুব সমাজ যদি অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হয় তাহলে দেশের অধ:পতন নিশ্চিত। আমাদের দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত যুবক-যুবতি বেকার। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে তারা প্রতিনিয়ত অস্থির জীবন-যাপন করছে। ফলে আমাদের যুবক শ্রেণির সিংহভাগ অজ্ঞাতে বা জ্ঞাতসারে অবক্ষয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করতে হবে। নব জীবনে গাহিয়া গান/ সজীব করিব মহাশ্মশান। যুবই শক্তি যুবরাই পারে অনেক সফল ও সার্থক কাজ করতে। সাহিত্যিক ড. লূৎফুর রহমান তার “উন্নত জীবন” গ্রন্থে বলেছেনÑ“যৌবনের রক্তই আল্লাহ চান, আল্লাহর পথে কোরবান হওয়ার ইহাই শ্রেষ্ঠ কাল।” যৌবনকালের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুল (সা:) বলেছেন “বৃদ্ধ হওয়ার পূর্বে যৌবনকে গুরুত্ব দেয়ার জন্য” তিনি আরও বলেছেন হাশরের ময়দানে প্রত্যেক আদম সন্তানকে ৫টি প্রশ্নের জবাব দিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে “তুমি তোমার যৌবনকাল কোন পথে অতিক্রম করেছ। যৌবনকাল জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার কদরও বেশী। যৌবন যাদের তাদেরই আজ যুদ্ধে যাওয়ার সময়। কিন্তু আজ নানা কারণে যুব সমাজ অবক্ষয়ের শিকার হতে পারে। বর্তমানে আমাদের সমাজ জীবনে চরম অবক্ষয়ের চিত্র জীবন্ত হয়ে আছে। এ অবক্ষয় যুব সমাজকে ও প্রভাবিত করছে। আমাদের যুব সমাজের সামনে আজ কোন আদর্শ নেই। যুব সমাজকে নতুন চেতনায় উদ্দীপ্ত করার মতো কোন পরিকল্পনা নেই, ফলে তারা প্রতিনিয়ত অবক্ষয়ের দিকে অগ্রসরমান।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই আমাদের যুব সমাজের অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও যুব সমাজের অবক্ষয়ের আর এক কারণ। একদিকে রাজনৈতিক দ্বন্দ-কলহ, অপরদিকে অর্থনৈতিক দুর্দশা, ফলে শিক্ষ জগতে নৈরাজ্য, সমাজসেবা নামে নিজের স্বার্থ হাসিল এবং স্বেচ্ছাচারিতা যুব সমাজকে বিপদগামী করছে। তাই মানবিক, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ও এখন গৌন হয়ে উঠেছে। অথচ উহাই সবচেয়ে অবহেলিত হচ্ছে।
বর্তমানে টেলিভিশনের সাথে ডিশ এ্যান্টিনার সংযোগ হয়ে আমাদের ঘরে ঘরে এসে গেছে বিজাতীয় সংস্কৃতি যা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। ফলে এসব সস্তা বিনোদনে আকৃষ্ট হয়ে আমাদের যুব সমাজ অবক্ষয়ের দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে। জাতির যুগ-যুগান্তরের স্বপ্ন ও সাধনা তার ভাবলোকের গৌরব ও সমুন্নতি তিল তিল সফল করে সৃষ্টি হয় সংস্কৃতি ধারা। সংস্কৃতির মূলকথা হলো নিজেকে সৌন্দর্যমন্ডিত করে গড়ে তোলা এবং অপরের নিকট নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনা করা। প্রেম ও সৌন্দর্য সংস্কৃতির প্রধান আশ্রয়। অপরদিকে শিক্ষা ও সভ্যতার অবনতি ঘটিয়ে যে সংস্কৃতি মানুষকে সুন্দর থেকে দূরে সরিয়ে দেয় তাই অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতি মানুষকে কলুষিত করে এবং জীবনের সৌন্দর্য বিকাশকে স্তব্ধ করে দিয়ে শ্রীহীনতার দিকে ঠেলে দেয় সংস্কৃতির আশ্রয় থেকে বিচ্যুত হলে সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যায় এবং মানুষ অপসংস্কৃতির দিকে ধাবিত হয়। মোতাহার হোসেন চৌধুরী বলেছেন “সংস্কৃতি মানে বাঁচা, সুন্দরভাবে বাঁচা”। অপসংস্কৃতি জাতির এক মানসিক ব্যাধি। সংস্কৃতির গভীর অর্থে হচ্ছে পরিশীলিত জীবনবোধ। বর্তমানে আমাদের দেশে সংস্কৃতির অবক্ষয় বা অপসংস্কৃতি দিনে দিনে স্পষ্ট হয়েছে। সমাজের সর্বস্তরে বিকৃতি, জাতিকে আজ যেন গ্রাস করতে উদ্যত।
বেকারত্ব একটি মারাত্মক অভিশাপ। লেখাপড়া শেষ করেও যারা চাকরি পায় না, তারা সবাই হতাশায় ভোগে এবং অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়। দীর্ঘ সময় এ অবস্থা চলতে থাকলে তারা নিগৃহীত হয় এবং ক্রমে ক্রমে তাদের মনের ভেতরে ক্ষোভ জন্ম নেয়। আন্দোলনের ডাক দেয়। এ ক্ষোভ থেকেই তারা আকৃষ্ট হয় অন্যায়ের দিকে, লিপ্ত হয় নেশায়, মাদকাসক্ত হয়, খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ইত্যাদি জঘন্যতম কাজ কর্মে লিপ্ত হয়। মাদকাসক্তির জন্য সমাজের মধ্যে অনিশ্চিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। নেশা ও মাদকাসক্তি বর্তমানে জাতীয় ও সামাজিক সমস্যায় রূপ লাভ করেছে। বর্তমান সরকারের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী “মাদক বিরোধী অভিযান” শুরু করেছেন। এ অভিযানে ১৬ দিনের অভিযানে ১২৩ জন কথিত “বন্দুকযুদ্ধে” নিহতও হয়েছে। বর্তমানে মাদকাসক্তি আমাদের সমাজে এক সর্বনাশা ব্যাধিরূপে বিস্তার লাভ করেছে। দুরারোগ্য ব্যধির মতোই তা তরুণ সমাজকে গ্রাস করেছে। এ তীব্র দংশনে ছটফট করছে কত তরুণ ও যুব সমাজ। এর ভয়াবহ পরিণতি দেখে প্রশাসন আজ বিচলিত, অভিভাবকরাও আতঙ্কিত। চিকিৎসকরাও দিশেহারা। তরুণ যুব শক্তিই দেশের প্রাণ, মেরুদন্ড নেশার ছোবলে সেই মেরুদন্ড আজ ভেঙে পড়েছে। নেশার ছোবলে ধুঁকছে লক্ষ প্রাণ। ঢলে পড়েছে মৃত্যুর কোলে। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে এ দেশের বিভিন্ন শহর, শহরতলিতে গ্রামে-গ্রামান্তরে এমনকি বস্তিতেও। মাদকাসক্তি থেকে যুব সমাজকে রক্ষা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে, এমন দেশটি সম্ভবত বিশ্বের কোথাও পাওয়া যাবে না, যেখানে মাদকাসক্তির কালো ছায়া দেশের তরুণ সমাজকে স্পর্শ না করেছে। রাসুল (সা:) মাদকমুক্ত সমাজ গড়েছিলেন তিনি বলেছেন “নেশাজাতীয় যে কোন দ্রব্যই মদ, আর যাবতীয় মদই হারাম” সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ফিউদর উগলভ বলেছেন “মানব জাতির জন্য মদ্যপান যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও প্লেগের একান্ত প্রতিক্রিয়ার চেয়েও ভয়াবহ”।
যুবকদের সুসংগঠিত করতে হলে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করতে হবে। তাদের মধ্যে নীতিজ্ঞান ও সচেতনতা জাগিয়ে তুলতে হবে। তারা সচেতন থাকলে কোন রকম অন্যায়ের কুমন্ত্রণা তাদেরকে বশীভূত করতে পারবে না। সমাজে যতদিন অন্যায় অবিচার মাথা উঁচু করে থাকবে ততদিন যুব সমাজকে সুপথে আনা কষ্টকর।
ধর্মজ্ঞান ও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়ে তাদের সামনে থেকে অন্ধকার দূর করতে হবে। যুবকরাই দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও জাতির কর্ণদার। তাদের মনে এ চেতনাবোধ জগিয়ে তুলতে হবে। দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারত্ব সমস্যা দূর করতে হবে। তাছাড়া যারাই সমাজে অপরাধ কর্মে লিপ্ত হয় তাদের জন্যে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবেই অবক্ষয়ের প্রতিকার করা সম্ভব।
বর্তমানে আমাদের যুব সমাজকে এ ব্যাধি গ্রাস করতে বসছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে জাতির ভবিষ্যৎ অচিরেই তলিয়ে যাবে গভীর অন্ধকারে। কাজেই যেকোন মূল্যে অবক্ষয়ের হাত থেকে আমাদের তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে হবে। যুব সমাজকে অবক্ষয়ের কবল থেকে রক্ষা করতে পারলেই আমরা একটি সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারবো। মাদকদ্রব্য চোরাচালান প্রতিরোধ কর্মসূচিকে আরো জোরদার করতে হবে। মানবিক মূল্যবোধ গঠন ও পরিবেশন করতে হবে। সাংস্কৃতিক দিক থেকে তরুণদের আকর্ষনযোগ্য আদর্শ কার্যক্রম সামনে তুলে ধরতে হবে। পিতা-মাতা কর্তৃক শিক্ষামূলক কর্মসূচি গ্রহণ শেষ করছি কবি সুকান্তের বানী দিয়েÑ
“এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান, জীর্ন পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ পিঠে, চলে যেতে হবে আমাদের/ চলে যাব তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ. প্রাণ প্রণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল/ এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গিকার”।
লেখক : কলামিস্ট

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বইয়ের বিকল্প প্রযুক্তি নয়
  • আগুনের পরশমণি ছোয়াও প্রাণে
  • বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা
  • জনসচেতনতাই পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারে
  • এক শারীরিক প্রতিবন্ধীর কথা
  • এই অপসংস্কৃতির অবসান হোক
  • সৈয়দ সুমন আহমদ
  • পানিশূন্য তিস্তা
  • বিদ্যুৎ প্রিপেইড মিটারের গ্যাড়াকলে গ্রাহকরা : দায় কার?
  • পরিবহন ধর্মঘট এবং জনদুর্ভোগ
  • পানি সমস্যা সমাধানে নদী খনন জরুরি
  • শব্দসন্ত্রাস
  • মাধবপুর : যাতায়াত দুর্ভোগ
  •   তাফসীরুল কুরআন
  • ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহর পুরস্কার নির্ধারিত
  • প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান (রাহ.) ও সাদাকায়ে জারিয়া
  • আল্লাহ নামের তুলনা নেই
  • রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ও অমীমাংসিত কিছু প্রশ্ন
  • স্বীকৃতি, শোকরিয়া ও রাষ্ট্রের আদর্শ নাগরিক
  • ধর্মঘটের নামে মানুষকে জিম্মি করা মানবাধিকার পরিপন্থি
  • Developed by: Sparkle IT