মহিলা সমাজ

হবিগঞ্জ রতœ

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৬-২০১৮ ইং ০১:৫৬:৫৩ | সংবাদটি ৪১ বার পঠিত

সৈয়দ আবুল বশর মাহমুদ হোসেন ১৯১৬ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি হবিগঞ্জ জেলার লস্করপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। হযরত শাহজালাল (রহ.) এর সঙ্গী সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালারের অধস্তন বংশধর বিচারপতি এ. বি মাহমুদ হোসেন। তাঁর পিতা সৈয়দ আব্দুল মোতাকাব্বার আবুল হাসান একজন শিক্ষাবিদ ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও ‘উপন্যাস কল্পতরু’ গ্রন্থের প্রণেতা। তাঁর মাতা বেগম সালমা খাতুন হযরত শাহজালালের অনুসারী তাজউদ্দিন কোরেশির বংশধর।
সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেন নিজ এলাকায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা লাভের পর সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি ও বিএ পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা থেকে বিএল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
১৯৪০ সালে এ. বি মাহমুদ ঢাকা জজকোর্টে উকিল হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৩ হতে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তিনি হবিগঞ্জে সরকারি উকিল হিসাবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ৮ এপ্রিল তিনি তদানীন্তন পাকিস্তান হাইকোর্টের এডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই দেওয়ানী বিভাগের মামলা পরিচালনায় খ্যাতি লাভ করেন।
১৯৪৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি পাকিস্তান ফেডারেল কোর্টে এটর্নী নিযুক্ত হন এবং ১৯৫০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান ফেডারেল কোর্টে এডভোকেট তালিকাভুক্ত হন।
মাহমুদ হোসেন ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র এডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৬৪ সালে মাহমুদ হোসেন স্বীয় মেধা বলে পূর্ব পাকিস্তানের এডভোকেট জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন, সমাজ সচেতন এবং স্বাধীনচেতা একজন মানুষ ছিলেন এ. বি মাহমুদ। আমাদের ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন সদা জাগ্রত এক আপোষহীন সৈনিক। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে কেন্দ্রিয় সরকারে বাঙালিদের চাকুরি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব আদায়ের সংগ্রামে ছিলেন সোচ্চার। পাকিস্তানের উভয় অংশের বিভিন্ন বৈষম্যের ব্যাপারে এ. বি মাহমুদ হোসেন সব সময় কথা বলেন এবং এর সমাধানের পথে বিভিন্ন পরামর্শ দেন।
জ্ঞানতাপস এ. বি মাহমুদ ১৯৬৫ সালের ২৬ এপ্রিল তারিখে পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির পদ লাভ করেন এবং ৮ নভেম্বর শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি উক্ত পদ থেকে অবসরগ্রহণ করেন। সৈয়দ এ. বি মাহমুদ পেশাগত ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে, তাঁর ব্রতে ব্রতী হয়ে বহু আইনজীবী আজ প্রতিষ্ঠিত। একজন দক্ষ এবং ন্যায়পরায়ণ বিচারক ছিলেন তিনি।
মুশুরীখোলার পীর শাহ আব্দুল আজিজ সাহেবের কন্যা সুফিয়া বেগমের সাথে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। সুফিয়া বেগম ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক গৃহবধূ। বিচারপতি নিজ সহধর্মিনীকে ‘দরবেশ’ বলে সম্বোধন করতেন। স্বামীর মৃত্যুর কিছু দিন পূর্বে সুফিয়া বেগম সুস্থ শরীরে পরলোকগমন করেন।
তাঁদের চারপুত্র এবং পাঁচ কন্যা সন্তান রেখে গিয়েছিলেন। পুত্র-কন্যাদের অনেকেই আজ জীবিত নেই। সৈয়দ এ. বি মাহমুদ হোসেনের পুত্র সৈয়দ দস্তগীর হোসেন বর্তমানে হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আমার ছেলে বেলায় এ. বি মাহমুদ হোসেন এবং তাঁর পরিবার সম্পর্কে আব্বা-আম্মার মুখে অনেক গল্প শুনেছি। আমাদের বাড়িতে অর্থাৎ হবিগঞ্জ জেলার পইল গ্রামের সম্ভ্রান্ত সৈয়দ পরিবারে (পইল সাহেব বাড়িতে) তাঁর সব ছোট মেয়ে সৈয়দা হাসিনা বেগমকে বিয়ে দিয়েছিলেন। বর্তমানে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার চেয়ারম্যান সৈয়দ আহমদুল হকের ছোট ভাই ডাঃ সৈয়দ হামিদুল হক (চক্ষু বিশেষজ্ঞ) হলেন তাঁর জামাতা। তাঁর মেয়ের দিকের এক নাতি ও এক নাতনি রয়েছেন। আমার দাদা সৈয়দ আব্দুল আজিজের চাচাতো ভাই হলেন ডাঃ সৈয়দ হামিদুল হক। সেই সুবাদে তিনি আমার দাদা হন। উল্লেখ্য যে, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে এ. বি মাহমুদের ছোট মেয়ে সৈয়দা হাসিনা বেগম পরলোক গমন করেন।
আমার আব্বার চাকুরিসূত্রে আমরা সিলেটে বসবাস করি। এখানে আমরা ভাই-বোন সবাই লেখাপড়া শেষ করে স্থায়ীভাবে বসবাস করছি। আমি এমএ, এলএলবি পাশ করে এখানকার একটি বেসরকারি স্কুলে সিনিয়র শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। পাশাপাশি সিলেট বারে মাঝে মাঝে সিনিয়রদের সাথে কাজ শিখছি। আমার ছোট ভাই মঞ্জুর রাশেদ পেশায় একজন প্রকৌশলী। সে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে একটি বেসরকারি কোম্পানীর সিলেট শাখায় কর্তব্যরত রয়েছে।
সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সাহিত্য-সংস্কৃতি এসব বিষয়ে জানার আমার প্রবল আগ্রহ। এ কারণে আমি প্রচুর বই পড়ি এবং টুকটাক লেখালেখির সাথে জড়িত রয়েছি। তাই এ. বি মাহমুদের মতো কীর্তিমান মানুষ সম্পর্কে পাঠককে জানানোর আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। বই পড়তে গিয়ে সিলেটের কয়েকজন সম্মানিত লেখকের এ. বি মাহমুদ কে নিয়ে লেখা আমি পড়েছি। তাছাড়া তাঁর সাথে আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকায় আমি ছোট বেলায়ও তাঁর কথা শুনেছি। আমি যখন খুব ছোট তখন তিনি মারা যান।
বিচারপতি মাহমুদ হোসেনের জীবন ছিল বৈচিত্রময়। তিনি কখনও সক্রিয় রাজনীতি করেছেন, কখনও ওকালতি করেছেন, আবার কখনও বিচারকের আসনে বসে বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন। বিচারকাজে তিনি সব সময় ন্যায়ের পথটি বেছে নিয়েছেন। সমাজসেবী হিসেবে তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। তিনি অনেক জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। তিনি ঢাকা সেন্ট্রাল ল’ কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ঢাকা হার্ট ফাউ-েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ১৯৭৬ সালে তিনি ‘দেওয়ানে গওছিয়ার’ অনুবাদ করেন। এটি তাঁর একমাত্র সাহিত্যকর্ম। বৃহত্তর সিলেটে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রধান বিচারপতির আসন অলংকৃত করেন।
বিচারপতি সৈয়দ এ. বি মাহমুদ হোসেন ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, সদালাপী, নিরহংকারী ও সহজ সরল ধর্মপ্রাণ একজন মানুষ। ধর্মের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় বিশ্বাস তাঁকে সুফী মতবাদের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। তিনি নিজে যেমন ধার্মিক ও পরহেজগার ছিলেন, পুত্র-কন্যাদেরও তেমনি ধর্মপ্রাণ ও ধর্মানুরাগী করে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি ইংরেজি, উর্দু, আরবি ও ফার্সী ভাষায় অনর্গল কথা বলতে ও লিখতে পারতেন। অত্যন্ত নির্ভীকচেতা, আপোষহীন, ন্যায়-পরায়ন পুরুষ ছিলেন তিনি। তাঁর মধ্যে বিকশিত ছিল একটি আদর্শ।
আজ তিনি আমাদের মধ্যে নেই। ১৯৮২ সালের ২রা আগস্ট সৈয়দ এ. বি মাহমুদ হোসেন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর নাম, রেখে গেছেন তাঁর আদর্শ যা অনুকরণীয়-অনুস্মরণীয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT