ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৬-২০১৮ ইং ০১:০৮:০৮ | সংবাদটি ৬৪ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
সূরা : বাক্বারাহ
উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এখন ঈমান বিল-গায়ব বা অদৃশ্যে বিশ্বাসের অর্থ এই দাঁড়ায় যে, রসুলুল্লাহ (সা.) যে হেদায়েত এবং শিক্ষা নিয়ে এসেছিলেন, সে সবগুলোকে আন্তরিকভাবে মেনে নেয়া। তবে শর্ত হচ্ছে যে, সেগুলো রসুলের (সা.) শিক্ষা হিসেবে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হতে হবে। আহলে ইসলামের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ঈমানের এ সংজ্ঞাই দিয়েছেন। ‘আকায়েতে তাহাবী’ ও ‘আকায়েতে নসফী’ তে এ সংজ্ঞা মেনে নেয়াকেই ঈমান বলে অভিহিত করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, শুধু জানার নামই ঈমান নয়। কেননা, খোদ ইবলিস এবং অনেক কাফেরও রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়ত যে সত্য তা আন্তরিকভাবে জানতো, কিন্তু না মানার কারণে তারা ঈমানদারের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন নি।
দ্বিতীয়ত : ইক্বামতে-সালাত : ইক্বামত বা প্রতিষ্ঠা অর্থ শুধু নামায আদায় করা নয়, বরং নামাযকে সকল দিক দিয়ে ঠিক করাকে প্রতিষ্ঠা করা বলা হয়। ‘ইক্বামত’ অর্থে নামাযে সকল ফরয, ওয়াজিব, সুন্নত, মুস্তাহাব পরিপূর্ণভাবে আদায় করা, এতে সব সময় সুদৃঢ় থাকা এবং এর ব্যবস্থাপনা সুদৃঢ় করা সবই বোঝায়। ফরয, ওয়াজিব, সুন্নত ও নফল প্রভৃতি সকল নামাযের জন্য একই শর্ত। এক কথায় নামাযে অভ্যস্ত হওয়া ও তা শরীয়তের নিয়ম মতো আদায় করা এবং এর সকল নিয়ম-পদ্ধতি যথার্থভাবে পালন করাই ইক্বামতে-সালাত।
তৃতীয়ত : আল্লাহর পথে ব্যয় : আল্লাহর পথে ব্যয় অর্থে এখানে ফরয যাকাত, ওয়াজিব সদকা এবং নফল দান-খয়রাত প্রভৃতি যা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা হয় সে সবকিছুই বোঝানো হয়েছে। কুরআনে সাধারণতঃ ‘ইনফাক্ব’ শব্দ নফল দান-খয়রাতের জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে। যেখানে ফরজ যাকাত উদ্দেশ্য সেসব ক্ষেত্রে ‘যাকাত’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
‘ওয়া মিম্ম্মা রাযাক্বনাহুম’ এ সংক্ষিপ্ত বাক্যটিতে গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায় যে, আল্লাহর রাস্তায় তথা সৎপথে অর্থ ব্যয় করার একটা প্রবল আকাক্সক্ষা প্রত্যেক সৎ মানুষের মধ্যে বিশেষভাবে জাগ্রত করাই এই আয়াতের উদ্দেশ্য। একজন সুস্থ বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তি চিন্তা করবে যে, আমাদের নিকট যা কিছু রয়েছে, তা সবই তো আল্লাহর দান ও আমানত। যদি আমরা সমস্ত ধন-সম্পদ তাঁর পথে ব্যয় করি, তবেই মাত্র এ নেয়ামতের হক আদায় হবে। পরন্তু এটা আমাদের পক্ষ থেকে কারো প্রতি কোনো এহসান বা অনুগ্রহ হবে না। তবে এ আয়াতে ‘মিম্ম্মা’ শব্দ যোগ করে একথা বোঝানো হয়েছে যে, যে ধন-সম্পদ আমাদেরকে দেয়া হয়েছে তা সবই ব্যয় করতে হবে এমন নয়; বরং কিয়দংশ ব্যয় করার কথাই বলা হয়েছে।
মুত্তকীদের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে প্রথমে অদৃশ্যে বিশ্বাস, এরপর নামায প্রতিষ্ঠা এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ঈমানের গুরুত্ব সকলেরই জানা যে, ঈমানই প্রকৃত ভিত্তি এবং সকল ‘আমল কবুল হওয়া ঈমানের উপরই নির্ভরশীল। কিন্তু যখনই ঈমানের সাথে ‘আমলের কথা বলা হয়, তখন সেগুলোর তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হতে থাকে। কিন্তু এখানে শুধু নামায এবং অর্থ ব্যয় পর্যন্ত’ আমলকে সীমাবদ্ধ রাখার কারণ কি? এর উত্তর হচ্ছে এই যে, যত রকমের আমল রয়েছে তা ফরযই হোক অথবা ওয়াজিব, সবই হয় মানুষের দেহ অথবা ধন-দৌলতের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এবাদতে বদনী তথা দৈহিক এবাদতের মধ্যে নামায সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এখানে নামাযের বর্ণনায় এবং যেহেতু আর্থিক ইবাদত সবই ‘ইনফাক্ব’ শব্দের অন্তর্ভুক্ত, সুতরাং এ উভয় প্রকার এবাদতের বর্ণনার মধ্যে প্রকৃতপক্ষে যাবতীয় এবাদতের বর্ণনা অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। পূর্ণ আয়াতের অর্থ হচ্ছে : তারাই মুত্তাকি যাদের ঈমান পূর্ণাঙ্গ এবং’ আমলও পূর্ণাঙ্গ। ঈমান এবং’ আমল এ দুয়ের সমন্বয়েই ইসলাম। এ আয়াতে ঈমানের পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা দেয়ার সাথে সাথে ইসলামের বিষয়বস্তুর প্রতিও ইঙ্গিত করা হয়েছে।
ঈমান ও ইসলামের পার্থক্য : অভিধানে কোন বস্তুতে আন্তরিক বিশ্বাস স্থাপন ঈমান এবং কারো অনুগত হওয়াকে ইসলাম বলে।
ঈমানের আধার হলো অন্তর, ইসলামের আধার অন্তরসহ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। কিন্তু শরীয়তে ঈমান ব্যতিত ইসলাম এবং ইসলাম ব্যতিত ঈমান গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থা, আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসুল (সা.) এর প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস ততোক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য নয়, যতোক্ষণ পর্যন্ত এ বিশ্বাসের মৌখিক স্বীকৃতির সাথে সাথে কর্মের দ্বারা আনুগত্য ও তাবেদারী প্রকাশ করা না হয়।
মোটকথা, আভিধানিক অর্থে ঈমান ও ইসলাম স্বতন্ত্র অর্থবোধক বিষয়বস্তুর অন্তর্গত। অর্থগত পার্থক্যের পরিপ্রেক্ষিতে কুরআন-হাদিসে ঈমান ও ইসলামের পার্থক্যের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু শরীয়ত ঈমানবিহীন ইসলাম এবং ইসলামবিহীন ঈমান অনুমোদন করে না।
প্রকাশ্যে আনুগত্যের সাথে যদি অন্তরের বিশ্বাস না থাকে, তবে কুরআনের ভাষায় একে ‘নেফাক্ব’ বলে। নেফাক্বরে কুফর হতেও বড় অন্যায় সাব্যস্ত করা হয়েছে।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT