উপ সম্পাদকীয়

প্রশাসনের দৃষ্টি চাই : শব্দদূষণ চাই না

গোলাম সারওয়ার প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৬-২০১৮ ইং ০১:১৭:০৬ | সংবাদটি ১৪০ বার পঠিত

গরমে অতীষ্ঠ হলে আর যাই হোক লেখাজোখার কাজ তেমনটা হয় না। লিখতে গেলে কল্পনাশক্তির প্রয়োজন হয়। গরমে কল্পনাশক্তি অসার, অকর্মন্য হয়ে পড়ে। এই রমজানে অনেকগুলো বিষয় আমার মাথায় কিলবিল করছিল। পত্রিকার পাতায় লেখা পাঠানোর জন্য মনটা অস্থির হয়ে পড়েছিল। কিন্তু লিখতে গেলে যে কল্পনাশক্তির প্রয়োজন হয় সেই এনার্জি আমার মাঝে ছিল না এই গরমে। তাই কিলবিল করা বিষয়গুলো পত্রিকায় পাঠাতে পারিনি।
৮ থেকে ১২ জুন পর্যন্ত দু:সহ গরম ছিল সিলেটে। নরমালি ২০-২৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে অতিক্রম করে ৩৫-৪০ ডিগ্রী পর্যন্ত ছুঁয়েছে। রমজানের শেষ দিকে তাই রোজাদারদের বেশ কষ্ট হয়েছিল। তারাবীহ নামাজ অনেকটা এসির ওপর ভর করে পড়তে হয়েছিল।
গরমে স্বস্তির বৃষ্টি খুঁজতে এখন আর আবহাওয়া অফিসের বার্তার অপেক্ষা করতে হয় না। স্মার্টফোনেই যখন-তখন রোদ-বৃষ্টি-মেঘলার খবর জানা যায়। তাই ঘন ঘন স্মার্টফোনেই নজরছিল কখন বৃষ্টি নামবে বা কতো তাপমাত্রা উঠানামা করছে! ৫ দিন প্রচন্ড গরমের পর স্বস্তির বৃষ্টি নামল। বৃষ্টি আর বৃষ্টি। ১৬ জুন ঈদের দিনও ছিল থেমে থেমে বৃষ্টি। অতিমাত্রার বৃষ্টির ফলে মৌলভীবাজারের মনু নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার খবরও এসেছিল। শেষ পর্যন্ত শহর রক্ষার বাঁধ প্লাবনের পানি আটকাতে পারেনি। বাঁধ ভেঙ্গেঁ মৌলভীবাজার শহর প্লাবিত হয়েছিল ১৭ জুন।
সেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি মনু নদীর পানি একটু বৃষ্টিপাত হলেই বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। আমার তো মনে হয় মনু নদীতে পানি ধারণের ক্ষমতা নেই। ধারণ ক্ষমতা না থাকলে ড্রেজিং করা দরকার। এখন তো ডিজিটাল যুগ। স্থানীয় সরকার মনু নদীর সংস্কারে ব্যর্থ হলে জাতীয় সরকারও কি ব্যর্থ? ওখানে তো জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ বসবাস করেন। উনারা একটু নড়াচড়া করলে জাতীয় সরকার কি না নড়ে পারবেন? আতংকের নাম মনু নদী হবে কেন? মনু নদীর এই গ্লানি মুছে ফেলার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে দৃষ্টি কামনা করছি।
প্রিয় পাঠক, আজকের লেখার বিষয় কিন্তু এটা নয়। অতি গরমে যেমন আমরা অতীষ্ঠ, অতি শব্দেও আমরা অতীষ্ঠ। সিলেট শহরে ইদানিং কিছু মোটর বাইকের যন্ত্রণায় আমরা অতীষ্ঠ। মোটর বাইকে ঐড়ৎৎরনষব ঝড়ঁহফ মানে ভয়ংকর শব্দ করার জন্য একটা সিস্টেম চালু করা হয়েছে যা একসেলেটর বাড়ালেই এর বিকট শব্দে সারা শহরময় কেঁপে ওঠে। এদের রুখে দাঁড়াবার কেউ নেই দেখে আমরা হতাশ হচ্ছি। এ অবস্থায় আমাদের বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় প্রতিনিধি বা ট্রাফিক পুলিশ কেন নির্বিকার তা আমাদের মাথায় কোনো অবস্থাতেই প্রবেশ করছে না। ওনারা প্রভাবশালী? প্রভাবশালীদের কেউ? রাজনৈতিক নেতা বা নেতাদের কেউ? উনি যে-ই হোন শব্দদূষণ করার অধিকার তার নেই। শব্দদূষণে সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়। অসুস্থ মানুষ আরো অসুস্থ হয়ে যায়। পড়ালেখায় ছাত্র-ছাত্রীদের বিঘœ ঘটে। মসজিদ-মন্দির-গীর্জায় প্রার্থনারতদের আতংক সৃষ্টি হয়। ভট ভট আওয়াজ তুলে যারা পাড়া, মহল্লা কিংবা রাজপথ দাপিয়ে বেড়ায় এদের বয়স কিন্তু এতো বেশি নয়। এরা প্রচুর পয়সা রোজগার করে এমনও নয়। অথচ এরা দামী মোটর সাইকেল চালায় এবং বুকের বোতাম খুলে পুরো শহর প্রদক্ষিণ করে ঐড়ৎৎরনষব ঝড়ঁহফ বা ভয়াবহ শব্দ তুলে।
অভিভাবক, স্থানীয় প্রতিনিধি, পরিবেশবিদ এবং প্রশাসন এ নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে শব্দদূষণ হতো না। হাইড্রোলিক হর্ণ অনেক আগেই এদেশে নিষিদ্ধ। তবুও ওই হর্ণ দিবানিশি বেজেই চলেছে। কী বিচিত্র আমাদের দেশ তাই না? নিষিদ্ধ পণ্য আমদানীও হচ্ছে, বাজারেও খুব সহজে কিনতে পাওয়া যাচ্ছে। কখনো কখনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা পুলিশ প্রশাসন হাইড্রোলিক হর্ণ বা মোটর সাইকেলের ঐড়ৎৎড়ৎ ঝুংঃবস খুলে নিলে কি হবে বাজারে যদি কিনতেই পাওয়া যায়?
উচ্চস্বরে মাইকিং নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। মাইক বা লাউড স্পিকার বলতেই তো উচ্চস্বর। আমাদের কন্ঠস্বরকে জোরে বা উচ্চস্বরে শোনার জন্যই মাইক বা স্পিকার ব্যবহার হয় প্রয়োজনের তাগিদে। কিন্তু ইদানিং যে হারে মাইক বা স্পিকার ব্যবহার হচ্ছে তা কতটুকু আমাদের প্রয়োজনের তাগিদে হচ্ছে? রাত ১০টার পর ভোর ৫টা পর্যন্ত মাইকের কোনো দরকার আছে? সারা রাত মাইক বা স্পিকারে রাতের ঘুম অবশ্যই হারাম হয়ে যায়, আমাদের নীতি নির্ধারকরা তা বুঝেন?
রাতের বেলা গাড়ি বা মোটর বাইকের বা অন্য কোনো যানবাহনের হর্ণ বাজানোর নিয়ম নেই। শুধু আমাদের দেশেই নয়, পৃথিবীর কোনো দেশেই রাতের বেলা হর্ণ বাজানোর নিয়ম নেই। হেড লাইটের ডিমার (উওগগঊজ) ব্যবহার করে যানবাহনগুলো বাচনভঙ্গিঁ প্রকাশ করে। এই নিয়মই বা কয়জন জানে? গাড়ি বা মোটর বাইকের ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করার সময় কি এসব প্রশ্ন করা হয়? অথবা কখনো কি প্রশ্ন করা হয় হর্ণের ব্যবহার নিয়ে? আমার মনে হয়, ট্রাফিক পুলিশও এ বিষয়ে অজ্ঞাত, যার ফলে দিবানিশি হর্ণ বেজেই চলেছে। আমার মনে হয়, বিনা কারণে বাজানো যাবে না- এ রকম একটা আইন করলে হর্ণে শব্দদূষণের মাত্রা অনেকটাই কমে আসবে।
কিছুদিন আগে শহরের গুরুত্বপূর্ণ একটা রোডে সংস্কারের কাজ হয়েছিল। ওই সময় প্রচন্ড যানজটও লেগে থাকতো। একদিন ঠিক সন্ধ্যার আগে আমার মেয়ে ঐশীকে নিয়ে মোটরবাইকে আটকা পড়েছিলাম যানজটে। ডানে-বামে নড়াচড়ার কোনো পথ নেই। সামনে-পিছনে গাড়ি, রিক্সা, সিএনজি। আমার ঠিক ডান পাশে ছিল একটা এম্বুলেন্স। ঠায় দাঁড়িয়ে উ আ করে ভেপু বাজাচ্ছিল। যানজটে আটকা পড়ে সামনে-পিছনে যাওয়া যাবে না জেনেও একটানা উ আ বাজাচ্ছে। এর কারণ কি? কমনসেন্স! কমনসেন্সের অভাবেই এমনটা হচ্ছে। দামি গাড়ি- ওয়ালাদেরও দেখি একি স্বভাব। গাড়ির গেরেজ থেকে বের হয়ে গেরেজে ফেরা পর্যন্ত একটানা গাড়ির হর্ণ ওই কমনসেন্সের অভাবেই। ভীরু কাপুরুষেরা একটানা গাড়ির হর্ণ বাজায়, তাই কি? এ কাজটা অবশ্য বেশিরভাগ হো-াওয়ালারাও করে থাকেন। খালি রাস্তায় পি-ই-প শব্দ না তুললে যেন হো-া চালাতে মজাই পান না! শুধু যে কমনসেন্সের অভাব তাও নয়। এম্বুলেন্সের একটানা উ আ শব্দের পাশেই আমি ঘামছিলাম। এমন সময় মাগরিবের আজান। এম্বুলেন্সের বাজনা থামাতে বললাম-ভাই আজান হচ্ছে! ভেপুটা থামান! বলা শেষ না হতেই ড্রাইভার এবং রোগীর স্বজনেরা রেগেমেগে আগুন। আসলে আমাদের দেশের লোকদের শুধু কমনসেন্সেরই অভাব নয়, মানবিক আচরণ এবং মূল্যবোধেরও বড় বেশি অভাব। কেউ কারো কথা রিসিভ করতে চায় না। স্বার্থপরতার ধান্ধাই বেশি।
শব্দদূষণ এখন আর নীরব ঘাতক নয়, সরব ঘাতক। সরব আওয়াজ তুলেই আমাদের শেষ করে দিচ্ছে। বাড়ি বা দালান নির্মাণ করতে ৬ মাস থেকে ২ বৎসর বা ততোধিক সময় লাগে। উঁচু টাওয়ার বানাতে সময় আরো বেশি। এই সময়ের মধ্যে আমাদের অনেক জীবন অতীষ্ঠ হতে হতে ঝরে যায়, কেউ তা খেয়াল করে না। একটি বাড়ি বা উঁচু টাওয়ার নির্মাণে নানাবিধ শব্দের উৎপত্তি হয়। সব শব্দ অবশ্য ঝাঁঝাঁলো নয়। দালান নির্মাণের কোনো কোনো শব্দ আমাদের জীবনটাকে অতীষ্ঠ করে তুলে। টাইলস কাটার শব্দ, রড বা গ্রিল কাটার শব্দ, পুরনো মিকচার মেশিন ব্যবহার করলে সে মেশিনের কালো ধোঁয়াযুক্ত গড়াৎ গড়াৎ শব্দ, ড্রিল করার শব্দ ইত্যাদি চারপাশের লোকদের ভীষণ-ক্ষতিগ্রস্থ করে।
সিনেমা হলে অনেক ছবি দেখেছি জীবনে। কোনোদিনও শ্রুতিকটু বা বিকট শব্দে আক্রান্ত হইনি। কিন্তু আজকাল ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেমে পৌঁছেও সাউন্ড পলিউশন হচ্ছে কেন? বদ্ধ ঘরে বা অডিটরিয়ামে লাউড স্পিকারের হাই ভলিউমে কোনো অনুষ্ঠানই দীর্ঘক্ষণ দেখতে ইচ্ছে করে না। বিকট শব্দের প্রতিক্রিয়ায় বমি বমি ভাব নিয়ে অথবা হার্টবিটে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে হল থেকে বের হতেই হয়। আসলে লাউড স্পিকারগুলো বদ্ধ ঘরের জন্য নয়, এই বিষয়টাও আমাদের কমনসেন্সের বাইরে। লাউড স্পিকারগুলোর ওপেন এয়ার কনসার্টের জন্য ব্যবহৃত হবে-এটা জেনেও কি আমরা না জানার ভান করে বদ্ধ ঘরে বা অডিটরিয়াম হলে ব্যবহার করে আসছি? প্রায় নি:শব্দে স্যাটেলাইট উড়িয়ে মহাকাশে যেতে পারলেও এ ধরায় কেন শান্তিতে, স্বস্তিতে শ্রুতিমধুর সাউন্ড সিস্টেম উপভোগ করতে পারছি না? এখানেও কি কমনসেন্সের অভাব?
নাদানের গীত আর গাইতে চাই না। আমাদের বিবেক, আমাদের কমনসেন্স জাগ্রত হলে এবং একই সাথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এগিয়ে এলে আমার মনে হয় আমরা এই সবুজ শহরে শান্তির নীড় খুঁজে পাবো। শব্দদূষণের অচলাবস্থা থেকে আমরা অবশ্যই মুক্তি চাই। কিন্তু কে হবে আমাদের মুক্তি সনদ? বিবেক, কমনসেন্স না প্রশাসন? আমার মনে হয় প্রশাসন ছাড়া আমাদের বিবেক, আমাদের কমনসেন্সগুলো জাগ্রত হবে না।
১৯৮৮ সালে আমি দেখেছি, বন্যা পরবর্তী সময়ে করণীয় কাজগুলো ফেলে রেখে ত্রাণের অপেক্ষায় মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো কখন হেলিকপ্টার আসে ত্রাণ নিয়ে। বিবেক, চেতনা, সাধারণ জ্ঞান তখন অনেকটাই প্রশাসন নির্ভর হয়ে পড়েছিল। আসলে প্রশাসনের সুশাসনই পারে আমাদের বিবেক এবং চেতনাকে জাগ্রত করতে। সম্প্রতি, ১৪ জুন বৃহস্পতিবার, সিলেটের জেলা প্রশাসক নুমেরী জামান রিক্সাচালক আব্দুল আজিজকে সততার পুরস্কার দিয়েছেন। সেজন্য আমরা তাকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ রকম নজির সৃষ্টি করা সত্যিকার অর্থে প্রশংসার দাবী রাখে। মাঝে মধ্যেই যদি শ্রেষ্ঠ রিক্সাচালক, মোটর বাইক চালক কিংবা শ্রেষ্ঠ বাড়ি নির্মাতাকে পুরস্কার দেয়ার ব্যবস্থা করা হতো আমার মনে হয় সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন আসতো। পজিটিভ বাংলাদেশ হিসেবে দেশ দ্রুত গড়ে উঠতো। আপনারা কি বলেন?
লেখক: কলামিস্ট

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মৃত্যুই দিয়েছে তাঁরে চিরমুক্তি!
  • আমেরিকা : ট্রাম্প শাসনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব
  • ইলেকট্রনিক ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে ক্ষতিকর প্রভাব
  • পরিবহন নৈরাজ্য
  • মাদকবিরোধী অভিযান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
  • ছড়াকার বদরুল আলম খান
  • একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিগত দশটি নির্বাচন
  • বইয়ের বিকল্প প্রযুক্তি নয়
  • আগুনের পরশমণি ছোয়াও প্রাণে
  • বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা
  • জনসচেতনতাই পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারে
  • এক শারীরিক প্রতিবন্ধীর কথা
  • এই অপসংস্কৃতির অবসান হোক
  • সৈয়দ সুমন আহমদ
  • পানিশূন্য তিস্তা
  • বিদ্যুৎ প্রিপেইড মিটারের গ্যাড়াকলে গ্রাহকরা : দায় কার?
  • পরিবহন ধর্মঘট এবং জনদুর্ভোগ
  • পানি সমস্যা সমাধানে নদী খনন জরুরি
  • শব্দসন্ত্রাস
  • মাধবপুর : যাতায়াত দুর্ভোগ
  • Developed by: Sparkle IT