ধর্ম ও জীবন

মক্কা-মদীনায় পনেরো দিন

মো. ইসমত আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৬-২০১৮ ইং ০১:০৬:৪৪ | সংবাদটি ১২৩ বার পঠিত

পবিত্র ওমরাহ পালনার্থে ২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আমার সহধর্মীনি নূরুন নেহার চৌধুরী, আমি ও মেজো ছেলে ইশতিয়াক আহমদসহ প্রায় ৭০ জনের একটি কাফেলা বাংলাদেশ বিমানে যাত্রা করি। ঢাকায় হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে রাত ৮টার দিকে জেদ্দার উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। সাত ঘণ্টা আকাশে উড়ে জেদ্দা সময় রাত ২টায় আমরা জেদ্দা বিমানবন্দরে অবতরণ করি। জেদ্দা বিমানবন্দর অত্যন্ত ব্যস্ত বিমানবন্দর আমাদের পাসপোর্ট, ইমিগ্রেশন ইত্যাদি কাজ শেষ করতে করতে রাত ৪টা। আমরা দু’টি বড় বাসে মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। প্রায় দেড় ঘণ্টা ড্রাইভে আমরা পৌঁছে গেলাম। আমাদের হোটেল ছিল মক্কা টাওয়ারের খুব কাছে এবং হেরেম শরীফ ছিল পায়ে হাটার পথ, দিন ছিল শুক্রবার। আমরা হোটেলে গোসল ও অজু করে আমাদের প্রথম কাজ ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। তালবিয়া পাঠ করতে করতে কা’বা ঘর তওয়াফের নির্দিষ্ট স্থান হজরে আসওয়াদ বরাবর দাড়িয়ে বিছমিল্লাহি আল্লাহু আকবার ওলিল্লাহিল হামদ বলে দুই হাতের তালুতে চুমু দিয়ে তওয়াফের প্রথম চক্কর শুরু করি। আবার হজরে আসওয়াদ পর্যন্ত পৌঁছে দ্বিতীয় চক্কর শুরু করি। বিবি টুথপিকের সাতটি কাঠি দিয়ে হিসাব রাখছিলেন। প্রতি চক্করে আলাদা আলাদা দোয়া আছে তবে সবচেয়ে ভালো হচ্ছে- ‘রাব্বানা আ’তীনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওফিল আখীরাতি হাসানাতাও ওয়াক্বিনা আযাবান্নার।’ তারপর আকামে ইব্রাহিমকে সামনে রেখে দু’রাকাত নামাজ পড়ে কাছে জমজম কূপের কাছে রক্ষিত বড় বড় জাড়ে জমজমের পানি বিসমিল্লাহ বলে পেট ভরে পান করলাম। এই পানি অনেক রোগ ব্যধির শেফা এবং উৎকৃষ্ট সব খাদ্যপ্রাণে বা গুনে সমৃদ্ধ। তারপর অরেকটু সামনে বেড়ে বাবে সাফা হয়ে সাফা স্টার সাইন দেখে সাই আরম্ভ করলাম। এখানে বিবি টুথপিকের কাঠি দিয়ে হিসাব রাখছিলেন। সাফা হতে মারওয়া এভাবে সাত চক্করে মারওয়া এসে পূর্ণ হয়। তারপর একটি ছেলে কাঁচি দিয়ে পাঁচ রিয়াল এর মাধ্যমে আমার সামান্য চুল কেটে দিল। হোটেলে এসে বিবির চুলের অগ্রভাগের চুল আমি কাঁচি দিয়ে কেটে দিলাম। ‘আমাদের ওমরা শেষ হলো। এবার আমরা সাধারণ পোষাকে হেরেমে নামাজ পড়তে চললাম। আগেই বলেছি দিনটি ছিলো শুক্রবার তাই জুম্মার নামাজ পড়তে গেলাম। ইমাস সাহেব যখন খুতবা আরম্ভ করেন তখন মুসল্লিদের উদ্যোশ্যে বলেন আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। প্রকাশ থাকে যে আমাদের দেশে সেভাবে খুতবার আগে বয়ান হয়, মক্কা শরীফে বয়ান হয় না। আমার বিবি ও ছেলে ইশতিয়াক আহমদ, আব্বা-আম্মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাই-বোনদের জন্য কয়েকটি নফল তওয়াফ করেছেন। আমার শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় আমি কোনো নফল তাওয়াফ করি নাই।
পরদিন ফজরের নামাজের পর ইশতিয়াক আহমদকে নিয়ে নবীর জন্মস্থান (বাড়ি), আবু জাহেলের বাড়িতে দেখতে যাই। নবীর জন্মস্থান এখন বড় পাবলিক লাইব্রেরী করা হয়েছে। কাছেই একটি উঁচু পাহাড়। সেখান থেকে কাফিরদের মোকাবিলায় নবী (স:) চাঁদকে দ্বি-খন্ডিত করেছিলেন আল্লাহর আদেশে। পরদিন সকালে আমাদেরকে দু’টি বাসে করে কিছু দর্শনীয় স্থান দেখার জন্য নিয়ে গেলেন। বাসে মাইক ছিলো এবং ধারাভাষ্য করে প্রতিটি স্থানের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিতে থাকলেন। জবলে নূর, গাঢ়ে নূর, জান্নাতুল মা’ওয়া, মিনা, আরাফাত ময়দান, শয়তানকে পাথর মারার স্থান, নবীর ছোট বিবির রওজা ইত্যাদি।
২১ এপ্রিল বিকালে আমরা মক্কা শরীফ ত্যাগ করলাম এবং পবিত্র মদীনা মনওয়ারার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। রাত প্রায় ৮টায় আমরা মদীনা শরীফে পৌঁছলাম। মদিনায় আমাদের হোটেল ছিল খুব কাছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হোটেলে উঠলাম। যেহেতু হেরেম ছিল খুব কাছে তাই আমরা একা একা যেতে পারতাম। পরদিন বাদ ফজর আমি, ইশতিয়াক নবী করিম (সা.) এর রওজা শরীফ জিয়ারত করলাম। আমাদেরকে রোজ হাশরে নবীর সাক্ষাতের প্রার্থনা করে হযরত আবু বক্কর (রা.), হযরত ওমর (রা.) রওজার কাছে গেলাম এবং জিয়ারত করে বের হয়ে গেলাম। এখানে বেহেশতের টুকরো অবস্থিত। একজন পুলিশ আমাকে ডাকলো এবং একজন নামাজরতকে দেখিয়ে বললো সবর, ওনার নামাজ শেষ হলে আমাকে নামাজ পড়তে বলল। এরপর কাছেই অবস্থিত জান্নাতুল বাকীতে গেলাম। এখানে হাত তুলে দোয়া করা নিষেধ।
পরদিন সকালে বের হলাম ওহুদ এবং আরো দর্শনীয় স্থান দেখতে। এখানে কুরাইশদের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ হয়েছিল। এই যুদ্ধে আল্লাহর নবীর পবিত্র দানদান শহীদ হয়েছে, হযরত হামজা (রা.) সহ অনেক আসহাব শহীদ হয়েছিলেন। মসজিদে কুবা মদিনা হতে তিন মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। মসজিদে কিবলাতাঈন মদীনা শরীফের তিন মাইল উত্তরে অবস্থিত। এই মসজিদে ২ রাকাত নামাজ পড়ে দোয়া করা হয়। আমাদেরকে মদিনা ইউনিভার্সিটি দেখানো হলো। সময় স্বল্পতার জন্য ভিতরে প্রবেশ করতে পারি নাই। ইউনিভার্সিটির সুন্দর ফটক বাস থেকে অবলোকন করেছি। সাথে যে গাইড ছিলেন তিনি মদিনা ইউনিভার্সিটির ছাত্র (ডক্টরেটের জন্য পড়াশুনায়রত)। তিনি সর্বশেষ আমাদের নিয়ে মদিনার খুব কাছে একটি বিরাট খেজুর বাগানে নিয়ে গেলেন। সেখান থেকে আমাদের অনেকে খেজুর খরিদ করে দেশে নিয়ে আসেন। আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলার অশেষ মেহেরবাণীতে আমি, আমার বিবি এবং ছেলে ইশতিয়াক মদিনা মনওয়ারার মসজিদে সন্তুষ্ট চিত্তে নামাজ পড়ার এই কয়দিন শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ছিলাম।
২৬ এপ্রিল দুপুরের পর মদিনা শরীফ ত্যাগ করে জেদ্দার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। চালক ১২০-১৩০ কি. মি. গতিতে গাড়ি চালিয়ে আমাদের রাত ১০টার দিকে জেদ্দা বিমানবন্দর পৌঁছালো। ২৭ এপ্রিল সকাল ১০ টার দিকে জেদ্দা বিমানবন্দর ত্যাগ করে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। বাংলাদেশ বিমানে প্রায় ৭ ঘণ্টা আকাশে উড়ে বিকাল ৫টার দিকে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর অবতরণ করে। আমরা কাফেলার সবাই সুস্থ ছিলাম এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে যার যার বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করলাম। আমাদের এই সংক্ষিপ্ত সফর খুবই ভালো হয়েছে এবং স্মৃতিতে এর মধুরতা অনেক দিন থাকবে।

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  • শতবর্ষের স্থাপত্য সিকন্দরপুর জামে মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  •  আত্মার খাদ্য
  • মানব জীবনে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা
  • সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ : ইসলাম কী বলে
  • মৃত্যুর আগে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করি
  •   তাফসীর
  • ইসলামে বিনোদনের গুরুত্ব
  • কুরআনে হাফিজের মর্যাদা
  • মদীনা রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্র ছিল মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • এতিম শিশু
  • বার্মিংহামে আল কুরআনের হাতে লেখা প্রাচীন কপি
  • রাসুলের সমগ্র জীবন আমাদের জন্য অনুকরণীয়
  • মৌল কর্তব্য আল-কুরআনের বিধান
  • তাফসিরুল কুরআন
  • ওলীগণের লাশ কবরে অক্ষত থাকে
  • ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার
  • কওমি সনদের স্বীকৃতিতে কী লাভ
  • ইসলামে সংখ্যালঘুর অধিকার
  • Developed by: Sparkle IT