ইতিহাস ও ঐতিহ্য

খুন ও ধর্ষণ করেছে চরমপন্থিরাও

তাজুল মোহাম্মদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৬-২০১৮ ইং ০৩:২৬:১৩ | সংবাদটি ৯৫ বার পঠিত

সিরাজ শিকদার এক আলোচিত চরিত্র। স্বাধীনতা উত্তরকালে শ্রেণি শত্রু খতমের স্লোগান তুলেন। সংঘটিত করতে থাকেন একের পর এক হত্যা কান্ড। বুর্জোয়াদের হত্যা করে বাংলাদেশে মেহনতি মানুষের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার এক মুখরোচক স্লোগান দিয়ে দেশপ্রেমিক তরুণদের বিভ্রান্ত করা হয়। তারা সিরাজ শিকদারের সঙ্গেঁ শ্রেণি শত্রু খতমের আওয়াজ তুলে। হাতে নিয়েছিল অস্ত্র। শ্রেণি শত্রু খতমের নামে মানুষ খুন করতে থাকে একের পর এক। ষাটের দশকের শেষ প্রান্তে এই বিভ্রান্তির শুরু। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে গোটা জাতি সম্পৃক্ত হলেও তাদের লাইন ছিলো ভিন্ন।
সমাজতন্ত্রে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঊনবিংশ শতাব্দি থেকেই বিশ্বের দেশে দেশে আন্দোলন শুরু হয়। রাশিয়ায় বলশেভিক পার্টির ক্ষমতা দখলের পর প্রতিটি দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো প্রেরণা লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার বিজয়, সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন ইত্যাদি ভীষণভাবে উজ্জীবিত করে কমিউনিস্টদের। তারপর বিংশ শতাব্দীর ঠিক মধ্যভাবে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে চীনের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে কমিউনিস্টরা। এসব ঘটনার পর সমাজতন্ত্রী সাম্যবাদিদের পালে লাগে দমকা হাওয়া। আকৃষ্ট হয় যুবকরা। এরকম একটি অবস্থায় মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব দেখা দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে। ফলশ্রুতিতে ভাঙ্গঁনের সুর বেজে ওঠে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট শিবিরে। প্রভাব পড়লো বাংলাদেশেও। তখন ছিলো পাকিস্তানের একটি প্রদেশ মাত্র। পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টিও বিভক্ত হয়ে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীনের লাইন অনুসরণ করতে গিয়ে। একটি অংশ পরিচিতি লাভ করে মস্কোপন্থি হিসেবে। আর অপর অংশের গায়ে তকমা লাগে পিকিং (বর্তমানে বেইজিং) পন্থির।
কমিউনিস্ট পার্টির অনুসারি ছাত্র সংগঠন ছিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। প্রথম ধাক্কাটা লাগে সেখানেই। দ্বি-খন্ডিত হলো ছাত্র ইউনিয়ন। ব্র্যাকেটবন্ধি একটি গ্রুপের পরিচয় তখন মতিয়া গ্রুপ (আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য এবং কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর নামে)। অপর অংশ পরিচিতি পায় মেনন গ্রুপ (ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের নামানুসারে)। বিভক্ত হলো কমিউনিস্ট পার্টির শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনও। কিন্তু দ্বিধা বিভক্তিতেই বিভক্তির অবসান হলো না। গ্রুপ ভেঙ্গেঁ ভেঙ্গেঁ সৃষ্টি হতে থাকে উপগ্রুপ। বিপ্লবী থেকে অতি বিপ্লবী। তারপর প্রতি বিপ্লবী। মস্কো থেকে পিকিং পন্থি হয়ে চরমপন্থি। শ্রেণি শত্রু খতমের নামে খুন-গুম, হত্যা, গণহত্যা, ডাকাতি। অর্থ ও সম্পদ হাতিয়ে নেয়া। এদেরই একটি গ্রুপের নেতা সিরাজ শিকদার।
বর্তমান শরীয়তপুর জেলায় রয়েছে ভেদরগঞ্জ নামে একটি উপজেলা। সেখানেই সিরাজ শিকদারের জন্ম। মেধাবী ছাত্র ছিলেন অধ্যয়নকালে। আকৃষ্ট হন সমাজতন্ত্রের বুলি শুনে শুনে। গ্রহন করেন চরমপন্থি লাইন। বুর্জোয়াদের পেটি বুর্জোয়াদের হত্যা করে করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখান কিছু যুবকদের। বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে ওরা। তাদের গ্রুপই পরবর্তীতে দেশব্যাপী পরিচিতি পায় সর্বহারা পার্টি হিসেবে। আর, নেতা হলেন সিরাজ শিকদার।
কমিউনিস্ট পার্টির যে গ্রুপটি মাওবাদি বা পিকিং পন্থি লাইন গ্রহণ করেছিল মুক্তিযুদ্ধকালে তাদের মধ্যে দেখা দেয় নতুন বিভ্রান্তি। চীন আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেনি। বরং বিরোধীতা করে পাকিস্তানকে সাহায্য করেছে। দিয়েছে অস্ত্র-গোলা বারুদ, সামরিক সরঞ্জাম এবং নৈতিক সমর্থন। বর্হিবিশ্বেও পাকিস্তানের পক্ষে চালিয়েছে প্রচারণা। চীনের এই নীতি বিভ্রান্তিতে ফেলে বাংলাদেশে চীনপন্থি দলগুলোকে। চীনপন্থিদের প্রধান দল তখন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী গ্রুপ) এবং প্রধান নেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাঁর অবস্থান হলেও পার্টির সাধারণ সম্পাদক মসিউর রহমান যাদু মিয়া ছিলেন বিরুদ্ধে। পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর সমর্থক-দালাল। এভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলগুলোও দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কোনো কোনো গ্রুপ পুরোপুরিই পাকিস্তানের পক্ষে। আবার কারো মতে মুক্তিযুদ্ধ ছিল দুই কুকুরের লড়াই। সিরাজ শিকদারও সে দলের অন্তর্ভুক্ত।
নিজের গ্রুপ নিয়ে সিরাজ শিকদার সুন্দরবনের কাছাকাছি আটঘর কুড়িয়ানায় আস্তানা গাড়েন। সেখানে হত্যা করেছেন গরিব কৃষক, পেয়ারা চাষী, ছাত্র-যুবকদের। হত্যা করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। সিরাজ শিকদার মুক্তিযোদ্ধাদের বলেছেন, ‘এটি মুক্তিযুদ্ধ নয়, মুক্তিযুদ্ধ হতে পারে না। ইহা ¯্রফে দুই কুকুরের লড়াই।’ তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের আহবান জানিয়ে বলেছেন- তার সঙ্গে যোগ দিতে। এক সঙ্গেঁ শ্রেণি শত্রু খতমের লড়াই চালিয়ে যেতে। তার আহবানে সাড়া না দেয়াতে হত্যা করেছেন বাংলার সূর্য সন্তানদের অনেককে। গ্রুপের অধিকাংশই প্রাণ রক্ষা করেছেন সেখান থেকে পালিয়ে। যে গ্রুপের মুক্তি সেনাদের হত্যা করেছে সিরাজ শিকদার গ্রুপ- সে গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন কমিউনিস্ট ও ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আনোয়ার জাহিদ। সে সময় ছাত্র ইউনিয়ন বরিশাল জেলা (বর্তমান বিভাগীয়) শাখার সহ সভাপতি। তার নিজ জেলা ঝালকাঠি তখন ছিল একটি থানা মাত্র (পরে মহকুমা এবং বর্তমানে জেলা)। সেখানে ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি। কমিউনিস্ট পার্টিতে সম্পৃক্ত হয়ে পার্টির নির্দেশেই আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়েছেন তিনি। তার অধিনস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই শহীদ হয়েছে সিরাজ শিকদার বাহিনীর হাতে।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্নে আনোয়ার জাহিদ ছিলেন বর্তমান ঝালকাঠি জেলার কৃতি পাশায়। কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশানুযায়ী কাজ করছিলেন সেখানে। ছাত্র ইউনিয়ন গড়ে তুলেছেন সে অঞ্চলে তিনি। ফলে নিজের একটি পরিচিতি তৈরি হয়েই ছিল। যে কারণে কাজ করা সহজ হয়ে ওঠে তার পক্ষে। অন্যদিকে এপ্রিল মাসের শেষ দিকে পাকিস্তানী হানাদার সৈন্যরা দৃষ্টি প্রসারিত করে ঝালকাঠির দিকে। একদিন খুলনা বরিশাল হয়ে কৃর্তিনাশা দিয়ে লঞ্চ ছাড়ে সুগন্ধা নদীতে। সেই সুগন্ধা তীরে দক্ষিণ বঙ্গের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসা কেন্দ্র ঝালকাঠি। লঞ্চঘাট থেকে মূল শহর তখন ছিল একটু দূরত্বে। মধ্যখানে রাস্তার দু’পাশে বাড়ি ঘর। পাকিরা অবতরণ করে লঞ্চ থেকে। তারপর দু’পাশের ঘর বাড়িতে ছড়িয়ে দেয় আগুনের লেলিহান শিখা। জ্বলছে আগুন প্রতিটি বাড়িতে। পুড়ছে বাড়ি ঘর এবং গাছপালা। পুড়ছে গৃহপালিত পশুপাখি। মরছে মানুষ। একই সঙ্গে পশু পাখি। একই রকম ছাই ভস্মে পরিণত হচ্ছে মানুষের দেহ, বৃক্ষলতা আর গরু ছাগল। পাখি শিকারের ন্যায় মানুষ শিকার করে চলেছে হায়নারা। কতো লোক হত্যা করেছিল সেদিন সে হিসেব কষা আজ খুবই দূরূহ কাজ। সে সময়ের ছাত্রনেতা আনোয়ার জাহিদ সেদিনের হত্যাকান্ড সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, ‘পাকিস্তানী সৈন্যরা ষ্টিমার ঘাট থেকে শহর অবধি অসংখ্য মানুষ হত্যা করেছিল। লক্ষ বিহীন ছুড়েছে বুলেট। যেখানে যাকে পেয়েছে তাকেই হত্যা করেছে। ধরাও পড়েছিলেন বহু লোক। নিয়ে গেছে তাদেরকে সঙ্গে করে। এই হতভাগ্যদের শেষ পরিণতি সম্পর্কেও জানা যায়নি কিছুই। একই সঙ্গে লুটপাট করেছে গোটা শহর। এই লুটতরাজ থেকে রেহাই পায়নি কিছুই। লুট করে নিয়েছে বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, অফিস-আদালত সব-সবই। নারী ধর্ষণের মতো গর্হিত ঘটনাও ঘটেছে অসংখ্য। আর ঝালকাঠি লঞ্চঘাট ব্যতিত শহরের কোথাও একটি ঘরও রেহাই পায়নি আগুনের লেলিহান শিখা থেকে। খুবই দুঃখজনক সংবাদ হলো ঝালকাঠি থেকে বহু হিন্দু মেয়েকে তুলে নিয়ে যায় ওরা সঙ্গে করে। আর, কত রকমের নির্যাতন তা বলে শেষ করা যাবে না।
সে দিনই আনোয়ার জাহিদ স্বরূপকাঠিতে নুরুল ইসলাম মুনশীর বাড়ি থেকে ছুটে যান ঝালকাঠি। তারপর পালিয়ে যান কৃর্তিপাশা। কিছুদিন সেখানে অবস্থানের পর নিজের গ্রুপ নিয়ে চলে যান আটঘর কুড়িয়ানা। সেখানে অবস্থান করে করে চারপাশে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে অপারেশন করার প্রস্তুতি চালান। সংগঠিত গ্রুপকে সংহত করতে থাকেন তিনি। আনোয়ার জাহিদের মতে মে-জুন মাসের দিকে সেই আটঘর-কুড়িয়ানাতেই অবস্থান নিয়েছিলেন সিরাজ শিকদার। তার দলের নাম তখন পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন। তিনি নিজের সমস্ত শক্তি সেখানে নিয়োজিত করেন। নিয়ে আসেন সাইক্লোস্টাইল মেশিন, আগ্নেয়াস্ত্র রসদপত্র এবং সমস্ত ক্যাডার। অস্ত্রের মহড়া দিতে শুরু করেন চার দিকে। আনোয়ার জাহিদ গ্রুপের সংবাদও সংগ্রহ করেন তিনি সঠিকভাবে। সব কিছু বিচার বিশ্লেষণ করেই ওরা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে থাকে। তারপর ধরে নিয়ে যায় আনোয়ার জাহিদ নামে (অন্য আনোয়ার জাহিদ) এক যোদ্ধা এবং যতীন কর্মকারকে।
সিরাজ শিকদার বাহিনী ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টির গেরিলা বাহিনীর আরো অনেককে ধরে নিয়ে যায়। তারপর হত্যা করেছে নৃশংসভাবে। দলনেতা আনোয়ার জাহিদ এর দীর্ঘ বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘সিরাজ বাহিনী অন্ততঃ ১০ জনকে হত্যা করেছিল। তাঁরা হলেনÑ কবি ও সাংবাদিক (দৈনিক সংবাদে কর্মরত) শশাংক পাল, পিতা সুশীল রঞ্জন পাল, (স্বরাজ) গ্রাম- কৃর্তিপাশা, ঝালকাঠি। আব্দুস সত্তার, ছাত্র ইউনিয়ন, কৃর্তিপাশা। রঙ্গঁলাল পাল, ছাত্র ইউনিয়ন, কৃর্তিপাশা। শ্যামল রায়ের এক বোন (নাম অঞ্চলি রায়) কৃর্তিপাশা। শশাংক পালের বোন টুলু পাল ঝালকাঠি কলেজের ছাত্রী। যতীন্দ্রনাথ কর্মকার, কৃর্তিপাশা (প্রবীন কমিউনিস্ট নেতা)। মেনন গ্রুপ ছাত্র ইউনিয়নের মুজিব, ঝালকাঠি। মেনন গ্রুপ ছাত্র ইউনিয়নের মালেক, ঝালকাঠি। জেলা স্কুলের ছাত্র পাথর ঘাটার সেলিম শাহ নেওয়াজ।
এই সহযোদ্ধাদের সবাইকে সিরাজ শিকদার নিজেই হত্যা করেছেন। এর আগে আমাকে একটি চিঠি দিয়ে জানায় আমাদের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠক করতে চান তিনি। জানালাম আমিতো শীর্ষ নেতা নই। শীর্ষ বৈঠক কেমন করে হবে? আমি পার্টির একজন কর্মি মাত্র। কিন্তু জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক নলিনি দাসের (প্রয়াত) পরামর্শে সিরাজ শিকদারের সঙ্গে বসতেও রাজি হলাম। এর আগেই সিরাজ শিকদারের সঙ্গে পরিচয় ছিল আমার। মালিবাগে ‘মাও সেতুং চিন্তাধারা কেন্দ্রে’ গিয়েছিলাম। গ্রামের বাড়ি শরিয়তপুরের ভেদরগঞ্জ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৌশলী হিসেবে বের হয়ে তারপর এই লাইনে চলে যাব। যাই হোক বৈঠকের ব্যবস্থা হলো। গানম্যানসহ আসেন তিনি। আর, আমার সঙ্গেও একজন নিতে বলেন। আমি নিয়ে যাই যতীন দাকে। সিরাজ বললেন, এই এলাকায় আমাদের সুনাম আছে। মানুষ আমাদেরকে ভালোবাসে। আমাদের সঙ্গে একত্রে কাজ করতে চান। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রাম- মুক্তিযুদ্ধ এসব শব্দে তার আপত্তি। এটি মুক্তিযুদ্ধ নয়- তিনি মন্তব্য করেন- দুই কুকুরের লড়াই বলে।’ এর প্রতিবাদ করি আমি। ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন এক কুকুর ইয়াহইয়া এবং অপর কুকুর মুজিব। অন্যভাবে বললে এক কুকুর পাকিস্তান, অপর কুকুর ইন্ডিয়া। এর প্রতিবাদ করে জানালাম এ বক্তব্যের পর তার সঙ্গে আলোচনার কোনো অভিপ্রায় আর আমাদের নেই। সেখানেই সমাপ্তি ঘটে আলোচনার।
আনোয়ার জাহিদ বলেন, পরবর্তী ঘটনা। গিয়েছেন একটি গ্রামে। কৃষকদের নিয়ে একটি বৈঠক করেছেন। সাথে একটি দু’নালা এবং একটি এক নালা বন্দুক। কয়েকটি রামদাও এবং লাঠি। তিনি বলছিলেন, ‘আমার নিজের হাতে না বন্দুক, না রামদাও। ছিল একটি লাঠি। তাই নিয়ে যাচ্ছি আস্তানার দিকে। হঠাৎ দেখি বড় রাস্তায় ৫ ব্যাটারি টর্চের তীব্র আলো। আমাদের চোখে টর্চের আলো দিয়ে অন্ধ করে দেয়। কিছুই যে দেখতে পারছি না। মুহূর্তের মধ্যে ওরা ঘেরাও করে ফেলে আমাদেরকে। হাত উপরে তোলার নির্দেশ পেলাম আমরা। হ্যাঁ, তা-ই করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না। সিরাজ শিকদারের এই গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন শশাংক পাল। ও আমার ভালো বন্ধ্।ু বললেন আমায় হত্যা করার জন্যেই এসেছেন। তাকে এই দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে, আজ রাতেই যদি আটঘর কুড়িয়ানা ছেড়ে চলে যাই তা হলে আমাকে ছেড়ে দিতে পারেন। প্রাণ রক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য রাতে শশাংকের কথা মতো এলাকা ছেড়ে চলে যাই ভিমরুলা গ্রামে। সাথে ছিলেন কালাচান্দ সাহা (বর্তমানে ভারতে বসবাসরত)। তারপর আবার ভোর রাতে নৌকা করে বাকেরগঞ্জের একটি গ্রামে অবস্থান করেছি সেখানে দশ বারো দিন। এরপর আবার বরিশালের বাখেরগঞ্জ উপজেলাধীন অন্য একটি গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেই। সেখানেও আসে পাকিস্তানি সেনা বাহিনী। তাই বেশি দিন অবস্থান করা সম্ভব হলো না। আমরা চলে যাই মটবাড়িয়ায়। সেখানকার বিভিন্ন গ্রামে কাটিয়েছি সময়। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট করে ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থাও করেছিলাম। কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশ অনুযায়ী এসব কাজ করেছি আমি।
এই যে শহীদ যারা সবাই ছিলেন এক সময়ের ছাত্র ইউনিয়ন কর্মি। সংগঠন দ্বিধা-বিভক্ত হবার পর কেউ কেউ ছিলেন মেনন গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারপর গালভরা সমাজতন্ত্রের বুলিতে বিভ্রান্ত হয়েছেন অনেকেই। যোগ দিয়েছেন তারা সিরাজ শিকদারের পূর্ব পাকিস্তানের শ্রমিক আন্দোলনে। তাদের সবাইকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালে সিরাজ শিকদার আশ্রয় নেন পেয়ারা বাগান এলাকায়। ধীরে ধীর গ্রুপটি সেখানে লুটপাট করতে শুরু করে পাকি বাহিনী এবং রাজাকার বাহিনীর ন্যায়। তা করতে গিয়ে হত্যা করেছে ওরা সাধারণ মানুষকে। পুড়িয়েছে তাদের বাড়িÑঘর। তুলে নিয়ে গেছে সুন্দরী তরুণীদের। এসব অপকর্মের প্রতিবাদ যারা করেছেন তাদেরকেই হত্যা করেছেন সিরাজ শিকদার। সে অন্য গ্রুপেরই হোক আর নিজের দলের লোকই হোক। এ কারণেই হত্যা করেছেন তিনি শশাংক পালকে, আব্দুস সাত্তারকে, মুজিব, মালেক, শাহ নেওয়াজ, শ্যাামল, রঙ্গঁলালকে। অঞ্জলি রায় টুলু পালদের তুলে নেবার পর শেষ পরিণতি সম্পর্কে জানে না কেউ।
সিরাজ শিকদার গ্রুপ নারী-ধর্ষক, নারী নির্যাতনকারী, নারী হন্তারক। এ বিষয়টা প্রমান করার জন্যে বেশি গভীরে যেতে হবে না। মানুষ গড়ার কারিগর অঞ্জলি রায় এবং কলেজ ছাত্রী টুলু পাল স্বাক্ষ্য দেয় এসব ঘটনার। তাদেরকে তুলে নিয়ে গিয়েছে সিরাজ শিকদার বাহিনী। তারপর আর ফিরে আসেন নি। পরবর্তীতে আত্মীয়-স্বজন এবং এলাকাবাসী ঐ গ্রুপের সদস্যদের নিকট থেকেই জেনেছেন তাঁদের ওপর পরিচালিত নির্যাতনের ভয়াল চিত্র। শিউরে ওঠেছেন স্বজনরা। অশ্রুসিক্ত হয়েছে গ্রামবাসিও। কেঁপে ওঠেছে মানবতা। কেঁদেছে মানুষ। কিন্তু বিচার হয়নি এ সব হত্যাকান্ডের। দৈনিক সংবাদের সাংবাদিক ছিলেন শশাংক পাল। লিখতেন কবিতাও। দু’ভাবেই ছিল তার পরিচিতি। অপর দিকে বামপন্থি রাজনীতিক। ছাত্র জীবনে করেছেন ছাত্র ইউনিয়ন। সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন তখনই। একটি অসাম্প্রদায়িক, সমতা ভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন লালন করতেন অন্তরে। কিন্তু হটকারি রাজনীতির বলি হলেন তিনি। আব্দুস সাত্তার, রঙ্গঁলাল পাল, মুজিবুর রহমান, আব্দুল মালেক, সবাই ছিলেন এক সময়ের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা-কর্মি। সেলিম শাহ নেওয়াজ, টুলু পাল, অঞ্জলি রায়- সবাই অন্তরে লালন করতেন সমাজতন্ত্র নামক সুখি সমৃদ্ধশীল সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন। তাঁরা চেয়েছিলেন সন্ত্রাস, মৌলবাদ বিরোধী একটি বিজ্ঞান ভিত্তিক সমাজ। সেখানে থাকবে না হত্যা, ধর্ষণ প্রভৃতি ভয়ংকর শব্দ। পরের প্রজন্ম অভিধান ব্যতিত কোথাও পাবে না সেই সব শব্দের অস্তিত্ব। অথচ তাঁরাই শিকার হলেন এরকম শব্দের দ্বারা পরিচিত ন্যাক্কারজনক ঘটনার। আর এসব ঘটনার স্বাক্ষী আনোয়ার জাহিদ নিজেই বর্ণনা দিয়েছেন ঘটনাবলির।
শুধু এই একটি মাত্র ঘটনা বিশ্লেষণ করলেই কি মনে হয় পাকিস্তানি সেনা বাহিনী যা যা করেছে, রাজাকার-আল বদর, জামায়াতে ইসলামি যা করেছে অতিবাস এবং চরম পন্থিরাও তাই করেছে। পাকিস্তানি সেনা বাহি

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • উনিশ শতকে সিলেটের সংবাদপত্র
  • হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশঝাড় চাষের নেই উদ্যোগ
  • হারিয়ে যাচ্ছে বেদে সম্প্রদায়ের চিকিৎসা ও ঐতিহ্য
  • একটি হাওরের অতীত ঐতিহ্য
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • Developed by: Sparkle IT