সাহিত্য

ফররুখের কাব্য দর্শন

আবু মালিহা প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৬-২০১৮ ইং ০১:১৬:২০ | সংবাদটি ১২৯ বার পঠিত

কবি ফররুখ একটি চেতনার নাম। তাঁর কাব্যিক ভাষা প্রাঞ্জল সাবলিল এবং শাণিত শব্দকোষের গাঁথুনিতে বিপ্লবী বাক সমৃদ্ধ। একজন মহান সাধক। কবিতার ছন্দে আন্দোলিত হয় হৃদয়তন্ত্রিতে হাজারো আবেগ আর শৈল্পিক ছন্দোবদ্ধ কবিতার দুর্বার প্রকাশ। যেন এক একটি শব্দমালা তরবারীর শাণিত ঝলকানি। অন্ধকার এবং প্রহেলিকাবৎ কুসংস্কার ভেদী উচ্চকিত হয় তার নির্ঘোষ কন্ঠ ধ্বনির সাহসী প্রকাশ। বাধাবিঘœ যতই আসুক শব্দকোষের তরবারী তাকে দ্বিখন্ডিত করে আলোর প্রকাশকে সহসাই দুর্বার গতিতে এগিয়ে নিতে আর কোনো কবির ভাব-ভাষাতে সহজে পরিলক্ষিত হয় না। নৈতিক আদর্শ তার কবিতার দৃঢ় অঙ্গীকার। যুগবাণী ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় সকল দোয়ার খুলে দেয় তাঁর তেজোদীপ্ত বাক্যের প্রকাশ। জ্বরা এবং জীর্ণতাকে ধুয়ে মুছে এবং গ্লানিকর জীবনের পঙ্খিলতাকে ফেনানিভ সমুদ্র¯্রােতে ভাসিয়ে নিয়ে সফেদ-স্বচ্ছ সলিলে শুদ্ধ এবং জাগরণের সোনালী ভোরের আবাহন গীত শোনাতে সর্বদা উন্মুখ থেকেছেন।
তাইতো তিনি ঘুমন্ত জাতিকে হায়দরী হাঁকে ডেকেছেন- পাঞ্জেরী কবিতায়:
রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরী?
এখনও তোমার আসমান ভরা মেঘে?
যে তারা, হেলাল এখনও ওঠেনি জেগে?
তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;
অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।
রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরী?
এমনিভাবে ভ্রান্ত পথিকদের তিনি হুঁশিয়ার করেছেন আদর্শের বিভ্রান্তি যেন না ঘটে। তাই তিনি বার বার হাঁকিয়েছেন নোনা দরিয়ায় যেন পথ হারা না হয় এ জাতি- তারই প্রকাশ ঘটিয়েছেন মধ্যছত্রে। তিনি বলেছেন,
পথহারা এই দরিয়া- সোঁতায় ঘুরে
চলেছি কোথায়? কোন সীমাহীন দূরে?
মুসাফির দল বসে আছে কূল ঘেরি।
তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;
একাকী রাতের ম্লান জুলমাত হেরি।
রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরী।
কী আকুল আবেদন জাতির ভ্রান্ত নেশার পথ ভুলে অন্ধকারে হাতড়ে যেন মৃত্যু পারে না যায়, তারই আহ্বান কালজয়ী এ কবিতার প্রতিটি ছত্রে তিনি দক্ষ কান্ডারীর দায়িত্ব নিয়ে নিরলস আহ্বান জানিয়েছেন জুলমাতে ঘেরা এ জাতিকে মুক্তির পথে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে।
সত্যিই বিরল ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার কবি ফররুখ আহমদ।
বাংলা ভাষার এ মহান কবির ১০ জুন জন্ম শতবার্ষিকী। জাতির দুর্দিনে যে কবি মহান কান্ডারীর ন্যয় দাঁড় টেনে বিভীষিকাময় মহাসমুদ্রে জাহাজকে কূলে ভিড়াতে চেষ্টা করেছেন।
মাঝে মাঝে তিনি হতাশা ব্যক্ত করেছেন এ জাতির গাফলতিতে ডুবে থাকা মানুষদের নিয়ে। যাদের চেতনা হয়না এবং উদভ্রান্তের মত দিক-বিদিক ছুটে চলা মানুষদের অন্ধকার গহ্বরে পতিত হতে দেখে।
হতাশার সাগরে ডুবন্ত জাতির আহাজারি তার হৃদয়ে সর্বদা রোনাজারিতে ব্যাকুল করে তুলছে। একজন পথিকের আহ্বান শুনতে- তারই বেদনার সুর অনুরণিত হয়েছে বারং বার এবং তারই প্রকাশ ঘটিয়েছেন এভাবে-
ওকি বাতাসের হাহাকার, -ওকি
রোনাজার ক্ষুধিতের।
ওকি দরিয়ার গর্জন, ওকি বেদনা মজলুমের!
ওকি ক্ষুধাতুর পাঁজরায় বাজে মৃত্যুর জয়ভেরী!
পাঞ্জেরী!
জাগো বন্দরে কৈফিয়তের তীব্র ভ্রুকুটি হেরি;
জাগো অগনন ক্ষুধিত মুখের নীরব ভ্রুকুটি হেরি;
দেখ চেয়ে দেখ সূর্য ওঠার কত দেরি, কত দেরি।
সত্যিকার ভাবেই বাংলা সাহিত্য আকাশ যখন কালো মেঘে ছেয়ে গিয়েছিল, তখনই কবি ফররুখ আলোর মশাল হাতে পথহারা এ জাতিকে পথ দেখাতে এগিয়ে এসেছেন। ক্লান্তি শ্রান্তি দূর করে আবাহন সংগীত গেয়েছেন জাতিকে সত্যিকারের পথের দিশা দেখাতে। তাঁর সমসাময়িক কালের কবি-সাহিত্যিকগণ যখন জুলমাতের গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাচ্ছিলেন- তখনই কবি ফররুখ দৃঢ় নাবিকের ন্যায় শক্ত হাতে হাল ধরে রেখেছিলেন সংস্কৃতির শুদ্ধতায় এবং সোনালী প্রভাতের নবসূর্যের প্রত্যাশায়। আদর্শ এবং নৈতিকতায় যার তুলনা মেলা ভার। নজরুল পরবর্তী যুগে মুসলিম জাগরণের নকীবের ভূমিকায় একমাত্র ফররুখের কাব্য দর্শন, আদর্শ এবং চেতনা জাতির সাহিত্যাকাশে ধ্রুবতারার মত জ্বল জ্বল করতে দেখেছি। একটি শুভ এবং কল্যাণময় পৃথিবীর প্রত্যাশায় সর্বদাই তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার নিরলস সাধনা স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। তৎকালীন সময়ে তিনি কারো রক্তচক্ষুকে পরোয়া করতেন না। সাহসিকতার সাথে নিজের স্পষ্ট কথা অকপটে বলে ফেলতেন। তোষামোদী তার জীবনে কখনো দেখা যায়নি। এবং তিনি কারো দয়ার উপর নির্ভর করতেন না, একমাত্র আল্লাহ ভরসা ছাড়া। তিনি ছিলেন বিশ্বমানবতার কবি।
মানবতার জয়গানই ছিল তাঁর কবিতার মূলমন্ত্র। তাঁর কবিতায় ছিল আধুনিকতার সুষ্পষ্ট ছাপ। তাঁর কবিতার প্রকরণ কৌশল, শব্দ চয়ন এবং বাকরীতির অনন্য বৈশিষ্ট্যের সমুজ্জ্বল এবং যুগোত্তীর্ণ সফল কবিদের অন্যতম ছিলেন।
সমসাময়িককালে নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। ১৯৬০ সালে কবি ফররুখ বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেছিলেন। তিনি ১৯৬৫ সনে প্রেসিডেন্ট পদক ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’ এবং ১৯৬৬ সালে পান আদমজী পুরস্কার ও ইউনেস্কো পুরস্কার। ১৯৭৭ সালে ও ১৯৮০ সালে তাঁকে যথাক্রমে মরণোত্তর একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয়।
সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর বিচরণ থাকলেও মূলত কবি হিসেবেই খ্যাত। অধ:পতিত মুসলিম সমাজের জন্য তাঁর অবদান খুবই অর্থবহ। আর সে কারণেই তাঁকে ‘মুসলিম জাগরণের কবি’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়। ইসলামী রেঁনেসা আন্দোলনের তিনি ছিলেন অন্যতম পথিকৃত। বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য তাঁর চর্চায় অনন্য মাত্রায় সংযোজিত হয়েছে। সফল শব্দ প্রয়োগ, বাকরীতিগঠন ও শৈল্পিক উপমা প্রয়োগে দক্ষ শিল্পীর পরিচয় দিয়েছেন। সযতনে এবং স্বচ্ছভাবে কথার মর্মার্থ সাবলিল ভাষায় বর্ণনা করেছেন, যার অনুসৃতি পাওয়া যায় কবি বেনজীর আহমদ ও কবি তালিম হোসেনের মধ্যে। সমসাময়িককালে কবিদের যুগনায়ক হিসেবেও উল্লেখ করা যায়। তার স্থিতধী মেধা এবং দৃঢ়তা হিমদ্রী উচ্চতায় অটল ছিল ‘সাত সাগরের মাঝি’র মত। এমন দৃঢ়তা সম্পন্ন ব্যক্তিত্বের কবি খুব কমই দেখা যায়। তাইতো তাঁর ‘নৌফেল ও হাতেম’ কাব্যনাট্যে সে পরিচয় মূর্ত হয়ে ওঠেছে।
বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান অনেক। হাজারো দুঃখ-কষ্ট এবং প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও উল্লেখযোগ্য কাব্য গ্রন্থ ও শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। কাব্যগ্রন্থের মধ্যে প্রকাশিত- সাতসাগরের মাঝি (ডিসেম্বর, ১৯৪৪), সিরাজাম মুনিরা (সেপ্টেম্বর, ১৯৫২), নৌফেল ও হাতেম (জুন, ১৯৬১), মুহূর্তের কবিতা (সেপ্টেম্বর ১৯৬৩), হাতেম তায়ী (মে, ১৯৬৬), ধোলাই কাব্য (জানুয়ারি, ১৯৬৩), নতুন লেখা (১৯৬৯), কাফেলা (আগস্ট ১৯৮০), হাবিদা মরুর কাহিনী (সেপ্টেম্বর, ১৯৮১), সিন্দাবাদ, (অক্টোবর, ১৯৮৩), দিলরুবা (ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪)।
শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- পাখির বাসা (১৯৬৫), হরফের ছড়া (১৯৭০), চাঁদের আসর (১৯৭০), ছড়ার আসর (১৯৭০), ফুলের জলসা (ডিসেম্বর ১৯৮৫)। কবি ফররুখের মূল দর্শন ছিল তৌহিদবাদী চেতনা।
ইসলামী ভাবধারার কাব্য রচনা এবং চিন্তাধার লেখায় ফুটে উঠেছে জীবনের পূর্ণতা ও সাফল্যের মূল লক্ষ। কুসংস্কার ও অন্ধত্বের মূলে কুঠারাঘাত করে উদ্দীপ্ত প্রেরণায় জীবনের উদ্দেশ্যকে মহান মাবুদের সন্তুষ্টির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন আজীবন। ইসলামী ঐতিহ্যের প্রতি ছিল তার অগাধ আস্থা। তবে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে সমর্থন করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই কবি ফররুখ আহমদ ‘মাসিক সওগাত’-এ ‘পাকিস্তান: রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য নিবন্ধে লেখেন- ‘গণতান্ত্রিক বিচারে যেখানে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া উচিৎ সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাকে পর্যন্ত যাঁরা অন্য একটি প্রাদেশিক ভাষায় রূপান্তরিত করতে চান তাঁদের উদ্দেশ্য অসৎ। পূর্ব পাকিস্তানের সকল অধিবাসীর সাথে আমিও এই প্রকার অসাধু প্রতারকদের বিরুদ্ধে আমার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’ আশ্বিন ১৩৫৪ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৪৭) সংখ্যা।
বাংলা ভাষার তিনি ছিলেন একজন মৌলিক কবি। কবিতার শব্দ গঠন, বিন্যাস, উপমা-নিদর্শন প্রকাশে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। ভাব-ভাষা ও বাক্য গঠনে শৈল্পিক গাঁথুনি ছিল অভিনবত্বের ছোয়ায় দক্ষ ও নিপুণ কারিগরি প্রকাশ। উৎপ্রেক্ষা ও সাবলিল ভাষা তরঙ্গ ছিল মধুময় এবং চিত্তরসের ধারায় আপ্লুত বিহ্বলতা। মনের গভীর দর্শন উদ্ভাসিত হয় সূর্যালোকের মতই। তাই কবি ফররুখ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের হিরক সম সম্পদ। তাঁর কাব্য ও কবিতার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার অনুসারীদের মহান কর্তব্য ও নৈতিক দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি। তাই কবিতা ও কবিতার মূল দর্শনকে যদি আমরা সংস্কৃতির সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে চাই, তবে কবি ফররুখের সমস্ত সৃষ্টিকে স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু সাহিত্যের সমস্ত শাখাতেই তার ব্যপক আলোচনা ও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। যাতে আগামী প্রজন্ম কবি ফররুখের কাব্য ও সাহিত্যকে পাঠ করার মাধ্যমে তার সাহিত্য ও আদর্শকে জাতীয় সংস্কৃতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পাবে। তার জন্ম শতবার্ষিকীতে এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT