সম্পাদকীয় এমন লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করো না, যে তোমার দোষগুলো মনে রাখে এবং গুণগুলো ভুলে যায়। -হজরত আলী (রা.)

গরীবদের বিদ্যালয়!

প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৬-২০১৮ ইং ০২:০২:১০ | সংবাদটি ২৯ বার পঠিত

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো কি গরিবদের শিক্ষা লাভের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে গেছে? বিভিন্ন মহল থেকে এই ধরনের প্রশ্নই উত্থাপিত হচ্ছে আজকাল। বিশেষজ্ঞদের মতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখন আর সচ্ছল পরিবারের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে চায় না। তবে অসচ্ছল ও স্বল্প আয়ের পরিবারের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার প্রধান অবলম্বন এখনও এই বিদ্যালয়গুলোই। দেশের প্রায় ৭৮ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুধু দরিদ্র শিশুদের লেখাপড়া হচ্ছে। অথচ এক সময় উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং নি¤œবিত্ত সকল শ্রেণির পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা শুরু হতো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার মাধ্যমে। তখন এর কোন বিকল্প ছিলো না। বর্তমানে দেশের উচ্চ পর্যায়ে আসীন ব্যক্তিরা এই সব বিদ্যালয় থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। এখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পরিণত হয়েছে অনগ্রসর গোষ্ঠীর সন্তানদের অক্ষরজ্ঞান দেয়ার প্রতিষ্ঠানে।
আমাদের শিক্ষার মূল ভিত্তি যে প্রাথমিক শিক্ষা, তার অবস্থা খুব ভালো নয়। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু হওয়ার দুই যুগ পরেও শতভাগ শিশুকে বিদ্যালয়মুখী করা সম্ভব হয়নি। সেই সঙ্গে লেখাপড়ার মানও উন্নত হচ্ছে না। উন্নতি হচ্ছে না শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর। তাছাড়া জনসংখ্যার অনুপাতে বিদ্যালয়ের সংখ্যা কম। অথচ প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতির জন্য প্রতি বছর সরকার ব্যয় করছে কোটি কোটি টাকা। তারপরেও প্রাথমিক শিক্ষার প্রত্যাশিত উন্নতি হচ্ছে না। প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতির জন্য সরকার বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি চালুসহ বিনামূল্যে বই প্রদান করছে। চালু করা হয়েছে উপবৃত্তি প্রকল্প। এতো সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক শিক্ষায় বিরাজ করছে দৈন্যদশা।
এই সুযোগেই দেশে গড়ে ওঠেছে ব্যক্তি পর্যায়ে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অভিজাত ও ব্যয় বহুল এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে শহর নগরের আনাচে কানাচে। এমনকি গ্রাম পর্যায়েও এর বিস্তার ঘটেছে। এইসব কিন্ডার গার্টেন বিদ্যালয়ে সচ্ছল এবং বেশি আয়ের লোকেরা তাদের ছেলেমেয়েদের পাঠায়। এই ধারা শুরু হয়েছে গত প্রায় চার দশক ধরে। সামর্থ্যবানদের বক্তব্য হচ্ছে, কিন্ডার গার্টেনে শিক্ষার মান ভালো এবং যুগোপযোগী, অপরদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভালোভাবে লেখাপড়া হয় না। এই ধারণা থেকেই তারা নিজেদের সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য পাঠাচ্ছেন কিন্ডার গার্টেন স্কুলে। আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ৯৮ ভাগই অসচ্ছল পরিবারের শিশুরা লেখাপড়া করছে। এরা বেশিরভাগই দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা গার্মেন্টস কর্মীর সন্তান। এরা ব্যয় সংকুলান করতে পারবে না বলেই সন্তানদের কিন্ডার গার্টেন স্কুলে লেখাপড়া করাতে পারছে না।
এটা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই যে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি শিশুদের বেশ উপযোগী এবং এ থেকে শিশুরা সহজেই জ্ঞান আহরণ করতে সক্ষম। দেশের বিজ্ঞজনেরাই আমাদের শিশুদের মনমানসিকতা ও মেধা বিবেচনা করে এইসব গ্রন্থ রচনা করেছেন। কিন্তু শিশুদের উপযোগী পাঠ্যক্রম হলেও এগুলো যথাযথভাবে পাঠদান না করা হলে এর কোন মূল্য নেই। আমাদের জন্য এটাই মূল সমস্যা। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি শিক্ষক সংকট দূর করে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দায়িত্বের প্রতি আন্তরিকতা প্রদর্শনের মনোভাব তৈরির ব্যবস্থা করলে, সর্বোপরি বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি সকল শ্রেণির শিশু ও অভিভাবক আকৃষ্ট হতে বাধ্য। যে প্রাথমিক শিক্ষার পেছনে সরকার ব্যয় করছে কোটি কোটি টাকা সেই শিক্ষার সুযোগ গ্রহণ করবে সকল শ্রেণির মানুষ, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT