ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য তথ্য কোষ

প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৬-২০১৮ ইং ০৩:২৫:৩৩ | সংবাদটি ৯৮ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
(তাং-বুধবার ১ অগ্রহায়ন ১৪০৭ বাংলা, ১৫ নভেম্বর ২০০০ খ্রি./ দৈনিক গিরিদর্পণ, রাঙামাটি)।
এটা বিস্ময়কর যে, উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ গোটা পর্বতাঞ্চলেই নিজেদের ভূম্যাধিকার দাবী করছেন। অথচ বৈধ ভূম্যাধিকারের পক্ষে লীজ ও বন্দোবস্তি থাকা প্রয়োজন, যা তাদের অধিকাংশের নেই। অধিকন্তু বাঙালিদের বন্দোবস্তিকেও তারা অবৈধ বলে দাবী করছেন। হেডম্যানদের প্রাথমিক পত্তন দান তখনই বৈধ হয়, যখন তা জেলা প্রশাসক থেকে বন্দোবস্তি বা ইজারা নেয়া হয়। খাজনা সালামী প্রদান ছাড়া, বন্দোবস্তি আর ইজারার বৈধতা স্থায়ী হয় না। কোন লা খেরাজ বা নিষ্কর সম্পত্তির পক্ষেও বন্দোবস্তি দলিল থাকা জরুরি। পর্বতাঞ্চলে প্রতি মৌজায় সার্ভিস ল্যান্ড বা সেবা সম্পত্তিরূপে পঞ্চাশ একর জমি নির্দিষ্ট আছে যা হেডম্যানদের নিজস্ব স্বার্থে ব্যবহৃত হয়। হেডম্যানরা খাস জমি ও বন পাহাড়ের তত্ত্বাবধায়ক। চীফ হেডম্যান কারবারী ও বাজার চৌধুরীরা মাসোহারাভোগী গ্রাম্য কর্মকর্তা ধরণের সরকারি রাজস্ব এজেন্ট। তারা সরকারি কর্মকর্তা বা জমিদার নন। তাই সার্কেল মৌজা ও বাজার সমূহ তাদের জমিদারী সম্পত্তি নয়। তারা প্রধানতঃ জুম খাজনা ও বাজার রাজস্ব উশোল ও জমাদানের ক্ষমতাপ্রাপ্ত, কমিশন ও মাসোহারা ভোগী বেসরকারী কর্মকর্তা। কমিশনের ভিত্তিতে ভূমি রাজস্ব আদায়, জমাদান ও উপজাতীয় সামাজিক বিচার সালিশ করাও তাদের দায়িত্ব। জুম খাজনা ভূমি রাজস্ব নয়। আসলে জুম চাষ অবৈধ এবং জুম ভূমি বিশুদ্ধ সরকারি সম্পত্তি। জুম চাষের জন্য সংশ্লিষ্ট চাষী খাস পাহাড় ও বনকে ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচন করে এবং ঐ বেআইনী কাজটির জন্য সে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী। সে ঐ জুম ভূমির জন্য কোন খাজনা দেয় না। তার পরিশোধিত জুম কর পারিবারিক দায়। জুম ভূমিটিও নির্দিষ্ট হয় না, এবং তা ভোগকারী চাষীর দ্বারা পরিত্যক্ত হয়। অবৈধ হওয়া সত্ত্বেও জুম চাষে বাধা দান, এবং তজ্জন্য কাউকে অভিযুক্তও করা হয় না। কারণ বিপুল সংখ্যক উপজাতীয় গরিব লোক তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য এ পেশার উপর একান্তভাবে নির্ভরশীল। তারা লাঙ্গল চাষ, মজুরী ও ব্যবসায়িক কাজেও অভ্যস্ত নয়। সরকার তাদের এই অসহায়তার প্রতি সহানুভূতিশীল। সুতরাং অবৈধ জুম চাষ করতে দেয়া একটি উদারতা। এটি সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসকারী গুরুতর অপরাধের কাজ বলে তবুও গণ্য।
এই উদারতাকে পুঁজি করে এখন দাবী করা হচ্ছে, জুম ভূমি উপজাতিদের দখলাধীন সামাজিক সম্পত্তি। হোক খাস, তবু তা উপজাতিদের জন্য নির্দিষ্ট। বিনা বন্দোবস্তিতে উপজাতিরা চিরকাল তা ভোগ দখল করে আসছে এবং তাতেই তাদের উক্ত জমিজমার উপর অবাধ অধিকার বর্তেছে। এটা এক অলঙ্ঘনীয় ঐতিহ্য। এর কোনো ভিন্নতা হতে পারে না। কোনো ভিন্ন সম্প্রদায়কে তা বন্দোবস্তি বা ইজারা দান বা অন্য কোনো ভিন্ন উদ্দেশ্যে এর ব্যবহার, পাহাড়ীদের জীবন ও জীবিকার উপর হস্তক্ষেপের শামিল। অন্য কারো দ্বারা বন করা, বাগান করা, শিল্প গড়া, বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার পাহাড়ী স্বার্থের বিরোধী। এ হল একদল সংখ্যালঘু উপজাতীয় লোকের সম্মিলিতভাবে আইন অমান্য ও একগোয়ে আচরণ করার পক্ষে যুক্তি। বিষয়টি স্পর্শকাতর ও জটিল।
গোটা কয়েক ব্যতিক্রম বাদে বাজার, মৌজা ও সার্কেলগুলো উপজাতীয় বাজার চৌধুরী, কারবারী, হেডম্যান ও চীফদের নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত। এ হলো প্রচলিত আইন হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েল সৃষ্ট ভূমি প্রশাসন ব্যবস্থা। যদিও মূল ভূমি প্রশাসন ডেপুটি কমিশনারদের দায়িত্ব এবং তাঁদের পক্ষে চীফ, হেডম্যান, কারবারী ও বাজার চৌধুরীরা মাসোহারা ও কমিশন ভোগী এজেন্ট মাত্র। তবু এই ঠুনকো ক্ষমতার বলে চীফ হেডম্যান, কারবার্রী ও বাজার চৌধুরীরা আপনা আপনি সর্বেসর্বা কর্তা। এ কারণেই পাহাড়ীদের ধারণা পার্বত্য অঞ্চলের জায়গা জমিতে তাদের অধিকার ও কর্তৃত্ব ঐতিহ্য ভিত্তিক।
ভূমি প্রশাসনকে এই কোটারীর কবল থেকে মুক্ত করা না হলে, সরকারি কর্তৃত্ব পুনঃস্থাপিত হবে না, এবং তার একমাত্র উপায় হলো পরিপূর্ণ সরকারি তহসিলদারী ব্যবস্থার প্রবর্তন। তজ্জন্য প্রয়োজন : হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েলের দ্বারা প্রবর্তিত চীফ শীফ ও হেডম্যান প্রথার অবসান। ভূমি প্রশাসন দায়িত্বে তহসিলদার ও খরিদ বিক্রিতে রেজিস্ট্রার নিযুক্ত করা হলে, গোটা পার্বত্য ভূমি নিয়ন্ত্রণ নিরুপদ্রব হবে। পার্বত্য শাসন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায়, প্রয়োজনীয় সংশোধনি এনে তা সহজেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এমনি এই আইনে বহু সংশোধনি এসেছে। রহিত করণ আইন প্রণয়ন করেও পার্বত্য শাসন আইনটি বহাল রাখা হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় আইনটি প্রয়োজনীয় বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে তাকে যুগোপযোগী ও প্রয়োজনীয় লক্ষ্য সম্পন্ন করা হোক।
পাকিস্তান আমলের শুরুতে পঞ্চাশের দশকে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের চীফ শীপ ও হেডম্যান প্রথা জমিদারী না হলেও অবশ্যই তদ্রুপ সামন্তীয় ব্যবস্থা। এখানে জমির মালিক সরকার, তবে তার খাজনার একাংশের ভাগিদার হলেন চীফ হেডম্যান, বাজার চৌধুরী ও কারবারীরা। জুম করের ৮০% তাদের প্রাপ্য, যা সামন্ত ব্যবস্থা। এটা বজায় রাখা মানে উপজাতীয় অভিজাত শ্রেণিকে ভূমির সাথে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট রাখা এবং জুমিয়াদের তাদের প্রজায় পরিণত করা। এটা স্বাধীনতার পরিপন্থী।
চীফ ও হেডম্যানেরা খাস জমি জমাকে বেসরকারিভাবে পত্তন দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে তার বদলা ব্যক্তিগত নজরানা ও সালামী আদায় করে থাকেন, যার অংশ বিশেষও সরকারি তহবিলে জমা হয় না। খাস জমি বন ও পাহাড়ে উৎপাদিত প্রাকৃতিক পণ্যাদি আহরণ ও খরিদ বিক্রির খবরদারীতেও তাদের বিস্তর অবৈধ আয় রোজগার হয়ে থাকে। সামাজিক বিচারে আরোপিত নগদ জরিমানায়ও তাদের ভাগ প্রাপ্য। এ হলো আইনের মাধ্যমে আরোপিত অন্যায় সুযোগ-সুবিধা লাভের উদাহরণ। স্বাধীন দেশে এগুলো অচল।
[চলবে]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • উনিশ শতকে সিলেটের সংবাদপত্র
  • হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশঝাড় চাষের নেই উদ্যোগ
  • হারিয়ে যাচ্ছে বেদে সম্প্রদায়ের চিকিৎসা ও ঐতিহ্য
  • একটি হাওরের অতীত ঐতিহ্য
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • Developed by: Sparkle IT