সম্পাদকীয়

মাদক বিরোধী দিবস

প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৬-২০১৮ ইং ০১:৫৬:২৪ | সংবাদটি ৩৭ বার পঠিত

আজ দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী দিবস। মাদকাসক্তি একটি নীরব ঘাতক। এটি মানুষকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। ধ্বংস হয় পরিবার, সমাজ ও দেশ। যেসব দ্রব্য গ্রহণে আসক্তি জন্মে তার নাম মাদকদ্রব্য। বিভিন্ন নামে পরিচিত এই মাদকদ্রব্য। অত্যন্ত বাজে একটি অভ্যাস হচ্ছে মাদকদ্রব্য গ্রহণ। মূলত: এটি একটি আচরণগত সমস্যা। মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে মাদকাসক্তের স্বাস্থ্যহানী ঘটে, জীবনী শক্তি কমতে থাকে, শরীরে ইন্দ্রিয়গুলো নিস্তেজ হয়ে পড়ে। আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়, মানসিক ভারসাম্য লোপ পায়। এতে কর্মক্ষমতা কমে যায় এবং হতাশা ও অবসাদ একজন মাদকাসক্তকে ঠেলে দেয় এক অন্ধকার জীবনে। মাদকাসক্তরা নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং ধাবিত হয় ধ্বংসের দিকে। আমাদের দেশে মাদকের আগ্রাসী ছোবল দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটেই আজ দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী দিবস।
শুধু তাই নয়, বছরে মাদক বিরোধী আরও কিছু দিবস পালিত হয়ে আসছে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও। এইসব দিবস পালনের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে সর্বনাশা মাদকের ছোবল থেকে মানুষকে মুক্ত করা, এ ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করে তোলা। কিন্তু বাস্তবে এইসব দিবস পালনের সুফল খুব একটা আসছে না। এর উদাহরণ রয়েছে চারপাশে। প্রতিদিনই পত্রিকার পাতা খুললে মাদকাসক্ত তরুণ-যুবকদের করুণ কাহিনী চোখে পড়ে। মাদকাসক্ত সন্তানকে পুলিশে দেয়া থেকে শুরু করে মাদককে ঘিরে আরও লোমহর্ষক ঘটনাবলী ঘটে চলেছে এ দেশে। তাছাড়া, মাদকদ্রব্যের আমদানি ও বিপণন ঘটছে অবলীলায় দেশের বিভিন্নস্থানে। তাছাড়া বাংলাদেশ হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের একটি ট্রানজিট রুট। আর তাই এখানে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য সহজলভ্য। আমাদের পার্শ্ববর্তী অনেক দেশেই উৎপাদন হচ্ছে মাদকদ্রব্য। এগুলো বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ হয়ে পাচার হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বাংলাদেশ ছাড়াও মাদকদ্রব্য পাচারের আরও কয়েকটি ট্রানজিট হচ্ছে-এঙ্গোলা, অষ্ট্রেলিয়া, বাহামা, বেনিন, বলিভিয়া ইত্যাদি।
সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, এশিয়ার অনেক দেশেই চাষ হচ্ছে মাদক। বিশেষ করে মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে ঘিরে তিন লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গাল’ হচ্ছে এশিয়ার সবচেয়ে বড় মাদক উৎপাদন কেন্দ্র। এর পর রয়েছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং ইরান জুড়ে মাদক উৎপাদন কেন্দ্র ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’। বিশ্বের সবচেয়ে বড় আফিম উৎপাদনকারী দেশ হচ্ছে আফগানিস্তান। দ্বিতীয় স্থানে আছে মিয়ানমার। এছাড়া, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কোকেন উৎপাদিত হয় দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়ায়। আর বিশ্বে মাদকের সবচেয়ে বড় ভোক্তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলো। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয় সারা বিশ্বে বছরে মাদক ব্যবসায় লেনদেন হয় চারশ বিলিয়ন ডলার। এই ব্যবসায় স্রোতের মতো টাকা আয়ের সুযোগ থাকায় এর সঙ্গে খুন, সন্ত্রাস আর রক্তপাতের ঘটনা সম্পৃক্ত রয়েছে। এই কারণে বিশ্বের প্রায় সব উল্লেখযোগ্য সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী সংগঠন এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
মাদকদ্রব্য উৎপাদিত হচ্ছে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। আর এগুলো পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশ। মূলত: ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার থেকেই বেশির ভাগ মাদকদ্রব্য আসে আমাদের দেশে এবং এখান থেকে পাচার হয় অন্যান্য দেশে। এই প্রক্রিয়ায় অনেক সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাদকদ্রব্য থেকে যায় আমাদের দেশেই। আর এগুলোই ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। এই প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। মাদকদ্রব্য কোনো অবস্থাতেই যাতে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে না পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, মাদকদ্রব্য পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে যাতে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা না হয়, সেটা নিশ্চিত করা জরুরি। এর পাশাপাশি মাদকাসক্তদের ব্যাপারে সহমর্মিতা ও ভালোবাসার মনোভাব প্রদর্শন করতে হবে। এদের চিকিৎসার ব্যাপকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই। মাদকাসক্তদের যাতে সমাজে কোনোভাবে হেয় করা না হয়, তার জন্য সকল স্তরের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এটাই আমাদের প্রত্যাশা আজকের আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী দিবসে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT