মহিলা সমাজ

বিজ্ঞানচর্চার পথিকৃৎ

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৬-২০১৮ ইং ০১:৫৭:১৫ | সংবাদটি ১২৪ বার পঠিত

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর সার্বিক আলোচনা ও এর ভবিষ্যৎ রূপরেখা সম্বন্ধে আলোকপাত সমৃদ্ধ ‘কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট’ বাংলার শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছে পরিচিত নাম, একটি পরিচিত বিষয়। সে-ই বিজ্ঞানচর্চার অগ্রপুরুষ কুদরাত-এ-খুদা’র বর্ণাঢ্য জীবন সম্পর্কে কিছু জানতে চান? তো, পড়–ন ফিচারটি-
১৯০০ সালের ৮ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গঁ রাজ্যের বীরভূম জেলার মাড়গ্রাম গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদা। বাবা সৈয়দ শাহ সুফি খোন্দকার আব্দুল মুকিত ছিলেন ভারতের মুর্শিদাবাদ ও বর্ধমান জেলার সীমান্ত মৌ গ্রামের অধিবাসী। মা সৈয়দা ফাসিয়া খাতুন ছিলেন গৃহিনী। আব্দুল মুকিত আঠারো শতকের শেষ দিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাশ করেছিলেন। সরকারি চাকুরি না করে তিনি ধর্ম চর্চায় মনোনিবেশ করেন। বাবা-মায়ের সাত সন্তানের মধ্যে কুদরাত-এ-খুদা ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান।
মাড়গ্রাম এমই স্কুলের পন্ডিত মশাইদের ¯েœহের ছাত্র কুদরাত-এ-খুদা পরপর দুই বছর ডবল প্রমোশন লাভ করেন। এরপর বড় মামার কাছে থেকে পড়াশোনা করার জন্য মাড়গ্রাম গ্রামের এমই স্কুল ছেড়ে ভর্তি হন কলকাতার মিরজাপুর ষ্ট্রিটে অবস্থিত উডবার্ন এমই স্কুলে। বাংলা শেখার ব্যবস্থা না থাকায় তিনি উর্দুতে মাইনর স্কুলের পড়াশোনা শেষ করেন। এবং বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে বৃত্তিলাভ করেন। দু’ বছর পর মধ্য ইংরেজি বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন এবং কলকাতা মাদরাসায় অ্যাংলো পারশিয়ান বিভাগে ভর্তি হন। সেখানে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় পন্ডিত মশাইয়ের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বাংলা পড়তে শুরু করেন। সব সময় তিনি ক্লাসে প্রথম হতেন। ১৯১৮ সালে তিনি কলকাতার আলিয়া মাদরাসায় অ্যাংলো পারশিয়ান বিভাগ থেকে মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে ম্যাট্টিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার একজন পথিকৃৎ কুদরাত-এ-খুদা এরপর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে কেমিষ্ট্রি বা রসায়ন সাবজেক্ট এর প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ ছিলো। ১৯২৪ সালে তিনি রসায়ন শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন এবং এই ফলাফলের জন্য স্বর্ণপদক পান। ১৯২৪ সালের শেষের দিকে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত ষ্টেট স্কলারশিপ লাভ করে উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমান। সেখানে প্রতিদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলতে থাকে তাঁর গবেষণার কাজ। গবেষণা শেষে উচ্চ বেতনের কাজের প্রপোজাল ফেলে রেখে তিনি দেশে ফিরে আসেন। সে বছরই লন্ডন ইম্পিরিয়াল কলেজ অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে ডি.এসসি. ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯২৯ সালে কুদরাত-এ-খুদা যখন দেশে ফিরে আসেন, তখন সারা ভারতবর্ষে একমাত্র তিনিই ছিলেন ডি.এসসি ডিগ্রি অর্জনকারী মুসলমান তরুণ। তবুও একটি উপযুক্ত চাকরির জন্য তাঁকে অপেক্ষা করতে হয় দুই বছরেরও বেশি সময়। অবশেষে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়ন বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন কুদরাত-এ-খুদা। ১৯৩৬ সালে উক্ত বিভাগের বিভাগীয় প্রধানও হন তিনি। ১৯৪২ সালে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক সাহেবের অনুরোধে কুদরাত-এ-খুদা ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। এরপর ১৯৪৬ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে ফিরে এসে অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ড. মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদা স্থানীয় বিভিন্ন গাছ-গাছড়া থেকে জৈব রাসায়নিক উপাদান নিষ্কাশনে সক্ষম হন। পাটঘড়ি থেকে কাগজ তৈরি তাঁরই গবেষণার ফল। এছাড়া, চিটাগুড় ও তালের গুড় থেকে ভিনেগার প্রস্তুত ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য আবিস্কার।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে ‘খুদা কমিশন’ একটি মাইলফলক। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর কুদরাত-এ-খুদা যখন তাঁর পরিবার নিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসেন তখন তাঁকে জনশিক্ষা পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয়। এই দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি পল্লী অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি, বয়স্ক শিক্ষা জোরদার, নতুন বিদ্যালয় স্থাপন ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি শিক্ষাকে ডেভলাপ করার চেষ্টা করেন। ১৯৭২ সালে গঠিত প্রথম শিক্ষা কমিশনের সভাপতি নিযুক্ত হন ড. কুদরাত-এ-খুদা। এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে তিনি সরকারের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পেশ করেন। এই প্রতিবেদনটি ‘কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট’ নামে পরিচিত। ১৯৭৫ সালে ডা. কুদরাত-এ-খুদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যোগদান করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে নিযুক্ত ছিলেন।
বারাসাতের অধিবাসী প্রখ্যাত আইনজীবি আলহাজ কাজী গোলাম আহমদ সাহেবের কনিষ্ঠ কন্যা আকরামুন্নেছা উম্মাল উলুম সাদাত আকতারকে প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় ড. কুদরাত-এ-খুদা বিয়ে করেন। কুদরাত-এ-খুদা ছিলেন দুই পুত্র ও চার কন্যা সন্তানের জনক।
শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ড. কুদরাত-এ-খুদাকে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৬ সালে একুশে পদক প্রদান করেন। ১৯৮৪ সালে তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়। ১৯৯০ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গেঁ ড. কুদরাত-এ-খুদার বসতভিটায় প্রতিষ্ঠিত হয় কুদরাত-এ-খুদা গ্রামীণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিকাশ কেন্দ্র ও সংগ্রহশালা। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সরকার ঢাকার নিউ এলিফ্যান্ট রোডের নাম পরিবর্তন করে ‘কুদরাত-এ-খুদা সড়ক’ নামকরণ করেন।
বার্ধক্যজনিত কারণে ১৯৭৭ সালের ৩ নভেম্বর মহান এই বিজ্ঞানী মৃত্যুবরণ করেন। এ দেশে বিজ্ঞানচর্চার অগ্রপুরুষ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা রবে তাঁর নামটি। বিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে তথা সকল প্রগতিশীল মানুষের কাছে তিনি প্রেরণা’র বাতিঘর হয়ে থাকবেন। তোমায় জানাই শ্রদ্ধা হে, সময়ের রূপকার।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT