ধর্ম ও জীবন

মক্তব শিক্ষা বোর্ডের প্রয়োজনীয়তা

মোহাম্মদ আব্দুল গফুর প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৬-২০১৮ ইং ০১:০৭:৪৭ | সংবাদটি ১১২ বার পঠিত


শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড, মানে শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির মানোন্নয়ন ও ভাগ্য পরিবর্তন হয় না। মেধা, যোগ্যতা ও কর্মশীল একটি শিক্ষিত জাতি যে কোনো অশিক্ষিত জাতির সম্মুখে শক্ত প্রাচীরের মতো দাঁড়াবার জন্য তার শিক্ষাই একটি মজবুত মেরুদন্ডের ন্যায় কাজ করে।
এ প্রবাদ বাক্যটি ইসলামি শিক্ষার বেলায় শতভাগ প্রয়োগ করা ন্যায়সঙ্গত। কারণ সকল শিক্ষার আগে প্রয়োজনীয় ইসলামি শিক্ষা অর্জন করা সকল মুসলমানদের উপর অপরিহার্য কর্তব্য। ইসলামি শিক্ষা ছাড়া নেক আমল করা যায় না। তাইতো ইসলামি শিক্ষাকে নেক আমলের উৎস এবং মানব জীবনের উদ্দেশ্যে সাবস্ত করা হয়েছে। সুতরাং প্রত্যেক মানুষ একজন সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে উঠার জন্য তার একমাত্র ভিত্তি হবে ইসলামি শিক্ষা।
বলাবাহুল্য ইসলামের ব্যাপক শিক্ষা অর্জন করা সিংহভাগ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তো শুধু প্রয়োজনীয় শিক্ষাকে অপরিহার্য শিক্ষা হিসেবে ধার্য্য করা হয়েছে। বাকী সব শিক্ষা প্রয়োজনীয় শিক্ষার সম্পূরক বলে গণ্য করা হয়েছে।
আমরা সাধারণত মক্তব শিক্ষাকেই প্রয়োজনীয় ইসলামি শিক্ষা বলে মনে করি। কারণ এ শিক্ষার মধ্যে দ্বীনের প্রয়োজনীয় বিষয় ঢুকানো হয়েছে। আর এ শিক্ষাই সকল মুসলমান নারী-পুরুষের প্রথম ও মূল শিক্ষা। মুসলমান হিসেবে ইসলামি শিক্ষায় যে যতো বড় শিক্ষিত হবে, যে যতো বড় আবীদ বা ধর্ম সাধক হবেন, সে মক্তব শিক্ষা থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করবেন এবং মক্তব শিক্ষাই হবে তার সাধনার উৎস। বিজ্ঞ আলেমগণ মক্তব শিক্ষার সিলেবাস যা নির্ধারণ করেছেন, তা হচ্ছে নি¤œরূপ : কালিমায়ে তায়্যিবাহ, কালিমায়ে শাহাদাত, ঈমানে মুজমল, ঈমানে মুফাস্সল, সানা, তাশাহহুদ, দুরূদ, দু’আ মাযুরাহ, কেসারে মুফাস্সল, সূরাহ সমূহ, মাম্নুন দোয়া সমূহ, ফাযায়েলে যিকিরের দোয়া সমূহ অর্থাৎ আদইয়ায়ে মাস্নুনাহ, নামাজের মাসাঈল, অযুর ফরজ, অযুর সুন্নাত, অযু ভঙ্গের কারণ, রোজা ভঙ্গের কারণ, গোসলের ফরজ, গোসলের সুন্নাত, তায়াম্মুমের ফরজ, নামাজের ফরজ, নামাজের ওয়াজিব, নামাজের সুন্নাত, নামাজের তাসবীহ, ঈদের নামাজ, জানাযার নামাজ, মুর্দা গোসল দেওয়ার নিয়ম-কানুন, দাফন-কাফনের নিয়ম কানুন এবং সম্পূর্ণ কুরআন করিম তিলাওয়াতের শিক্ষা অর্জন, সূরা ইয়াসিন, সূরা ওয়াক্বিয়াহ, সূরা মূলক, আয়াতুল কুরসী, সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত মুখস্ত করা ইত্যাদি।
প্রকাশ থাকা আবশ্যক যে, যারা শিশুদের মক্তব শিক্ষা ভালো করে দেন, তারা তাদের শিশুদের ইসলামের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর মোটামুটি ধারণা দিতে সক্ষম হন। পক্ষান্তরে যারা শিশুদেরকে মক্তব শিক্ষা ভালো করে দেন না, তারা তাদের শিশুদেরকে ইসলামের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর ধারণা দিতে অক্ষম হন। সুতরাং শিশুদেরকে মক্তব শিক্ষা দেয়ার বেলায় অবহেলা করা উচিত নয়। এ শিক্ষায় অবহেলা করার মানে হচ্ছে শিশুদের মেরুদন্ডহীন ধর্ম-কর্মহীন ও নিরেট মূর্খ করে রাখা। আমাদের মধ্যে এক শ্রেণির লোকজন এমন আছেন, যারা সত্যিই ইসলামের ব্যাপক শিক্ষায় সময় ব্যয় করাকে ভালো পান না। ভালো পান না মক্তব শিক্ষাকেও। সম্পূর্ণ কুরআন মজীদ তেলাওয়াত করার ধারণা রাখা তো দূরের কথা, আরবি অক্ষর জ্ঞানটাও এদের নেই।
উচ্চ সমাজ ও কৌলিন্য পরিবারে বাস করার নাম উচ্চ মানবতা নয়। বরং উচ্চমানবতা হচ্ছে কুরআন সুন্নাহর শিক্ষার দ্বীপ্তি দ্বারা ইসলামী জীবন গড়ার জন্য মন মগজকে উদ্ভাসিত করা। পরিতাপের বিষয় যে, কিছু কিছু কৌলিন্য পরিবারের লোকজন ইসলামি শিক্ষা সম্পর্কে খুব কম ধারণা পোষণ করেন।
অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে যে, শহর-শহরতলী, পাড়া-গ্রাম গঞ্জে সত্তর ভাগ সাবালক ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিগণ সূরা, ক্বিরাত, দোয়া, তাসবীহ জানে না। এ দুর্দশায় আমাদেরকে কেন পেল এর সঠিক কারণ কী? গভীর ভাবনার পর দেখা গেছে যে, শিশুদের অভিভাবকগণের গাফিলতি ও অবহেলা এবং পাড়া মহল্লার মসজিদ পরিচালনা কমিটির দায়ীত্বশীলদের মক্তব শিক্ষা পরিচালনায় চরম অনিয়ম ও অবহেলা এর মূল কারণ। সর্বোপরি কিছু কিছু প্রাইভেট স্কুল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সকালে মক্তব শিক্ষার সময়ে পড়া লেখার ব্যবস্থা চালু থাকায় শিশুরা মক্তব টাইমে স্কুলে চলে যায়। এটাও একটা বিরাট সমস্যা।
এদিকে বেশ কিছু অশিক্ষিত ও অধার্মিক অভিভাবক আছেন, যারা মক্তব শিক্ষা চলাকালীন সময়ে নিদ্রামগ্ন থাকেন এবং শিশুরাও মা-বাবার সঙ্গে নিদ্রামগ্ন থাকে। এরা সময়মতো মক্তবে আসতে পারে না। এছাড়া এখনকার সময়ের বেশির ভাগ শিশু খেলাধুলা, ছবি দেখা ও মোবাইলে ম্যাজিক ও ফাইট দেখায় মগ্ন থাকার কারণে লেখাপড়া ভালো করে পায় না। এটাও একটা বড় সমস্যা।
ওদিকে সচেতন লোকজন স্কুল শিক্ষার প্রতি বেশ জোর দিয়ে থাকেন। তারা স্কুল শিক্ষাকেই মুখ্য মনে করেন। ফলে স্কুল শিক্ষার চাপের কারণে শিশুদেরকে মক্তব শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখেন। উপরন্তু অধিকাংশ মসজিদ পরিচালনা কমিটি একজন ইমাম দিয়ে মসজিদ ও মক্তব শিক্ষার কাজ সম্পাদন করেন। অনেক জায়গায় মসজিদ কমিটি অযোগ্য ইমাম নিয়োগ দিয়ে থাকেন। যার মক্তবে পড়াবার অভ্যাস নেই। ফলে মক্তব পড়া সুচারুরূপে হয় না।
বর্তমান যোগের দশটি শিশুকে একজন শিক্ষক সামাল দিতে হিমশিম খান। তাহলে অর্ধশত বা এর চেয়ে আরও অধিক শিশুদেরকে একজন শিক্ষক কি করে সামাল দেবেন? এ সমস্যা সমূহ সমাধানের জন্য শিশুদের অভিভাবকগণ ও মসজিদ পরিচালনা কমিটি মক্তব শিক্ষা বিষয়ে বেশ যতœবান হওয়া অনিস্বীকার্য। মক্তব শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য প্রত্যেক ইউনিয়নে ইউনিয়নে মাকাতিব শিক্ষা বোর্ড গঠন করতঃ বোর্ডের অধীনে নির্ধারিত সিলেবাসের অনুপাতে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে মক্তব শিক্ষা উন্নয়নের বিকল্প নেই।
দেশ বরেণ্য ওলী ও বুযুর্গ শায়খে বাঘা বশির আহমদ (রহ.) মাকাতিব শিক্ষাবোর্ড বিগত কয়েক বছর ধরে সিলেট জেলার অন্তর্গত গোলাপগঞ্জ থানার ১নং বাঘা ইউনিয়নের শিশুদের মক্তব শিক্ষায় বেশ কিছু অবদান রেখে আসছে। গোলাপগঞ্জ থানার ১নং বাঘা ইউনিয়নের সত্তরের অধিক মক্তব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে এ বোর্ড গঠন করা হয়। পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে সম্পূর্ণ ইউনিয়নের মক্তবগুলোতে পাঠদান চলছে। প্রতি বছর নিয়মিতভাবে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এভাবে দেশের প্রত্যেক থানা ও ইউনিয়নে ইউনিয়নে মাকাতিব শিক্ষাবোর্ড গঠন করে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে মক্তব শিক্ষা চালু করলে ইসলামি মক্তব শিক্ষায় শিশুরা যথেষ্ট ধারণা পাবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT